আধুনিক ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনি। তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালনকালে হয়ে ওঠেন প্রজাতন্ত্রের নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে দেশটির পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনা ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। দাফনের আগে লাখো মানুষ খামেনির ছবি এবং বিপ্লবের স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শোকমিছিলে অংশ নেন। এই দাফন অনুষ্ঠানেও জনসমক্ষে দেখা যায়নি খামেনির ছেলে ও তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিকে।
সপ্তাহব্যাপী শোকানুষ্ঠানের শেষ দিনে খামেনির মরদেহ ট্রাকে করে ধীরে ধীরে মাশহাদের জনাকীর্ণ সড়ক পেরিয়ে মাজারে নেওয়া হয়। সাদা পাগড়ি পরা আলেমদের উপস্থিতিতে কালো পোশাক পরা শোকাহত জনতা ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি এবং বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত লাল প্ল্যাকার্ড হাতে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় গুরুতর আহত মোজতবা খামেনি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জনসমক্ষে আসেননি। লিখিত বিবৃতি দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা কণ্ঠবার্তা প্রকাশ করা হয়নি। তেহরানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, মোজতবা চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে জনসমক্ষে আনা হচ্ছে না, যাতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার ঝুঁকি এড়ানো যায়।
মাশহাদে খামেনির শেষযাত্রার অপেক্ষায় থাকা জনতার একটি অংশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দেয়। তারা স্লোগান দেন, ‘সর্বোচ্চ নেতার রক্তের শপথ– ট্রাম্প, আমরা তোমাকে হত্যা করব।’ অনেক নারীর হাতে ছিল ‘কিল ট্রাম্প’ লেখা প্ল্যাকার্ড। পাশাপাশি ‘আমেরিকার মৃত্যু’সহ ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পুরোনো স্লোগানও উচ্চারিত হয়।
দাফনের আগে খামেনির মরদেহ এবং তার সঙ্গে নিহত পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ তেহরান, শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোম এবং ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হয়। প্রতিটি স্থানেই বিপুল জনসমাগম হয় এবং শোকগাথার সঙ্গে বিপ্লবী স্লোগান ধ্বনিত হয়।
শিয়া ধর্মতত্ত্বে শাহাদতের বিশেষ গুরুত্ব থাকায় বিদেশি শত্রুর হাতে খামেনির মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তুলে ধরছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিশাল জনসমাগমকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জনপ্রিয়তা ও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এর বিপরীতে দেশটিতে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক সংকট ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার বিক্ষোভ হয়েছে। খামেনির ৩৭ বছরের শাসনামল নিয়ে দেশটির ভেতরেও তীব্র মতভেদ রয়েছে।
১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর খামেনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা নিজের কার্যালয়ের অধীনে কেন্দ্রীভূত করেন। এ প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের প্রভাব কমে যায় এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ক্রমেই দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়।
খামেনির মৃত্যুর পর আইআরজিসির সমর্থনেই মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে বাহিনীটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
রয়টার্স/এসএন