কেপ ভার্দের ভোজিনহা, প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল, ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ, কুরাসাওয়ের এলয় রুম, অস্ট্রেলিয়ার প্যাট্রিক বিচ, মিসরের মোস্তফা শোবেইর এবং নরওয়ের ওরইয়ান নাইল্যান্ড–সাত দেশের এই সাত গোলরক্ষক নিজেদের পারফরম্যান্সে প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শুধু গোলদাতাদের কাঁধে ভর করে এগোয় না; গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া নির্ভরযোগ্য হাতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিয়েই বিশেষ আয়োজন ‘সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ’।
ভোজিনহা: কেপ ভার্দের রূপকথার নায়ক
বিশ্বকাপে ভোজিনহার পরিসংখ্যানই বলে দেয় তিনি কতটা দুর্দান্ত ছিলেন। ৫ ম্যাচে ১৮টি সেভ, হজম করেছেন ৫টি গোল, রেখেছেন ২টি ক্লিনশিট। টাইব্রেকার কিংবা নির্ধারিত সময়ে কোনো পেনাল্টি সেভ না থাকলেও তার অসাধারণ শট-স্টপিং কেপ ভার্দেকে প্রতিটি ম্যাচেই লড়াইয়ে রেখেছে।
তার সেরা পারফরম্যান্স আসে গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক উপহার দেন ভোজিনহা। পেদ্রি, ফেরান তোরেস ও মিকেল ওইয়ারসাবালের মতো তারকাদের নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করে ম্যাচসেরার মতোই পারফরম্যান্স করেন তিনি। সেই ম্যাচেই গোটা ফুটবল বিশ্ব প্রথমবার উপলব্ধি করে, কেপ ভার্দের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন অসাধারণ এক অভিভাবক।
নকআউট পর্বেও ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষকের দৃঢ়তা কমেনি। ক্লাবহীন এই ফুটবলার শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লিওনেল মেসিদের একের পর এক আক্রমণ সামলে ম্যাচটিকে দীর্ঘ সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে রাখেন। শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দে হারলেও ভোজিনহার একাধিক অবিশ্বাস্য সেভ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমনকি অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের পারফরম্যান্স ছিল সেটি।
অরল্যান্ডো গিল: পরাজয়েও মাথা উঁচু
কয়েক বছর আগেও সংসার চালাতে নিজের প্রিয় জার্সি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে একে একে বিক্রি করেছিলেন নিজের মূল্যবান স্মৃতিগুলো। সেই অরল্যান্ডো গিলই আজ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত গোলরক্ষকদের একজন। ২০২৬ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষকের।
১.৯৮ মিটার উচ্চতার গিল বর্তমানে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান লোরেঞ্জো দে আলমাগ্রোর হয়ে খেলেন। বিশ্বকাপে গিল ছিলেন প্যারাগুয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। চার ম্যাচে তিনি ১৫টি সেভ করেছেন, ৬টি গোল হজম করেছেন এবং ১টি পেনাল্টি সেভ করে আলোচনায় আসেন। দুটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে গোলশূন্যও রাখেন। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণেই প্যারাগুয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় এবং জার্মানির মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়।
বিশ্বকাপে তার সেরা ম্যাচ নিঃসন্দেহে জার্মানির বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে জার্মান ফরোয়ার্ডদের হতাশ করেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া একটি হেড অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। সেই সেভটিই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকসুলভ মুহূর্ত হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে।
শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের বিপক্ষেও গিল নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পেদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দীর্ঘ সময় ম্যাচে প্যারাগুয়েকে টিকিয়ে রাখেন। শেষ পর্যন্ত একটি পেনাল্টির গোলে ১-০ ব্যবধানে হারলেও গিলের কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন সেভ ফরাসি আক্রমণভাগকে বারবার হতাশ করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গোলরক্ষকের অসাধারণ নৈপুণ্য না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইউরোপের ক্লাবগুলোরও নজর কেড়েছে। ইতালির ক্লাব তুরিনো তাকে দলে ভেড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যিনি কেবল দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলেই পরিচিত ছিলেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ইউরোপের ট্রান্সফার বাজারের আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন।
আলিরেজা বেইরানভান্দ: মরুভূমির রাখাল, বিশ্বকাপের মহাপ্রাচীর
৩৩ বছর বয়সী বেইরানভান্দ বর্তমানে ইরানের শীর্ষ ক্লাব ট্রাক্টরের হয়ে খেলছেন। বিশ্ব ফুটবলে তার পরিচিতি অবশ্য অনেক আগেই। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অভিজ্ঞতা আরও পরিণত রূপে ফুটে উঠেছে।
চলতি বিশ্বকাপে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দেখা দেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি ৪৬টি সেভ করে গোলরক্ষকদের তালিকায় শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছেন। অসংখ্য নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দিয়ে তিনি ইরানকে একাধিক ম্যাচে লড়াইয়ে রাখেন। তবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাকে।
বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স আসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করেও বেলজিয়াম গোলের দেখা পায়নি। কেভিন ডি ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকুদের একের পর এক প্রচেষ্টা অবিশ্বাস্য দক্ষতায় প্রতিহত করেন বেইরানভান্দ। সেই ম্যাচে তিনি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ইরানকে মূল্যবান গোলশূন্য ড্র এনে দেন। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকসুলভ পারফরম্যান্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শুধু বেলজিয়াম নয়, পুরো টুর্নামেন্টে তার অবস্থানজ্ঞান, বল ধরার দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইরানের রক্ষণভাগকে দিয়েছে আলাদা আত্মবিশ্বাস। প্রতিপক্ষের ক্রস কিংবা দূরপাল্লার শট–সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বিপজ্জনক আক্রমণ নষ্ট করার দক্ষতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
বেইরানভান্দের জীবনও যেন রূপকথার মতো। ছোটবেলায় যাযাবর পরিবারের সন্তান হিসেবে ভেড়া চরিয়েছেন, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে ঘর ছেড়ে রাজধানী তেহরানে এসে কখনও কার ওয়াশে, কখনও পিৎজার দোকানে, কখনও রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করেছেন। সেই সংগ্রামী কিশোরই আজ ইরানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক।
এলয় রুম: ক্যারিবীয় ফুটবলের নতুন গর্ব
বিশ্বকাপের মঞ্চে বড় দলগুলোর তারকাদের ঝলকানিই সাধারণত সবচেয়ে বেশি আলো কাড়ে। কিন্তু প্রতিটি আসরেই এমন কিছু ফুটবলার উঠে আসেন, যাদের পারফরম্যান্স দলীয় সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব ফুটবলের শ্রদ্ধা আদায় করে নেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলয় রুম ছিলেন তেমনই একজন। ছোট্ট ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির জার্সিতে তিনি যে দৃঢ়তা, সাহস এবং অসাধারণ গোলরক্ষকসুলভ দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা তাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত গোলরক্ষকে পরিণত করেছে।
৩৬ বছর বয়সী এলয় রুম দীর্ঘদিন ধরেই কুরাসাও জাতীয় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব মায়ামি এফসির হয়ে খেলেন। এর আগে তিনি নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্লাবেও খেলেছেন। অভিজ্ঞতা, শান্ত স্বভাব এবং দুর্দান্ত রিফ্লেক্সই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
বিশ্বকাপে কুরাসাও তুলনামূলক কম শক্তিশালী দল হলেও এলয় রুমের নৈপুণ্যের কারণে প্রতিপক্ষকে সহজে গোলের দেখা পেতে হয়নি। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে নিজের দলকে একাধিক ম্যাচে লড়াইয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে কাছ থেকে নেওয়া শট ঠেকানো এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
তার সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স আসে দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইকুয়েডরের বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে একের পর এক অসাধারণ সেভ করেন তিনি। প্রথমার্ধেই কয়েকটি নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে ম্যাচে কুরাসাওকে টিকিয়ে রাখেন। দ্বিতীয়ার্ধেও তার দৃঢ়তা ভাঙতে প্রতিপক্ষকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফল নিজেদের পক্ষে না এলেও এলয় রুমই ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপের যাত্রা হয়তো কুরাসাওয়ের জন্য দীর্ঘ হয়নি, কিন্তু এলয় রুম দেখিয়ে দিয়েছেন, ছোট দেশের একজন গোলরক্ষকও বিশ্বমঞ্চে সমান উজ্জ্বল হতে পারেন।
প্যাট্রিক বিচ: অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রহরী
২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার যদি একজন ফুটবলারের নাম বলতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সেই নাম প্যাট্রিক বিচ। মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি এমন পরিণত গোলরক্ষকের পরিচয় দিয়েছেন, যা ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি কাড়তে বাধ্য করেছে। অভিজ্ঞ গোলরক্ষকদের ভিড়ে তরুণ এই অস্ট্রেলিয়ান প্রমাণ করেছেন, বয়স নয়–সাহস, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিভাই বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দেয়।
মেলবোর্নে জন্ম নেওয়া প্যাট্রিক বিচ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন সিটি এফসির হয়ে খেলেন। ক্লাব পর্যায়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে তিনি জাতীয় দলে সুযোগ পান। বিশ্বকাপের মতো বিশাল আসরে প্রথমবার খেলেই নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন তিনি।
টুর্নামেন্টজুড়ে বিচের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অসাধারণ রিফ্লেক্স। কাছ থেকে নেওয়া শট ঠেকানো, দ্রুত নিচু হয়ে বল ধরার ক্ষমতা এবং কর্নার থেকে উড়ে আসা বল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংগ্রহ করার দক্ষতা অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগকে দিয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। প্রতিপক্ষের চাপের মুহূর্তেও তাকে খুব কমই বিচলিত হতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপে তার অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স আসে শক্তিশালী প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে রাখেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে পরপর কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন সেভ দর্শকদের মুগ্ধ করে। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের কোচও তার প্রশংসা করতে বাধ্য হন।
নকআউট পর্বেও বিচ নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইউরোপের কয়েকটি ক্লাব ইতোমধ্যেই তার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, খুব শিগগিরই তিনি ইউরোপের শীর্ষ কোনো লিগে খেলবেন। বয়স তার পক্ষে, আর উন্নতির সুযোগও অনেক।
অস্ট্রেলিয়া হয়তো এবার বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। কিন্তু দলটি ভবিষ্যতের জন্য যে সবচেয়ে বড় সম্পদ খুঁজে পেয়েছে, তার নাম প্যাট্রিক বিচ। গোলপোস্টের নিচে তার আত্মবিশ্বাস, পরিণত মানসিকতা এবং অসাধারণ প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রমাণ করেছে, আগামী এক দশক অস্ট্রেলিয়ার গোলবার নিরাপদ হাতেই থাকবে।
মোস্তাফা শোবেইর: মিসরের প্রাচীর
আফ্রিকার ফুটবল ঐতিহ্যে গোলরক্ষকদের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় এসাম এল-হাদারি, পরে মোহাম্মদ এল শেনাওয়ি–এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন এক নাম উঠে এসেছে, মোস্তফা শোবেইর। টুর্নামেন্টজুড়ে তার দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং অসাধারণ শট-স্টপিং মিসরকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবলই উপহার দেয়নি, বরং বিশ্ব ফুটবলেও নতুন এক গোলরক্ষকের আগমনী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
২৫ বছর বয়সী শোবেইর বর্তমানে মিসরের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আল আহলির গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন। কিংবদন্তি গোলরক্ষক ও টেলিভিশন বিশ্লেষক আহমেদ শোবেইরের ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তবে বিশ্বকাপে তিনি প্রমাণ করেছেন, পরিচয়ের চেয়ে নিজের পারফরম্যান্সই একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তার সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স আসে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ এবং আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ম্যাচজুড়ে মিসরের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করলেও শোবেইর একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে দীর্ঘ সময় লড়াইয়ে রাখেন। বিশেষ করে প্রথমার্ধে মেসির কাছ থেকে নেওয়া নিচু শট এবং দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া একটি হেড ফিরিয়ে দেওয়া ছিল ম্যাচের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। যদিও শেষ পর্যন্ত মিসর জয় পায়নি, তবু ম্যাচসেরার আলোচনায় উঠে আসে শোবেইরের নাম। আর মেসির পেনাল্টি শট রুখে দেওয়া তো রয়েছেই।
গ্রুপ পর্বেও তিনি ধারাবাহিক ছিলেন। প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে সহজে গোলের সুযোগ নিতে দেননি। তার রিফ্লেক্স, পজিশনিং এবং বলের গতিপথ বোঝার ক্ষমতা মিসরের রক্ষণকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। অনেক সময় ডিফেন্ডারদের ভুলও নিজের দক্ষতায় সামলে দেন তিনি। মিসর হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, কিন্তু দলটি নতুন এক নির্ভরতার প্রতীক খুঁজে পেয়েছে। মোস্তফা শোবেইর দেখিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে নাম নয়, প্রয়োজন সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম।
ওরইয়ান নাইল্যান্ড: গোলমুখে নরওয়ের ভরসা
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের সাফল্যের কথা উঠলে সবার আগে উচ্চারিত হয় আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নাম। কিন্তু টুর্নামেন্টজুড়ে নরওয়ের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড। ৩৫ বছর বয়সী নাইল্যান্ড বর্তমানে স্পেনের শীর্ষ লিগের ক্লাব সেভিয়ার হয়ে খেলছেন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আরও পরিণত করেছে। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলনই দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে।
নরওয়ের আক্রমণভাগ যেমন প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে, তেমনি রক্ষণভাগে শেষ ভরসা ছিলেন নাইল্যান্ড। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। প্রতিপক্ষের দ্রুতগতির আক্রমণ, দূরপাল্লার শট কিংবা কর্নার থেকে ভেসে আসা বল–সব ক্ষেত্রেই ছিল তার আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বল ক্লিয়ার করার দক্ষতাও নরওয়ের রক্ষণকে আরও সুসংগঠিত করেছে।
বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স আসে ব্রাজিলের বিপক্ষে। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি ম্যাচজুড়ে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালালেও নাইল্যান্ড একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে নরওয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া দুটি শট প্রতিহত করে তিনি দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন কুড়ান। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও তার প্রশংসা করতে বাধ্য হন।
বিশ্বকাপে নরওয়ের অগ্রযাত্রায় হালান্ডদের গোল যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিল নাইল্যান্ডের সেভগুলো। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো নরওয়ের জন্য ঐতিহাসিক ট্রফি এনে দিতে পারুক বা না পারুক, ওরইয়ান নাইল্যান্ড নিজের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে এই আসরের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ইতোমধ্যে।