ফ্যাটি লিভার (মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ–এমএএসএলডি) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা একটি নীরব রোগ। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনেকেই জানতে চান, ‘ফ্যাটি লিভারের কি কোনো কার্যকর ওষুধ আছে?’ বাস্তবতা হলো, ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর ওষুধের ভূমিকা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার কী?
যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। আগে একে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) বলা হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এমএএসএলডি নামে উল্লেখ করা হয়। এ রোগের কিছু রোগীর লিভারে শুধু চর্বি জমে থাকে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, এমনকি সিরোসিসও হতে পারে।
কেন ফ্যাটি লিভার হয়?
ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণগুলো হলো অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও জাংকফুড, কিছু ওষুধ এবং অ্যালকোহল সেবনের কারণে হয়ে থাকে।
চিকিৎসার মূল ভিত্তি
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলো হলো ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালকোহল পরিহার।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি, প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে ‘ওজন কমানো’ নিজেই সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা।
তাহলে ওষুধের ভূমিকা কোথায়?
বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো ম্যাজিক ওষুধ নেই। তবে নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ উপকারী হতে পারে।
১. ভিটামিন-ই
কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যাদের নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস (এনএএসএইচ) রয়েছে এবং ডায়াবেটিস নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কিছু ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।

২. পায়োগ্লিটাজোন
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকা রোগীদের কিছু ক্ষেত্রে এ ওষুধ উপকার দিতে পারে। এটি লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে ওজন বৃদ্ধি, শরীরে পানি জমা বা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
৩. জিএলপি ওয়ান রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু আধুনিক ওষুধ, যেমন–সেমাগ্লুটাইড, ওজন কমানোর মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারে উপকার দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এদের সম্ভাবনা দেখা গেলেও এখনো সব রোগীর জন্য রুটিন চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
৪. এসজিএলটি২ ইনহিবিটর
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ লিভারের চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে।
৫. আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড
অনেক রোগী ফ্যাটি লিভারের জন্য আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড গ্রহণ করেন। কিন্তু সাধারণ ফ্যাটি লিভারে এর কার্যকারিতা সীমিত এবং এটি মূল চিকিৎসা নয়।
৬. রেসমেটিরম
রেসমেটিরম সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় বহুল আলোচিত একটি নতুন ওষুধ। এটি বিশেষভাবে থাইরয়েড হরমোন রিসেপ্টর বিটা (THR-β) অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে এবং লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সহায়তা করে।
রেসমেটিরম মূলত লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে, ফাইব্রোসিসের অগ্রগতি ধীর করতে পারে এবং লিপিড প্রোফাইলেরও কিছু উন্নতি করতে পারে।
সাধারণ ফ্যাটি লিভারের সব রোগীর জন্য এ ওষুধ প্রয়োজন হয় না। সাধারণত বায়োপসি পরীক্ষায় এমএএসএইচ/এনএএসএইচ নিশ্চিত হলে অথবা ফাইব্রোসিস থাকলে কিংবা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও ঝুঁকি বেশি থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে এটি বিবেচনা করা হয়।
যদিও রেসমেটিরম নতুন আশার সৃষ্টি করেছে, তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যেমন এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। অন্যদিকে এটি একটি ব্যয়বহুল ওষুধ। এটির ব্যবহারে নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হয় এবং এটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের বিকল্প নয়। অর্থাৎ, রেসমেটিরম ব্যবহার করলেও রোগীকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, ফ্যাটি লিভারের মূল চিকিৎসা এখনো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই।
লিভার টনিক ও হারবাল ওষুধ কতটা নিরাপদ?
বাজারে প্রচলিত অনেক হারবাল বা লিভার পরিষ্কার জাতীয় ওষুধের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দুর্বল। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো উল্টো লিভারের ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ বা অপ্রমাণিত ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়?
ফ্যাটি লিভারের মূল সমস্যা হলো মেটাবোলিক ডিসফাংশন বা বিপাকীয় অসামঞ্জস্য। তাই কেবল একটি ট্যাবলেট দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। রোগী যদি অতিরিক্ত ওজন বহন করেন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ করেন এবং শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তাহলে শুধু ওষুধে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়া কঠিন।
কোন রোগীদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?
উল্লেখিত রোগীদের দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন–ডায়াবেটিস রোগী, স্থূল ব্যক্তি, লিভার এনজাইম দীর্ঘদিন বেশি, ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের ঝুঁকি, ফাইব্রোস্ক্যানে অগ্রসর রোগের ইঙ্গিত এবং পরিবারে লিভার রোগের ইতিহাস।
ভবিষ্যৎ চিকিৎসা
বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য নতুন নতুন ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসা আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর চিকিৎসা হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ।
উপসংহার
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কিছু ভূমিকা থাকলেও এটি কোনো ‘শুধু ওষুধে ভালো হয়ে যাওয়ার’ রোগ নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি (লিভার) বিভাগ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা।