ঢাকা ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
আনোয়ারায় পানিবন্দি অর্ধশতাধিক গ্রাম, সহস্রাধিক পরিবারকে ত্রাণ বিতরণ বিশ্বকাপ ফাইনালের হাফটাইম শোতে জাস্টিন বিবার প্রথমবার সিনেমায় শাহরুখ সুহানা এমি অ্যাওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ২৫টি মনোনয়ন পেল ‘দ্য পিট’ বদনজর লাগলে যে দুটি কাজ করবেন স্ত্রীকে হত্যার পর আত্মহত্যা সাজানোর চেষ্টা, গ্রেপ্তার স্বামী ময়মনসিংহে শিশু হত্যা মামলায় ৩ আসামির মৃত্যুদণ্ড, একজনের কারাদণ্ড বিশ্বকাপ ফাইনাল মাতাবেন যারা ইরানে ২০ গুণ বড় মার্কিন হামলার ভিডিও শেয়ার করলেন ট্রাম্প টেক্সাসে ‘চেতনাতে নজরুল’: হৃদি হকের ব্যতিক্রমী সংগীত-নাট্য উপস্থাপনা ঘুষ নিয়ে ধরা বিমান কর্মকর্তা রাশেদ দণ্ডিত রিকশাচালক সাকিবুল হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন, আসামি গ্রেপ্তার স্বাস্থ্যসেবায় নতুন ধারণা দিচ্ছে ডক্টরস২৪ জামালপুরে গৃহবধূ হত্যায় ১৩ বছর পর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড চীনে বন্যায় নিহত ৩৯ মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে রেফারিদের পাশে কলিনা কুতুবদিয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু বর্ষায় সঙ্গে রাখতে হবে যেসব জিনিস পর্তুগালের নতুন কোচ হতে যাচ্ছেন জর্জ জেসুস! আলমডাঙ্গায় জমি নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা বাংলাদেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্থিতিশীল: এডিবি আগামী নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ পরিবেশ ও জাতীয় বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতির কোলে এক নির্মল জলভূমি সিরাজগ‌ঞ্জে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ১০ নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা সুনামগঞ্জে বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড বান্দরবানে পাহাড়ধসে পৃথক দুই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু

নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম
নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ

কখনো খুব আনন্দ, আবার হঠাৎই অকারণ মন খারাপ, বিরক্তি কিংবা কান্না–এমন অনুভূতির পরিবর্তন অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। সমাজে এখনো অনেকেই এটিকে ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘নারীদের স্বভাব’ বলে উড়িয়ে দেন। অথচ বাস্তবতা হলো, নারীর মুড সুইংয়ের পেছনে রয়েছে শরীরের জটিল হরমোনগত পরিবর্তন, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ক্রিয়া এবং নানা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তাই মুড সুইংকে দুর্বলতা নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

হরমোনের ওঠানামাই সবচেয়ে বড় কারণ

নারীর শরীরে প্রধানত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নামের দুটি হরমোন মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মাসিক চক্রের বিভিন্ন সময়ে এই হরমোনগুলোর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এর প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে থাকা সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ওপর, যা আমাদের আনন্দ, শান্তি ও মানসিক স্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে অনেক নারীর মধ্যে বিরক্তি, উদ্বেগ, ক্লান্তি, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বা মন খারাপ দেখা দেয়। একে বলা হয় প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম। কারও ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো এতটাই তীব্র হতে পারে যে, দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হয়। তখন সেটিকে প্রিমেনস্ট্রুয়াল ডিসফোরিক ডিসঅর্ডার বলা হয়।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক বার্তাবাহকের পরিবর্তন

মুড নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউরো ট্রান্সমিটারগুলোর একটি হলো সেরোটোনিন। এটি কমে গেলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে।

ইস্ট্রোজেনের মাত্রা পরিবর্তিত হলে সেরোটোনিন উৎপাদন ও কার্যকারিতাও পরিবর্তিত হয়। ফলে অনেক নারী মাসিকের আগে বা পরে আবেগের ওঠানামা বেশি অনুভব করেন। অর্থাৎ, এটি শুধুই মানসিক বিষয় নয়; বরং মস্তিষ্কের জৈবিক পরিবর্তনেরও ফল।

গর্ভাবস্থায় কেন আবেগ বেশি পরিবর্তিত হয়?

গর্ভধারণের পর শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শরীরকে নতুন একটি প্রাণের জন্য মানিয়ে নিতে হয়। এই পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী নারীরা কখনো খুব আনন্দিত, আবার কখনো অকারণ উদ্বিগ্ন বা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তে পারেন। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়া, বমিভাব, শারীরিক অস্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাও মুড সুইংকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সন্তান জন্মের পর মানসিক পরিবর্তন

প্রসবের পর হরমোনের মাত্রা খুব দ্রুত কমে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের ঘাটতি, শিশুর যত্নের চাপ এবং নতুন দায়িত্ব। ফলে অনেক মা কয়েক দিনের জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, যা সাধারণভাবে ‘বেবি ব্লুজ’ নামে পরিচিত।

মেনোপজেও বাড়তে পারে মুড সুইং

৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে অধিকাংশ নারী মেনোপজের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে। এর ফলে শুধু মাসিক বন্ধ হয় না, বরং ঘুমের সমস্যা, হট ফ্ল্যাশ, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি এবং মেজাজের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। অনেক নারী এই সময় নিজেদের আগের মতো প্রাণবন্ত অনুভব করেন না। কিন্তু এটি বয়সজনিত দুর্বলতা নয়; বরং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনের অংশ।

শুধু হরমোন নয়, জীবনযাপনও দায়ী

মুড সুইংয়ের জন্য শুধু হরমোনকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা, থাইরয়েডের সমস্যা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চার অভাবও মেজাজের ওঠানামা বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া পারিবারিক দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও নারীর মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

মুড সুইং পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও কিছু অভ্যাস এর তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উপকারী।

এছাড়া মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, নিজের অনুভূতি পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং নেওয়াও কার্যকর হতে পারে।

নারীর মুড সুইংকে ‘নাটক’, ‘অতিরিক্ত আবেগ’ বা ‘হরমোনের অজুহাত’ বলে অবহেলা করার সময় এখন আর নেই। বিজ্ঞান বলছে, এটি শরীর ও মস্তিষ্কের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল। তাই সমালোচনার বদলে প্রয়োজন সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা।

/এসএল

নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:২১ পিএম
নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা

একজন নারী হিসেবে আপনার মাথার ভেতরে কি সব সময় এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খায়–বাড়িতে যথেষ্ট খাবার আছে তো? সন্তানের টিকা সময়মতো দেওয়া হয়েছে? আমি কাজে থাকাকালে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করবে কে? এমন অসংখ্য সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও দায়িত্বের তালিকা প্রতিনিয়ত কারও না কারও মাথায় ঘুরতেই থাকে। 

এই অদৃশ্য মানসিক দায়িত্বকেই বলা হয় ‘মেন্টাল লোড’ বা মানসিক বোঝা। অধিকাংশ পরিবারে এই দায়িত্বের বড় অংশই বহন করেন নারীরা। পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া, ঘরের কাজের পরিকল্পনা করা, প্রয়োজন অনুমান করা, সবকিছু ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা–এসবই এমন শ্রম, যার স্বীকৃতি খুব কমই মেলে। এই দায়িত্ব যদি একা একজনের কাঁধে পড়ে, যথেষ্ট সহযোগিতা, বিশ্রাম বা স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে তা থেকে সৃষ্টি হতে পারে কেয়ারগিভার বার্নআউট বা পরিচর্যাকারীর চরম মানসিক ও শারীরিক অবসাদ। 

অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের আর্থিক মূল্য হিসাব করলে, অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। অথচ এই শ্রমকে এখনও স্বাভাবিক বা অবমূল্যায়িত হিসেবেই দেখা হয়।

মেন্টাল লোড কী?

মেন্টাল লোড হলো সেই অদৃশ্য মানসিক ও আবেগগত শ্রম, যার মাধ্যমে মানুষ প্রতিদিনের অসংখ্য কাজের পরিকল্পনা করে, দায়িত্ব ভাগ করে, প্রয়োজন আগে থেকেই অনুমান করে এবং শেষ পর্যন্ত কাজটি সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে।

কেন নারীরাই বেশি বহন করেন এই বোঝা?

আজও সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো–নারীরাই স্বভাবগতভাবে ভালো পরিচর্যাকারী, রাঁধুনি, গৃহপরিচালক কিংবা সন্তান লালন-পালনে বেশি দক্ষ। কিন্তু বাস্তবে এগুলো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; বরং সামাজিকভাবে শেখানো ভূমিকা।

ফলে নারীরা চাকরি করলেও, এমনকি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হলেও, ঘরের অধিকাংশ দায়িত্ব তাদেরই কাঁধে থেকে যায়। একই সঙ্গে বহু কাজ সামলানোর কারণে তাদের ‘মাল্টিটাস্কিং’-এ দক্ষ বলা হয়। অথচ এক কাজ থেকে আরেক কাজে বারবার মনোযোগ সরানো মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর।

অন্যদিকে, পুরুষদেরও ছোটবেলা থেকে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে ঘরের দায়িত্বে নেতৃত্ব দেওয়া তাদের কাজ নয়। ফলে অনেক সময় তারা সহকারী বা দর্শকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকেন।

বাস্তবে গবেষণা বলছে, পুরুষরাও সমান দক্ষতার সঙ্গে পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। লিঙ্গভিত্তিক সক্ষমতার প্রচলিত ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

মাতৃত্বের পর নারীরা প্রায়ই আয়, পদোন্নতি ও কর্মজীবনের অগ্রগতিতে পিছিয়ে পড়েন। এমনকি সন্তান নেওয়ার আগেই অনেক নিয়োগকর্তা মাতৃত্বকালীন ছুটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নারীদের নিয়োগে অনীহা দেখান। 

ইউরোপের একাধিক দেশে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্যের বড় একটি অংশই এই ‘মাদারহুড পেনাল্টি’র কারণে তৈরি হয়।

সংঘাত, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের সময় নারীদের পরিচর্যার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সময় অবৈতনিক পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন।

বাবারা কি দায়িত্ব নিতে চান না?

গবেষণা বলছে, অধিকাংশ বাবাই সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোকে জীবনের অন্যতম আনন্দের বিষয় মনে করেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা সব সময় বাস্তবে দায়িত্ব ভাগাভাগিতে রূপ নেয় না। এর একটি বড় কারণ সামাজিক ধারণা। অনেক পুরুষ মনে করেন, সন্তানের যত্নে বেশি সময় দিলে তাদের ‘ভালো উপার্জনকারী’ পরিচয় ক্ষুণ্ন হতে পারে। আবার অনেক দেশে মাতৃত্বকালীন ছুটি দীর্ঘ হলেও পিতৃত্বকালীন ছুটি খুবই সীমিত, ফলে দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি হয় না।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব বাবা সন্তানের পরিচর্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তারা মানসিকভাবে বেশি সুস্থ থাকেন, আত্মবিশ্বাসী হন, সামাজিক সম্পর্কও উন্নত হয়। পরিচর্যা কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি। তাই উন্নত পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর আইন, উন্নত সেবা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

এই লক্ষ্যেই জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা বিভিন্ন দেশে পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগাভাগি, পরিচর্যাকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং পরিচর্যা ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে।

সবশেষে একটি বিষয় স্পষ্ট–একটি পরিবার কিংবা সমাজকে টিকিয়ে রাখতে সবারই কখনো না কখনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, আবার অন্যের পরিচর্যাও করতে হয়। তাই নারীদের ওপর একতরফাভাবে এই দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে নারী-পুরুষ, পরিবার, সমাজ, সরকার এবং কর্মক্ষেত্র–সবাইকে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কমবে মানসিক চাপ, রোধ হবে পরিচর্যাকারীদের অবসাদ এবং তৈরি হবে আরও সমতাভিত্তিক সমাজ।

/এসএল

বর্ষাকালে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
বর্ষাকালে নারীদের সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সচেতনতা

বর্ষা প্রকৃতিতে এনে দেয় স্বস্তির ছোঁয়া। কিন্তু এই ঋতুর সঙ্গে বাড়ে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিও। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা, অপরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কিছু শারীরিক সমস্যা বেশি দেখা দেয়। সামান্য অসচেতনতা বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই বর্ষায় নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ছত্রাকজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি

বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। ভেজা কাপড়, দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকা কিংবা শরীরের ভাঁজে ঘাম জমে থাকার কারণে ছত্রাকজনিত সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। বিশেষ করে কুঁচকি, বগল, স্তনের নিচে বা পায়ের আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, লালচে দাগ বা র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা এড়াতে ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে ফেলা, শরীর শুকনো রাখা এবং পরিষ্কার সুতির পোশাক পরা জরুরি।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই)

বর্ষাকালে অনেকেই কম পানি পান করেন। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাক পরে থাকা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় ঘাটতি থাকলে নারীদের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, তলপেটে ব্যথা বা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

যোনিপথের সংক্রমণ

বর্ষার আর্দ্র পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক নারী যোনিপথে চুলকানি, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা অস্বস্তির মতো সমস্যায় ভোগেন। অনেকেই লজ্জা বা সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন, যা পরবর্তী সময়ে সমস্যা জটিল করে তুলতে পারে। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ

বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু এবং বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার এবং পুরো শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা গুরুত্বপূর্ণ।

সর্দি-কাশি ও ভাইরাল সংক্রমণ

আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বর্ষায় ঠাণ্ডা, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা কিংবা ভাইরাল জ্বরের প্রকোপ বাড়ে। কর্মজীবী নারী বা যারা প্রতিদিন বাইরে যাতায়াত করেন, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বৃষ্টি ভিজে গেলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় পরা, গরম পানীয় পান করা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

ত্বকের নানা সমস্যা

বর্ষায় অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ব্রণ, অ্যালার্জি, র‍্যাশ, চুলকানি কিংবা একজিমার সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে এসব সমস্যা আরও বেশি দেখা দেয়। মুখ পরিষ্কার রাখা, ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার এবং ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় না থাকা প্রয়োজন।

এছাড়া বর্ষাকালে কাদা-পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করতে হয়। দীর্ঘ সময় ভেজা জুতা বা স্যান্ডেল পরে থাকলে পায়ের ত্বকে সংক্রমণ, দুর্গন্ধ কিংবা ফাঙ্গাস হতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে পা ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া এবং শুকনো জুতা ব্যবহার করা উচিত।

বর্ষা যেমন প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, তেমনি এই ঋতু কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও সঙ্গে নিয়ে আসে। তবে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ সমস্যাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিজের শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রতিও গুরুত্ব দিন। কারণ একজন সুস্থ নারী মানেই একটি সুস্থ পরিবার এবং সুস্থ সমাজ।

নারীর স্বাবলম্বিতা সময়ের অন্যতম দাবি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম
নারীর স্বাবলম্বিতা সময়ের অন্যতম দাবি

একসময় নারীর পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল পরিবার, সংসার আর সম্পর্কের গণ্ডিতে। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে সমাজের চাহিদাও। আজ একজন নারী শুধু পরিবারের দায়িত্বই পালন করেন না, তিনি অর্থনীতির চালিকাশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার, উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তাই বর্তমান সময়ে নারীর স্বাবলম্বিতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়, এটি একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।

স্বাবলম্বিতা বলতে কেবল অর্থ উপার্জনের সক্ষমতাকেই বোঝায় না। এর অর্থ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকা, আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচা এবং জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি অর্জন করা। একজন নারী যখন শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন, তখনই প্রকৃত অর্থে তিনি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নারীর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণও বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা, প্রশাসন, উদ্যোক্তা কার্যক্রম–প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলেও ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি, হস্তশিল্প কিংবা অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে অনেক নারী নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঘরে বসেই এখন অনেক নারী নিজের উদ্যোগ গড়ে তুলছেন এবং বৈশ্বিক বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছেন।

তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতায় এখনো নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক নারী উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও পারিবারিক বা সামাজিক চাপে কর্মজীবন শুরু করতে পারেন না। কোথাও নিরাপত্তাহীনতা, কোথাও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, আবার কোথাও সমান কাজের জন্য সমান সুযোগ না পাওয়ার মতো সমস্যা তাদের পথকে কঠিন করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে নারীর আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় না কিংবা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও সীমিত থাকে। ফলে স্বাবলম্বিতার পথ কেবল দক্ষতা অর্জনের নয়, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনেরও।

নারীর স্বাবলম্বিতা গড়ে ওঠার প্রথম ভিত্তি হলো শিক্ষা। শিক্ষিত নারী নিজের স্বাস্থ্য, সন্তানের শিক্ষা, পারিবারিক পরিকল্পনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অধিক সচেতন হন। পাশাপাশি তিনি নিজের অধিকার সম্পর্কে জানেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস পান। তাই মেয়েদের শিক্ষাকে কোনোভাবেই বিলাসিতা নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নারীর আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি। নিজের আয় থাকলে একজন নারী শুধু নিজের প্রয়োজনই পূরণ করতে পারেন না, পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। গবেষণায় দেখা যায়, নারীর আয় বাড়লে পরিবারের শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ একজন স্বাবলম্বী নারী কেবল নিজের নয়, পুরো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

তবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি মানসিক স্বাবলম্বিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী আজও নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন, নিজের সাফল্যকে ছোট করে দেখেন কিংবা সব সময় অন্যের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকেন। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান এবং নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস–এই তিনটি বিষয় মানসিক স্বাবলম্বিতার মূল ভিত্তি। পরিবার ও সমাজ যদি ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং ব্যর্থতাকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখায়, তাহলে তারা আরও দৃঢ় ও আত্মনির্ভর হয়ে উঠতে পারে।

নারীর স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের শুধু গৃহস্থালির কাজ শেখানো নয়, আর্থিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্বের দক্ষতা অর্জনেও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে ছেলেদেরও শেখাতে হবে যে সংসার, সন্তান পালন কিংবা পরিবারের দায়িত্ব কেবল নারীর একার নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমান দায়িত্ববোধই একটি সুস্থ পরিবার গড়ে তোলে।

রাষ্ট্র এবং কর্মক্ষেত্রেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সমান সুযোগ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার–এসব উদ্যোগ আরও বেশি নারীকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি গ্রাম ও শহরের নারীদের মধ্যে সুযোগের বৈষম্য কমানোও জরুরি।

স্বাবলম্বিতা মানে একা চলা নয়; বরং নিজের সক্ষমতার ওপর ভর করে সম্মানজনক জীবন গড়ে তোলা। একজন স্বাবলম্বী নারী পরিবারকে শক্তিশালী করেন, সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ দেখান। তাই নারীর স্বাবলম্বিতা কেবল নারীর অধিকার নয়, এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই অগ্রগতির অন্যতম পূর্বশর্ত।

/এসএল

নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
নারীর জীবনে ইমপোস্টার সিন্ড্রোমের প্রভাব

পদোন্নতি পেয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছেন, সহকর্মীদের প্রশংসাও পেয়েছেন। তবু মনে হচ্ছে, ‘আমি আসলে এতটা যোগ্য নই’, ‘একদিন সবাই বুঝে যাবে আমি এই জায়গার যোগ্য নই।’ এমন অনুভূতি অনেক নারীর কাছেই পরিচিত। অথচ বাস্তবে তাদের দক্ষতা, পরিশ্রম ও অর্জন নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই। এই মানসিক অবস্থাকেই বলা হয় ইমপোস্টার সিন্ড্রোম।

এটি কোনো মানসিক রোগ নয়; বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা, যেখানে ব্যক্তি নিজের সাফল্যকে নিজের যোগ্যতার ফল হিসেবে মেনে নিতে পারেন না। তিনি মনে করেন, হয়তো ভাগ্য, অন্যের সাহায্য বা কাকতালীয় কারণে তিনি সফল হয়েছেন। ফলে নতুন দায়িত্ব, পদোন্নতি কিংবা বড় কোনো সুযোগ এলেই আত্মবিশ্বাসের বদলে ভয় ও উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষ উভয়েই ইমপোস্টার সিন্ড্রোমে ভুগতে পারেন। তবে করপোরেট, প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা, প্রশাসন কিংবা নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্রে কর্মরত অনেক নারী এটি তুলনামূলক বেশি অনুভব করেন। কারণ শুধু ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

শৈশব থেকেই অনেক মেয়েকে শেখানো হয়–ভুল করা যাবে না, সব সময় নিখুঁত হতে হবে, বিনয়ী থাকতে হবে এবং নিজের সাফল্য নিয়ে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। অন্যদিকে ছেলেদের ঝুঁকি নেওয়া, নেতৃত্ব দেওয়া বা নিজের অর্জন তুলে ধরতে উৎসাহ দেওয়া হয়। এই ভিন্ন সামাজিকীকরণ নারীদের মধ্যে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে তারা নিজের সাফল্যকে ছোট করে দেখেন, কিন্তু সামান্য ব্যর্থতাকেও নিজের অযোগ্যতার প্রমাণ মনে করেন।

কর্মক্ষেত্রেও নারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ কম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো নেতৃত্বের পদে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ফলে একজন নারী যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পান, তখন অনেক সময় তাকে নিজের যোগ্যতার চেয়ে বেশি প্রমাণ দিতে হয়। কখনো সরাসরি, কখনো সূক্ষ্মভাবে তাকে শুনতে হয়–‘তুমি কি পারবে?’ কিংবা ‘এত বড় দায়িত্ব সামলানো সহজ নয়।’ এমন পরিবেশ আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে এবং ইমপোস্টার সিন্ড্রোমকে আরও গভীর করে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদের পদোন্নতি, পুরস্কার, বিদেশে প্রশিক্ষণ বা নানা সাফল্যের খবর দেখে অনেকেই নিজের যাত্রাকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করেন। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত মানুষের সাফল্যের দিকটাই দেখি, সংগ্রাম বা ব্যর্থতার গল্প খুব কমই সামনে আসে। এই অসম তুলনা আত্মসন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘদিন এই অনুভূতি থাকলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রে ক্লান্তি (বার্নআউট) এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। অনেক নারী শুধু আত্মসন্দেহের কারণে পদোন্নতির আবেদন করেন না, নতুন চাকরির জন্য আবেদন করতে ভয় পান কিংবা নেতৃত্বের সুযোগ থেকেও নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এতে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও একজন দক্ষ কর্মীকে তার পূর্ণ সম্ভাবনায় কাজে লাগাতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, নিজের অর্জনের একটি তালিকা তৈরি করা, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সংরক্ষণ করা, প্রয়োজন হলে মেন্টর বা বিশ্বস্ত সহকর্মীর সঙ্গে অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং নিজেকে অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের আগের অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করা। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করাও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নারীদের এমন একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে তাদের দক্ষতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং নেতৃত্বের সুযোগ সমানভাবে তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজেও মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শুধু নিখুঁত হওয়ার নয়, সাহসী হওয়ার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজের সাফল্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা দিতে হবে।

সাফল্যের পথে আত্মসন্দেহ আসতেই পারে। কিন্তু সেই সন্দেহ যেন নিজের সামর্থ্যকে আটকে না রাখে। একজন নারীর যোগ্যতা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; তা গড়ে ওঠে তার জ্ঞান, পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর প্রচেষ্টায়। তাই নিজের অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া, আত্মবিশ্বাসকে লালন করা এবং ‘আমি পারি’–এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করাই ইমপোস্টার সিন্ড্রোম থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

/এসএল

‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
‘না’ বলার শক্তি: সীমা নির্ধারণেই মানসিক স্বাধীনতার শুরু

সমাজে নারীদের ছোটবেলা থেকেই একটি বিষয় খুব সূক্ষ্মভাবে শেখানো হয়–ভদ্র হতে হবে, সবাইকে খুশি রাখতে হবে, কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। ফলে অনেক নারী নিজের ইচ্ছা, স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা মানসিক সুস্থতার চেয়ে অন্যের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখে যান। অথচ প্রতিটি মানুষের মতো একজন নারীরও নিজের সীমা নির্ধারণ করার অধিকার আছে। প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলার অধিকারও আছে। কারণ ‘না’ বলা অভদ্রতা নয়; বরং এটি আত্মসম্মান, আত্মরক্ষা এবং মানসিক স্বাধীনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।

কেন নারীদের জন্য ‘না’ বলা এত কঠিন?

অনেক নারী জানেন যে, কোনো অনুরোধ গ্রহণ করলে তিনি কষ্ট পাবেন, তবু না বলতে পারেন না। কারণ এর পেছনে রয়েছে সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ। প্রথমত, আমাদের সংস্কৃতিতে নারীদের ত্যাগী ও সহনশীল হওয়ার গুণকে অতিরিক্ত মূল্য দেওয়া হয়। একজন ভালো মেয়ে, ভালো স্ত্রী কিংবা ভালো মা হওয়ার সঙ্গে যেন সবসময় অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার ধারণা জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক নারী মনে করেন ‘না’ বললে মানুষ হয়তো তাকে স্বার্থপর, অহংকারী বা অভদ্র ভাববে। এই ভয় থেকেই তারা নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেন। তৃতীয়ত, শৈশবের পারিবারিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেসব পরিবারে সন্তানদের নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ কম থাকে, সেখানে বড় হয়ে নিজের সীমা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে যখন নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে যায় 

ধরুন, অফিসে একজন সহকর্মী প্রায়ই নিজের কাজ আপনার ওপর চাপিয়ে দেন। আপনি ব্যস্ত থাকলেও প্রত্যাখ্যান করতে পারেন না। পরিবারে সবাই ধরে নেয়, ঘরের সব দায়িত্ব আপনাকেই পালন করতে হবে। বন্ধুরা যেকোনো সময় সাহায্য চাইলে নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়েই ছুটে যান। এভাবে প্রতিটি পরিস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’ বলতে বলতে এক সময় মানুষ মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নিজের জন্য সময় থাকে না, ইচ্ছাগুলো হারিয়ে যায়, সম্পর্কগুলোও ভারসাম্য হারাতে শুরু করে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ, হতাশা, আত্মসম্মানবোধের ঘাটতি, এমনকি বার্নআউট পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

সীমা নির্ধারণ মানে সম্পর্ক ভাঙা নয়

অনেকের ধারণা, সীমা নির্ধারণ করলে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবতা ঠিক উল্টো। সুস্থ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তিই হলো পারস্পরিক সম্মান এবং ব্যক্তিগত সীমার প্রতি শ্রদ্ধা।
যখন একজন নারী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পারছি না’, ‘এভাবে কথা বললে আমি অস্বস্তি বোধ করি’, অথবা ‘এই সিদ্ধান্তটি আমি নিজেই নিতে চাই’, তখন তিনি সম্পর্ক শেষ করছেন না; বরং সম্পর্কের মধ্যে সম্মানজনক একটি কাঠামো তৈরি করছেন। যে সম্পর্ক শুধু একজনের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে না।

অনেক সময় নারীরা মনে করেন, সবাইকে সন্তুষ্ট রাখাই ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ। কিন্তু বাস্তবে কেউই সবসময় সবাইকে খুশি রাখতে পারেন না। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মূল্য দেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। বরং একজন সুস্থ মানুষই পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে সবচেয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। যখন একজন নারী নিজের সীমাকে সম্মান করতে শেখেন, তখন অন্যেরাও ধীরে ধীরে সেই সীমাকে সম্মান করতে শেখে।

কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘না’ বলা যায়?

‘না’ বলা একটি দক্ষতা, যা অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো বিষয়ে অস্বস্তি লাগলে সেই অনুভূতিকে অবহেলা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র বাক্যই যথেষ্ট–‘দুঃখিত, আমি এটা করতে পারছি না’, ‘এটি আমার জন্য সুবিধাজনক নয়’, অথবা ‘আমি এই সিদ্ধান্তে স্বচ্ছন্দ নই।’ তৃতীয়ত, অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের সময়, শক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়ার অধিকার রয়েছে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, শুরুতে অনেকেই আপনার নতুন সীমাকে মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। কারণ তারা আপনার সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ সম্পর্কগুলো নতুন ভারসাম্য খুঁজে নেয়।

‘না’ বলা মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নয় কিংবা অহংকার দেখানোও নয়। এটি নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।

একজন নারী যখন নিজের সীমা নিজেই নির্ধারণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি জানিয়ে দেন যে তার সময়, অনুভূতি, স্বপ্ন এবং ব্যক্তিত্বেরও মূল্য আছে। আর এই উপলব্ধিই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন করে তোলে। কারণ একজন নারীর শক্তি শুধু সহ্য করার মধ্যে নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে সম্মান বজায় রেখে দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে পারার মধ্যেও নিহিত।

/এসএল