হঠাৎ ভালো চলতে থাকা ব্যবসাটা ধসে গেল, সুস্থ-সবল শিশুটি মাঝরাতে কেঁদে কেঁদে নীল হয়ে যাচ্ছে, কিংবা আপনার কোনো সাফল্যে কারও চোখের চাউনি বুকটা কাঁপিয়ে দিল–বাঙালি সমাজে একে আমরা বলি ‘নজর লাগা’। অনেকেই একে কুসংস্কার ভাবেন, কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান যেখানে ‘নেতিবাচক শক্তি’ বা নেগেটিভ এনার্জি নিয়ে কথা বলে, ইসলাম সেখানে ১৪শ বছর আগেই ‘বদনজর’ বা ‘আইন’-এর বাস্তব অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বদনজর সত্য। (বুখারি)।
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত শেয়ার করার প্রবণতা বদনজরের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ইসলাম শুধু সমস্যার কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি, এর চমৎকার এবং বিজ্ঞানসম্মত সমাধানও দিয়েছে, যা ‘রুকইয়াহ’ বা আত্মিক চিকিৎসা নামে পরিচিত।
বদনজরের চিকিৎসায় আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর শেখানো একটি অনন্য ও জীবন্ত সুন্নত রয়েছে, যা আজ সমাজে প্রায় মৃত। আসুন, নির্ভরযোগ্য রেফারেন্সের আলোকে সেই নিখাদ সুন্নতি আমল ও দোয়াগুলো জেনে নিই।
১. বদনজরকারীর অজুর পানি দিয়ে গোসল
যদি সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় যে কার নজর লেগেছে, তবে ইসলামে একটি বিস্ময়কর এবং ফলপ্রসূ চিকিৎসা রয়েছে। সাহাবি সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-কে যখন আমের ইবনে রবীআ (রা.)-এর বদনজর লাগে, তখন নবিজি (সা.) আমের (রা.)-কে অজু করার নির্দেশ দেন।
আমের (রা.) একটি পাত্রে মুখমণ্ডল, দুই হাত কনুই পর্যন্ত, দুই পা গোছা পর্যন্ত এবং লজ্জাস্থান ধৌত করেন। এর পর সেই ব্যবহৃত পানি সাহল (রা.)-এর পেছন দিক থেকে তার মাথার ওপর ঢেলে দেওয়া হয়। অলৌকিকভাবে সাহল (রা.) তখনই সুস্থ হয়ে ওঠেন। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৫০৯; মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৭৪৫/১৭৪৬)।
অনেকেই মনে করেন পানিতে ফুঁ দিয়ে কুলি করার কথা, কিন্তু বিশুদ্ধ হাদিসে সরাসরি বদনজরকারীর অজুর পানি ব্যবহারের কথাই এসেছে।
২. ঝাড়ফুঁক বা পঠিতব্য দোয়া
যদি বদনজরকারী ব্যক্তি অজ্ঞাত হয়, তবে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের নিচের দোয়াগুলোর মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিয়মিত রুকইয়াহ করতে হবে:
সুরা ফালাক ও সুরা নাস: রাসুলুল্লাহ (সা.) জিন ও মানুষের বদনজর থেকে বাঁচতে এই দুটি সুরা নাজিল হওয়ার পর অন্য সব দোয়া ছেড়ে শুধু এগুলোর মাধ্যমেই আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। (সুনান ইবনু মাজাহ, ৩৫১১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত দোয়া: হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে নজর থেকে বাঁচাতে নবিজি (সা.) এই দোয়াটি পড়তেন:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ
উচ্চারণ: আউযু বিকালিমা তিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আয়নিল লাম্মাতিন।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাক্যসমূহের উসিলায় প্রতিটি শয়তান, বিষাক্ত জীব ও অনিষ্টকারী বদনজর থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। (সুনান ইবনু মাজাহ, ৩৫২৫)।
রোগমুক্তির সার্বজনীন দোয়া: বদনজর ও শারীরিক অসুস্থতায় এই দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী:
بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِي نَفْسِي، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِينِي، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِينِي
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বী নাফসী, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যীনী, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন, আও আইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীনী।
অর্থ: আল্লাহর নামে আমি নিজেকে রুকইয়াহ করছি, প্রতিটি ক্ষতিকারক জিনিস ও হিংসুক ব্যক্তির বদনজর থেকে। আল্লাহ আমাকে আরোগ্য দান করুন।
আমাদের উচিত লোকজ কুসংস্কার বা কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে না ছুটে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই খাঁটি ও বিজ্ঞানসম্মত সুন্নতের চর্চা সমাজজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক