একজন নারী হিসেবে আপনার মাথার ভেতরে কি সব সময় এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায়–বাড়িতে যথেষ্ট খাবার আছে তো? সন্তানের টিকা সময়মতো দেওয়া হয়েছে? আমি কাজে থাকাকালে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করবে কে? এমন অসংখ্য সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও দায়িত্বের তালিকা প্রতিনিয়ত কারও না কারও মাথায় ঘুরতেই থাকে।
এই অদৃশ্য মানসিক দায়িত্বকেই বলা হয় ‘মেন্টাল লোড’ বা মানসিক বোঝা। অধিকাংশ পরিবারে এই দায়িত্বের বড় অংশই বহন করেন নারীরা। পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া, ঘরের কাজের পরিকল্পনা করা, প্রয়োজন অনুমান করা, সবকিছু ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা–এসবই এমন শ্রম, যার স্বীকৃতি খুব কমই মেলে। এই দায়িত্ব যদি একা একজনের কাঁধে পড়ে, যথেষ্ট সহযোগিতা, বিশ্রাম বা স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে তা থেকে সৃষ্টি হতে পারে কেয়ারগিভার বার্নআউট বা পরিচর্যাকারীর চরম মানসিক ও শারীরিক অবসাদ।
অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে, অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। অথচ এই শ্রমকে এখনও স্বাভাবিক বা অবমূল্যায়িত হিসেবেই দেখা হয়।
মেন্টাল লোড কী?
মেন্টাল লোড হলো সেই অদৃশ্য মানসিক ও আবেগগত শ্রম, যার মাধ্যমে মানুষ প্রতিদিনের অসংখ্য কাজের পরিকল্পনা করে, দায়িত্ব ভাগ করে, প্রয়োজন আগে থেকেই অনুমান করে এবং শেষ পর্যন্ত কাজটি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে।
কেন নারীরাই বেশি বহন করেন এই বোঝা?
আজও সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো–নারীরাই স্বভাবগতভাবে ভালো পরিচর্যাকারী, রাঁধুনি, গৃহপরিচালক কিংবা সন্তান লালন-পালনে বেশি দক্ষ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সামাজিকভাবে শেখানো ভূমিকা।
ফলে নারীরা চাকরি করলেও, এমনকি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হলেও, ঘরের অধিকাংশ দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে থেকে যায়। একই সঙ্গে বহু কাজ সামলানোর কারণে তাদের ‘মাল্টিটাস্কিং’-এ দক্ষ বলা হয়। অথচ এক কাজ থেকে আরেক কাজে বারবার মনোযোগ সরানো মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।
অন্যদিকে, পুরুষদেরও ছোটবেলা থেকে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে ঘরের দায়িত্বে নেতৃত্ব দেওয়া তাদের কাজ নয়। ফলে অনেক সময় তারা সহকারী বা দর্শকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন।
বাস্তবে গবেষণা বলছে, পুরুষরাও সমান দক্ষতার সঙ্গে পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। লিঙ্গভিত্তিক সক্ষমতার প্রচলিত ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
মাতৃত্বের পর নারীরা প্রায়ই আয়, পদোন্নতি ও কর্মজীবনের অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়েন। এমনকি সন্তান নেওয়ার আগেই অনেক নিয়োগকর্তা মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নারীদের নিয়োগে অনীহা দেখান।
ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্যের বড় একটি অংশই এই ‘মাদারহুড পেনাল্টি’র কারণে তৈরি হয়।
সংঘাত, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় নারীদের পরিচর্যার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সময় অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন।
বাবারা কি দায়িত্ব নিতে চান না?
গবেষণা বলছে, অধিকাংশ বাবাই সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোকে জীবনের অন্যতম আনন্দের বিষয় মনে করেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা সব সময় বাস্তবে দায়িত্ব ভাগাভাগিতে রূপ নেয় না। এর একটি বড় কারণ সামাজিক ধারণা। অনেক পুরুষ মনে করেন, সন্তানের যত্নে বেশি সময় দিলে তাদের ‘ভালো উপার্জনকারী’ পরিচয় ক্ষুণ্ন হতে পারে। আবার অনেক দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি দীর্ঘ হলেও পিতৃত্বকালীন ছুটি খুবই সীমিত, ফলে দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি হয় না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বাবা সন্তানের পরিচর্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তারা মানসিকভাবে বেশি সুস্থ থাকেন, আত্মবিশ্বাসী হন, সামাজিক সম্পর্কও উন্নত হয়। পরিচর্যা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই উন্নত পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর আইন, উন্নত সেবা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
এই লক্ষ্যেই জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা বিভিন্ন দেশে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগি, পরিচর্যাকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে।
সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট–একটি পরিবার কিংবা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে সবারই কখনো না কখনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, আবার অন্যের পরিচর্যাও করতে হয়। তাই নারীদের ওপর একতরফাভাবে এই দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে নারী-পুরুষ, পরিবার, সমাজ, সরকার এবং কর্মক্ষেত্র–সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কমবে মানসিক চাপ, রোধ হবে পরিচর্যাকারীদের অবসাদ এবং তৈরি হবে আরও সমতাভিত্তিক সমাজ।
/এসএল