বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তুমুল বৃষ্টি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুম বৃষ্টির ফলে জলাবদ্ধতায় থমকে গেছে নগর। তবু বাংলাদেশের মানুষ বর্ষাকে ভালোবাসে। কবিতায়, গানে, কৃষিতে, প্রকৃতির নবজাগরণে বর্ষার সৌন্দর্য অনন্য। আবার এই বর্ষাই প্রতি বছর লাখো শিশুর জন্য নিয়ে আসে কঠিন বাস্তবতা–বিদ্যালয়ে যেতে না পারার কষ্ট, বই-খাতা ভিজে যাওয়ার যন্ত্রণা, পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘ বিরতি। যে শিশু কয়েক দিন আগেও শ্রেণিকক্ষে বসে অঙ্ক কষছিল, গল্প পড়ছিল কিংবা নতুন অক্ষর শিখছিল, বর্ষার পানি বাড়তেই সে হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন। কোথাও নৌকা ছাড়া স্কুলে যাওয়ার উপায় থাকে না, কোথাও বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, কোথাও আবার জলাবদ্ধতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অভিভাবকেরাই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে সাহস পান না। ফলে একটি মৌসুমি দুর্যোগ ধীরে ধীরে রূপ নেয় শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সংকটে।
বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে আলোচনায় আমরা সাধারণত পরীক্ষার ফল, পাঠ্যক্রম, শিক্ষকসংকট কিংবা অবকাঠামোর কথা বলি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন যে এখন শিক্ষারও অন্যতম বড় সংকট, সে উপলব্ধি এখনো নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ুর অভিঘাত এখন শুধু কৃষি, স্বাস্থ্য বা অর্থনীতিকে নয়, শিশুদের শেখার অধিকারকেও প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ সংকটের ভয়াবহতা বোঝাতে সাম্প্রতিক একটি তথ্যই যথেষ্ট। ইউনিসেফের ২০২৫ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর শিক্ষাজীবন কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছে। এপ্রিল-মের তীব্র তাপপ্রবাহে সারা দেশে বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়েছিল, এরপর ঘূর্ণিঝড় রিমাল ও জুনের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। শুধু সিলেট অঞ্চলের বহু শিক্ষার্থী আট সপ্তাহ পর্যন্ত শ্রেণিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এটা এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডারও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো, সেই বাস্তবতার জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশের শিশুরা এমনিতেই শিখন-সংকটের মধ্যে আছে। ইউনিসেফের ভাষায়, দেশে প্রতি দুজন শিশুর একজন নিজের শ্রেণির উপযোগী পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারে না, দুই-তৃতীয়াংশ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও মৌলিক গণনা-দক্ষতায় পিছিয়ে থাকে। এমন অবস্থায় কয়েক সপ্তাহের শিক্ষাবিরতি কেবল কয়েকটি ক্লাস করতে না পারার ব্যাপার নয়, এটা শেখার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
শিশুশিক্ষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধারাবাহিকতা। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো কয়েক সপ্তাহ পরে আবার পড়াশোনায় ফিরতে পারে। কিন্তু প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণির একজন শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে প্রতিদিন অক্ষর চিনতে শেখে, বাক্য গঠন শেখে, সংখ্যা বোঝে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে শেখে, শিক্ষককে অনুসরণ করতে শেখে। এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে শেখার গতি যেমন কমে যায়, তেমনি আত্মবিশ্বাসও নষ্ট হয়। অনেক শিশু ফিরে এসে আগের পাঠই ভুলে যায়।
বর্ষার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওড়, চর, উপকূল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার শিশুরা। বর্ষা সেখানে কেবল ঋতু নয়, জীবনযাত্রার কাঠামো বদলে দেওয়া বাস্তবতা। বিদ্যালয়ে যেতে নদী পার হতে হয়, কাঁচা রাস্তা ডুবে যায়, নৌযানই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা। অনেক বিদ্যালয় সপ্তাহের পর সপ্তাহ কার্যত অচল থাকে। আবার কোথাও বিদ্যালয়কে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করায় শিক্ষা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ভুল হবে যদি মনে করি, এটা শুধু প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা অন্যান্য বড় শহরেও জলাবদ্ধতা এখন নিয়মিত ঘটনা। ইতোমধ্যে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, হাঁটুপানি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছেপ না। ফলে বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা আজ গ্রাম-শহর উভয়ের বাস্তবতা, যদিও এর তীব্রতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন।
সবচেয়ে নীরব কিন্তু গভীর ক্ষতি ঘটে তখন, যখন শিশুরা ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের সঙ্গে মানসিক সম্পর্ক হারাতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের বিরতি অনেক সময় কয়েক মাসের অনুপস্থিতিতে পরিণত হয়। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কেউ পারিবারিক কাজে যুক্ত হয়, কেউ মৌসুমি শ্রমে যায়, কারও ক্ষেত্রে বেড়ে যায় স্থায়ী ঝরে পড়ার ঝুঁকি। অর্থাৎ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ শেষ পর্যন্ত সামাজিক বৈষম্যকেও আরও তীব্র করে তোলে।
এ কারণেই বর্ষাজনিত শিক্ষাবিচ্ছিন্নতাকে কেবল দুর্যোগব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটা এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু অভিযোজন–এই তিনটিরই মিলিত প্রশ্ন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর যখন একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তখনো কেন আমরা প্রতিবারই অপ্রস্তুত থাকি? কেন বর্ষা এলেই শিক্ষা কার্যক্রম যেন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোর দিকে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশে দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও শিক্ষা–দুটি খাতই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাস্তবে তাদের সমন্বয় এখনো সীমিত। বন্যা বা অতিবৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও অধিকাংশ এলাকায় আগাম কোনো বিকল্প শিক্ষা পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকে না। কোথাও অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা নেই, কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়িতে অনুশীলনের উপকরণ পৌঁছায় না, আবার কোথাও শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ফলে দুর্যোগ দেখা দিলেই শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
অথচ দুর্যোগপ্রবণ অনেক দেশ ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোতে বিদ্যালয়ের জন্য আগাম দুর্যোগ পরিকল্পনা, বিকল্প পাঠসূচি, কমিউনিটিভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা এবং দ্রুত পুনরায় পাঠদান শুরু করার সুস্পষ্ট প্রোটোকল রয়েছে। শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতাকে সেখানে দুর্যোগব্যবস্থাপনারই অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশেরও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের সময় এসেছে।
দেশের মধ্যেও ইতিবাচক অভিজ্ঞতার অভাব নেই। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও নদীবিধৌত কিছু এলাকায় ভাসমান বিদ্যালয় বহু বছর ধরে প্রমাণ করে আসছে যে, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা সব সময় শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা নয়। বিদ্যালয় যখন শিশুর কাছে পৌঁছে যায়, তখন বর্ষার পানিও শেখাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। এই উদ্যোগগুলো দেখিয়েছে, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিকল্পনা করলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এগুলো এখনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প, জাতীয় শিক্ষানীতির মূলধারায় সেভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
অনেকে মনে করেন, ডিজিটাল শিক্ষা বা অনলাইন ক্লাসই সমস্যার সমাধান। কোভিড-১৯-এর অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, বিষয়টি এত সহজ নয়। শহরের অনেক পরিবারের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যকর হলেও হাওড়, চর কিংবা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক শিশুর হাতে স্মার্টফোন নেই, অনেক পরিবারে একটি ফোন থাকলেও সেটা কর্মজীবী সদস্যের সঙ্গে বাইরে থাকে। ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল, বিদ্যুৎ অনিয়মিত এবং ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা। ফলে অনলাইন শিক্ষা একটি সহায়ক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু এটা কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না।
বরং আমাদের প্রয়োজন বহুমাত্রিক বিকল্প। যেখানে ইন্টারনেট নেই, সেখানে মুদ্রিত স্বশিক্ষা প্যাকেট, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক-শিক্ষক, কমিউনিটি রেডিও বা টেলিভিশনভিত্তিক পাঠ, মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা–সবকিছুর সমন্বিত ব্যবহার করা যেতে পারে। একেক অঞ্চলের জন্য একেক ধরনের সমাধানই হবে সবচেয়ে কার্যকর।
বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের। কারণ এ বয়সে প্রতিটি দিন গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী যদি এক মাস নিয়মিত পাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তার ক্ষতি একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শুধু বিদ্যালয় খুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, প্রয়োজন শিখন-ঘাটতি মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধারমূলক পাঠদান এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা।
আরও একটি বিষয় প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়–বিদ্যালয় শিশুদের জন্য শুধু শেখার জায়গা নয়, এটি নিরাপত্তা, পুষ্টি, সামাজিকীকরণ এবং মানসিক বিকাশেরও কেন্দ্র। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে বেড়ে যায় শিশুশ্রমের ঝুঁকি, আর কিশোরীদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে বিয়ের আশঙ্কাও বাড়তে পারে। অর্থাৎ শিক্ষাবিরতির প্রভাব শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিস্তৃত।
এ কারণেই বর্ষা জেঁকে বসার আগে কয়েকটি পদক্ষেপকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, দুর্যোগপ্রবণ প্রতিটি জেলার জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক জরুরি শিক্ষা পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা। দ্বিতীয়ত, যেসব বিদ্যালয় নিয়মিত আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে বিকল্প পাঠদানের আগাম ব্যবস্থা রাখা। তৃতীয়ত, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ভাষায় প্রস্তুতকৃত স্বশিক্ষা প্যাকেট ও অনুশীলন সামগ্রী আগেই বিতরণ করা। চতুর্থত, শিক্ষক, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে স্থানীয় শিক্ষা সহায়তা দল গঠন করা। পঞ্চমত, দুর্যোগ শেষে শুধু সিলেবাস শেষ করার তাড়না নয়, বরং শিখন-ঘাটতি পূরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ষষ্ঠত, নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ এবং পুরোনো বিদ্যালয় সংস্কারে জলবায়ু-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করা।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতকে এখন জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মানে শুধু বাঁধ নির্মাণ বা আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি নয়, শিশুদের শেখার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে যে আলোচনা চলছে, সেখানে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে–সবচেয়ে বড় ক্ষতি অনেক সময় দৃশ্যমান অবকাঠামোয় নয়, মানবসম্পদে। একটি ভেঙে যাওয়া সেতু কয়েক মাসে পুনর্নির্মাণ করা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কার করা যায়, এমনকি বিধ্বস্ত ঘরবাড়িও আবার গড়ে ওঠে। কিন্তু একজন শিশুর হারিয়ে যাওয়া শেখার সময়, নষ্ট হয়ে যাওয়া শিক্ষাভিত্তি কিংবা বিদ্যালয়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অভ্যাস সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না। এই ক্ষতির হিসাব কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়-লাভ বিশ্লেষণে ধরা পড়ে না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে সেটিই সবচেয়ে বড় জাতীয় ক্ষতিতে পরিণত হয়।
বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবেই থাকবে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে। অর্থাৎ বর্ষা, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা নদীভাঙনের মতো বাস্তবতাকে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো আমাদের নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা দুর্যোগের কারণে থেমে যাবে না, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে পারবে।
এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা জরুরি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বন্যার সম্ভাব্যতা এবং বিদ্যালয়ের ঝুঁকির তথ্য একত্র করে আগাম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোন বিদ্যালয় কত দিন বন্ধ থাকতে পারে, কোথায় বিকল্প পাঠদান প্রয়োজন, কোথায় নৌযান বা অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র লাগবে–এসব বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে স্থানীয় সম্প্রদায়কেও এই প্রস্তুতির অংশ করতে হবে। বিদ্যালয় শুধু সরকারের নয়; এটি একটি সমাজেরও প্রতিষ্ঠান। অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসমাজ এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি একসঙ্গে কাজ করলে দুর্যোগকালেও শিশুদের শেখার ধারাবাহিকতা অনেকাংশে বজায় রাখা সম্ভব। শিশুর শিক্ষা রক্ষার দায়িত্বকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
এখানে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা উদ্যোগেরও ভূমিকা আছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ভাসমান বিদ্যালয়, কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, মোবাইল লাইব্রেরি কিংবা স্বশিক্ষা উপকরণ তৈরির মতো উদ্যোগগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে বিস্তৃত করা গেলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের শিশুরাও শিক্ষার মূলধারায় থাকতে পারবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়, এটা দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের ভিত্তি। যে শিশু আজ বর্ষার কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না, সে-ই কয়েক বছর পর দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, কৃষি উদ্ভাবক কিংবা দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে। ফলে প্রতিটি হারানো পাঠদিবস শুধু একজন শিশুর নয়, পুরো দেশের সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করে দেয়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার বাড়িয়েছে, লিঙ্গসমতা অর্জনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে এবং শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এখন সেই অর্জন টিকিয়ে রাখার নতুন চ্যালেঞ্জের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি–যেখানে বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যা যেকোনো দুর্যোগের মধ্যেও শিশুর শেখার অধিকার নিশ্চিত করতে সক্ষম।
বর্ষা আসবে, নদী ফুলে উঠবে, কোথাও কোথাও বন্যাও হবে। প্রকৃতির এই নিয়ম আমরা বদলাতে পারব না। কিন্তু শিশুর শিক্ষা বর্ষার পানিতে ভেসে যাবে কি না, সেটি পুরোপুরি মানুষের সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করে।
বর্ষা যদি প্রতি বছর আমাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা প্রকাশ করে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় প্রকৃতির নয়, আমাদের। আর যদি আমরা এখনই শিক্ষা ও দুর্যোগব্যবস্থাপনাকে একই সুতোয় গেঁথে জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে বর্ষা আর শিশুদের ভবিষ্যতের প্রতিপক্ষ হবে না, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে। একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে এর বিকল্প নেই।
লেখক: কথাসাহিত্যিক