কখনো খুব আনন্দ, আবার হঠাৎই অকারণ মন খারাপ, বিরক্তি কিংবা কান্না–এমন অনুভূতির পরিবর্তন অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। সমাজে এখনো অনেকেই এটিকে ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘নারীদের স্বভাব’ বলে উড়িয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীর মুড সুইংয়ের পেছনে রয়েছে শরীরের জটিল হরমোনগত পরিবর্তন, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ক্রিয়া এবং নানা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তাই মুড সুইংকে দুর্বলতা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
হরমোনের ওঠানামাই সবচেয়ে বড় কারণ
নারীর শরীরে প্রধানত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নামের দুটি হরমোন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে থাকা সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর, যা আমাদের আনন্দ, শান্তি ও মানসিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে অনেক নারীর মধ্যে বিরক্তি, উদ্বেগ, ক্লান্তি, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বা মন খারাপ দেখা দেয়। একে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম। কারও ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো এতটাই তীব্র হতে পারে যে, দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হয়। তখন সেটিকে প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বলা হয়।
মস্তিষ্কের রাসায়নিক বার্তাবাহকের পরিবর্তন
মুড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউরো ট্রান্সমিটারগুলোর একটি হলো সেরোটোনিন। এটি কমে গেলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে।
ইস্ট্রোজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হলে সেরোটোনিন উৎপাদন ও কার্যকারিতাও পরিবর্তিত হয়। ফলে অনেক নারী মাসিকের আগে বা পরে আবেগের ওঠানামা বেশি অনুভব করেন। অর্থাৎ, এটি শুধুই মানসিক বিষয় নয়; বরং মস্তিষ্কের জৈবিক পরিবর্তনেরও ফল।
গর্ভাবস্থায় কেন আবেগ বেশি পরিবর্তিত হয়?
গর্ভধারণের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শরীরকে নতুন একটি প্রাণের জন্য মানিয়ে নিতে হয়। এই পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী নারীরা কখনো খুব আনন্দিত, আবার কখনো অকারণ উদ্বিগ্ন বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া, বমিভাব, শারীরিক অস্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও মুড সুইংকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সন্তান জন্মের পর মানসিক পরিবর্তন
প্রসবের পর হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুত কমে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের ঘাটতি, শিশুর যত্নের চাপ এবং নতুন দায়িত্ব। ফলে অনেক মা কয়েক দিনের জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যা সাধারণভাবে ‘বেবি ব্লুজ’ নামে পরিচিত।
মেনোপজেও বাড়তে পারে মুড সুইং
৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ নারী মেনোপজের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে। এর ফলে শুধু মাসিক বন্ধ হয় না, বরং ঘুমের সমস্যা, হট ফ্ল্যাশ, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি এবং মেজাজের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। অনেক নারী এই সময় নিজেদের আগের মতো প্রাণবন্ত অনুভব করেন না। কিন্তু এটি বয়সজনিত দুর্বলতা নয়; বরং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনের অংশ।
শুধু হরমোন নয়, জীবনযাপনও দায়ী
মুড সুইংয়ের জন্য শুধু হরমোনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা, থাইরয়েডের সমস্যা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চার অভাবও মেজাজের ওঠানামা বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া পারিবারিক দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও নারীর মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।
মুড সুইং পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও কিছু অভ্যাস এর তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উপকারী।
এছাড়া মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নিজের অনুভূতি পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং নেওয়াও কার্যকর হতে পারে।
নারীর মুড সুইংকে ‘নাটক’, ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘হরমোনের অজুহাত’ বলে অবহেলা করার সময় এখন আর নেই। বিজ্ঞান বলছে, এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল। তাই সমালোচনার বদলে প্রয়োজন সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা।
/এসএল