ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
দিনাজপুরে কোটি টাকার প্রত্নসম্পদ উদ্ধার ব্রাজিলের বিদায়ে অবাক হননি পারেদেস ফিলিস্তিনিদের জন্য যার অনুভুতি নেই সে ‘মানুষই নয়’: মিশর কোচ আজকের মুদ্রার বাজার: ৭ জুলাই, ২০২৬ কোমে পৌঁছেছে খামেনির মরদেহ ন্যাটো সম্মেলনের আগে মস্কোর দিকে ৪ শতাধিক ড্রোন নিক্ষেপ ইউক্রেনের বিলাসী যুবক থেকে ছেঁড়া চাদরের শহিদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলের বৈঠক জুনে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.১৬ শতাংশ চীনে বন্যা ও বজ্রঝড়ে ১০ জনের প্রাণহানি যশোর-মাগুরা মহাসড়কে রহস্যজনক প্রাইভেটকার উদ্ধার বিশ্বকাপে কোনো দলই একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারছে না: স্কালোনি দিনাজপুরে অপহরণ ও চাঁদা দাবির অভিযোগে যুব নাগরিক শক্তির নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫ ৬ দিন বিরতির পর বসছে সংসদ অধিবেশন হাতিয়ায় মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ মিলনের মরদেহ উদ্ধার মাদারীপুরে ডিবি পুলিশের ওপর হামলা করে আসামি ছিনতাই পদত্যাগ করলেন রবার্তো মার্তিনেস পটিয়া পৌরসভার তিন  টেন্ডার নিয়ে বিতর্ক, বিক্ষুব্ধ স্থানীয় ঠিকাদাররা সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটিতে শুরু হয়েছে ফল আপরাইজ অ্যাডমিশন ফেয়ার জাকার্তা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর, ঢাকা ‘সহনীয়’ অবস্থানে পেকুয়ায় পাহাড় ধসে ১ শিশু নিহত সাজেকে কীটনাশকে প্রস্তুত চা পান করে অসুস্থ ১২ গ্রামবাসী সিলেটে ব্যবস্থাপনা ও ইজারা নিয়ে সিসিক-বাজার কমিটি দ্বন্দ্ব যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের পর লুকাকুর ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ডান্স’ ভাইরাল বালোগুনের লাল কার্ড বিতর্কে রেফারির পাশে ফিফা সোনারগাঁয় এসএসসি পরীক্ষার্থীকে অপহরণের অভিযোগ লিডিং ইউনিভার্সিটি বিএনসিসি প্লাটুনের কালেক্টিভ ক্যাম্পে গৌরবময় অর্জন আবারও ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনিকে ট্রাম্পের খোঁচা ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় কীভাবে উদযাপন করলেন হালান্ড? ফাঁশ করলেন বান্ধবী ৫ বিভাগে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস

মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২১ এএম
মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া
কাচারিঘাটের নার্সারিতে গোলাপি বন পিটুনিয়া। ছবি: লেখক

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর ও কষ্টসহিষ্ণু ফুল হলো বন পিটুনিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ruellia simplex, এটি Acanthaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ Mexican Petunia, Mexican Bluebell, Brittons Wild Petunia নামে পরিচিত। এর নামের সঙ্গে বিখ্যাত ‘পিটুনিয়া’ ফুলের মিল থাকলেও এটি কিন্তু প্রকৃত পিটুনিয়া নয়। কেবল ফুলের আকৃতিগত মিলের কারণে একে বন পিটুনিয়া বা মেক্সিকান পিটুনিয়া বলা হয়। এর চোখজুড়ানো বেগুনি, নীল বা গোলাপি আভা যেকোনো বাগানকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলে।

নামেই প্রকাশ পায় এর আদি নিবাস মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা। তবে এর চমৎকার অভিযোজনক্ষমতার কারণে এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গৃহকোণ, ছাদবাগান, সরকারি পার্ক এবং রাস্তার ডিভাইডারে এখন প্রায়ই এই ফুলের দেখা মেলে।

বন পিটুনিয়া বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ড খাড়া এবং কিছুটা চৌকো আকৃতির হয়। কাণ্ডের রং গাঢ় সবুজ, তবে অনেক সময় এতে বেগুনি বা কালচে রঙের ছোঁয়া দেখা যায়।

এর পাতাগুলো ল্যান্সের মতো (Lance-shaped) লম্বাটে ও সূক্ষ্ম অগ্রভাগযুক্ত হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের এবং কাণ্ডের বিপরীতমুখী জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত থাকে। পাতার শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট। 

ডালের ডগায় বা পাতার কোণ থেকে এককভাবে বা থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা ফানেল বা মাইকের মতো। এর পাঁচটি নরম পাপড়ি থাকে। সাধারণত উজ্জ্বল বেগুনি বা নীলচে বেগুনি রঙের ফুল বেশি দেখা গেলেও এর কিছু প্রজাতিতে গোলাপি কিংবা সাদা রঙের ফুলও ফুটতে দেখা যায়। এই ফুলের একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ফুল ফোটার পর মাত্র এক দিন বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সাধারণত সকালে ফোটে এবং বিকেলের দিকে ঝরে যায়। তবে গাছটিতে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণে নতুন ফুল ফোটে যে বাগান কখনোই ফুলশূন্য মনে হয় না। মে থেকে শরৎকাল পর্যন্ত এতে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে।

বন পিটুনিয়া শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর কিছু বিশেষ পরিবেশগত ও ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। কম যত্নে দারুণ ফলন পাওয়ায় আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং বা বাগান সাজানোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ। বর্ডার প্ল্যান্ট (সীমানা ঘেঁষে লাগানো গাছ) হিসেবে কিংবা দলবদ্ধভাবে লাগালে এটি দারুণ এক বেগুনি চাদরের আবহ তৈরি করে।
 
এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির। তীব্র খরা, প্রচণ্ড গরম কিংবা অতিরিক্ত আর্দ্রতা–সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেই এটি বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি সহজে মানিয়ে নেয়। যারা বাগানে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি দারুণ পছন্দ।

এর উজ্জ্বল রং এবং মিষ্টি মধু মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ডের মতো পরাগায়নকারী পাখিদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। ফলে আশপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম সচল রাখতে এটি সাহায্য করে।

লোকজ চিকিৎসায় রুয়েলিয়া গণের কিছু উদ্ভিদের মূল ও পাতা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্ট উপশমে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এর ব্যবহার সীমিত।

বন পিটুনিয়ার একটি নেতিবাচক দিক হলো এর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা। এর বীজ ক্যাপসুল ফেটে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত নতুন চারা গজায়। আমেরিকার ফ্লোরিডায় একে আক্রমণাত্মক আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই বাগানে লাগানোর সময় এটি যেন চারপাশের দেশীয় উদ্ভিদকে গ্রাস না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। টবে বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চাষ করা এর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বভাব থাকা সত্ত্বেও সঠিক নিয়মনীতি ও ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বন পিটুনিয়াকে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা যায়। কম পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে ফুলের মায়া উপভোগ করতে চাইলে বন পিটুনিয়ার জুড়ি মেলা ভার।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ 

মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২১ এএম
মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া
কাচারিঘাটের নার্সারিতে গোলাপি বন পিটুনিয়া। ছবি: লেখক

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর ও কষ্টসহিষ্ণু ফুল হলো বন পিটুনিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ruellia simplex, এটি Acanthaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ Mexican Petunia, Mexican Bluebell, Brittons Wild Petunia নামে পরিচিত। এর নামের সঙ্গে বিখ্যাত ‘পিটুনিয়া’ ফুলের মিল থাকলেও এটি কিন্তু প্রকৃত পিটুনিয়া নয়। কেবল ফুলের আকৃতিগত মিলের কারণে একে বন পিটুনিয়া বা মেক্সিকান পিটুনিয়া বলা হয়। এর চোখজুড়ানো বেগুনি, নীল বা গোলাপি আভা যেকোনো বাগানকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলে।

নামেই প্রকাশ পায় এর আদি নিবাস মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা। তবে এর চমৎকার অভিযোজনক্ষমতার কারণে এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গৃহকোণ, ছাদবাগান, সরকারি পার্ক এবং রাস্তার ডিভাইডারে এখন প্রায়ই এই ফুলের দেখা মেলে।

বন পিটুনিয়া বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ড খাড়া এবং কিছুটা চৌকো আকৃতির হয়। কাণ্ডের রং গাঢ় সবুজ, তবে অনেক সময় এতে বেগুনি বা কালচে রঙের ছোঁয়া দেখা যায়।

এর পাতাগুলো ল্যান্সের মতো (Lance-shaped) লম্বাটে ও সূক্ষ্ম অগ্রভাগযুক্ত হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের এবং কাণ্ডের বিপরীতমুখী জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত থাকে। পাতার শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট। 

ডালের ডগায় বা পাতার কোণ থেকে এককভাবে বা থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা ফানেল বা মাইকের মতো। এর পাঁচটি নরম পাপড়ি থাকে। সাধারণত উজ্জ্বল বেগুনি বা নীলচে বেগুনি রঙের ফুল বেশি দেখা গেলেও এর কিছু প্রজাতিতে গোলাপি কিংবা সাদা রঙের ফুলও ফুটতে দেখা যায়। এই ফুলের একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ফুল ফোটার পর মাত্র এক দিন বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সাধারণত সকালে ফোটে এবং বিকেলের দিকে ঝরে যায়। তবে গাছটিতে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণে নতুন ফুল ফোটে যে বাগান কখনোই ফুলশূন্য মনে হয় না। মে থেকে শরৎকাল পর্যন্ত এতে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে।

বন পিটুনিয়া শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর কিছু বিশেষ পরিবেশগত ও ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। কম যত্নে দারুণ ফলন পাওয়ায় আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং বা বাগান সাজানোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ। বর্ডার প্ল্যান্ট (সীমানা ঘেঁষে লাগানো গাছ) হিসেবে কিংবা দলবদ্ধভাবে লাগালে এটি দারুণ এক বেগুনি চাদরের আবহ তৈরি করে।
 
এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির। তীব্র খরা, প্রচণ্ড গরম কিংবা অতিরিক্ত আর্দ্রতা–সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেই এটি বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি সহজে মানিয়ে নেয়। যারা বাগানে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি দারুণ পছন্দ।

এর উজ্জ্বল রং এবং মিষ্টি মধু মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ডের মতো পরাগায়নকারী পাখিদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। ফলে আশপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম সচল রাখতে এটি সাহায্য করে।

লোকজ চিকিৎসায় রুয়েলিয়া গণের কিছু উদ্ভিদের মূল ও পাতা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্ট উপশমে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এর ব্যবহার সীমিত।

বন পিটুনিয়ার একটি নেতিবাচক দিক হলো এর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা। এর বীজ ক্যাপসুল ফেটে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত নতুন চারা গজায়। আমেরিকার ফ্লোরিডায় একে আক্রমণাত্মক আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই বাগানে লাগানোর সময় এটি যেন চারপাশের দেশীয় উদ্ভিদকে গ্রাস না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। টবে বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চাষ করা এর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বভাব থাকা সত্ত্বেও সঠিক নিয়মনীতি ও ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বন পিটুনিয়াকে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা যায়। কম পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে ফুলের মায়া উপভোগ করতে চাইলে বন পিটুনিয়ার জুড়ি মেলা ভার।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ 

কালো লেডিবার্ড বিটল

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
কালো লেডিবার্ড বিটল
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা কালো লেডি বিটল। ছবি: লেখক

২০১০ সালের বর্ষাকাল, মাঠে মাঠে আমন ধানের চারাগুলো কুশি ছেড়ে সোমত্ত হয়ে উঠছে। খুলনার দৌলতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আমার দিনের পর দিন কাটে সেসব ধানখেতের পোকা দেখতে দেখতে। রোজই এক-দুবার চক্কর দিই। হঠাৎ একটা ছোট্ট কালো রঙের চকচকে বিটল চোখে পড়ল।

হাওয়ায় দোলা সবুজ পাতার ওপর তাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে কালো ডানা, আলো পড়ে ঠিকরে উঠছে, প্রায় গোলাকার সেই পোকাটি ছিল লেডিবার্ড বিটল, কালো রং, তাই তাকে বলা হয় কালো লেডিবার্ড বিটল। লেডিবার্ড বিটলদের রং আসলে লাল, কমলা বা হলুদ হয়। কিন্তু কালো কেন? আগ্রহের বশে সেখানে বসে একটা ছোটখাটো পর্যবেক্ষণের কাজেও নেমে পড়লাম যা আসলে গবেষকদের কাজ। কিন্তু আমার কৌতূহল ছিল, কত রকমের লেডি বিটল আসলে এ দেশে আছে, তা খুঁজে দেখা। যখনই কোনো এক প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল দেখতাম তখনই তার ছবি তুলতাম, রাতে রুমে বসে তার স্কেচ করতাম। যখন জানলাম যে, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল আছে তখন সে কাজের উৎসাহে ভাটা পড়ল। বাংলাদেশে কত প্রজাতির আছে, তা জানতে মনে হয় আমার জীবন পার হয়ে যাবে। সাকল্যে মাত্র ১২ প্রজাতির লেডিবার্ড বিটলের ছবি তুলে ও এঁকে সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এ নিয়ে আর কখনো কাজে নামিনি।

গত ২০ জুন চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চকবাজার থেকে কেবি আমান আলী রোড ধরে নুর বেগম জামে মসজিদ পেরিয়ে হজরত ভোলা শাহ (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বনজঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটি তিতবেগুন ও ফোস্কাবেগুনের গাছ চোখে পড়ল। সেসব গাছের পাতাতেই আবার এত বছর পর দেখতে পেলাম সেই কালো লেডিবার্ড বিটলকে। অন্য লেডিবার্ড বিটলের তুলনায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এসব পোকা উত্তর আমেরিকায় বলে লেডিবাগ, যুক্তরাজ্যে বলে লেডিবার্ড। কীটতত্ত্ববিদদের কাছে এরা লেডিবার্ড বিটল বা লেডি বিটল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এ পোকাকে লেডি বিটল বলার কারণ হলো, সেখানকার সবচেয়ে সাধারণ একটি লেডি বিটলের চেহারার সঙ্গে সে দেশের একটি ছবিতে আঁকা একজন প্রাচীন রমণীর মিল ছিল। ছবিতে ছিল, সেই প্রাচীন রমণী একটা লাল আলখাল্লা পরে রয়েছেন যার ওপর রয়েছে কালো ফোঁটা। কক্সিনেলা সেপ্টেমপাংটাটা প্রজাতির লেডি বিটলও লাল, আর তার ডানায় রয়েছে সাতটি কালো ফোঁটা। অঙ্কিত সে ছবির প্রাচীন রমণীর পোশাকে ছিল ৭টি ফোঁটা, যা ছিল সাত রকমের আনন্দ ও দুঃখের প্রতীক। সে চিত্রকর্মের সঙ্গে এ প্রজাতির পোকাটির এরূপ সাযুজ্যই তাকে লেডি বিটল নামে পরিচিত করে তোলে। এ প্রজাতির লেডি বিটল এ দেশে সচরাচর দেখা যায়। 

কালো লেডি বিটলের সাধারণ ইংরেজি নাম মালয়েশিয়ান লেডিবার্ড বিটল, প্রজাতিগত নাম Chilocorus nigrita  ও গোত্র কক্সিনেলিডি। এ জন্য এ গোত্রের পোকাদের অনেকে কক্সিনেলিডি বিটলও বলে। জনৈক ড্যানিশ কীটতত্ত্ববিদ জোহান ক্রিস্টিয়ান ফেব্রিকাস ১৭৯৮ সালে প্রথম এ পোকার প্রজাতিগত নাম ও বিবরণ দেন। তখন এর প্রজাতিগত নাম ছিল Coccinella nigrita। 

কালো লেডি বিটল গম্বুজের মতো গোলাকার বা ডিম্বাকার দেহের একটি ক্ষুদ্র পোকা। লেডি বিটলদের আকার মাত্র দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার। তবে এর আকার বেশ ছোট, দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩.২ থেকে ৪ মিলিমিটার। চকচকে কালো শক্ত সামনের ডানাজোড়া পুরো দেহকে ঢেকে রাখে, এর তলেই থাকে পাতলা ঝিল্লির মতো দুটি পিছনের ডানা, ওড়ার সময় তা বের হয়। এরা দিনের বেলায় বিচরণ করে ও ওড়ে। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। খাদ্য বা প্রজননের জন্য কোনো কোনো লেডি বিটলের ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার রেকর্ড আছে। এমনকি এরা উড়তে উড়তে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত যেতে পারে। এর ডিম মাকু আকৃতির, উজ্জ্বল হলুদ। এককভাবে বা গ্রুপে ২০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চা অবস্থায় থাকে ১২-১৮ দিন, এরপর পুত্তলি দশায় কাটায় ৫-৯ দিন। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা বাঁচে ৪-৮ সপ্তাহ। এরা বছরে ৮-১০ বার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

কালো লেডি বিটল একটি পরভোজী উপকারী পোকা। এরা গাছের বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা যেমন লাল খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট, সাদা মাছি, সাইলিড, জাব পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে একটি কালো লেডি বিটল তার সম্পূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড়ে ৫০০টির মতো ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে। তাই গবেষক ও বালাই ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা ফসলের এসব বালাই নিয়ন্ত্রণে জৈবিক নিয়ন্ত্রক এজেন্ট বা জীব হিসেবে এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেই এ পোকার উৎপত্তি। তাই এ পোকাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ আছে। বিশেষ করে গ্রিনহাউসে জন্মানো ফসলের কীট দমনে ইতোমধ্যে প্রতি ৫০ বর্গমিটারে মাত্র ৩০টি এই পোকা ছেড়ে সুফল পাওয়া গেছে।

উদাস করা বাবলা ফুল

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
উদাস করা বাবলা ফুল
বাগেরহাটের মোংলার কাছে পথের ধারে ফোটা বাবলা ফুল। ছবি: লেখক

‘বাবলা ফুলে নাক-ছাবি তার,
গায় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চলেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-কেজোর গান’-এর পঙ্‌ক্তিগুলো শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর মুগ্ধতার প্রকাশ। সেই একই মুগ্ধতা যেন আজও পথিকের মনে দোলা দেয়। খুলনা থেকে মোংলার পথে যেতে যেতে রাস্তার ধারে হলুদ বাবলা ফুলে সেজে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কবির সেই ‘উদাস পরশ’ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নজরুলের কল্পনার সেই বাবলা ফুল যেন বাস্তবের প্রকৃতিতেই আমাকে থামতে বাধ্য করল। দৃশ্যটা যেন কোনো জলরঙে আঁকা ছবি। রাস্তার ধারে বাবলা গাছগুলোর ডালপালায় যেন হলুদ হীরা মানিক জ্বলছে। প্রবল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে রূপের আধার। তেঁতুল পাতার মতো চিরল চিরল পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ফোটা ছোট্ট ছোট্ট কদমের মতো গোল গোল তুলির মতো ফুল, বাতাসে দুলে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পথিক ও মৌমাছিদের। গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে মাছের ঘের, দূরে গ্রামীণ বনভূমির কালচে-সবুজ প্রান্তরেখা। সে রেখা থেকে উঠে গেলে মেঘমাখা পাখিওড়া নীলাভ আকাশ।

মাছের ঘের পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে থাকা একটা ছোট্ট মাচান ঘর, জলে তার ছায়া পড়েছে। এ দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর কাছেই মনোমুগ্ধকর, ইজেল আর রঙতুলি নিয়ে বসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হতেই পারে। মন ভরে সে দৃশ্য ও বাবলা ফুলের ছবি তুললাম। কিছু ছবি বাতাসের ধাক্কায় ডি-ফোকাসড হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সে কারণেই তার মধ্যেও যেন আমি এক প্রকৃতির সুমধুর সুরধ্বনি শুনতে পেলাম–বাবলা পাতায় তানপুরার তানের মতো বাতাসের শন শন শোঁ শোঁ সেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীতজ্ঞ থাকবে আর কবি থাকবে না, তা কী করে হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামও যেন বাবলা ফুলের সে আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন, উদাস হয়েছিলেন সে আমন্ত্রণে। বাবলা ফুলের সে সৌন্দর্যে হয়তো কোনো গ্রাম্য তরুণীও সেদিন মুগ্ধ হয়ে আবদার করেছিলেন কবির কাছে–‘কুস্মী রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি/ কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল\’ বাবলা ফুলকে না পেলে তার কেমন অভিমান হতে পারে তা অনুমান করা যায় নজরুলের এ গানে।

গ্রামের বনজঙ্গলে, রাস্তার ধারে, বাঁধের উপরে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্তই বাবলা ফুলের এ শোভা দেখা যায়। শহরে এ শোভা বিরল। বাবলা ফুলের শুধু কি শোভাই আছে? প্রাচীন শাস্ত্র অথর্ববেদে বাবলার নাম বর্ব্বুর। সে গাছটি সম্পর্কে একটি সুক্তে বলা হয়েছে–‘বর্ব্বুর পৃথিবীর রস শোষণ করেই জন্মগ্রহণ করছে। অর্থাৎ মরুস্থলেও সে জন্মগ্রহণ করে। একে জলসেচ দিতে হয় না। এর রস পৃথিবীর জঠরাগ্নিকেও শোষণ করে। অত্যগ্নি তাপ ও বহুঋতুর আবির্ভাবেও স্তব্ধতা প্রাপ্ত হয়ে রস পান করে।’ জলসেচ না, এর নিজের রসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। খরা, শৈত্য, উষ্ণতা, লবণাক্ততা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা–সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সে টিকে থাকে। কি বরেন্দ্রভূমি, কি মরুভূমি, কি উপকূলে নদীর পাড়, সব জায়গাতেই বাবলা যেন এক সর্বংসহা বৃক্ষ। 

আবার আত্মরক্ষায়ও বাবলা ওস্তাদ। চারা গাছগুলো যাতে ছাগল-গরু মুড়ে খেতে না পারে, সেজন্য খুব বেশি কাঁটা গজায়। কাঁটাগুলো আলপিনের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবলার কাঁটা আলপিনের মতো ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। এ গাছের অনেক ঔষধি গুণও আছে। বাবলার পঞ্চাঙ্গ (মূলের ছাল, গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল) একসঙ্গে নিয়ে তা আটগুণ পানিতে সিদ্ধ করে গলা পিচের মতো ঘনসার তৈরি করা হয় যা দাঁতের মাড়ি ফোলা, মচকা ব্যথা, প্রবল কাশি, প্রদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কাঠ খুব শক্ত, তাই লাঙল আর গরুর গাড়ির চাকাও তৈরি করা হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। এ গাছ যে বন্ধ্যা মাটিতে জন্মে, গাছের গুণে ধীরে ধীরে সে মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে।

বাবলা একটি বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ ৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা হয় ও তরুণ গাছের ডালপালা তীক্ষ্ণ কাঁটায় ভরা, বয়স্ক গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে না। বাকল ধূসর ও অমসৃণ, কাঠ শক্ত। চিরুনির দাঁতের মতো পত্রকগুলো পত্রদণ্ডের দুপাশে সাজানো থাকে, ঘনভাবে পাতাগুলো থাকে। বসন্তে নতুন পাতা গজায় ও গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ফুল ফোটে। গোলাকার ছোট্ট বলের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য ফুল ফোটে, রং হলুদ। ফল শিমের মতো, খোসার রং ধূসর-সাদা, রোমশ। ফলের ভেতর বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। বাবলার ইংরেজি নাম থর্ন মাইমোসা ও ইজিপশিয়ান একাশিয়া। ইংরেজিতে একে কেউ কেউ বাবুলও বলেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Vachellia nilotica (পূর্ব নাম Acacia arabica, Acacia nilotica) ও গোত্র ফ্যাবেসি।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ 

সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪০ এএম
সুচালো মাথা ব্যাঙের কথা
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কাঁঠালকান্দি এলাকায় দেখা সুচালো মাথা ব্যাঙ –ছবি লেখক

দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সকালের দিকে আমিসহ চারজনের একটি দল বিরল ও দুর্লভ পাখি ও প্রাণীর সন্ধানে ঢাকা থেকে বাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার উদ্দেশে রওনা দিই। দুপুরের দিকে আমরা শ্রীমঙ্গল বাসস্টেশনে পৌঁছায়। এরপর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আদমপুর বাজারে এসে নামলাম। সেখানে সবজি ও ডিমের তরকারি দিয়ে পেট ভরে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেলাম। গ্রামীণ বাজারে এর চেয়ে ভালো খাবার পাওয়া দুষ্কর। খাওয়া শেষে আরেকটি অটোরিকশায় করে কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ওই বনের কাউয়ারগলা এলাকায় এসে নামলাম। কাউয়ারগলার টিলার ওপর বন বিভাগের ছোট্ট একটি রেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। তবে এখানে রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই, বাবুর্চিও নেই। তাই খাবার-দাবারের ব্যবস্থা হয়েছে স্থানীয় গাইড কাইয়ুমের বাসায়। 

খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলটা রেস্ট হাউসের পাশের গ্রামে কাটালাম। স্থানীয়দের সঙ্গে কথাবার্তা বললাম। ওদের সঙ্গে চা-নাশতা খেলাম। কিছু পাখি ও ফড়িংয়ের ছবিও তুললাম। রাতে রেস্ট হাউস থেকে বের হয়ে কাইয়ুমের বাসায় ডিনারের উদ্দেশে যাচ্ছিলাম। এ সময় ধানখেত থেকে বিভিন্ন ধরনের ডাক বা শব্দ ভেসে আসছিল। শব্দের উৎসের দিকে টর্চের আলো ফেলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! নানা প্রজাতির ব্যাঙের যেন মেলা বসেছে! অন্তত চার প্রজাতির ব্যাঙের ছবি তুললাম।

৮ সেপ্টেম্বরের পুরোটা দিন আদমপুর বনের বিভিন্ন অংশে ঘুরে ২৫ প্রজাতির পাখি-প্রাণী-প্রজাপতি-কীটপতঙ্গের ছবি তুললাম। তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিন খুব সকালে রাজকান্দির পাশের কাঁঠালকান্দির উদ্দেশে রওনা হলাম। সকাল পৌনে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাজকান্দি ও কাঁঠালকান্দির অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হেঁটে ৩০ প্রজাতির পাখি-প্রাণীর ছবি তুললাম। দুপুর ১টা ৩২ মিনিটে কাঁঠালকান্দির একটি ছড়ায় হঠাৎ সরু মাথার ছিপছিপে এক ব্যাঙের দেখা পেলাম। মিশ্র চিরসবুজ বনের এই ব্যাঙটিকে বহুদিন ধরে খুঁজছিলাম। লাউয়াছড়া, কাপ্তাই, সাতছড়ি বা রেমা-কালেঙ্গার বনে অনেক খুঁজেও তাকে পাচ্ছিলাম না। তবে কাঁঠালকান্দিতে তার দেখা পেলাম। ক্যামেরায় মাত্র সাতটি ক্লিক করতেই সে একটি গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। আমরা তাই সামনের দিকে পা বাড়ালাম। 

কাঁঠালকান্দিতে দেখা এই ব্যাঙটি এ দেশের এক বিরল প্রাণী সুচালো মাথা ব্যাঙ। এটি সরু মাথা ব্যাঙ, আসামের পানা ব্যাঙ বা সোনালি পাহাড়ি ব্যাঙ নামেও পরিচিত। মিশ্র চিরসবুজ পাহাড়ি বনের ব্যাঙটির ইংরেজি নাম Pointed-headed Frog, Pointed-nose Frog, Assam Hills Frog, Boulenger’s Frog বা High Altitude Frog। র‌্যানিডি (Ranidae) গোত্রের ব্যাঙটির বৈজ্ঞানিক নাম Clinotarsus alticola (ক্লিনোটারসাস অ্যালটিকোলা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডে এর দেখা মেলে। 

সরু মাথা ব্যাঙের আকার মাঝারি। দেহের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ২ থেকে ৫ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার। দেহ লম্বাটে ও ছিপছিপে। মাথা লম্বাটে ও নাক চোখা। চামড়া মোটামুটি মসৃণ। দেহের ওপরের রং হলদে বা সোনালি হলুদ, প্রায়ই তাতে কিছু গাঢ় দাগ থাকে। দেহতলের রং সাদাটে থেকে গাঢ় বাদামি। পা লম্বা ও ছিপছিপে। পায়ের আঙুল পুরোপুরি পাতার সঙ্গে যুক্ত। 

এরা মূলত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের (চট্টগ্রাম বিভাগ) বাসিন্দা। পাহাড়ি জলাধারের পাশে বা পাহাড়ের ঢালে মাটিতে বাস করে। নিশাচর এ প্রাণীটি সচরাচর দিনের বেলা পাথরের নিচে বা গাছের গুঁড়ির ভেতর লুকিয়ে থাকে। সচরাচর একাকী দেখা যায়। কীটপতঙ্গ এদের প্রধান খাদ্য। তৃণলতা বা ঝোপের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর এদের প্রজননকাল। স্ত্রী ব্যাঙ আবদ্ধ পানিতে ডিম ছাড়ে। ডিম ফুটে লেজযুক্ত ব্যাঙাচি বের হতে এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। এ সময় এরা মাছের মতো ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায়। প্রায় ১৪ সপ্তাহে রূপান্তরের মাধ্যমে সামনের ও পেছনের পা গজায় এবং ফুসফুস তৈরি হয়। একসময় ব্যাঙাচির লেজ খসে পড়ে এবং সে পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে পরিণত হয়। এরা তিন থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বাঁচে। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
নকশাদার উল্কি গান্ধিপোকা
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা উল্কি গান্ধিপোকা। ছবি: লেখক

চট্টগ্রাম শহরে এসে খানিকটা খোলা জায়গায় এক ঝোপঝাড়ের ভেতর একটি নকশাদার বা নকশা করা পোকার দেখা পাব, তা ভাবিনি। এ বছরের ৩ আষাঢ় সকালবেলা হাঁটতে গিয়ে চকবাজার এলাকায় হজরত ভোলা শাহ (র.) মাজার প্রাঙ্গণের ছোট পুকুরটার পাড়ে বুনোবেগুন কাকমাছি গাছের পাতায় পোকাটি দেখলাম।

পোকাটির ডানার রং ফ্যাকাশে লাল, এর মধ্যে কালো নকশাদার দাগ আছে। দাগগুলো দেখতে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টার ওয়ার্সের ভিলেন ডার্থ মৌলের মুখের উল্কির মতো। সে কারণেই এ পোকার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ডার্থ মৌল বাগ। দুই বঙ্গে এর কোনো বাংলা নাম খুঁজে পেলাম না। তাই ইংরেজি নামের সঙ্গে মিল বা তাৎপর্য বজায় রেখে এর বাংলা নামকরণ করা যেতে পারে ‘উল্কি গান্ধি’। 

পোকাটি প্রকৃত গান্ধি বা বাগজাতীয় পোকা, যারা বীজ থেকে রস চুষে খায়। এ জন্য কোনো কোনো দেশে এটি বীজের গান্ধিপোকা নামেও পরিচিত। হেমিপ্টেরা বর্গের এ পোকাটির প্রজাতিগত নাম Spilostethus hospes ও গোত্র লাইগেইডি। এ পোকা মূলত এশিয়া, ওশেনিয়া ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ায় কখনো কখনো এ পোকাকে মিল্কউইড বাগ বলা হয়। কেননা সে দেশে এরা মিল্কউইড গাছের বীজ থেকে দুধ চুষে খায়। তবে আমেরিকায় প্রায় একই রকম দেখতে আরেক প্রজাতির মিল্কউইড বাগ দেখা যায়, যাকে বলে বড় মিল্কউইড বাগ। সেটি ভিন্ন প্রজাতির, কিন্তু এ দুটি পোকাই এক গোত্রের ও খাওয়ার ধরন একই।

পোকাটি বেশ ছোট বা মাঝারি আকারের, তবে উজ্জ্বল রঙের কারণে সহজে চোখে পড়ে। এরা ১০ থেকে ১৩ মিলিমিটার লম্বা হয়। সামনের ডানা ও মাথার রং ফ্যাকাশে কমলা বা লাল। এদের পা ছয়টি, শুঁড় দুটি এবং চোখ দুটি কালো। চোখ দুটির ঠিক পেছনেই থাকে প্রায় ত্রিকোণাকৃতির দুটি কালো দাগ। সেই দাগ দুটির প্রান্তদ্বয় গ্রীবায় ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের ওপর যুক্ত করেছে আরেকটি ত্রিকোণ দাগ। ত্রিকোণাকৃতি স্কুটেলামের মতো চাকতিই অন্য সব পোকার মধ্য থেকে সব গান্ধিপোকাকে আলাদাভাবে চেনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার নিচে দুপাশের দুটি ডানায় তেরছা করে আছে দুটি ফ্যাকাশে চওড়া ব্যান্ডের মতো কালো দাগ ও দুটি গাঢ় কালো ফোটা। ডানার পেছন অংশ কালো। পেটের তলে সব খণ্ডেই রয়েছে আড়াআড়ি কালো দাগ বা ডোরা চিহ্ন। চোখ বড় ও গোলাকার। এদের পিঠের লাল-কালো নকশা সম্ভবত শিকারিদের সতর্কবার্তা দেয় যে তারা বিষাক্ত। আর তাদের কাছে এলে শিকারিরা ধরাশায়ী হবে। তবে লিঙ্গ, পরিবেশ ও খাদ্য ইত্যাদি কারণে এদের নকশা ও রঙের কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।

এর শুঁড় চারটি খণ্ডাংশবিশিষ্ট। এদের মুখগহ্বরে একটি ছিদ্রকারী চঞ্চু থাকে, যা দিয়ে তারা উদ্ভিদের রস চুষে খায়। এরা সাধারণত বর্ধনশীল অপরিপক্ব বীজের দুধরস খেতে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে বীজ পুষ্ট হতে পারে না, নষ্ট হয়ে যায়। এদের বিভিন্ন ঘাস, নটেশাক ও ডাঁটার বীজ থেকে এদের রস চুষে খেতে দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় কস্টিক ভাইন, রেড-হেডেড কটন বুশ, সোয়ান প্ল্যান্ট ইত্যাদি গাছ থেকে এদের রস চুষে খাওয়ার কথা জানা গেছে। এরা শুধু বীজ না–পাতা, কাণ্ড, ফল ইত্যাদি থেকেও রস চুষে খায়। এর ফলে সেসব গাছের জীবনীশক্তি ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়। 

মজার ব্যাপার হলো, এরা পাতায় বসে মিলনের জন্য সঙ্গীকে ডাকতে এক অদ্ভুত আচরণ করে, যা আমরা দেখতে পাই না। এরা পাতার মাধ্যমে কম্পন তৈরি করে নিজের প্রজাতির অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মিলনের পর স্ত্রী পোকা পাতার ওপর গুচ্ছাকারে ডিম পাড়ে। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

বাচ্চাদের দেখতেও বড়দের মতো দেখায়, তবে ওদের ডানা ও জনন অঙ্গ থাকে না। বাচ্চা অবস্থায় ওরা তিন থেকে চার সপ্তাহ কাটায় এবং বড়দের মতোই গাছ, পাতা, ফলের রস খেয়ে বাঁচে। কয়েক দফায় খোলস বদলের পর ছানারা সাবালক হয়। প্রাপ্তবয়স্ক হলে ওদের খোলস শক্ত হয়, পাখা হয়, উড়তে পারে এবং প্রজননের জন্য সঙ্গীকে আহ্বান জানায়। প্রাপ্তবয়স্ক উল্কি গান্ধি ৩০ থেকে ৬০ দিন বাঁচে। তবে এদের জীবনে এক ট্র্যাজেডি আছে। প্রকৃতিতে পুরুষের চেয়ে মেয়ে পোকাই বেশি দেখা যায়। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে গবেষকরা বেশ মজার এক তথ্য পেয়েছেন। 

গবেষণায় তারা দেখেছেন, পোকাদের জগতে এই একটিমাত্র জনগোষ্ঠীর পোকার পুরুষদের হত্যা করে একটি এন্ডোসিমবায়োটিক বা অন্তঃমিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া। এ কারণেই মেয়ে পোকার সংখ্যা বেড়ে যায়। সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এদের বেশি দেখা যায়।