আমাদের ঘরে কোরআন আছে, তাকেও আছে, শেলফেও আছে–কিন্তু আমাদের জীবনে কতটুকু আছে? আমরা প্রতিদিন অসংখ্য বই, সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও নানা ধরনের তথ্য পড়ি; অথচ সেই কিতাবটির দিকে অনেক সময় ফিরেও তাকাই না, যা আমাদের স্রষ্টা নিজ হাতে হেদায়েতের আলো হিসেবে নাজিল করেছেন। কোরআন শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, এটি জীবন গড়ার পথনির্দেশিকা, হৃদয়ের প্রশান্তি, জ্ঞানের উৎস এবং নাজাতের দিশারি। কেন একজন মুসলমানের কোরআন বুঝে পড়া জরুরি, কেন এটি দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার চাবিকাঠি–সেই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ নিয়েই আজকের আলোচনা।
১. সৃষ্টির কাছে স্রষ্টার পাঠানো চিঠি, যা এখনো খোলা হয়নি
কল্পনা করুন, আপনার দরজায় একটি চিঠি এসেছে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন আকাশ ও পৃথিবীর মালিক। চিঠিতে লেখা আছে, আপনি কে, কেন এসেছেন, কীভাবে বাঁচবেন এবং শেষে কোথায় যাবেন। আপনি কি সেই চিঠি না পড়ে রেখে দেবেন? অথচ ঠিক এটাই আমরা করছি।
কোরআন হলো আল্লাহর সেই চিঠি, যা সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে। এটি কোনো একটি সম্প্রদায়ের বই নয়, এটি প্রতিটি মানুষের। কিন্তু আমরা কোরআন পড়ছি না। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা এবং তাকওয়াবানদের জন্য হেদায়েত ও উপদেশ। (সুরা আলে ইমরান, ১৩৮)
২. এই বই পড়লে প্রতিটি অক্ষরে মেলে ১০টি নেকি, পৃথিবীর আর কোনো বইতে এমন পুরস্কার নেই
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, তার জন্য একটি নেকি। আর একটি নেকি ১০ গুণে পরিণত হয়। আমি বলি না আলিফ-লাম-মিম একটি অক্ষর, বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর, মিম একটি অক্ষর। (তিরমিজি, ২৯১০)
৩. হৃদয়ের মরিচা পড়েছে; আপনি হতাশ-বিষণ্ন, এসব দূর করার একমাত্র ওষুধ
আধুনিক পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় মহামারি কোনটি জানেন? ক্যানসার নয়, করোনা নয়–বিষণ্নতা। হতাশা, যাকে বলা হয় হৃদয়ের মরিচা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। কারণটা কী? মানুষ বাইরে অনেক কিছু পেয়েছে কিন্তু ভেতরে কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে। সেই ‘কিছু একটা’ হলো আত্মার সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক।
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে। (সুরা রাআদ, ২৮) আরও এরশাদ হয়েছে, আমি কোরআনে এমন কিছু নাজিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য এবং রহমত। (সুরা বনি ইসরাইল, ৮২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হৃদয়ে মরিচা ধরে, যেমন লোহায় মরিচা পড়ে। জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ, পরিষ্কারের উপায় কী? তিনি বললেন, মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করা এবং কোরআন তিলাওয়াত করা। (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, ১৮৫৯)
২০১৯ সালে জার্নাল অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে মুসলমানরা নিয়মিত কোরআন পড়েন তাদের কর্টিসল (stress hormone) মাত্রা উল্লেখযোগ্যহারে কম এবং সেরোটোনিনের মাত্রা বেশি। অর্থাৎ কোরআন তিলাওয়াত শুধু আধ্যাত্মিক নয়, জৈবিকভাবেও মানুষকে সুস্থ রাখে।
৪. ১৪০০ বছরে একটি শব্দও বদলায়নি, এর কারণ কী?
পৃথিবীর প্রতিটি মহাগ্রন্থই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। বাইবেলের শত শত সংস্করণ আছে। তাওরাত সম্পাদিত হয়েছে বারবার। বেদের মূল পাণ্ডুলিপি আর অবিকৃত নেই। কিন্তু কোরআন? ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত একটি শব্দ, একটি হরফ, একটি জবর পর্যন্ত পরিবর্তন হয়নি। আজ আপনি বাংলাদেশে যে কোরআন পড়ছেন–সেটি হুবহু একই যা সৌদি আরবে, ইন্দোনেশিয়ায়, আমেরিকায় পড়া হচ্ছে। পৃথিবীতে এখন অসংখ্য হাফেজ আছেন যারা বুকে সম্পূর্ণ কোরআন ধারণ করেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জীবন্ত সংরক্ষণ পদ্ধতি। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, নিশ্চয়ই আমি এই কোরআন নাজিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই এর সংরক্ষণকারী। (সুরা হিজর, ৯)
৫. জীবন বদলানোর, সফলতার ও বরকতের একমাত্র পথ কোরআন
মানুষ মাত্রই স্বপ্ন দেখে। একটু ভালো জীবন। একটু বেশি শান্তি। একটু বেশি সম্মান। একটু বেশি সুখ। কিন্তু প্রশ্ন হলো–সেই জীবন কোথায় খুঁজব? কোন পথে গেলে মিলবে সেই সফলতা যা ক্ষণিক নয়, টেকসই? কোথায় পাব সেই বরকত, যা শুধু দুনিয়ার সম্পদে নয়, আত্মার গভীরেও পৌঁছায়?
হাজারো বই পড়েছি। হাজারো গুরুর কাছে গেছি। কিন্তু সত্যিকারের শান্তি? সত্যিকারের সফলতার রহস্য? সেটা লুকিয়ে আছে একটি বইয়ে। যে বইটা হয়তো আপনার ঘরে আছে–কিন্তু পড়া হয়নি। যে বইয়ের মলাট হয়তো ধুলা জমে আছে–কিন্তু ভেতরে আছে আপনার পুরো জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি। সেই বইয়ের নাম আল-কোরআন।
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, এটি একটি কিতাব যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারো। (সুরা ইব্রাহিম, ১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই এই কোরআন আল্লাহর দস্তরখান। তোমরা যতটা পারো এই দস্তরখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো। কারণ, এই কোরআন আল্লাহর রশি–স্পষ্ট আলো, উপকারী ওষুধ। যে এটি আঁকড়ে ধরবে সে রক্ষা পাবে, যে এটি অনুসরণ করবে সে নাজাত পাবে। (দারেমি, ৩৩৬৪)। এই কোরআনই বরকতের উৎস। সেই আলো, যা অন্ধকার দূর করে। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো। (সুরা আনআম, ১৫৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, সে ঘর তার বাসিন্দাদের জন্য প্রশস্ত হয়ে যায়, সেখানে কল্যাণ বৃদ্ধি পায়, ফেরেশতারা উপস্থিত হন এবং শয়তান পালিয়ে যায়। আর যে ঘরে কোরআন পড়া হয় না, সে ঘর তার বাসিন্দাদের জন্য সংকীর্ণ হয়, কল্যাণ কমে যায়, ফেরেশতারা চলে যান এবং শয়তান সেখানে থাকে। (দারেমি, ৩৩৯৩)
৬. কোরআনে আছে বিজ্ঞানের এমন সত্য, যা মানুষ আবিষ্কার করেছে শতাব্দী পরে
যদি বলি ১৪০০ বছর আগের একটি বই মহাবিশ্বের উৎপত্তি, মানব ভ্রূণের বিকাশ, সমুদ্রের গভীরতার রহস্য এবং পাহাড়ের শিকড়ের কথা বলেছে–আপনি কি বিশ্বাস করবেন? বিশ্বাস করতে হবে না। শুধু যাচাই করুন। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, যারা কুফরি করে তারা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী একসঙ্গে মিলিত ছিল, তারপর আমি তাদের আলাদা করে দিলাম? (সুরা আম্বিয়া, ৩০)
বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রথম প্রস্তাবিত হয় ১৯২৭ সালে। কোরআন এই কথা বলেছে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আলাক (রক্তপিণ্ড/ঝুলন্ত বস্তু) থেকে। (সুরা আলাক, ২)
বিশ্বখ্যাত ভ্রূণবিদ্যার অধ্যাপক ড. কিথ মুর। যিনি The Developing Human গ্রন্থের রচয়িতা। তিনি বলেছেন, কোরআনে ভ্রূণবিদ্যার যে বর্ণনা আছে তা এতটাই নির্ভুল যে, এটি ১৪০০ বছর আগে জানা অসম্ভব ছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার ওষুধ নেই, শুধু বার্ধক্য ছাড়া। (বুখারি, ৫৬৭৮) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রবার্ট সাহাগুন বলেছেন, ইসলামের সোনালি যুগে (অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী) মুসলিম বিজ্ঞানীরা যখন কোরআন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গবেষণা করেছেন, তখনই সভ্যতার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে।
৭. কোরআন তোমার প্রতিটি কষ্টের দিনে তোমার পাশে থাকে, যা কোনো মানুষ পারে না
জীবনে এমন মুহূর্ত আসে যখন সবাই চলে যায়। মানুষ ক্লান্ত হয়, সম্পর্ক শেষ হয়, সাফল্য মিলিয়ে যায়। কিন্তু কোরআনের একটি আয়াত সেই রাতে আলো হয়ে জ্বলে।
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, এবং অচিরেই তোমার রব তোমাকে এত দেবেন যে, তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবে। (সুরা দুহা, ৫) আরও এরশাদ হয়েছে, কষ্টের সঙ্গেই আছে স্বস্তি। নিঃসন্দেহে কষ্টের সঙ্গেই আছে স্বস্তি। (সুরা ইনশিরাহ, ৫-৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিনের ব্যাপারটাই অবাক করার মতো! তার সবকিছুই কল্যাণকর। সুখে শোকর করে, তা কল্যাণ। কষ্টে সবর করে, তাও কল্যাণ। (মুসলিম, ২৯৯৯)
৮. মৃত্যুর পরও কোরআন তোমার সঙ্গে থাকবে, আর কিছু থাকবে না
একটু থামুন। চোখ বন্ধ করুন। এমন একটি মুহূর্তের কথা ভাবুন, যখন সব শেষ হয়ে গেছে। পরিবার কাঁদছে। বন্ধুরা বিদায় নিয়েছে। সম্পদ রেখে চলে যেতে হচ্ছে। ক্ষমতা, পদ, পরিচয়–সব মিলিয়ে গেছে। শুধু একা একটি অন্ধকার ঘরে। সেই মুহূর্তে আপনার সঙ্গে কী থাকবে? শুধু একটাই জিনিস থাকতে পারে–কোরআনের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক। আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, প্রতিটি প্রাণকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। আর কিয়ামতের দিনই তোমাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেওয়া হবে। (সুরা আলে ইমরান, ১৮৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরআন পড়ো। কেননা কিয়ামতের দিন এটি তার তিলাওয়াতকারীদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে। (মুসলিম, ৮০৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, কোরআন হয় তোমার পক্ষে দলিল হবে, নয়তো তোমার বিরুদ্ধে। (মুসলিম, ২২৩)
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক