ঢাকা ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্বকাপ ফাইনাল মাতাবেন যারা টেক্সাসে ‘চেতনাতে নজরুল’: হৃদি হকের ব্যতিক্রমী সংগীত-নাট্য উপস্থাপনা ঘুষ নিয়ে ধরা বিমান কর্মকর্তা রাশেদ দণ্ডিত স্বাস্থ্যসেবায় নতুন ধারণা দিচ্ছে ডক্টরস২৪ জামালপুরে গৃহবধূ হত্যায় ১৩ বছর পর স্বামীর মৃত্যুদণ্ড মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে রেফারিদের পাশে কলিনা কুতুবদিয়ায় পুকুরে ডুবে শিশুর মৃত্যু বর্ষায় সঙ্গে রাখতে হবে যেসব জিনিস পর্তুগালের নতুন কোচ হতে যাচ্ছেন জর্জ জেসুস! আলমডাঙ্গায় জমি নিয়ে বিরোধে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা বাংলাদেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্থিতিশীল: এডিবি আগামী নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে: আইনমন্ত্রী ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা নারীর মুড সুইংয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ পরিবেশ ও জাতীয় বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতির কোলে এক নির্মল জলভূমি সিরাজগ‌ঞ্জে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ১০ নারীরা কেন এত ক্লান্ত? অদৃশ্য শ্রম ও মানসিক চাপের বোঝা সুনামগঞ্জে বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড বান্দরবানে পাহাড়ধসে পৃথক দুই পরিবারের ৫ জনের মৃত্যু সারোয়ার আলমগীরের শপথে বাধা নেই: হাইকোর্ট ফেনীতে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ সিংড়ায় মাছ শিকারে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ গেল যুবকের ষোলশহর-জানালীহাট সেকশন রেললাইনকে ৫ ফুট উঁচু করা হবে: রেল প্রতিমন্ত্রী ঝিনাইদহে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন মৌলভীবাজারে বেড়েছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কা পার্বতীপুরে বিলের জন্য সন্তানহারা প্রসূতিকে আটকে রাখার অভিযোগ কাশিয়ানীতে ওয়াকিটকিসহ প্রতারক গ্রেপ্তার মাঝ আকাশে প্রশিক্ষকের আত্মহত্যা, বিমান অবতরণ শিক্ষানবীসের বেরোবিতে আবদুল হাই শিকদারের ১০ হাজার বই সংরক্ষণের ইউজিসির উদ্যোগ

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা
যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

ফ্যাটি লিভার (মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ–এমএএসএলডি) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা একটি নীরব রোগ। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনেকেই জানতে চান, ‘ফ্যাটি লিভারের কি কোনো কার্যকর ওষুধ আছে?’ বাস্তবতা হলো, ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর ওষুধের ভূমিকা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার কী?

যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। আগে একে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) বলা হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এমএএসএলডি নামে উল্লেখ করা হয়। এ রোগের কিছু রোগীর লিভারে শুধু চর্বি জমে থাকে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, এমনকি সিরোসিসও হতে পারে।

কেন ফ্যাটি লিভার হয়?

ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণগুলো হলো অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও জাংকফুড, কিছু ওষুধ এবং অ্যালকোহল সেবনের কারণে হয়ে থাকে।

চিকিৎসার মূল ভিত্তি

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলো হলো ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালকোহল পরিহার।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি, প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে ‘ওজন কমানো’ নিজেই সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা।

তাহলে ওষুধের ভূমিকা কোথায়?

বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো ম্যাজিক ওষুধ নেই। তবে নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ উপকারী হতে পারে।


১. ভিটামিন-ই
কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যাদের নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস (এনএএসএইচ) রয়েছে এবং ডায়াবেটিস নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কিছু ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।

 

২. পায়োগ্লিটাজোন
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকা রোগীদের কিছু ক্ষেত্রে এ ওষুধ উপকার দিতে পারে। এটি লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে ওজন বৃদ্ধি, শরীরে পানি জমা বা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সবার জন্য উপযুক্ত নয়।

৩. জিএলপি ওয়ান রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু আধুনিক ওষুধ, যেমন–সেমাগ্লুটাইড, ওজন কমানোর মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারে উপকার দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এদের সম্ভাবনা দেখা গেলেও এখনো সব রোগীর জন্য রুটিন চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

৪. এসজিএলটি২ ইনহিবিটর
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ লিভারের চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে।

৫. আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড
অনেক রোগী ফ্যাটি লিভারের জন্য আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড গ্রহণ করেন। কিন্তু সাধারণ ফ্যাটি লিভারে এর কার্যকারিতা সীমিত এবং এটি মূল চিকিৎসা নয়।

৬. রেসমেটিরম
রেসমেটিরম সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় বহুল আলোচিত একটি নতুন ওষুধ। এটি বিশেষভাবে থাইরয়েড হরমোন রিসেপ্টর বিটা (THR-β) অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে এবং লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সহায়তা করে।
রেসমেটিরম মূলত লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে, ফাইব্রোসিসের অগ্রগতি ধীর করতে পারে এবং লিপিড প্রোফাইলেরও কিছু উন্নতি করতে পারে।
সাধারণ ফ্যাটি লিভারের সব রোগীর জন্য এ ওষুধ প্রয়োজন হয় না। সাধারণত বায়োপসি পরীক্ষায় এমএএসএইচ/এনএএসএইচ নিশ্চিত হলে অথবা ফাইব্রোসিস থাকলে কিংবা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও ঝুঁকি বেশি থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে এটি বিবেচনা করা হয়।
যদিও রেসমেটিরম নতুন আশার সৃষ্টি করেছে, তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যেমন এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। অন্যদিকে এটি একটি ব্যয়বহুল ওষুধ। এটির ব্যবহারে নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হয় এবং এটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের বিকল্প নয়। অর্থাৎ, রেসমেটিরম ব্যবহার করলেও রোগীকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, ফ্যাটি লিভারের মূল চিকিৎসা এখনো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই।

লিভার টনিক ও হারবাল ওষুধ কতটা নিরাপদ?

বাজারে প্রচলিত অনেক হারবাল বা লিভার পরিষ্কার জাতীয় ওষুধের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দুর্বল। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো উল্টো লিভারের ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ বা অপ্রমাণিত ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ।

কেন শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়?

ফ্যাটি লিভারের মূল সমস্যা হলো মেটাবোলিক ডিসফাংশন বা বিপাকীয় অসামঞ্জস্য। তাই কেবল একটি ট্যাবলেট দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। রোগী যদি অতিরিক্ত ওজন বহন করেন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ করেন এবং শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তাহলে শুধু ওষুধে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়া কঠিন।

কোন রোগীদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?

উল্লেখিত রোগীদের দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন–ডায়াবেটিস রোগী, স্থূল ব্যক্তি, লিভার এনজাইম দীর্ঘদিন বেশি, ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের ঝুঁকি, ফাইব্রোস্ক্যানে অগ্রসর রোগের ইঙ্গিত এবং পরিবারে লিভার রোগের ইতিহাস।

ভবিষ্যৎ চিকিৎসা

বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য নতুন নতুন ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসা আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর চিকিৎসা হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ।

উপসংহার

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কিছু ভূমিকা থাকলেও এটি কোনো ‘শুধু ওষুধে ভালো হয়ে যাওয়ার’ রোগ নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। 

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি (লিভার) বিভাগ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা।

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কার্যকারিতা
যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

ফ্যাটি লিভার (মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ–এমএএসএলডি) বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা একটি নীরব রোগ। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। অনেকেই জানতে চান, ‘ফ্যাটি লিভারের কি কোনো কার্যকর ওষুধ আছে?’ বাস্তবতা হলো, ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় জীবনযাত্রার পরিবর্তনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর ওষুধের ভূমিকা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার কী?

যখন লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়, তখন তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। আগে একে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) বলা হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এমএএসএলডি নামে উল্লেখ করা হয়। এ রোগের কিছু রোগীর লিভারে শুধু চর্বি জমে থাকে, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, এমনকি সিরোসিসও হতে পারে।

কেন ফ্যাটি লিভার হয়?

ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণগুলো হলো অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত কোমল পানীয় ও জাংকফুড, কিছু ওষুধ এবং অ্যালকোহল সেবনের কারণে হয়ে থাকে।

চিকিৎসার মূল ভিত্তি

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলো হলো ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং অ্যালকোহল পরিহার।
গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি, প্রদাহ ও ফাইব্রোসিস উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে ‘ওজন কমানো’ নিজেই সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা।

তাহলে ওষুধের ভূমিকা কোথায়?

বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য সব রোগীর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর ও সর্বজনস্বীকৃত কোনো ম্যাজিক ওষুধ নেই। তবে নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ উপকারী হতে পারে।


১. ভিটামিন-ই
কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে যাদের নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস (এনএএসএইচ) রয়েছে এবং ডায়াবেটিস নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কিছু ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়।

 

২. পায়োগ্লিটাজোন
ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকা রোগীদের কিছু ক্ষেত্রে এ ওষুধ উপকার দিতে পারে। এটি লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে ওজন বৃদ্ধি, শরীরে পানি জমা বা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সবার জন্য উপযুক্ত নয়।

৩. জিএলপি ওয়ান রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু আধুনিক ওষুধ, যেমন–সেমাগ্লুটাইড, ওজন কমানোর মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারে উপকার দিতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এদের সম্ভাবনা দেখা গেলেও এখনো সব রোগীর জন্য রুটিন চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

৪. এসজিএলটি২ ইনহিবিটর
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ লিভারের চর্বি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে।

৫. আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড
অনেক রোগী ফ্যাটি লিভারের জন্য আর্সোডিঅক্সিকোলিক অ্যাসিড গ্রহণ করেন। কিন্তু সাধারণ ফ্যাটি লিভারে এর কার্যকারিতা সীমিত এবং এটি মূল চিকিৎসা নয়।

৬. রেসমেটিরম
রেসমেটিরম সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় বহুল আলোচিত একটি নতুন ওষুধ। এটি বিশেষভাবে থাইরয়েড হরমোন রিসেপ্টর বিটা (THR-β) অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে এবং লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সহায়তা করে।
রেসমেটিরম মূলত লিভারের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া লিভারের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে, ফাইব্রোসিসের অগ্রগতি ধীর করতে পারে এবং লিপিড প্রোফাইলেরও কিছু উন্নতি করতে পারে।
সাধারণ ফ্যাটি লিভারের সব রোগীর জন্য এ ওষুধ প্রয়োজন হয় না। সাধারণত বায়োপসি পরীক্ষায় এমএএসএইচ/এনএএসএইচ নিশ্চিত হলে অথবা ফাইব্রোসিস থাকলে কিংবা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরও ঝুঁকি বেশি থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে এটি বিবেচনা করা হয়।
যদিও রেসমেটিরম নতুন আশার সৃষ্টি করেছে, তবু কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যেমন এটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে আরও গবেষণা চলছে। অন্যদিকে এটি একটি ব্যয়বহুল ওষুধ। এটির ব্যবহারে নিয়মিত ফলোআপ প্রয়োজন হয় এবং এটি জীবনযাত্রার পরিবর্তনের বিকল্প নয়। অর্থাৎ, রেসমেটিরম ব্যবহার করলেও রোগীকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, ফ্যাটি লিভারের মূল চিকিৎসা এখনো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই।

লিভার টনিক ও হারবাল ওষুধ কতটা নিরাপদ?

বাজারে প্রচলিত অনেক হারবাল বা লিভার পরিষ্কার জাতীয় ওষুধের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দুর্বল। কিছু ক্ষেত্রে এগুলো উল্টো লিভারের ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ বা অপ্রমাণিত ওষুধ গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ।

কেন শুধু ওষুধ যথেষ্ট নয়?

ফ্যাটি লিভারের মূল সমস্যা হলো মেটাবোলিক ডিসফাংশন বা বিপাকীয় অসামঞ্জস্য। তাই কেবল একটি ট্যাবলেট দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। রোগী যদি অতিরিক্ত ওজন বহন করেন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ করেন এবং শারীরিক পরিশ্রম না করেন, তাহলে শুধু ওষুধে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়া কঠিন।

কোন রোগীদের বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?

উল্লেখিত রোগীদের দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন–ডায়াবেটিস রোগী, স্থূল ব্যক্তি, লিভার এনজাইম দীর্ঘদিন বেশি, ফাইব্রোসিস বা সিরোসিসের ঝুঁকি, ফাইব্রোস্ক্যানে অগ্রসর রোগের ইঙ্গিত এবং পরিবারে লিভার রোগের ইতিহাস।

ভবিষ্যৎ চিকিৎসা

বর্তমানে ফ্যাটি লিভারের জন্য নতুন নতুন ওষুধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসা আসতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর চিকিৎসা হলো স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ।

উপসংহার

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় ওষুধের কিছু ভূমিকা থাকলেও এটি কোনো ‘শুধু ওষুধে ভালো হয়ে যাওয়ার’ রোগ নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনই এ রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। 

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেপাটোলজি (লিভার) বিভাগ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা।

ভারতীয় চিকিৎসায় শ্রবণশক্তি ফিরে পাচ্ছে বাংলাদেশি শিশু

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম
ভারতীয় চিকিৎসায় শ্রবণশক্তি ফিরে পাচ্ছে বাংলাদেশি শিশু
ছবি:এআই

জন্মগতভাবে বহিঃকর্ণ ও কর্ণনালী ছাড়াই জন্ম নেওয়া ৭ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি কন্যাশিশুর সফল বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্ট সম্পন্ন হয়েছে কলকাতার সিএমআরআই সিকে বিড়লা হাসপাতালে। আধুনিক এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটি প্রথমবারের মতো স্বাভাবিকভাবে শুনতে পারার ক্ষমতা পাচ্ছে।

চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির অন্তঃকর্ণ স্বাভাবিকভাবে কাজ করলেও বহিঃকর্ণ, কর্ণনালী এবং কানের পর্দা না থাকায় শব্দ অন্তঃকর্ণ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছিল না। ফলে সে সম্পূর্ণরূপে শ্রবণ শক্তিহীন ছিল। গত সপ্তাহে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার মাথার খুলির হাড়ের নিচে একটি চৌম্বকীয় অভ্যন্তরীণ ইমপ্লান্ট বসানো হয়। ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে উঠলে প্রায় তিন সপ্তাহ পর একটি বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসর সংযুক্ত করা হবে, যা চারপাশের শব্দ সংগ্রহ করে অভ্যন্তরীণ ইমপ্লান্টে পাঠাবে এবং সেখান থেকে শব্দের কম্পন সরাসরি অন্তঃকর্ণে পৌঁছে যাবে।

অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেন, হাসপাতালের ওটোলজিস্ট ও কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট সার্জন ডা. এনভিকে মোহন।

তিনি জানান, এটি কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট নয়, বরং এমন রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয় যাদের অন্তঃকর্ণ সুস্থ থাকলেও শব্দ পরিবহনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত থাকে।

তিনি আরও জানান, শিশুটির কর্ণনালী পুনর্গঠন সম্ভব হলেও তাতে একাধিক জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো এবং সফলতার নিশ্চয়তা কম ছিল। তাই চিকিৎসক দল বোন কন্ডাকশন ইমপ্লান্টকেই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হিসেবে বেছে নেন।

চিকিৎসকদের মতে, বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসরটি একটি ছোট চৌম্বকীয় ডিভাইসের মতো, যা সহজেই খুলে রাখা যায়। গোসল, ঘুম বা প্রয়োজন অনুযায়ী এটি খুলে রাখা সম্ভব। শ্রবণশক্তি ফিরিয়ে আনার কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ভবিষ্যতে শিশুটির বহিঃকর্ণ পুনর্গঠন বা কৃত্রিম কান প্রতিস্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অস্ত্রোপচারের পর শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তিন সপ্তাহ পর পুনরায় হাসপাতালে এনে বাহ্যিক সাউন্ড প্রসেসর সংযুক্ত করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে তার শ্রবণক্ষমতা মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

রবিউল/নাঈম

বর্ষাকালের ভাইরাল জ্বর

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম
বর্ষাকালের ভাইরাল জ্বর
ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বর্ষাকাল প্রকৃতিকে যেমন সজীব করে তোলে, তেমনি এই সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপও বেড়ে যায়। আর্দ্রতা বৃদ্ধি, পরিবেশের পরিবর্তন এবং জীবাণুর দ্রুত বিস্তারের কারণে ভাইরাল জ্বর এ মৌসুমের অন্যতম সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। শিশু, বয়স্ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। যদিও অধিকাংশ ভাইরাল জ্বর কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়, তবু সচেতনতা ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে জটিলতা দেখা দিতে পারে।


লক্ষণ

ভাইরাল জ্বরের লক্ষণ রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের এক থেকে তিন দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়।
◉ সাধারণ লক্ষণ: হঠাৎ জ্বর আসা এবং শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর শুরু হওয়া। অতিরিক্ত দুর্বলতা ও অবসাদ। শরীর ও পেশিতে ব্যথা। জয়েন্টে ব্যথা বা অস্বস্তি। 
◉ মাথা ও চোখের লক্ষণ: মাথাব্যথা। চোখ ভারী লাগা বা চোখের পেছনে ব্যথা। আলোতে অস্বস্তি অনুভব করা। কিছু ক্ষেত্রে চোখ লাল হয়ে যাওয়া।
◉ শ্বাসতন্ত্রের লক্ষণ: গলাব্যথা। শুকনো বা কফযুক্ত কাশি। নাক দিয়ে পানি পড়া। নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া। বারবার হাঁচি হওয়া।
◉ পরিপাকতন্ত্রের লক্ষণ: ক্ষুধামন্দা। বমি বমি ভাব। হালকা বমি বা পাতলা পায়খানা। পেটে অস্বস্তি।
◉ শিশুদের ক্ষেত্রে: অস্থিরতা বা অতিরিক্ত কান্না। দুধ বা খাবার খেতে না চাওয়া। অতিরিক্ত ঘুম বা ঝিমুনি। খেলাধুলায় অনীহা।

 

প্রকারভেদ

◉ সাধারণ ভাইরাল জ্বর: ঋতু পরিবর্তনের সময় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কয়েক দিনের জ্বরের সঙ্গে শরীরব্যথা ও দুর্বলতা থাকে।
◉ ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত জ্বর: ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে হয়। এতে কাশি, গলাব্যথা, মাথাব্যথা এবং তীব্র ক্লান্তি বেশি থাকে।
◉ শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসজনিত জ্বর: এ ধরনের সংক্রমণে গলা, নাক ও ফুসফুস বেশি আক্রান্ত হয়। ফলে কাশি ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
◉ মশাবাহিত ভাইরাসজনিত জ্বর: বর্ষাকালে জমে থাকা পানিতে মশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাসজনিত জ্বরের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এসব রোগের লক্ষণ ও জটিলতা সাধারণ ভাইরাল জ্বর থেকে আলাদা হতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি।
অন্তঃসত্ত্বা নারী।
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি বা ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি।
যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল।
স্কুল, কলেজ, অফিস বা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে নিয়মিত যাতায়াতকারীরা।

লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক

পেটের আলসারের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
পেটের আলসারের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
অনেকের ধারণা, কেবল ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই আলসার হয়, যা আসলে একটি বড় ভুল ধারণা।

পেটের সবচেয়ে সাধারণ অথচ অবহেলিত সমস্যা হলো ‘স্টমাক আলসার’ বা পাকস্থলীর ক্ষত। আমাদের পেটের ভেতরে যে অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যাসিড থাকে, তা থেকে পাকস্থলীকে রক্ষা করার জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষামূলক স্তর থাকে। কোনো কারণে যখন এই স্তরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অ্যাসিড সরাসরি পাকস্থলীর দেয়ালে আঘাত করে, তখন সেখানে এক ধরনের খোলা ক্ষত বা ঘা তৈরি হয়। একেই চিকিৎসাশাস্ত্রে পেটের আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার বলা হয়। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। সাধারণ মনে হলেও সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না করালে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।


আলসারের লক্ষণ

পাকস্থলীর আলসার হলে সাধারণত বুকের ঠিক নিচে, পেটের ওপরের দিকে মাঝখানে বা কিছুটা বাম পাশে এক ধরনের তীব্র জ্বালাপোড়া বা কামড়ানোর মতো ব্যথা অনুভূত হয়। এ ছাড়া আরও কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা যায়–
হজমে সমস্যা ও পেট ফাঁপা: খাওয়ার ঠিক পরপরই পেট অতিরিক্ত ভরা মনে হওয়া, গ্যাস বা পেট ফোলার সমস্যা।
অম্বল বা বুক জ্বালা: টক ঢেকুর ওঠা এবং বুক ও গলায় অ্যাসিড রিফ্লাক্সের অনুভূতি।
বমি বমি ভাব: অনেকের ক্ষেত্রে সকালের দিকে বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে।
নীরব আলসার: কিছু মানুষের আলসার থাকলেও কোনো বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না। হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ বা পেটে তীব্র ছিদ্র না হওয়া পর্যন্ত তারা বুঝতেও পারেন না যে ভেতরে কোনো জটিলতা তৈরি হয়েছে।

 

কেন হয় এই আলসার?

অনেকের ধারণা, কেবল ঝাল-মসলাযুক্ত খাবার খেলেই আলসার হয়, যা আসলে একটি বড় ভুল ধারণা। ঝাল খাবার আলসারের ব্যথা বাড়াতে পারে, কিন্তু আলসার তৈরি করে না। প্রায় ৯৯ শতাংশ আলসারের জন্য মূলত দুটি কারণ দায়ী–
এইচ. পাইলোরি (H. pylori) ব্যাকটেরিয়া: এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ব্যাকটেরিয়া, যা মানুষের পাকস্থলীতে বংশবৃদ্ধি করে এবং পাকস্থলীর সুরক্ষাকারী স্তরটিকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে।
ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরহামেশা আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা এসপিরিনের মতো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস পাকস্থলীর দেয়ালকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান এবং তীব্র মানসিক চাপ (যেমন- বড় কোনো অস্ত্রোপচার বা দুর্ঘটনা) আলসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

রোগ নির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসা

যদি আপনার আলসারের লক্ষণ থাকে, তবে চিকিৎসক সাধারণত একটি অ্যান্ডোস্কোপি পরীক্ষার পরামর্শ দেন। এই পরীক্ষায় একটি ছোট ক্যামেরাযুক্ত নল মুখের ভেতর দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করিয়ে সরাসরি ক্ষতটি দেখা হয় এবং প্রয়োজনে ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষার জন্য সামান্য টিস্যু নেওয়া হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতি

অ্যান্টিবায়োটিক: এইচ. পাইলোরি ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়লে তা দূর করতে চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট মেয়াদের অ্যান্টিবায়োটিক দেন।
অ্যাসিড কমানোর ওষুধ: কিছু ওষুধ পেটের অ্যাসিড উৎপাদন কমিয়ে ক্ষত শুকিয়ে যেতে সাহায্য করে।
পাকস্থলীর দেয়াল রক্ষাকারী ওষুধ: সুক্রালফেটের মতো কিছু ওষুধ ক্ষতের ওপর একটি প্রলেপ তৈরি করে, যাতে অ্যাসিড সরাসরি সেখানে লাগতে না পারে।

কখন হাসপাতালে যাবেন

আলসার থেকে যদি ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হয়, তবে রোগীর শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা চরম দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। যদি মল কালো রঙের হয়, বমির সঙ্গে কফির দানার মতো রক্ত আসে কিংবা পেটে হঠাৎ তীব্র, সহ্যাতীত ব্যথা শুরু হয়–তবে দেরি না করে রোগীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হবে। কারণ এটি পাকস্থলী ফুটো হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।

লেখক: চিকিৎসক, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ

তরুণীদের স্তনের সাধারণ সমস্যা ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৫ পিএম
আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
তরুণীদের স্তনের সাধারণ সমস্যা ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা
ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা হলো স্তনের ফাইব্রাস ও গ্রন্থিযুক্ত টিস্যুর অস্বাভাবিক কিন্তু নিরাপদ বৃদ্ধি।

স্তনে কোনো ছোট চাকা বা গাঁট অনুভব করলেই যেকোনো নারীর মনে প্রথম যে ভয়টি জাগে, তা হলো ক্যানসার। তবে আশার কথা হলো, স্তনের সব চাকা বা টিউমার ক্যানসার নয়। স্তনের অত্যন্ত সাধারণ এবং সম্পূর্ণ অ-ক্যানসারজনিত (Benign) একটি টিউমারের নাম ‘ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা’। সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয় এবং সঠিক সময়ে সচেতন হলে সহজেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশেষ করে তরুণী ও কিশোরীদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।

ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা কী এবং কেন হয়?

ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা হলো মূলত স্তনের ফাইব্রাস (তুনাযুক্ত) ও গ্রন্থিযুক্ত টিস্যুর একটি অস্বাভাবিক কিন্তু নিরাপদ বৃদ্ধি। এটি কোনো ক্যানসার নয় এবং সাধারণত ক্যানসারে রূপান্তরিতও হয় না। এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে অজানা, তবে হরমোনের তারতম্য (বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোন) এর জন্য প্রধানত দায়ী বলে মনে করা হয়। নারীদের প্রজননক্ষম বয়সে হরমোনের আধিক্যের কারণে এটি বেশি দেখা যায়। ফলে গর্ভাবস্থায় বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় এর আকার বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় এটি আকারে ছোট হয়ে যেতে পারে।

কাদের এই সমস্যা বেশি হয়?

সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণী ও কিশোরীদের মধ্যে এর প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। কিশোরীদের স্তনে কোনো চাকা দেখা দিলে তার সিংহভাগই ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা। মেনোপজের পর অর্থাৎ বয়স বাড়লে এই টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।

 

লক্ষণ ও উপসর্গ

ফাইব্রোঅ্যাডেনোমার কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই খুব সহজে অনুমান করা যায়—
স্তনে একটি গোল বা ডিম্বাকৃতির সুনির্দিষ্ট সীমানাযুক্ত চাকা অনুভব করা।
এটি স্পর্শ করলে বেশ শক্ত কিন্তু কিছুটা রবারের মতো নরম ও মসৃণ অনুভূত হয়।
সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, হাত দিয়ে চাপ দিলে এটি স্তনের ভেতর সহজেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে নড়াচড়া করে। এই নড়নশীলতার কারণে চিকিৎসাশাস্ত্রে একে রসিকতা করে ‘Breast Mouse’ বা ‘স্তনের ইঁদুর’ বলা হয়ে থাকে।
এটি সাধারণত সম্পূর্ণ ব্যথাহীন হয় এবং এক বা একাধিক হতে পারে।

ফাইব্রোঅ্যাডেনোমার প্রকারভেদ

গঠন ও আকারের ওপর ভিত্তি করে এটি চার ধরনের হতে পারে–
Simple (সাধারণ): এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এতে ক্যানসারের কোনো ঝুঁকি থাকে না।
Complex (জটিল): এর ভেতরে ছোট সিস্ট বা ক্যালসিফিকেশন থাকতে পারে।
Giant (বিশাল): আকার ৫ সেন্টিমিটারের বেশি হলে একে জায়ান্ট বলা হয়।
Juvenile (কৈশোরকালীন): কিশোরীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

স্তনে চাকা দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধারণত চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা (Physical Examination), তরুণীদের জন্য স্তনের আল্ট্রাসাউন্ড এবং বয়স ৪০-এর বেশি হলে ম্যামোগ্রাফি করার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়। কোনো সন্দেহ থাকলে সুঁই ফুটিয়ে টিস্যু পরীক্ষা বা বায়োপসি করা হতে পারে।

চিকিৎসা পদ্ধতি মূলত তিনভাবে করা হয়—
পর্যবেক্ষণ: টিউমারটি আকারে ছোট এবং কোনো উপসর্গ না থাকলে কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ডাক্তারের ফলো-আপে থাকাই যথেষ্ট। অনেক সময় এটি নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়।
অস্ত্রোপচার: চাকাটি আকারে বড় হলে, দ্রুত বৃদ্ধি পেলে, ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করলে অথবা কসমেটিক কারণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়।
আধুনিক পদ্ধতি: বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে কোনো কাটাছেঁড়া ছাড়াই ভ্যাকুয়াম-সহায়ক পদ্ধতির (Vacuum-assisted excision) মাধ্যমে এটি অপসারণ করা সম্ভব।

রোগীর সচেতনতা ও শেষ কথা

ফাইব্রোঅ্যাডেনোমা নিয়ে প্যানিক বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ এর পূর্বাভাস অত্যন্ত চমৎকার এবং ক্যানসারে রূপান্তরের হার খুবই বিরল। তবে প্রত্যেক নারীর উচিত প্রতি মাসে নিয়মিত নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করা। যদি স্তনে নতুন কোনো চাকা দেখা যায়, চামড়ার রং পরিবর্তন হয় বা বোঁটা থেকে রক্ত কিংবা পুঁজ নিঃসৃত হয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সচেতনতাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।

লেখিকা: সহকারী অধ্যাপক, জেনারেল অ্যান্ড কলোরেক্টাল সার্জন, চেম্বার আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬, ঢাকা