ঢাকা ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তির খবর চকরিয়ায় পাহাড়ধসে ২ শিশুর মৃত্যু, পানিবন্দি লাখো মানুষ একটু অসচেতনতায় হারিয়ে যাচ্ছে অসামান্য উপহার জামালপুরে সাবেক এমপি নূর মোহাম্মদ শোন অ্যারেস্ট বহিরাগত প্রবেশে নিরাপত্তা শঙ্কায় ইবির শিক্ষার্থীরা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন আদনান আজাদ জনপ্রশাসনে বড় পদোন্নতি, ১৭২ জন হলেন যুগ্মসচিব কারেনের সেঞ্চুরিতে জিম্বাবুয়ের পুঁজি ২৪৭ প্রিয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খাদ্যে ভেজাল নিয়ে সংসদে এমপিদের অসন্তোষ, খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস আহসান হাবীব: কবিতায় নিবিড়, গভীর অর্থায়নের সূচনা অধ্যায়ের ২০টি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির ফিন্যান্স, ব্যাংকিং ও বিমা ১ম পত্র ব্র্যাক ব্যাংকের ৫০ হাজার কোটি টাকার রিটেইল ডিপোজিট মাইলফলক শিশুশিক্ষায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা মালা নয়, হাতে উঠল হাতকড়া শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল বাড়াতে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ ইউজিসির টানা বৃষ্টিতে কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়ক পানির নিচে সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা হত্যা: পাঁচ মাস পর বাবু শেখের মৃত্যুদণ্ড রক্ত পরীক্ষায় ভয় নয় দেশজুড়ে ফ্লেক্সিবল ডেলিভারি অপশন নিয়ে এলো পাঠাও পার্সেল সিলেট সীমান্তে বিএসএফের অবৈধ পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ, সতর্ক বিজিবি দুর্গত মানুষের নিরাপত্তা ও ত্রাণ সহায়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি: ত্রাণমন্ত্রী মুখ দেখালেই বোর্ডিং পাস আইস্ক্রিনে ফুটবলের সেরা দুই সিনেমা ‘দামাল’ ও ‘জাগো’ রাজবাড়ীতে কোরআন পোড়ানোর অভিযোগে যুবক গ্রেপ্তার শেরপুরে বাসচাপায় নিহত ১, আটক ২ উর্মি খানের নতুন গান ‘ভাবনার মিছিল’ দেশের বাজারে ভিভোর নতুন স্মার্টফোন বাবার মামলায় ছেলের জেল, হাজতেই আত্মহত্যা মাদক ও বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ

শিশুশিক্ষায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
শিশুশিক্ষায় প্রয়োজন জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তুমুল বৃষ্টি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুম বৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতায় থমকে গেছে নগর। তবু বাংলাদেশের মানুষ বর্ষাকে ভালোবাসে। কবিতায়, গানে, কৃষিতে, প্রকৃতির নবজাগরণে বর্ষার সৌন্দর্য অনন্য। আবার এই বর্ষাই প্রতি বছর লাখো শিশুর জন্য নিয়ে আসে কঠিন বাস্তবতা–বিদ্যালয়ে যেতে না পারার কষ্ট, বই-খাতা ভিজে যাওয়ার যন্ত্রণা, পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘ বিরতি। যে শিশু কয়েক দিন আগেও শ্রেণিকক্ষে বসে অঙ্ক কষছিল, গল্প পড়ছিল কিংবা নতুন অক্ষর শিখছিল, বর্ষার পানি বাড়তেই সে হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন। কোথাও নৌকা ছাড়া স্কুলে যাওয়ার উপায় থাকে না, কোথাও বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, কোথাও আবার জলাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিভাবকেরাই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে সাহস পান না। ফলে একটি মৌসুমি দুর্যোগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সংকটে।

বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় আমরা সাধারণত পরীক্ষার ফল, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকসংকট কিংবা অবকাঠামোর কথা বলি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন যে এখন শিক্ষারও অন্যতম বড় সংকট, সে উপলব্ধি এখনো নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ুর অভিঘাত এখন শুধু কৃষি, স্বাস্থ্য বা অর্থনীতিকে নয়, শিশুদের শেখার অধিকারকেও প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এ সংকটের ভয়াবহতা বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি তথ্যই যথেষ্ট। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর শিক্ষাজীবন কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। এপ্রিল-মের তীব্র তাপপ্রবাহে সারা দেশে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছিল, এরপর ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও জুনের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু সিলেট অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী আট সপ্তাহ পর্যন্ত শ্রেণিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটা এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো, সেই বাস্তবতার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের শিশুরা এমনিতেই শিখন-সংকটের মধ্যে আছে। ইউনিসেফের ভাষায়, দেশে প্রতি দুজন শিশুর একজন নিজের শ্রেণির উপযোগী পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারে না, দুই-তৃতীয়াংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও মৌলিক গণনা-দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। এমন অবস্থায় কয়েক সপ্তাহের শিক্ষাবিরতি কেবল কয়েকটি ক্লাস করতে না পারার ব্যাপার নয়, এটা শেখার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

শিশুশিক্ষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধারাবাহিকতা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো কয়েক সপ্তাহ পরে আবার পড়াশোনায় ফিরতে পারে। কিন্তু প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে প্রতিদিন অক্ষর চিনতে শেখে, বাক্য গঠন শেখে, সংখ্যা বোঝে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে শেখে, শিক্ষককে অনুসরণ করতে শেখে। এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে শেখার গতি যেমন কমে যায়, তেমনি আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হয়। অনেক শিশু ফিরে এসে আগের পাঠই ভুলে যায়।

বর্ষার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওড়, চর, উপকূল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুরা। বর্ষা সেখানে কেবল ঋতু নয়, জীবনযাত্রার কাঠামো বদলে দেওয়া বাস্তবতা। বিদ্যালয়ে যেতে নদী পার হতে হয়, কাঁচা রাস্তা ডুবে যায়, নৌযানই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। অনেক বিদ্যালয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কার্যত অচল থাকে। আবার কোথাও বিদ্যালয়কে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

তবে ভুল হবে যদি মনে করি, এটা শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা অন্যান্য বড় শহরেও জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। ইতোমধ্যে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, হাঁটুপানি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছেপ না। ফলে বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা আজ গ্রাম-শহর উভয়ের বাস্তবতা, যদিও এর তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন।

সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতি ঘটে তখন, যখন শিশুরা ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক হারাতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের বিরতি অনেক সময় কয়েক মাসের অনুপস্থিতিতে পরিণত হয়। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কেউ পারিবারিক কাজে যুক্ত হয়, কেউ মৌসুমি শ্রমে যায়, কারও ক্ষেত্রে বেড়ে যায় স্থায়ী ঝরে পড়ার ঝুঁকি। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্যকেও আরও তীব্র করে তোলে।

এ কারণেই বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতাকে কেবল দুর্যোগব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু অভিযোজন–এই তিনটিরই মিলিত প্রশ্ন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর যখন একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখনো কেন আমরা প্রতিবারই অপ্রস্তুত থাকি? কেন বর্ষা এলেই শিক্ষা কার্যক্রম যেন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে।

বাংলাদেশে দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা–দুটি খাতই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে তাদের সমন্বয় এখনো সীমিত। বন্যা বা অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও অধিকাংশ এলাকায় আগাম কোনো বিকল্প শিক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকে না। কোথাও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা নেই, কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়িতে অনুশীলনের উপকরণ পৌঁছায় না, আবার কোথাও শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্যোগ দেখা দিলেই শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

অথচ দুর্যোগপ্রবণ অনেক দেশ ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোতে বিদ্যালয়ের জন্য আগাম দুর্যোগ পরিকল্পনা, বিকল্প পাঠসূচি, কমিউনিটিভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা এবং দ্রুত পুনরায় পাঠদান শুরু করার সুস্পষ্ট প্রোটোকল রয়েছে। শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতাকে সেখানে দুর্যোগব্যবস্থাপনারই অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেরও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সময় এসেছে।

দেশের মধ্যেও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার অভাব নেই। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও নদীবিধৌত কিছু এলাকায় ভাসমান বিদ্যালয় বহু বছর ধরে প্রমাণ করে আসছে যে, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা সব সময় শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা নয়। বিদ্যালয় যখন শিশুর কাছে পৌঁছে যায়, তখন বর্ষার পানিও শেখাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। এই উদ্যোগগুলো দেখিয়েছে, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিকল্পনা করলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প, জাতীয় শিক্ষানীতির মূলধারায় সেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

অনেকে মনে করেন, ডিজিটাল শিক্ষা বা অনলাইন ক্লাসই সমস্যার সমাধান। কোভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। শহরের অনেক পরিবারের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যকর হলেও হাওড়, চর কিংবা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক শিশুর হাতে স্মার্টফোন নেই, অনেক পরিবারে একটি ফোন থাকলেও সেটা কর্মজীবী সদস্যের সঙ্গে বাইরে থাকে। ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল, বিদ্যুৎ অনিয়মিত এবং ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। ফলে অনলাইন শিক্ষা একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু এটা কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।

বরং আমাদের প্রয়োজন বহুমাত্রিক বিকল্প। যেখানে ইন্টারনেট নেই, সেখানে মুদ্রিত স্বশিক্ষা প্যাকেট, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক-শিক্ষক, কমিউনিটি রেডিও বা টেলিভিশনভিত্তিক পাঠ, মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা–সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার করা যেতে পারে। একেক অঞ্চলের জন্য একেক ধরনের সমাধানই হবে সবচেয়ে কার্যকর।

বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের। কারণ এ বয়সে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী যদি এক মাস নিয়মিত পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তার ক্ষতি একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শুধু বিদ্যালয় খুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন শিখন-ঘাটতি মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধারমূলক পাঠদান এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা।

আরও একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়–বিদ্যালয় শিশুদের জন্য শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি নিরাপত্তা, পুষ্টি, সামাজিকীকরণ এবং মানসিক বিকাশেরও কেন্দ্র। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে বেড়ে যায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি, আর কিশোরীদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে বিয়ের আশঙ্কাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ শিক্ষাবিরতির প্রভাব শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিস্তৃত।
এ কারণেই বর্ষা জেঁকে বসার আগে কয়েকটি পদক্ষেপকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, দুর্যোগপ্রবণ প্রতিটি জেলার জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক জরুরি শিক্ষা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, যেসব বিদ্যালয় নিয়মিত আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে বিকল্প পাঠদানের আগাম ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ভাষায় প্রস্তুতকৃত স্বশিক্ষা প্যাকেট ও অনুশীলন সামগ্রী আগেই বিতরণ করা। চতুর্থত, শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে স্থানীয় শিক্ষা সহায়তা দল গঠন করা। পঞ্চমত, দুর্যোগ শেষে শুধু সিলেবাস শেষ করার তাড়না নয়, বরং শিখন-ঘাটতি পূরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ষষ্ঠত, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ এবং পুরোনো বিদ্যালয় সংস্কারে জলবায়ু-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করা।

সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতকে এখন জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মানে শুধু বাঁধ নির্মাণ বা আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি নয়, শিশুদের শেখার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে–সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় দৃশ্যমান অবকাঠামোয় নয়, মানবসম্পদে। একটি ভেঙে যাওয়া সেতু কয়েক মাসে পুনর্নির্মাণ করা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কার করা যায়, এমনকি বিধ্বস্ত ঘরবাড়িও আবার গড়ে ওঠে। কিন্তু একজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া শেখার সময়, নষ্ট হয়ে যাওয়া শিক্ষাভিত্তি কিংবা বিদ্যালয়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভ্যাস সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। এই ক্ষতির হিসাব কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণে ধরা পড়ে না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে সেটিই সবচেয়ে বড় জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবেই থাকবে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। অর্থাৎ বর্ষা, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা নদীভাঙনের মতো বাস্তবতাকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আমাদের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা দুর্যোগের কারণে থেমে যাবে না, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারবে।

এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বন্যার সম্ভাব্যতা এবং বিদ্যালয়ের ঝুঁকির তথ্য একত্র করে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত দিন বন্ধ থাকতে পারে, কোথায় বিকল্প পাঠদান প্রয়োজন, কোথায় নৌযান বা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র লাগবে–এসব বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

একই সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়কেও এই প্রস্তুতির অংশ করতে হবে। বিদ্যালয় শুধু সরকারের নয়; এটি একটি সমাজেরও প্রতিষ্ঠান। অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি একসঙ্গে কাজ করলে দুর্যোগকালেও শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতা অনেকাংশে বজায় রাখা সম্ভব। শিশুর শিক্ষা রক্ষার দায়িত্বকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

এখানে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা উদ্যোগেরও ভূমিকা আছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ভাসমান বিদ্যালয়, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, মোবাইল লাইব্রেরি কিংবা স্বশিক্ষা উপকরণ তৈরির মতো উদ্যোগগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত করা গেলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শিশুরাও শিক্ষার মূলধারায় থাকতে পারবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়, এটা দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের ভিত্তি। যে শিশু আজ বর্ষার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, সে-ই কয়েক বছর পর দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, কৃষি উদ্ভাবক কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে। ফলে প্রতিটি হারানো পাঠদিবস শুধু একজন শিশুর নয়, পুরো দেশের সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করে দেয়।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়িয়েছে, লিঙ্গসমতা অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন সেই অর্জন টিকিয়ে রাখার নতুন চ্যালেঞ্জের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি–যেখানে বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যা যেকোনো দুর্যোগের মধ্যেও শিশুর শেখার অধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম।

বর্ষা আসবে, নদী ফুলে উঠবে, কোথাও কোথাও বন্যাও হবে। প্রকৃতির এই নিয়ম আমরা বদলাতে পারব না। কিন্তু শিশুর শিক্ষা বর্ষার পানিতে ভেসে যাবে কি না, সেটি পুরোপুরি মানুষের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করে।

বর্ষা যদি প্রতি বছর আমাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় প্রকৃতির নয়, আমাদের। আর যদি আমরা এখনই শিক্ষা ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে একই সুতোয় গেঁথে জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে বর্ষা আর শিশুদের ভবিষ্যতের প্রতিপক্ষ হবে না, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে। একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে এর বিকল্প নেই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের ভয়াবহতা

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৩ পিএম
আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকের ভয়াবহতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সবুজে ভরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কাম্প্যাস। এই কাম্প্যাসে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আসে নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদকের ভয়াল ছোবলে সেই স্বপ্নপথ হতে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলে মাদকাসক্তি অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘকাল ধরে চবির অনেক শিক্ষার্থী মাদকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চবির মাদকসেবন ও মাদকাসক্তির প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মাদকের সহজলভ্যতা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে নেশার দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফুলের পাপড়ি যেমন প্রবল বাতাসে ঝড়ে যায়, ঠিক তেমনই শিক্ষার্থীরা নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আগেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে।

বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা বর্তমানে মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর পেছনে একটিমাত্র কারণ নয়, বরং সামাজিক, মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সম্পর্কজনিত সমস্যার কারণে অনেক সম্পর্ক বিচ্ছেদে গিয়ে শেষ হয়। প্রিয় মানুষকে হারানোর মানসিক আঘাত, একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হিসেবে অনেক শিক্ষার্থী মাদককে বেছে নেয়। চবির বিভিন্ন হল মাদকের আঁকড়ায় পরিণত হয়েছে। ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার ইনফ্লুয়েঞ্চ’ বা সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব ক্যাম্পাসে মাদকসেবনের উৎসাহ দেওয়ার ভূমিকা পালন করে। অগ্রজ, অনুজ কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে অনেকেই কৌতূহলবশত প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে এবং পরে আসক্ত হয়ে পড়ে। যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে ধূমপান পর্যন্ত করেনি কিন্তু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রভাবে ধূমপান শুরু করে তাদের নিয়ে ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ, একবার ধূমপান শুরু করার পর মাদকের সহজলভ্যতা এবং সেবনের পরিবেশ পাওয়ার কারণে খুব সহজেই অধিক ক্ষতিকর দ্রব্য যেমন: গাঁজা, ইয়াবা, মদ, হেরোইন ইত্যাদি সেবন শুরু করছে। অন্যদিকে, ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার রিজেকশন’ বা সহপাঠীদের সার্কেল থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরা নিজেদের গ্রহণযোগ্য মনে করতে বা মানসিক শূন্যতা পূরণ করতে মাদক গ্রহণ শুরু করছে। এ ছাড়া চবিতে অনেক শিক্ষার্থী জুয়ায় আসক্ত। এই জুয়ার আসক্তি অনেক বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। জুয়াতে টাকা হেরে আর্থিকসংকট এবং হতাশায় পড়ে অনেক শিক্ষার্থী সাময়িক স্বস্তির জন্য মাদক গ্রহণ করে। কিছু শিক্ষর্থী মাদক গ্রহণকে আধুনিকতা বা সাহসিকতার প্রতীক মনে করে সেবন করতে গিয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রত্যাশার অনুরূপ একাডেমিক ফলাফল যখন কোনো শিক্ষার্থী পেতে ব্যর্থ হয় তখন সেই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকসেবন শুরু করছে। খারাপ আর্থসামাজিক অবস্থাও অনেক সময় মাদকাসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পারিবারিক অশান্তি, ভাঙন ও মানসিক অবহেলা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে মাদক সহজেই তাদের জীবনে প্রবেশ করে। অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া দুশ্চিন্তাও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা পথ ও কৌশলে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে বহিরাগতরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। গত ৮ নভেম্বর ২০২৫ ক্যাম্পাসে ইয়াবা ও মাদকসেবনের সরঞ্জামসহ কয়েকজন বহিরাগত আটক হয়। ক্যাম্পাসে নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল এবং সিএনজির মাধ্যমে মাদক প্রবেশ করছে। শুধু প্রধান ফটক নয়, ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন অলিগলি ও বিকল্প পথও মাদক প্রবেশের নীরব করিডরে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাষাবাদের জন্য ইজারা নেওয়া জমিতে অবৈধভাবে চোলাই মদ উৎপাদন ও বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগে একজন ব্যক্তিকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। অভিযানে প্রায় ৩০ লিটার চোলাই মদ এবং মদ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্কে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। অধ্যয়নরত উপজাতি শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ইত্যাদি) থেকে ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করে আসছে। এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিরাপত্তা প্রহরীরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের পাশাপাশি কিছু অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির সম্পৃক্ততায় একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে মাদকের বিস্তার দিন দিন আরও বেড়ে উঠছে। ক্যাম্পাসে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মাদক সরবরাহের সময় একাধিক শিক্ষার্থী প্রক্টরিয়াল বডির কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে। গত ৭ জুলাই ২০২৪ মাদকসেবনরত অবস্থায় ৩০ জন শিক্ষার্থী এবং ২৭ জুন ২০২৫ একই অভিযোগে আরও নয়জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কিছু স্থান মাদকসেবনের জন্য পরিচিত। ব্রিকফিল্ড, কলা ঝুপড়ি, লেডিস ঝুপড়ি, আইন অনুষদ ক্যান্টিনসংলগ্ন এলাকা, নীরা পাহাড়, জীববিজ্ঞান অনুষদের পেছনের অংশ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, রেলওয়ে স্টেশন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, প্যাগোডা, ঝরনা ও আশপাশের এলাকা, স্লুইস গেট এবং চবি কলেজের পেছনের অংশকে ঘিরে মাদকসেবার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব এলাকাকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনার অভিযোগ বেশি শোনা যায়।

একজন মাদকাসক্ত শিক্ষার্থী শুধু নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্যই নয়, তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও এক নীরব হুমকিস্বরূপ। সে একই সঙ্গে নিজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে বসে। এসবের ফলে একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন যেমন হুমকির মুখে পড়ে, অনেক সময় একেবারে স্থবির হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে পাঠানোর পেছনে প্রতিটি পরিবারের থাকে অসংখ্য স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তখন পরিবারের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করে। পরিবারকে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়; অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত শিক্ষার্থী জোরপূর্বক অর্থ দাবি করে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এর ফলে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের বিশ্বাস, আস্থা ও মানসিক শান্তি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্যাম্পাসে মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এলে তা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। মাদকের কারণে যখন একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এর প্রভাব ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে জাতীয় উন্নয়নের জন্য বাধাস্বরূপ হয়ে পড়ে। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় শিক্ষার্থীদের ডোপ টেস্ট চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে এবং পরীক্ষায় মাদকসেবনের প্রমাণ মিললে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে প্রতি মাসে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মশালা, পোস্টার ক্যাম্পেইন ও উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করা জরুরি। গুরুতর আসক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলরের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসে মাদক প্রবেশের সম্ভাব্য পথগুলোতে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত তল্লাশি জোরদার করতে হবে। মাদক সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগই একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে পারে।

লেখকদ্বয়: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

মহাকালের পটে এক ঋজু পদচ্ছাপ: আবুল কাসেম ফজলুল হক ও বাঙালির মননবিশ্বের বিবর্তন

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৯ পিএম
মহাকালের পটে এক ঋজু পদচ্ছাপ: আবুল কাসেম ফজলুল হক ও বাঙালির মননবিশ্বের বিবর্তন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

২০২৬ সালের ৫ জুলাই। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটি হয়তো আর ১০টি দিনের মতোই সাধারণ ছিল, কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক আকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র এদিন নিঃশব্দে খসে পড়ল। অপরাহ্ণের সেই মলিন আলো যখন শ্রাবণের মেঘে ঢাকা পড়ছিল, তখন বাংলা একাডেমি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরগুলোতে যেন এক গভীর বিষণ্ণতা থমকে দাঁড়িয়েছিল। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই–এ খবরটি যখন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছিল: আমরা কি কেবল একজন শিক্ষককে হারালাম, নাকি একটি আস্ত যুগের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে গেল?

আসলে মানুষটির প্রস্থান কেবল রক্ত-মাংসের শরীরের বিনাশ নয়। এটি ছিল একটি ঋজু মেরুদণ্ডের প্রস্থান, যা কোনোকালেই কোনো শাসকের রক্তচক্ষু বা কোনো প্রলোভনের কাছে অবনত হয়নি। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন শব্দের আরাধনা করেছেন সত্যের সন্ধানে। তার প্রয়াণোত্তর এই লগ্নে যখন স্মৃতির পাতা ওল্টানো হয়, তখন কেবল তার পাণ্ডিত্য নয়, বরং তার সেই অমলিন সারল্য আর গভীর দার্শনিক নির্লিপ্ততা বারবার সামনে চলে আসে। নদী যেমন নিঃশব্দে পলল জমিয়ে উর্বর করে ভূমি, আবুল কাসেম ফজলুল হকও তেমনি কয়েক দশক ধরে বাঙালির চিন্তার জগতে সেই উর্বরতার কাজটুকু করে গেছেন।

আবুল কাসেম ফজলুল হককে বুঝতে হলে তার ‘লোকায়ত’ দর্শনের গভীরে প্রবেশ করা প্রয়োজন। তিনি কেবল পুঁথিগত পণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। গ্রামীণ বাংলার ধুলোবালি আর সাধারণ মানুষের জীবনবোধ ছিল তার চিন্তার প্রধান রসদ। কেন তিনি তার সম্পাদিত পত্রিকার নাম ‘লোকায়ত’ রেখেছিলেন? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের শিকড়ে। চার্বাক থেকে শুরু করে আরজ আলী মাতুব্বর পর্যন্ত যে যুক্তিবাদী ও ইহজাগতিক ধারাটি বাংলার মাটিতে বইছে, তিনি ছিলেন সেই ধারার আধুনিক উত্তরাধিকারী।

তার কাছে দর্শন মানে কেবল ঘরের কোণে বসে তত্ত্বকথা আওড়ানো ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে জ্ঞান মানুষের দৈনন্দিন যন্ত্রণাকে স্পর্শ করে না, তা নিছক বিলাসিতা। তার প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে মনে হয়, তিনি যেন প্রতিটি বাক্যে পাঠকের সঙ্গে নিবিড় সংলাপে মগ্ন। ফরাসি দার্শনিক রনে দেকার্ত বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি’। আবুল কাসেম ফজলুল হক একে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি চিন্তা করি এবং সেই চিন্তাকে সমাজমুখী করি, তাই আমি সার্থক’। তার চিন্তার এই সমাজমুখী দায়বদ্ধতাই তাকে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের থেকে আলাদা করেছিল। তিনি কেবল শ্রেণিসংগ্রামের চশমায় জগৎকে দেখেননি, বরং সংস্কৃতির সংকটকে মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে তার যে ভাবনা, তা ছিল এক গভীর স্বদেশি আধুনিকতার পরিচায়ক। আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে যখন আমরা নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে মগ্ন, তখন তিনি বারবার মনে করিয়ে দিতেন শেকড় হারানো বৃক্ষ কখনো ফুল ফোটাতে পারে না। রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক পথিক। উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর জন্য তিনি যে জেদ ধরেছিলেন, তা কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। তিনি জানতেন, ভাষার পরাধীনতা আসলে চিন্তার পরাধীনতা।

এডওয়ার্ড সাঈদ কিংবা ফ্রান্তজ ফানো যেভাবে উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছেন, অধ্যাপক হকের কাজ ছিল সেই তত্ত্বকে বাংলার বাস্তবতায় প্রয়োগ করা। তিনি বুঝতেন, ইংরেজি ভাষার প্রতি আমাদের যে অগাধ মোহ, তা আসলে একপ্রকার মানসিক দাসত্বের অবশেষ। তার কাছে বাংলা ভাষা ছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক। তিনি যখন লিখতেন, ‘উচ্চ আদালতে কেন বাংলা থাকবে না?’, তখন সেটি কেবল একটি প্রশ্ন থাকত না, সেটি হয়ে উঠত রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দলিল। তিনি পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের সমালোচনা করতে পিছপা হননি। তার মতে, গণতন্ত্র কোনো প্যাকেটে আসা পণ্য নয় যে বিদেশ থেকে আমদানি করলেই তা দেশে শেকড় গড়বে। গণতন্ত্রকে এ দেশের মাটির রস নিতে হবে, সাধারণ মানুষের আকাক্ষার সঙ্গে মিশতে হবে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক আধুনিকতার, যা হবে নিজস্ব এবং বিশ্বজনীন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেই পুরোনো বারান্দা আর শ্রেণিকক্ষগুলো আজও যেন তার উপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তিনি কি কেবল শিক্ষক ছিলেন? না, তিনি ছিলেন একজন ‘মেন্টর’ বা জীবন-পথের দিশারি। তার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা কেবল ব্যাকরণ বা সাহিত্যের রসদ খুঁজে পেত না, তারা শিখত কীভাবে জীবনকে নির্মোহভাবে দেখতে হয়। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল বা মতের অনুসারী হতে কাউকে বাধ্য করেননি, বরং শিখিয়েছেন নিজের মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে।

মিশেল ফুকোর মতে, জ্ঞান ও ক্ষমতা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আবুল কাসেম ফজলুল হকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, জ্ঞানই ছিল তার একমাত্র ক্ষমতা। তিনি কখনো পদ-পদবির পেছনে ছোটেননি, বরং পদই তাকে খুঁজে নিয়েছে। তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এক প্রকার হবসীয় দৃঢ়তা থাকলেও সেখানে কোমলতার অভাব ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মেরুদণ্ড সোজা রাখা মানে অহংকার নয়, বরং তা হলো নিজের আদর্শের প্রতি সততা।

বর্তমানের এই ভোগবাদী পৃথিবীতে যেখানে সাফল্য মানেই অঢেল সম্পদ আর লোকচক্ষুর সামনে জাঁকজমক প্রদর্শন, সেখানে আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক বিপ্রতীপ স্রোত। তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, অনেকটা মহর্ষিদের মতো। অথচ তার চিন্তার জগৎ ছিল সীমাহীন বিস্তৃত। তার প্রবন্ধে বারবার উঠে এসেছে এক গভীর আক্ষেপ কেন আমরা একটি প্রকৃত সুশীল সমাজ গঠন করতে পারলাম না? রাজনীতির যে অবক্ষয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তা তাকে পীড়িত করত।

আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা হেজিমনি তত্ত্বের আলোকে তিনি মনে করতেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল পেশি দিয়ে নয়, বরং সংস্কৃতি দিয়ে মানুষকে শাসন করে। আর এই শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে সাধারণ মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলতেন, ‘যেদিন রিকশাচালক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একই ভাষায় জ্ঞান নিয়ে আলোচনা করবেন, সেদিনই প্রকৃত গণতন্ত্র আসবে।’ তার এই কথাগুলো শুনতে কিছুটা কাল্পনিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল সাম্যের এক সুগভীর দর্শন। তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে ছিলেন আপসহীন। বিদেশি শক্তির আধিপত্য যখন বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে গ্রাস করতে আসত, তিনি তার ক্ষুরধার কলমে তার প্রতিবাদ জানাতেন। সার্বভৌমত্বকে তিনি কেবল ভূখণ্ড রক্ষা নয়, বরং মানসিক মুক্তি হিসেবে দেখতেন।

সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন অনন্য উচ্চতায়। তিনি সাহিত্যকে কেবল নন্দনতত্ত্বের মাপকাঠিতে বিচার করেননি। তার কাছে সাহিত্য ছিল সমাজের দর্পণ এবং পরিবর্তনের হাতিয়ার। গ্যেটে কিংবা টলস্টয়কে তিনি যখন ব্যাখ্যা করতেন, তখন তাতে মিশে থাকত বাংলার মাটির ঘ্রাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের আবেদন তখনই চিরন্তন হয় যখন তা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে, কিন্তু তার শেকড় থাকতে হয় নিজের ঐতিহ্যে। রবীন্দ্র-উত্তর যুগে প্রবন্ধ সাহিত্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তিনি তা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে।

তার গদ্য ছিল ঝরঝরে, কোথাও কোনো মেদ ছিল না। অতিরিক্ত পাণ্ডিত্যের বোঝা তিনি পাঠকের ওপর চাপিয়ে দিতেন না। বরং সহজ ভাষায় কঠিন সত্যটি বলে দেওয়াই ছিল তার বৈশিষ্ট্য। ‘আমাদের শিকড় বাংলায়, কিন্তু আমাদের শাখা থাকবে সারা বিশ্বে’ এই অমর বাণীটি কেবল তার নয়, বরং পুরো বাঙালি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার মন্ত্র হওয়া উচিত। তিনি লালন আর হাসন রাজার দর্শনের মধ্যে যে সমন্বয় খুঁজতেন, তা আধুনিক শিক্ষিত সমাজের জন্য এক বড় শিক্ষা। তিনি শিখিয়েছেন, লোকজ ঐতিহ্য আর আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা চারদিকে তাকিয়ে দেখি বুদ্ধিজীবীদের চরম দলদাসত্ব, তখন আবুল কাসেম ফজলুল হকের অভাব আরও বেশি করে অনুভূত হয়। সত্য বলার সাহস এখন বিরল হয়ে যাচ্ছে। স্বার্থের সংঘাতে যখন বড় বড় পণ্ডিতরা নীরব থাকেন, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন এক জ্বলজ্বলে ব্যতিক্রম। তিনি কখনো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর তাবেদারি করেননি। এই একাকী লড়াইটা সহজ ছিল না। সমাজের স্রোতের বিপরীতে চলতে গিয়ে তাকে অনেক সময় সমালোচনার শিকার হতে হয়েছে, কিন্তু তিনি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।

তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্ধকার যত ঘনীভূত হয়, প্রদীপের গুরুত্ব তত বেড়ে যায়। তিনি নিজে একটি প্রদীপ হয়ে জ্বলেছিলেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তি ‘অন্ধকারকে গালি না দিয়ে একটি প্রদীপ জ্বালো’ এটি কেবল একটি প্রবাদ নয়, এটি ছিল তার জীবনদর্শন। তিনি জানতেন, সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। ইমানুয়েল কান্ট যেভাবে ‘চিরস্থায়ী শান্তি’র কথা বলেছিলেন, অধ্যাপক হকও তেমনি এক শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন। তবে তিনি ছিলেন বাস্তববাদী; জানতেন যে লড়াইটা মানসিক এবং সাংস্কৃতিক। তাই তিনি বারবার তরুণ প্রজন্মের ওপর জোর দিয়েছেন। তরুণদের সুশিক্ষিত এবং যুক্তিবাদী করে তোলাই ছিল তার জীবনের মূল লক্ষ্য।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের শরীরী প্রস্থান হয়তো আমাদের মধ্যে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু তার চিন্তা কি মরে গেছে? জর্জ উইলহেম হেগেলের ‘গেইস্ট’ বা বিশ্ব-আত্মার ধারণার মতো আবুল কাসেম ফজলুল হকের দর্শন আমাদের জাতীয় মননে প্রবাহিত হতে থাকবে। তিনি যে ‘চিন্তার কাঠামো’ রেখে গেছেন, তা আগামী বহু বছর ধরে গবেষক ও পাঠকদের পথ দেখাবে। তার লেখা বইগুলো কেবল আলমারিতে সাজিয়ে রাখার জন্য নয়, বরং বারবার পড়ার জন্য। সেখানে পাওয়া যায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি এবং জীবনের অর্থ।

মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন? যারা তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, তারা জানেন তার হাসির ভেতরে একটা নির্মল শিশুমন লুকিয়ে ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি আলাপ করতেন গম্ভীর সব বিষয় নিয়ে, কিন্তু তার মাঝেও থাকত রসবোধ। তিনি কোনো সংকীর্ণ দেয়াল তৈরি করেননি। 

আবুল কাসেম ফজলুল হক আসলে কোনো বিশেষ সময়ের জন্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন কালজয়ী। তার মেধা ও মনন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের নির্যাস। তিনি ছিলেন সেই প্রাজ্ঞ ঋষি, যিনি আধুনিকতার পোশাক পরলেও হৃদয়ে ধারণ করতেন বাংলার চিরন্তন লোকজ রূপ। তার প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, চিন্তার লড়াই কখনো শেষ হয় না। একটি দীপ নিভে গেলে আরেকটি জ্বালিয়ে নিতে হয়।

তিনি নেই, কিন্তু তার পদচ্ছাপ এই বাংলার মাটিতে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। যখনই কোনো মানুষ সত্যের জন্য লড়াই করবে, যখনই কোনো ছাত্র প্রথাগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করবে, যখনই কোনো লেখক আপসহীন কলম ধরবে তখনই আবুল কাসেম ফজলুল হক সেখানে সশরীরে না থাকলেও উপস্থিত থাকবেন তার আদর্শ হয়ে। ‌মুক্ত করো ভয়, নিজেরে করো জয়’ রবীন্দ্রনাথের এই পঙ্‌ক্তিটিই যেন ছিল তার জীবনের মূলমন্ত্র। বাঙালির মননবিশ্বে তিনি এক অক্ষয় বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন, যা রোদ-বৃষ্টি সয়েও ছায়া দিয়ে যাবে আগামী প্রজন্মকে। তার প্রস্থান আমাদের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া দর্শনই সেই ক্ষত নিরাময়ের পথ দেখাবে। মহাকালের পটে তিনি এক ঋজু এবং শুভ্র পদচ্ছাপ হিসেবেই অমলিন থাকবেন। তার আত্মার এই অভিযাত্রা অনন্তের পথে সফল হোক, আর আমাদের জীবনে তার জীবনদর্শনের ছায়া দীর্ঘতর হোক।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক

সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
সামাজিক অবক্ষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সমাজ পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল সমাজে নিত্যনতুন সমস্যা এবং সম্ভাবনা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নদীর মতো প্রবাহমান থাকে। মানুষের জীবনে সমাজের বিকল্প নেই। সমাজ হচ্ছে অস্তিত্ব ও মানুষের বসবাসের যথার্থ রূপকল্প। আমরা যে পৃথিবীতে আছি এবং জীবন-যাপন করছি তার পরিচয়টি সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের মাধ্যমে বিকাশিত হয়। সমাজবদ্ধভাবে জীবনযাপন করে মানুষ সমাজকে সমৃদ্ধ করে এবং নিজেও সৌভাগ্যের অধিকারী হয়। তবে সমৃদ্ধ মানবসমাজে সামাজিক অবক্ষয় হলে এবং নীতি-নৈতিকতা বিলীন হয়ে গেলে মানুষ অস্তিত্বসংকটে পড়ে।

আজ ভগ্ন সমাজের ভয়ংকর দিকগুলো নগ্নভাবে আমাদের সামনে উন্মোচিত। ভালোমন্দের মধ্যে বিচারিক ক্ষমতা, বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তার স্বাধীনতা থাকার কারণে মানুষকে প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয় না। আর এজন্য সৃষ্টির বিস্ময় মানুষের সেবায় পৃথিবীর সবকিছু নিয়োজিত। তবে মানুষের ভয়ংকর ও কুৎসিত রূপ যখন তার নিজ সমাজের সম্মুখে প্রকাশিত হয়, তখন ওই সমাজের মানুষ তাকে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে উপমা দিয়ে থাকে। কার্যক্ষেত্রে জন্তু-জানোয়ার থেকে আরও বেশি নিকৃষ্ট মনে করে। বর্তমানে নীতিহীনতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখলে যেকোনো বিবেকবান মানুষ ভয়ে শিহরিত হয়ে গায়ের রক্তহিম হয়ে যাবে এবং অন্তরাত্মা কেঁপে উঠবে। 
মাত্র ২০০০ টাকার জন্য ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আয়েশা নামের একটি মেয়ে জোড়া খুন করে। সে জানায়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গৃহকর্মীর ব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেছিল। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, দারিদ্র্যের অভিশাপ তাকে পাপের দিকে টেনে এনেছে। অর্থের অভাব সব অনর্থের মূল বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। কার্যত রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করত, হয়তোবা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত নাও হতে পারত। 

বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল তাদের মেয়ে ডাক্তার হয়ে মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু বাবা-মায়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে, উল্টো মা-বাবাকেই ঘুমের ওষুধ সেবন করিয়ে নিষ্ঠুরভাবে নিজ হাতে হত্যা করে তাদের একমাত্র সন্তান। বলছি দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আদালতের দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৫ সালে বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশীকে নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। বয়স কম, অতীতে ফৌজদারি অপরাধ না থাকার কারণে এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার-বিবেচনায় নিয়ে আদালত তার সাজা কমিয়ে দেয়। তবে এখানে বিচারপতির পর্যবেক্ষণে সামাজিক অবক্ষয় ও অধঃপতনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। মা-বাবা দুজনেই চাকরিরত থাকায় তাদের সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি। ফলে ঐশী একাকীত্ব ঘোচাতে খারাপ সঙ্গের পাল্লায় পড়ে নেশার জগতে প্রবেশ করে। রায়ে বলা হয়, মা-বাবাই সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষক। সুতরাং, সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত এবং সময় দেওয়া খুবই প্রয়োজন ছিল। মাদকদ্রব্যের সহলভ্যতা না থাকলে হয়তোবা ঐশীও ডাক্তার হয়ে মানবসেবাই করত। 

২৬ জুন, ২০১৯ সালে বরগুনা সরকারি কলেজের কাছে স্ত্রী মিন্নির সামনে তার স্বামী রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে ‘বন্ড বাহিনী’ নামের কিশোর গ্যাং এ হত্যায় জড়িত ছিল। আর এই কিশোর গ্যাং মূলত রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় বরগুনা জেলায় মাদকসাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করত। মিন্নি অপরাজনীতি ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসার কারণে স্বামী-সংসার হারিয়ে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তা না হলে, এখন হয়তোবা স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই থাকত। আমাদের দেশে এই জাতীয় ঘটনা অহরহ ঘটছে। সন্তানের হাতে বাব-মা, বাব-মায়ের হাতে সন্তান, স্বামীর হাতে স্ত্রী আবার স্ত্রীর হাতে স্বামী, ভাইয়ের হাতে ভাইসহ লোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটছে।

সম্প্রতি ২৯ জুন কুমিল্লায় প্রেমিকার হাতে প্রেমিক খুন হয়। ঘটনা যদি এ পর্যন্ত থেমে থাকত তাহলে খুব বেশি আলোচনা হতো না। মাত্র ১৫ বছর বয়সী নাইমা এর আগে একবার গর্ভপাত করেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিক ফয়সাল ও তার বন্ধুর সঙ্গে একত্রে রাত্র যাপন করে ফরিদপুরের মেয়ে নাইমা। এখানেই সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা ও গভীর ক্ষত আন্দাজ করে যেকোনো সমাজ সচেতন ব্যক্তি আঁতকে উঠবে। 

পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার ফলে একক পরিবারের প্রসার এবং সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের উদাসীনতা ভঙ্গুর সমাজের আরেক রূপ বলা যায়। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জেরে স্বামী-স্ত্রীকে, স্ত্রী-স্বামীকে অথবা তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সহযোগিতায় একে অপরকে হত্যা করছে। ২০১৪ সালে পরকীয়া প্রেমিকের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলায় প্রতিবেশী দুই শিশু জসিম ও আরাফাতকে গলা কেটে হত্যা করেছিল কুমিল্লার ইয়াসমিন ও তার চাচিশাশুড়ি মাজেদা বেগম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সপরিবারে হত্যা করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইতালিতে বাংলাদেশ কমিউনিটিতে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সময়ে সন্তান ফেলে অন্যের হাত ধরে চলে যাওয়া এই ভঙ্গুর সমাজ স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছে।

সামাজিক অবক্ষয়ের মাত্রা কতটা ধ্বংসাত্মক হলে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হতে পারে। ২০২৪ সালে মাগুরায় আট বছর বয়সী আছিয়াকে রামিসার মতো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ২৬ সালের মার্চে সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরাকে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু এবং ধর্ষণ-পরবর্তী ও ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক খুনি কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে শিশু, যুবক এবং বৃদ্ধসহ সমাজের কোনো স্থর রক্ষিত নেই। বিশেষত, শিশু ও যুবসমাজ নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।

বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ নেশাগ্রস্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং সরকারি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা ৮৩ লাখের বেশি। ২০১৮ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় এ সংখ্যা ছিল ৩৬ লাখ। মাদকাসক্তদের বৃহৎ অংশ পুরুষ হলেও নারী ও শিশুর সংখ্যা প্রায় কাছাকাছি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আংটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকের কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৫৯০০ কোটি টাকা পাচার হয়। যা মাদক ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে আছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলা রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য চোরাচালানের রুট (পথ) গোল্ডেন ওয়েজ, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে গত চার দশকে অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রচলিত, অপ্রচলিত এবং বহুল ব্যবহৃত মাদক স্রোতের মতো ভেসে আসছে। দেশের প্রতিটি খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্যসহ অপরাধমূলক প্রায় সব কর্মকাণ্ডে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

গণহারে এবং বাছবিচারহীনভাবে দেওয়া এ-প্লাস এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের মূল কারণ। করোনা-পরবর্তী ধ্বংসের মাত্রা আরও ঊর্ধ্বগামী হয়। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী পড়ালেখা পরিহার করে ভিডিও গেম এবং অনলাইনে নেভিগেশনে ব্যস্ত সময় পার করতে থাকে। বর্তমানেও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে যুবসমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধৈর্য এবং দেশপ্রেমের অভাব দেখা দিয়েছে। নৈতিক চরিত্রের অবলুপ্তির কারণে সমাজ থেকে শ্রদ্ধা, সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার হারিয়ে যাচ্ছে। আর বর্তমান সমাজে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা বর্ণিত কারণের ফল মাত্র। মানুষের ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতা থাকলে এ জাতীয় ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে না। সামান্য অর্থের জন্যই অর্থলোভী ও কুচক্রী মহল দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অবলীলায় ঠেলে দিচ্ছে। আর একটি রাষ্ট্র তখনই ধ্বংস হয়, যখন তার নাগরিকদের নৈতিকতার অধঃপতন ঘটে।

আফ্রো-আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের পতন ও নীতিহীনতার বিস্তার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন–‘আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো খারাপ মানুষের ভয়ংকর আচরণ বা নিষ্ঠুরতা নয় বরং মানুষের ভয়ংকর নীরবতা’। তার মন্তব্য সামাজিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের নীরবতার বিপক্ষে স্পষ্ট অবস্থান। সততই বিতর্কিত বিষয়গুলো সমাজ ও রাষ্ট্র উপেক্ষা করে নির্ভার পানকৌড়ি হতে পারে না। সুতরাং রাষ্ট্রকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, খুন-ধর্ষণ বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ এবং বতর্মান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে। আর সামজিকভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর (মসজিদ, মন্দির, গির্জা ইত্যাদি) মাধ্যমে মাদক ও সামজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সংবাদ বিশ্লেষক
[email protected] 

ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডগুলোর কাছে একজন মায়ের অনুরোধ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডগুলোর কাছে একজন মায়ের অনুরোধ
ছবি: সংগৃহীত

অনেক দিন ধরেই বিষয়টা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময় হচ্ছিল না। গত কয়েক দিন জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, গলাব্যথা ও শরীরব্যথা নিয়ে বাসায় বিশ্রামে থাকতে থাকতে ভাবলাম, এবার লিখেই ফেলি।

ঢাকা শহরে এখন বাচ্চাদের জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর ইনডোর প্লেগ্রাউন্ড হয়েছে। খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় আমরাও বাবা-মা হিসেবে বাচ্চাদের সেখানে নিয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। অফিস শেষে আমারও চেষ্টা থাকে, সপ্তাহে অন্তত দুই-তিন দিন মেয়েকে নিয়ে একটু খেলতে যাওয়ার। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে খুব কষ্ট দেয়।

প্রায় সব ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডেই ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙিন, কার্টুন দিয়ে সাজানো পেস্ট্রি, কেক, ফ্রেঞ্চফ্রাই ও নানা ধরনের জাঙ্কফুড। আবার বাইরে থেকে খাবার নেওয়াও নিষেধ।

সমস্যাটা শুধু খাবার বিক্রি করা নয়- সমস্যা হলো, ছোট্ট বাচ্চারা তো বোঝে না কোনটা স্বাস্থ্যকর আর কোনটা নয়। তারা যা দেখে, সেটাই চাইবে। তখন একজন বাবা-বা মায়ের জন্য ‘না’ বলা খুব কঠিন হয়।

মাসে এক বার বা দুই বার পেস্ট্রি খাওয়ানো এক কথা, কিন্তু যদি সপ্তাহে কয়েকবার সেখানে যেতে হয়, তাহলে কি প্রতিবারই বাচ্চাকে পেস্ট্রি বা জাঙ্কফুড কিনে দিতে হবে?

আমার মনে হয়, ইনডোর প্লেগ্রাউন্ডে অভিভাবকদের জন্য সাধারণ চা বা কফির ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, এক কাপ কফির দাম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আর ছোট্ট একটি পেস্ট্রির দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই দামগুলো সত্যিই অস্বাভাবিক। আমরা তো সেখানে খেতে যাই না, বাচ্চাদের খেলাতে নিয়ে যাই।

ইতোমধ্যেই দুই ঘণ্টা খেলার জন্য ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা প্রবেশমূল্য দিচ্ছি। এর পর যদি খাবারের জন্যও বাধ্য হয়ে আরও কয়েক শ টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে বিষয়টি অনেক পরিবারের জন্য চাপ হয়ে যায়।

আমার অনুরোধ, ব্যবসা অবশ্যই করবেন। লাভও করবেন। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করবেন না, যেখানে বাবা-মাকে প্রতিবার বাচ্চার কান্নার কাছে হার মানতে হয়। স্বাস্থ্যকর কিছু স্ন্যাকস রাখতে পারেন, সাধারণ দামের চা-কফি রাখতে পারেন কিংবা বাবা-মাকে বাচ্চার জন্য ছোটখাটো স্বাস্থ্যকর খাবার নিয়ে আসার অনুমতি দিতে পারেন।

আমরা চাই, আমাদের বাচ্চারা খেলুক, হাসুক, সুস্থ থাকুক। প্রতিবার খেলতে গিয়ে অস্বস্তি ও বাড়তি চাপ নিয়ে যেন ফিরতে না হয়।

আর কোনো বাবা-মায়ের কি একই অভিজ্ঞতা হয়েছে?

লেখক: সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ

আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
আমেরিকা: ২৫০ বছরের স্বাধীনতার আলো, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক অনন্য ইতিহাস
মোহম্মদ শরীফ

আজ ৪ জুলাই। স্বাধীনতার এমন একদিন, যা শুধু একটি জাতির জন্মদিন নয়; এটি স্বাধীনতার প্রতি মানুষের অদম্য আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার এবং সীমাহীন সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

১৭৭৬ সালে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ করবে। আড়াই শতাব্দীর এই পথচলা কখনো সহজ ছিল না। যুদ্ধ, বিভাজন, অর্থনৈতিকসংকট, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং নানা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আজকের আধুনিক, শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী আমেরিকার জন্ম হয়েছে।

আমেরিকার প্রকৃত শক্তি তার আকাশচুম্বী ভবন, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক সক্ষমতায় নয়–এর প্রকৃত শক্তি তার মানুষ। প্রতিদিন ভোরে কাজে বেরিয়ে পড়া শ্রমিক, রোগীর সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও নার্স, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর শিক্ষার্থী, গবেষণাগারে কর্মরত বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষক এবং অসংখ্য নীরব কর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই দেশ।

বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অভিবাসীরা নিজেদের শ্রম, মেধা ও সততার মাধ্যমে আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশি-আমেরিকানদের অবদানও অত্যন্ত গর্বের। তারা শুধু নিজেদের পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করছেন না, বরং শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, ব্যবসা ও জনসেবার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।

স্বাধীনতা শুধু একটি অধিকার নয়; এটি একটি দায়িত্ব। আইনকে সম্মান করা, ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করা, কঠোর পরিশ্রম করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলাই স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা।

আজ আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেই সব নারী-পুরুষকে, যাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতা স্বাধীনতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে সম্মান জানাই আজকের সেই সব মানুষকে, যারা প্রতিদিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে আমেরিকার অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছেন।

স্বাধীনতার ২৫০ বছরের এই গৌরবময় অধ্যায় আমাদের একটি শিক্ষা দেয়–যে জাতি পরিশ্রমকে সম্মান করে, আইনের শাসনকে ধারণ করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেয়, সেই জাতিই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেয়।

আজকের এই বিশেষ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিশ্বের সব মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।

শুভ স্বাধীনতা দিবস, আমেরিকা।

লেখক: রাষ্ট্রচিন্তক; সিলিকন ভ্যালি, আমেরিকা