ঢাকা ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
মনির খানের ‘মন ভালো নাই’ মুখোমুখি স্পেন-বেলজিয়াম: লড়াইটা কর্তোয়া বনাম ইয়ামালেরও আট কারণে প্রত্যেক মুসলমানের পবিত্র কোরআন বুঝে পড়া আবশ্যক বরিশালে অনিশ্চয়তার মুখে ২০ নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীরা স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে দাবানলে ১২ জনের মৃত্যু ৩১ আগস্ট ভোটার তালিকা প্রকাশ, ভোটকেন্দ্র নীতিমালায় পরিবর্তন পাহাড়ধস ও ডুবে আরও ১০ জনের মৃত্যু প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, নতুন বার্তা নেতানিয়াহুর ন্যাটোর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের মিথ্যাচার তত্ত্বাবধায়কের অধীনে আগামী নির্বাচন কুমিল্লায় পাহাড়ি ঢলে ভাসল কৃষকের স্বপ্ন পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে: ডিসি ফরিদা ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল বৃষ্টি হলেই ডোবে খুলনা এক মোহনায় তিন স্বাগতিক তুলা, বৃশ্চিক, ধনু , মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল লা রোজারার সামনে রেড ডেভিলস সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ জনসংখ্যায় মহাশক্তি, ফুটবলে কেন নয়? গুরুর কফিনে শিষ্যের পেরেক ১০ জুলাই  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি বিশ্বকাপে লাল-হলুদের ঝড় বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতা উত্থানের বিশ্বকাপে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন ক্লিন্সমান সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ কারা? এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে মরক্কোকে বিদায় করে সেমিফাইনালে ফ্রান্স ৬ মিনিটে দুই গোল, মরক্কোর বিপক্ষে এগিয়ে ফ্রান্স দুর্দান্ত বুনু, এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসে প্রথমার্ধ গোলশূন্য

আসা-যাওয়া-ফেরা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে আগামী নির্বাচন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
তত্ত্বাবধায়কের অধীনে আগামী নির্বাচন
জাতীয় সংসদ। ছবি: সংগৃহীত

আগামী (চতুর্দশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে বহাল থাকার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই অবস্থান জানিয়েছেন মন্ত্রী।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিলেন, তা আপিল বিভাগে বহাল থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার পথে এখন আর কোনো বাধা রইল না। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল গতকাল খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এরপর এ বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ। এটা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপির আন্দোলনের ফসল।’

আপিল বিভাগের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলও এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো খারিজ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল। পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে যখন রিট করা হয়, তখন হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরে আসা, গণভোট ফিরে আসা এবং সংবিধানে ৭ক, ৭খ বাতিলের রায় বহাল থাকল। আলটিমেটলি হাইকোর্টের রায়টি বহাল থাকল।’

প্রসঙ্গত, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী আইন সংসদে পাস হয়। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি–জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনাসহ এই সংশোধনীতে সংবিধানে ৫৪টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছিল।

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়। রিটের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ওই বছর ১৭ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাদ দেওয়াসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭(ক), ৭(খ), ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।

হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি আপিল করা হয়, আপিলগুলো খারিজ করে গতকাল রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ। যার ফলে হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকল বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

আদালতে আপিলকারী সুজন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এবং আরেক আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও অনীক আর হক এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্যাহ আল মাসুদ। মামলায় ইন্টারভেনার (তৃতীয় পক্ষ) হিসেবে যুক্ত গণফোরামের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন ও ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী হামিদুল মিসবাহ শুনানিতে অংশ নেন।

রায়ের পর মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে যে রায় হয়েছিল, সেটি বহাল রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে চারটি বিষয়কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, সেই বিষয়গুলো অসাংবিধানিক ঘোষিত থাকবে। এ ছাড়া বাকি যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

যে চারটি বিষয় হাইকোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন, তার মধ্যে এক নম্বর ছিল—বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(ক) ও ৭(খ)। ৭(ক) ও ৭(খ) ছিল এমন—এই সংবিধানের কতগুলো বিষয় আছে, যেগুলো পরিবর্তন করা যাবে না। যদি কেউ পরিবর্তন করে, তাহলে সেটা হবে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহ। হাইকোর্ট বিভাগ এই অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগে এই অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থেকে গেল। দ্বিতীয়ত, হাইকোর্ট বিভাগ গণভোটের যে বিধান ছিল, সেই গণভোটের বিধানকে পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান পুনঃপ্রবর্তিত হলো। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪(২) অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা প্রদানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগ এই অসাংবিধানিক ঘোষণা করার জায়গাটিকে অসাংবিধানিক রেখেছেন। অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না।

চতুর্থত, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ এই বাতিলটা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগ যে বাতিল করেছেন, সে বিষয় বহাল থাকবে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে আর কোনো বাধা থাকল না।

প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রাম মহানগরের প্রাণকেন্দ্রখ্যাত লালখান বাজার। এ বাজারসংলগ্ন চারটি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে গত রবিবার থেকে প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে একটি পরিবারও সেখান থেকে সরছে না। বসবাসকারীদের শঙ্কা পাহাড় ছেড়ে গেলে বাড়িঘর বেদখল হবে। তাই প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বিরিয়ানি বিতরণ করবেন, এ খবর ছড়িয়ে পড়লে গত বুধবার রাতে পাহাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৩০০ মানুষ সেখানে অবস্থান নেয়।  তবে বিরিয়ানি বিতরণ শেষে আশ্রয়কেন্দ্র খালি হয়ে যায়। অর্থাৎ ত্রাণ নিয়ে তারা আবার পাহাড়ের বসতিতে ফিরে গেছেন। 

বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) লালখান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লালখান বাজার ও সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী ভবনের পাশ দিয়ে মতিঝর্ণা, বাটালী হিল, এ কে খান ও পানির ট্যাংকি পাহাড়ে প্রবেশ সড়কের দুই পাশে সারি সারি বসতি। লালখান বাজার দিয়ে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে উঁচু পাহাড়। এসব পাহাড়ের মালিক জেলা প্রশাসন, ওয়াসা ও রেলওয়ে। পাহাড়ের ঢালে টিনশেড ঘরের পাশাপাশি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছে চার, পাঁচ এমনকি ছয়তলা ভবন। এসব অবৈধ বসতিতে রয়েছে বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। এলাকার ৪ নম্বর গলিতে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেছে সরু পথ। সেখানে রয়েছে বহুতল ভবনসহ অসংখ্য বাসা। এখানে ভাড়াবাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন রুবেল মিয়া নামের এক রিকশাচালক। পাহাড়ধসের ঝুঁকি জেনেও তিনি বসবাস করে আসছেন। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। 

তিনি বলেন, ‘এখানে গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ মাসে ছয় হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়া কম, তাই ঝুঁকি জেনেও এখানে পরিবার নিয়ে থাকি।’
ওই এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় সবাই নিম্নআয়ের মানুষ। কেউ রিকশাচালক, ভ্যানচালক, হকার্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কিন্তু দখলদার জমিদারদের কেউই এখানে থাকেন না। দখলদারদের মধ্যে পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন।

পাহাড়ের একটি ভবনের মালিক চট্টগ্রাম আদালতের শিক্ষানবিস আইনজীবী মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি জানান, এক দশক আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তাদের পরিবার অনেক বছর ধরে এখানে বসবাস করছে। 

এখানে বসবাসে ঝুঁকির বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, এত বছরেও তারা স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের মুখে পড়েননি। 

এখানকার একটি গলির মুখে মুদির দোকান করেন অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্য। তার ছেলেও পুলিশে চাকরি করেন। তিনি পরিচয় না দিয়ে বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। পর্যায়ক্রমে ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন নিয়েছি। এখনো কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি।
প্রায় ২৪ বছর ধরে মতিঝর্ণা পাহাড়ে বসবাস করছেন রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণের সময় প্রশাসনের মাইকিং শুনেছি। পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু যাইনি। ফিরে এসে যদি বাসা না পাই? 

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি ২৬টি পাহাড়ে বর্তমানে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে রয়েছে আরও ৩৮৩টি পরিবার। সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি রয়েছে ফয়'স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল পাহাড়ে, যেখানে প্রায় ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার বসবাস করছে। কিন্তু সরকারি এ হিসাবের বাইরে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করে পাহাড়ে। বায়েজিদ লিংক জঙ্গলসলিমপুর ও আলীনগরে প্রত্যেকটি পাহাড়ে অবৈধ বসতি রয়েছে, যা সরকারি হিসাবের মধ্যে নেই।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। আমাদের টিম এ দুযোর্গ পূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছে। কিন্তু কেউই নির্দেশনা মানেন না। ফলে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

১৯ বছরে ২৫৩ প্রাণহানি

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানির মিছিল থামছে না। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৮ জুলাই টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম নগরে দুটি পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় দেয়ালধসে একজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন এক দিনেই প্রাণ হারান ১২৭ জন। ওই ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকা প্রণয়ন, উচ্ছেদ অভিযান এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে মতিঝর্ণা, বাটালী হিল, আকবর শাহ, বায়েজিদ, ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় বারবার পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ২৫১ জন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে দুজনের মৃত্যুসহ মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৩ জনে।

স্থানীয়রা জানান, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল মাটি এবং টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের আগে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর সবাই ভুলে যায়।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা খবরের কাগজকে বলেন, ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস পেলেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাইকিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের সরিয়ে যে স্থানে বসবাস করতে দেব, সেখানে তারা যেতে চান না। কারণ হিসেবে দেখায়–সেখানে কাজ নেই, জীবনযাত্রার মান ভালো না। এটা হচ্ছে আসল বাস্তবতা। এর পরও দখলদার যারা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাহাড় কাটা ও দখল কমে গেছে অনেকটা।

বৃষ্টিতে বন্ধ ট্রেন, কক্সবাজার রেলপথের  সংস্কারের মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০২ এএম
বৃষ্টিতে বন্ধ ট্রেন, কক্সবাজার রেলপথের 
সংস্কারের মান নিয়ে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

যখন বন্যার কারণে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটে, তখন ট্রেনই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী টানা দীর্ঘ বন্যায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ট্রেন। কিন্তু চট্টগ্রামে গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির কারণে চট্টগ্রামে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা নিকট অতীতে নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, এখানে মূল সমস্যা পানি নয়। রেললাইনে ব্যালাস্ট বা পাথর না থাকার কারণে ট্রেন চলাচল করতে পারছে না। পর্যাপ্ত পাথর না দেওয়ায় রেললাইন নড়বড়ে হয়ে গেছে। লোকোমাস্টাররা (চালক) আর ট্রেন চালাতে সাহস পাচ্ছেন না। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ষোলশহর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথের অনেক জায়গায় পাথর নেই। কোথাও কোথাও পাথর দিয়ে কোনো রকমে মাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। যা এই রেলপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ব্যালাস্ট বা পাথরের কাজ কী?

রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, রেললাইনের পাথর বা ব্যালাস্টের প্রধান কাজ হলো ট্রেনের ভার বহন করে তা স্লিপার থেকে মাটির নিচে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। ট্রেনের ওজনে যাতে মাটি দেবে না যায়, সেজন্য স্লিপারের মাধ্যমে মাটির গভীরে ওজন সমানভাবে হয়ে যায়। পাথরের স্তর ট্রেনের ধাক্কা ও কম্পন শোষণ করার কারণে যাত্রা আরামদায়ক হয় এবং রেলের যন্ত্রাংশের ওপর চাপ কম পড়ে। পাথরের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়, আগাছা জন্মাতে পারে না। পাথরগুলো স্লিপারকে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে সঠিক অবস্থানে আটকে রাখে।  

রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের মধ্যে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় রেলওয়ে কিংবা যাত্রীদের কোনো কাজে আসেনি। বরং পাথরের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া লাইন দিয়ে সঠিক গতিতে ট্রেন চালাতে পারছেন না চালকরা। এতে ট্রেনের গতি কমে যায়। যে কারণে যাত্রী ভোগান্তি চলছিল অনেক দিন ধরে। সর্বশেষ জলাবদ্ধতার কারণে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পর ঢাকা-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০২৩ সালের শেষার্ধে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর এই রেলপথের অনুমোদিত গতিবেগ ছিল ৬০ কিলোমিটার। এর আগেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা খরচ করে সংস্কার করা হয়। যার অধিকাংশ টাকা খরচ হয় চট্টগ্রামের দোহাজারী অংশে। দুই দফা সংস্কারের পরও কাজের মান অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় ট্রেনের গতিবেগ নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনের গতির চেয়ে অনেক কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্টেশন মাস্টার ও লোকোমাস্টার খবরের কাগজকে জানান, রেললাইন নড়বড়ে হওয়ার কারণে এতদিন ধরে চট্টগ্রাম-ষোলশহর ও ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলছিল না। এখন বৃষ্টির কারণে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এর জন্য তারা প্রকৌশল বিভাগকেই দায়ী করেন। তারা জানান, রেলওয়েতে যত সংস্কার তত দুর্নীতি। সংস্কার কাজ করে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেবার মান বাড়ে না। বরং ট্রেনের গতিবেগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকিও।

পাথর বসানো এবং সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার কাজটি করা হয়েছে কোনোরকমে ট্রেন চলাচলের স্বার্থে। অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঠিকাদার যথাযথভাবে কাজ করেনি বলে তাকে জরিমানা করে কাজ বাতিল করা হয়েছে। পরে অবশ্য রেলওয়ের পক্ষ থেকে সেখানে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। নতুন পাথর বসানো হয়েছে। তারপরও ব্যালাস্ট স্বাভাবিক রাখা যায় না। বর্তমানে ওই লাইনে পাঁচ ইঞ্চি ব্যালাস্ট রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী ১০ ইঞ্চি পাথর থাকার কথা। অতীতে বন্যার সময় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অন্যান্য এলাকায় ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক ছিল। এখন কেন নয়–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই লাইনে যে ট্রেন চলছে তা ৬ ইঞ্চি পানিতে চলতে পারবে। সেখানে পানি জমেছে দুই ফুট ৬ ইঞ্চি। পানি ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ট্রেন চলাচল করতে পারবে না। 

প্রধান প্রকৌশলী জানান, এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী ৪৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান লাইনের পাশ দিয়েই এই লাইন হবে। তবে সেটি নির্মাণ হবে ৫ ফুট উঁচুতে। যাতে কোনো সময় অতিভারী বর্ষণ কিংবা জলাবদ্ধতার কারণে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেদিকটা মাথায় রেখেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমান দুর্ভোগের জন্য তিনি গত চার দশকের মধ্যে গত দুই দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাতকে দায়ী করে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। যারা দুই দশক আগে বাড়ি করেছেন তাদের বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। তারা তো জানতেন না দুই দশক পরে এমন অবস্থা হবে।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কঠোর হলেও ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কঠোর হলেও ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের
ছবি: সংগৃহীত

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি দেখা দেয়। তবে ঘাটতি থাকলেও চলতি অর্থাৎ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি প্রতিষ্ঠানটিকে। উল্টো দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই ‌রাজস্ব আদায়ে আটঘাট বেঁধে নেমেছে এনবিআর। এরই মধ্যে রাজস্ব আদায় বাড়াতে একগুচ্ছ কৌশল নির্ধারণ করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। 

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, গত অর্থবছরে কর জিডিপি অনুপাত কমেছে। এনবিআরের সক্ষমতা বাড়েনি। রাজস্ব খাতের বেশির ভাগ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বাড়তে পারে।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের কাছ থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। এর মধ্যে আয়, মুনাফা ও মূলধনের ওপর কর ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক ৮২ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক ৬১ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা, রপ্তানি শুল্ক ৯৯ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক ৭ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা আদায়ের হিসাব কষা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে অর্থ মন্ত্রণালয় এনবিআরের তিন শাখা আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে চলতি অর্থবছরে কোন কৌশলে রাজস্ব আদায় করতে এনবিআর কাজ করবে, তা নিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এনবিআর এসব দিকনির্দেশনা সামনে রেখে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ে একগুচ্ছ কৌশল নির্ধারণ করেছে। 

সূত্র জানায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে নতুন করদাতা সংগ্রহে। এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিযানে কারো ইটিআইএন এবং অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধনের আওতায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থনীতিতে বেশ কয়েকটি নতুন খাত যুক্ত করা হয়েছে। এসব খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য কঠোর নজরদারি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে নামিদামি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এনবিআরের তিন গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা শাখার কার্যক্রমে জোর দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে উৎসে রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে গুরুত্ব বাড়াতে, আমদানি-রপ্তানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা ও অবমূল্যায়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে জোরদারেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনে নজরদারি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে করদাতাদের সঙ্গে খাতভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এনবিআর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততায় এবং জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে নির্দেশ দিয়ে করদাতাদের হয়রানি না করতে সতর্ক করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে জরিপের মাধ্যমে অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নিবন্ধিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যকর করাসহ উচ্চ আদালতে অনিষ্পন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধে সর্বোচ্চ ৩ বারের বেশি সময় না বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

রাজস্ব আদায় বাড়াতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সহায়তা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন বছরে এনবিআর থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সদস্যদের অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর গ্রহণে উৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। 

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুর রহমান খানকে নিয়োগ করা হয়। বিভিন্ন ইস্যুতে সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে এনবিআর বিভক্তি ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়। প্রায় ৭/৮ মাস এনবিআরের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম চালু হওয়ার পরও এনবিআরে অস্থিরতা থামে না। হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়।

শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তদন্তের আওতায় আনা হয়। অনেকের চাকরি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমগ্র রাজস্ব আদায়ে। রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকে। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরেও দেখা দেয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। নতুন সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করতে না করতেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। জ্বালানিসংকট চরমে ওঠে। আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ কমতে থাকে। শিল্পে বিনিয়োগে ধস নামে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণে কমে যায়। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে রপ্তানি আয় কিছুটা বাড়লেও ওই অর্থবছরের মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। এসবের প্রভাবে রাজস্ব আদায় কমেছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজস্ব আহরণের সাম্প্রতিক প্রবণতা বিবেচনায় এনবিআরের চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে। গত অর্থবছরে যেসব কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে সেসব সংকটের বেশির ভাগ এখনো বিদ্যমান আছে। সংকট থাকবে তার মধ্যেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, লক্ষ্য পূরণের চাপ শেষ পর্যন্ত নিয়মিত করদাতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপরই এসে পড়তে পারে। আগের মতোই যারা নিয়মিত কর ও ভ্যাট দেন তাদের ওপর চাপ বাড়বে। এ ধারা থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে এনবিআরকে। 

একই আশঙ্কা করে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক খবরের কাগজকে বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, সেখানে অন্ততপক্ষে এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে।  

অস্ত্রের ভিডিও দিয়ে বেচাকেনা !

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ এএম
অস্ত্রের ভিডিও দিয়ে বেচাকেনা !
প্রতীকী ছবি

ঠাস ঠাস বিকট শব্দে একের পর এক গুলি ছোড়া হচ্ছে। পিস্তল থেকে পাশে ছিটকে পড়ে অন্তত পাঁচটি গুলির খোসা। ভিডিওর পরের দৃশ্যেই দেখানো হয়, একটি বিছানার চাদরের ওপর রাখা আছে একটি পিস্তল, বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি এবং গুলির খোসা।

পাশাপাশি একটি কারখানাসদৃশ কক্ষ ঘুরিয়ে দেখিয়ে পিস্তল তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং ফ্রেম (ডায়াস) প্রদর্শন করা হয়। এ সময় ভিডিওতে বলা হয়– “যারা নিতে চান, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে মেসেজ দিলেই প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ‘মাল’ (অস্ত্র) পৌঁছে দেওয়া হবে। কোনো ঝামেলা হবে না!”

রবিবার (৫ জুলাই) প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান ভিডিওটি তার ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান।

এর পরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র‌্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিওবার্তায় অনলাইনের অস্ত্র কেনাবেচার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে রাজধানীর ভাটারা থানার হেফাজতে রাখা তার ব্যক্তিগত লাইসেন্স করা একটি বৈধ অস্ত্র গায়েব (লুট) হয়, কিন্তু এখনো সেই অস্ত্রের কোনো হদিস পাননি। ফলে লুট হওয়া পুলিশের সরকারি অস্ত্র-গোলাবারুদের সঙ্গে বেসরকারি পর্যায়ের লাইসেন্স করা অস্ত্র-গুলি কাদের হাতে রয়েছে, সেটি বড় প্রশ্ন। লুট হওয়া ওই সব আগ্নেয়াস্ত্র-গুলিই কী ‘অনলাইন ও অফলাইনে’ কেনাবেচা হচ্ছে? নাকি সন্ত্রাসমূলক কাজে ব্যবহার হচ্ছে? এভাবে চলতে থাকলে সামনে খুব খারাপ পরিণতি দেখতে হবে। তাই দলমত নির্বিশেষে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালানোর আহ্বান জানান সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে আরও জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গোপনীয় গ্রুপে বা প্রকাশ্য পেজেও আগ্নেয়াস্ত্র-গুলি কেনাবেচায় এক ধরনের তৎপরতা চলছে অনেক দিন ধরেই। তবে সেগুলো অধিকাংশই প্রতিবেশী দেশে বা অন্য দেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে দেশের ভেতরেও এই ধরনের প্রবণতা লক্ষ করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। 

অন্যদিকে ‘মেটাল বডির’ হুবহু নকল পিস্তল-রিভলবারও বিক্রি হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দোকানে। অনেক সময় সেগুলোকে খেলনা পিস্তল হিসেবে প্রদর্শন করে বিভিন্ন দামসহ ফেসবুকে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই ‘খেলনার’ আড়ালে মূলত প্রকৃত (অরিজিনাল) পিস্তল বেচাকেনা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়ে তেমন নজরদারি নেই বললেই চলে। এ ছাড়া ইদানীং কক্সবাজারসহ দেশের কিছু সীমান্ত এলাকায় অনলাইন যোগাযোগে অস্ত্র কেনাবেচার কিছু অপতৎপরতার খবরও শোনা যাচ্ছে। ফলে থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং সন্ত্রাসীদের হাতে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র– এসব মিলে আগামী দিনগুলোয় আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।  

পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও স্থাপনায় হামলা চালিয়ে পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। লুট হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো হদিস জানতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব মারণাস্ত্র কার হাতে বা কোথায় আছে, সেটিও অজানা। উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- চায়নিজ রাইফেল, চায়নিজ সাব-মেশিনগান (এসএমজি), দুই শতাধিক চায়নিজ পিস্তল, চার শতাধিক (৯ x ১৯ মিমি) বোরের পিস্তল, ১২ বোরের বহু শটগান এবং এলএমজিসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। এ ছাড়া ওই সময়ে লুট করা হয় বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গুলি, যার মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ লাখ ৯ হাজার ৮টি। এখনো অন্তত ২ লাখ ৪৩ হাজার গুলির হদিস নেই। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের মাঝেই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাচ্ছে ব্যাপকহারে।

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযান ফলপ্রসূ ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, পেশাদার সন্ত্রাসী, উগ্রবাদী ও রাজনৈতিক ক্যাডার– এই তিন শ্রেণির হাতে লুট হওয়া সব অস্ত্র-গোলাবারুদ থাকতে পারে বলে ধারণা করছি। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালালেও সেটি ফলপ্রসূ ছিল না। আবার বর্তমান সরকারও এ নিয়ে দৃশ্যমান অভিযান চালায়নি, বা সেভাবে অনুভব করতে পারছি না। প্রায় ২ বছর হয়ে গেল, অনেকটা সময় চলে গেছে, এই অবস্থায় আন্তরিকভাবে সম্মিলিত অভিযান চালানোর কোনো বিকল্প নেই। দলমত নির্বিশেষে নির্মোহভাবে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে নামতে হবে। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযান দৃশ্যমান করতে হবে। 

একই প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, ‘সরকারি বাহিনী বা সংস্থার সদস্যদের বাইরে যে কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকা মানেই সেটি সমাজের সাধারণ মানুষের জন্য ভীতিকর বা আতঙ্কের বিষয়। আমরা বিভিন্নস্থানে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও মহড়া দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সে অনুসারে অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান চোখে পড়ছে না। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে যেকোনো মূল্যে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারসহ অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, গত ১ মে থেকে সারা দেশে মাদক ও অস্ত্রবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এই বিশেষ অভিযানে গত সোমবার পর্যন্ত মোট ২২৬টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে ২ হাজার ২৩৯ রাউন্ড গুলি, ৮৩টি ম্যাগাজিন, ৩৭টি হাতবোমা ও ২ হাজার ২০০ কেজি গানপাউডার উদ্ধার করা হয়। 

এআইজি শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারেও সব ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া রয়েছে। যদিও এখনো লুট হওয়া ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে পুলিশ এই বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১০ এএম
স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার
ছবি: খবরের কাগজ

যানজটের রাজধানীতে কর্মব্যস্ত মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্বস্তির বাহন মেট্রোরেল। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত, নিরাপদ ও সময়মতো পৌঁছানোর জন্য অল্প সময়েই এটি রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু কর্মজীবী মানুষই নন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে বেড়াতে আসা মানুষের কাছেও মেট্রোরেল এখন অন্যতম আকর্ষণ। অথচ দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক অবকাঠামোর স্টেশনগুলোর নিচে দিন দিন গড়ে উঠছে অস্থায়ী হাটবাজার। 

রাজধানীর মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন এলাকায় দেখা যায়, এসব স্টেশনের নিচে বসেছে মিনি বাজার। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এসব বাজারে বেচাকেনা চলে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, ফলমূল, কাঁচাবাজার, ঝালমুড়ি, চটপটি-ফুচকা, জুস, পান-সিগারেট, খাবারের হোটেল, ব্যাগ, মশারি–নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের পসরা বসে। বিভিন্ন ভ্যান ও অস্থায়ী দোকান স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে রাখায় যাত্রীদের চলাচলের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্টেশনের সিঁড়ি, লিফটের প্রবেশমুখও আংশিকভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিকশার দীর্ঘ সারি। ফলে প্রতিদিনই হকার, রিকশাচালক ও যাত্রীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা লেগেই থাকছে।

নিয়মিত মেট্রোরেল ব্যবহারকারী যাত্রীরা জানান, উদ্বোধনের পর মেট্রো স্টেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা দেখে অনেকেরই মনে হতো যেন ইউরোপের কোনো আধুনিক নগরের অবকাঠামো। সাধারণ মানুষও স্টেশনগুলোকে নিজেদের সম্পদ মনে করে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি কমে যাওয়ায় সেই পরিবেশ আর নেই। বর্তমানে অধিকাংশ স্টেশনের নিচেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে হকারদের অবস্থান চোখে পড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে মেট্রোরেল স্টেশন এলাকাতেও। তখন থেকে বিভিন্ন স্টেশনের নিচে হকারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এখন নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান কিংবা কার্যকর নজরদারি না থাকায় দিন দিন বাড়ছে দখলদারত্ব।

তাদের মতে, গত কোরবানির ঈদে উত্তরা মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসানো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হকারদের মধ্যে ‘উৎসাহ’ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গরু-ছাগলের সারি স্টেশনের সিঁড়ি ও লিফটের কাছ পর্যন্ত চলে আসার ঘটনা ঘটে। জবাবদিহি ও বিচার না হওয়ায় সেই ঘটনার পর অন্য স্টেশনেও ছোট আকারের বাজার গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত রবিবার সচিবালয়ের সামনে। সেদিন প্রতীকীভাবে ভাতের হোটেল চালু করে প্রতিবাদ জানাতে যান এক নারী। ১০ টাকার ভাতের হোটেল চালুর দাবি জানান ‘হকার ও অটোরিকশা হটাও’ আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা। তাকে পুলিশ আটক করে। এর আগে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, মেট্রো স্টেশনগুলোর রাস্তা দখলের প্রতিবাদে সচিবালয়ের সামনে প্রতীকী ভাতের হোটেল চালু করবেন।

পুলিশ আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা চিৎকার করে বলতে থাকেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মেট্রো স্টেশন এখন হাটবাজার হয়ে যাচ্ছে, কেউ দেখছে না। পুরো রাজধানীতে হাঁটার জায়গা নেই, ফুটপাত ও সড়ক পুরোটাই হকারদের দখলে! ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে রাজধানী। তাও দেখার কেউ নেই। এসবের বিচার চেয়েছেন তিনি। যদিও আটকের পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান এই আন্দোলনকর্মী। 

প্রতিদিন মেট্রোরেল চলাচল শুরু হওয়ার পরপরই হকাররা দোকান সাজাতে শুরু করেন। রাতে শেষ ট্রেন চলাচল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেচাকেনা অব্যাহত থাকে। এসব দোকানের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অবশ্য মেট্রোর যাত্রী।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, স্থায়ী নজরদারি এবং স্টেশন এলাকার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের সবচেয়ে আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার নিচে গড়ে ওঠা এই ‘মিনি হাটবাজার’ শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়াবে না, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতীক হয়ে থাকবে।

প্রতিদিন মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যাতায়াত করেন গণমাধ্যমকর্মী ফারজানা লাবনী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যানজটের এই রাজধানীতে আমাদের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বাহন এখন মেট্রোরেল। কিন্তু যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে এখন হাটবাজার গড়ে উঠছে। বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।’

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে মেট্রোরেল ব্যবহার করতেই হয়, তাই বিকল্পও নেই। অথচ এখন স্টেশনের নিচে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে নারীদের পোশাক থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হচ্ছে। স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে এসব দোকান বসায় যাত্রীদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক একটি গণপরিবহনের সঙ্গে এমন দৃশ্য মোটেও মানানসই নয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন প্রতিদিন মেট্রোরেলে করে মতিঝিলে যান। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই মিরপুর-১০ স্টেশনে ভিড় ঠেলে চলতে হয়। দোকান আর রিকশার কারণে হাঁটার জায়গাই থাকে না। আধুনিক মেট্রো স্টেশনের নিচে এমন দৃশ্য সত্যিই হতাশাজনক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, শুরুতে স্টেশনগুলো খুব পরিচ্ছন্ন ছিল। এখন মনে হয় যেন বাজারের মধ্য দিয়ে স্টেশনে ঢুকতে হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এটিও গুলিস্তানের মতো হয়ে যাবে। 

পরিকল্পনাবিদদের মতে, মেট্রোরেল শুধু একটি গণপরিবহন নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো। স্টেশন এলাকা দখলমুক্ত ও নিরাপদ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত দোকান, ভ্যান ও জনসমাগম জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। 

মেট্রো স্টেশনের নিচে হাটবাজার স্থাপনকে ন্যক্কারজনক বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, মেট্রোরেল একটি বিশেষায়িত নগর অবকাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেট্রো স্টেশনকে কেন্দ্র করে ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকা আলাদাভাবে পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা হয়, যাতে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল, যানবাহনের সংযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ঢাকায় এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গেল কোরবানির ঈদে মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা প্রমাণ করে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধীরে ধীরে এই এলাকা অন্য সড়ক ও ফুটপাতের মতোই অবৈধ দখলে চলে যেতে পারে। এতে শুধু যাত্রী ভোগান্তি নয়, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সমাধানের বিষয়ে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, প্রতিটি মেট্রো স্টেশনের চারপাশের অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকাকে ‘নো বিজনেস জোন’ ঘোষণা করে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টেশনকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত মোবিলিটি প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পথচারী চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং মেট্রোরেলের পরিবেশ শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরাপদ রাখা যায়। 

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড–ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এমন অবৈধ দোকানপাট ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড উচ্ছেদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত এই অভিযান পরিচালনা করছেন। পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সহায়তায় আমরা স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান করব।’