ঢাকা ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ জনসংখ্যায় মহাশক্তি, ফুটবলে কেন নয়? গুরুর কফিনে শিষ্যের পেরেক ১০ জুলাই  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি বিশ্বকাপে লাল-হলুদের ঝড় বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতা উত্থানের বিশ্বকাপে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন ক্লিন্সমান সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ কারা? এমবাপ্পে-দেম্বেলের গোলে মরক্কোকে বিদায় করে সেমিফাইনালে ফ্রান্স ৬ মিনিটে দুই গোল, মরক্কোর বিপক্ষে এগিয়ে ফ্রান্স দুর্দান্ত বুনু, এমবাপ্পের পেনাল্টি মিসে প্রথমার্ধ গোলশূন্য এমবাপ্পের পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে দিলেন বুনু ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জিতলে ব্যাংক হলিডের ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর ফ্রান্স ও মরক্কোর শুরুর একাদশে আছেন যারা হলুদের ফাঁদে ১৮ তারকা ফ্রান্স-মরক্কো লড়াই অনলাইনে দেখবেন যেভাবে কেন গুগলে নিজের নাম সার্চ দিতে বললেন আর্লিং হালান্ড? দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ ইংলিশ ডিফেন্ডার মাশহাদে সমাহিত হলেন খামেনি ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচে কার জয়ের সম্ভাবনা কত, জানাল সুপারকম্পিউটার ডেঙ্গুতে আরও ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯০ হামে মৃত্যু ৭৪৭, এক দিনেই শনাক্ত ৯৪৬ মুক্তাগাছায় প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে হুইলচেয়ারসহ সহায়ক উপকরণ বিতরণ হঠাৎ দিক হারিয়ে সিরিজ হারল বাংলাদেশ মুনিরের সঙ্গে আরাঘচির ফোনালাপ, মার্কিন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা সাঙ্গু নদীতে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে যুবদল কর্মী নিখোঁজ সিলেটের নতুন ডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন রাষ্ট্রীয় শোকযাত্রা শেষে মাশহাদে খামেনির মরদেহ সিএফমোটো ও ব্রেম্বোর নতুন অধ্যায় শুরু রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের মধ্যেই বন্যার আশঙ্কা

জনসংখ্যায় মহাশক্তি, ফুটবলে কেন নয়?

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম
জনসংখ্যায় মহাশক্তি, ফুটবলে কেন নয়?
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে নেইমারের ব্রাজিল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। দুই মহাতারকার বিদায়ের আবেগে ভেসে যায় বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তরা। লুকা মদ্রিচের বিদায়ও ছুঁয়ে কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়। এমনকি যখন আর্জেন্টিনা একই শঙ্কায় পড়েছিল মিসর ম্যাচে, তখন লাল-সবুজ দেশে বিশ্বকাপের আনন্দ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। শঙ্কার মেঘ দূর করেছেন লিওনেল মেসি। ভক্তদের কান্না মুছে হাসি ফেরান আর্জেন্টাইন খুদেরাজ। তবে নেইমার, রোনালদো, মদ্রিচকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে যে কান্নার রোল উঠেছিল তা এখনও তাজা স্মৃতি।

শুধু বাংলাদেশ নয়; ভারত, ইন্দোনেশিয়া কিংবা আরও অনেক দেশেই এমন দৃশ্য এখন দৃশ্যমান। নিজেদের দেশের বদলে অন্য একটি দেশের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ। কারণ, তাদের নিজেদের জাতীয় দল বারবার বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

পরিসংখ্যানটি আরও বিস্ময়কর। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে মাত্র দুটি দেশ এবার বিশ্বকাপে খেলছে–যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল। রাশিয়া ও নাইজেরিয়া অতীতে একাধিকবার বিশ্বকাপে খেললেও এবার নেই। চীন ও ইন্দোনেশিয়ার বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা মাত্র একবারের। আর ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়া এখনও বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। যদিও ভারত ১৯৫০ বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছিল, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর এক মাসেরও কম সময় আগে সরে দাঁড়ায়।

জনসংখ্যা কি সত্যিই সাফল্যের চাবিকাঠি?
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, জনসংখ্যা যত বেশি, প্রতিভার ভাণ্ডারও তত বড়। সে হিসাবে ফুটবলেও সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকার কথা। বিশ্বকাপ ইতিহাসও যেন সেই ধারণাকে কিছুটা সমর্থন করে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপজয়ী আট দেশের মধ্যে সাতটি–আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন তুলনামূলকভাবে বড় জনসংখ্যার দেশ। একমাত্র ব্যতিক্রম উরুগুয়ে। কিন্তু ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ স্টেফান শিমানস্কি বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

শিমানস্কির মতে, মানুষের পাশাপাশি দরকার অর্থ, অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রতিভা খুঁজে বের করার সক্ষমতা। তার গবেষণা বলছে, সফল ফুটবল দেশগুলোর আরেকটি বড় মিল হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। সাধারণভাবে বড় শিরোপা জিততে মাথাপিছু বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৫ হাজার মার্কিন ডলার হওয়া দরকার। তবে এখানেও রয়েছে ব্যতিক্রম। এই সীমার অনেক নিচে থেকেও ব্রাজিল পাঁচবার ও আর্জেন্টিনা তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছে।

শিমানস্কির ব্যাখ্যা, এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার। তার ভাষায়, যেসব দেশ শত বছর আগে থেকেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তারাই আজও বিশ্বকাপ জয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

জনসংখ্যায় বড় ১০ দেশের মাত্র দুটি ২০২৬ বিশ্বকাপে
দেশ        জনসংখ্যা (মিলিয়ন)    ফিফা র‌্যাংকিং    
ভারত        ১,৪৬৩.৯        ১৩৮
চীন        ১,৪১৬.১        ৯১
* যুক্তরাষ্ট্র    ৩৭৪.৩            ১৫
ইন্দোনেশিয়া    ২৮৫.৭            ১১৮
পাকিস্তান    ২৫৫.২            ১৯৮
নাইজেরিয়া    ২১২.৮            ২৫
* ব্রাজিল    ২১২.৮            ৫
বাংলাদেশ    ১৭৫.৭            ১৮১
রাশিয়া        ১৪৪            ৩৪
ইথিওপিয়া    ১৩৫.৫            ১৪৩
তথ্য সূত্র: বিসিবি

ইতিহাসও একটি বড় শক্তি
ফুটবলে সফল দেশগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়–তারা শুধু প্রতিভাবান নয়, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চপর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলেছে। সেই কারণেই মাত্র ৩৫ লাখ মানুষের দেশ উরুগুয়ে দুটি বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে। তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় ১৯০২ সালে, যা ব্রাজিলের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচেরও ১২ বছর আগে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে ফুটবলের বিকাশ হয়েছে অনেক পরে। ফলে তাদের এখনো সেই ব্যবধান কমানোর লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে। ১৯৫৬ সালে স্বাধীন হওয়া মরক্কো ২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলেছে। আর ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া প্রথম এশীয় দল হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে পৌঁছেছিল। তবু শিমানস্কির আক্ষেপ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত কিংবা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এখনো সেই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তার মতে, বিনিয়োগের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ফুটবল-জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি।

ক্রিকেট কি সত্যিই দোষী?
দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে একটি যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়, ক্রিকেটের জনপ্রিয়তাই ফুটবলের বড় বাধা। ভারত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্রিকেট দেশ। আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট লিগ। সাবেক ভারতীয় ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, আইপিএলের সাফল্যের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের ফুটবলের বদলে ক্রিকেটে পাঠাচ্ছেন। অথচ ফুটবলেও সফল ক্যারিয়ার গড়ে ভালো আয় করা সম্ভব। শ্যাম থাপার এই যুক্তি খাটে না অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের দিকে তাকালে। সবার জানা, ক্রিকেটে পরাশক্তি দুই দেশ। পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল বিশ্বকাপেও খেলছে। 

চীন কেন পারছে না?
চীনের গল্প আরও রহস্যময়। অলিম্পিকে তারা অন্যতম সফল দেশ। অথচ ফুটবলে সাফল্য নেই। চীনা ফুটবল বিশ্লেষক মার্ক ড্রেয়ারের মতে, প্রতিভার অভাব নয়, সমস্যার মূল জায়গা হলো অতিরিক্ত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। ২০১০-এর দশক থেকে বিপুল বিনিয়োগ, বিদেশি তারকা ফুটবলার আনা, সবকিছু করেও ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি চীন।

ইন্দোনেশিয়ার গল্প কিছুটা ভিন্ন। ১৯৩৮ সালের পর এবার তারা বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছায়। তবে সেই অগ্রগতির বড় কারণ ছিল ইউরোপে জন্ম নেওয়া ইন্দোনেশীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে অন্তর্ভুক্ত করা। একসময় তাদের শুরুর একাদশে আট বা নয়জনই ছিলেন ইউরোপে জন্ম নেওয়া ফুটবলার।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অবস্থা আরও হতাশাজনক। দুই দলই এশিয়ান বাছাইপর্বের গ্রুপ থেকেই বিদায় নিয়েছে। পাকিস্তান আবার ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনবার ফিফার নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়েছে।

তবু বিশ্বকাপ মানেই উৎসব
বিশ্বকাপে নিজেদের দেশের খেলা হয়তো এখনো দূরের স্বপ্ন। কিন্তু তাই বলে উৎসব থেমে থাকে না। ঢাকার অলিগলি, কলকাতার রাস্তা কিংবা জাকার্তার মোড়ে লাখো মানুষ এখনো মেসি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা অন্য প্রিয় দলের হয়ে উল্লাস করে। পাগলাটে এই ভক্তদের অনেকেই হয়তো তাদের জীবদ্দশায় নিজ দেশকে বিশ্বকাপে দেখতে পারবে না। তবু একটি বিষয় নিশ্চিত, ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বকাপের প্রতিটি গোল, প্রতিটি ম্যাচ আর প্রতিটি আনন্দের মুহূর্ত নিজেদের উৎসব হিসেবেই বাঁচিয়ে রাখবেন।

সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ কারা?

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪২ এএম
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ কারা?
ছবি: সংগৃহীত

মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলের গোলে জয় নিশ্চিত করে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

ম্যাচের প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোলের সুযোগ পেয়েও ব্যর্থ হন ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। তার নেওয়া পেনাল্টি শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু।

তবে দ্বিতীয়ার্ধে সেই হতাশা কাটিয়ে ওঠেন এমবাপ্পে। ম্যাচের ৬০ মিনিটে বক্সের প্রান্ত থেকে দুর্দান্ত শটে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি। এরপর ৬৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিচের কোণ লক্ষ্য করে নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। এই জয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স।

সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হবে স্পেন ও বেলজিয়ামের মধ্যকার দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালের বিজয়ী দল। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে শুক্রবার (১০ জুলাই) অনুষ্ঠিত হবে সেই ম্যাচ।

আগামী ১৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ডালাস স্টেডিয়ামে সেমিফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।

এসজি/

উত্থানের বিশ্বকাপে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন ক্লিন্সমান

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৫:০০ এএম
উত্থানের বিশ্বকাপে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখছেন ক্লিন্সমান
ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমান। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানের অভিজ্ঞতার পরিধি খুব কম মানুষেরই আছে। খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জয়, কোচ হিসেবে দলকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেওয়া, আর এখন টুর্নামেন্টের কারিগরি বিশ্লেষক–বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের সঙ্গে তার সম্পর্ক কয়েক দশকের।

জার্মানির এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নেন। ১৯৯০ সালে ইতালিতে পশ্চিম জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি করেন ১১টি গোল। পরে কোচ হিসেবে ২০০৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক জার্মানিকে সেমিফাইনালে এবং ২০১৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ ষোলোতে তুলেছিলেন।

বর্তমানে ক্লিন্সমান ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের (টিএসজি) সদস্য। এই দলের কাজ হলো বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের গভীর কারিগরি বিশ্লেষণ করা এবং সেই বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফুটবল সম্পর্কে বোঝাপড়াকে আরও সমৃদ্ধ করা। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে এই দায়িত্ব পালন করা ক্লিন্সমান এবার ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। টুর্নামেন্টের চমক, নতুন দলগুলোর সাফল্য, মিসর ও নরওয়ের উত্থান, অভিজ্ঞ তারকাদের দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ–বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপ সম্পর্কে আপনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কী?
৪৮টি দল অংশ নেওয়ায় আমরা এই টুর্নামেন্টে অনেক দারুণ চমক দেখেছি। এর ফলে বিশ্বকাপে সাধারণত যতটা দেখা যায়, তার চেয়ে কয়েকটি বেশি আন্ডারডগ দল সুযোগ পেয়েছে এবং তারা ভালোও করেছে। কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে কঠিন চাপে ফেলেছিল। এমন কিছু দলকে আমরা দেখেছি, যারা বড় দলগুলোকে ভুগিয়েছে। দর্শক উপস্থিতির দিক থেকে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টটি অসাধারণ হয়েছে। সব স্টেডিয়ামই দর্শকে পরিপূর্ণ, পরিবেশ দুর্দান্ত, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি শহরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও সমর্থকরা উদযাপন করছেন।

এত বড় একটি টুর্নামেন্টে স্বাগতিক দেশগুলো অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারা অনেক সাহায্য করে। তারা সবাই নকআউট পর্বে উঠেছে, এটি বিশাল একটি বিষয়। মাঠে এবং মাঠের বাইরে–দুই দিক থেকেই এটি দারুণ সফল হয়েছে।

চারটি অভিষিক্ত দলের মধ্যে কেপ ভার্দে এত ভালো করল কেন? সামগ্রিকভাবে এটি ফুটবল সম্পর্কে কী বার্তা দেয়?
এটি দেখায় যে বাছাইপর্বগুলো অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং তারা একটি কারণেই এখানে এসেছে–তারা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের প্রাপ্য। আপনি যদি আফ্রিকার মতো একটি অঞ্চল থেকে উঠে আসেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই একটি ভালো দল হতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা টুর্নামেন্টে অনেক আনন্দ এবং অসংখ্য চমকপ্রদ মুহূর্ত এনে দিয়েছে। তারা দারুণ ফুটবল খেলেছে এবং এটিও বিশ্বকাপের গল্পেরই একটি অংশ। শেষ পর্যন্ত, যখন আপনি কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাবেন, তখন সাধারণত প্রত্যাশিত দলগুলোকেই সেখানে দেখতে পাবেন। হয়তো এমন একটি চমকপ্রদ দল থাকবে, যাদের আপনি আগে ভাবেননি। তবে বিশ্বকাপে এমন গল্প তৈরি হওয়া দারুণ ব্যাপার এবং এটি টুর্নামেন্টে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে।

মিসর আগে কখনোই বিশ্বকাপে একটি ম্যাচও জেতেনি, তাদের এত দূর যাওয়া এবং দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে নরওয়ের ভালো পারফরম্যান্সকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
তারা এমন দুটি দেশ, যারা ভবিষ্যতে পরাশক্তিতে পরিণত হবে। তাদের মধ্যে এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, আগামী ১৫-২০ বছরের মধ্যে তারা বিশ্বের সেরা ১০ দলের একটি হয়ে উঠতে পারে। মিসর সব সময়ই বিশ্বের সবার কাছ থেকে অনেক সম্মান পেয়ে এসেছে। তারা এখনও বিশ্বকাপে সেটি দেখাতে পারেনি, যেমনটি মরক্কো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে দেখিয়েছিল। তবে আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সে তারা সবসময়ই শেষ চারে থাকে এবং ইউরোপের বিভিন্ন লিগে তাদের শীর্ষমানের খেলোয়াড় রয়েছে, যা অনেক বড় বিষয়।

নরওয়েকে নিয়ে বলতে গেলে, আমরা এখন এমন একটি দেশকে দেখতে পাচ্ছি, যারা ১৯৯০-এর দশকের ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে কিছুটা মিল রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে এত উদ্যম, প্রতিভা এবং গুণগত মান রয়েছে যে, আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে তারা আজকের ক্রোয়েশিয়ার মতোই একটি বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে সক্ষম। বর্তমান নরওয়ে দলটির সঙ্গে আমি সেই ক্রোয়েশিয়া দলের মিল দেখতে পাই, কারণ এটি শুধু আর্লিং হালান্ড বা মার্টিন ওডেগার্ডকে ঘিরে নয়, এর চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তাদের দলে অনেক গভীরতা রয়েছে এবং এটি এমন একটি দেশ, যারা খুবই উদ্যমী। ফলে তাদের মানসিকতা শীর্ষ পর্যায়ের ক্রীড়াবিদ গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। অলিম্পিকভিত্তিক খেলাগুলোতেও আপনি এটি দেখতে পাবেন, যেখানে নরওয়ে সেরাদের অন্যতম।

ত্রিশের শেষ দিকে এবং চল্লিশের শুরুর দিকে থাকা এত খেলোয়াড়কে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলতে দেখে আপনার মূল্যায়ন কী?
এই ক্রীড়াবিদদের দেখে দারুণ লাগে এবং বিষয়টি সত্যিই মুগ্ধকর যে তারা বুঝতে পেরেছে, নির্দিষ্ট জীবনধারা এবং নিজের পেশার প্রতি নিবেদনের মাধ্যমে তারা তাদের ক্যারিয়ার চতুর্থ, পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করতে পারে। চল্লিশের শুরুর দিকে খেলা–২০ বা ৩০ বছর আগে কেউই এটি কল্পনা করতে পারত না। এখন শুধু ফুটবল নয়, সব ধরনের খেলাতেই আপনি এটি দেখতে পাচ্ছেন। আমার কাছে এটি অনেক তরুণ ক্রীড়াবিদ ও শিশুদের অনুপ্রাণিত করে যে, আপনি যদি নিজের যত্ন নেন, তাহলে ২০ বছরেরও বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব। তাদের নিবেদন ও মনোযোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

এই টুর্নামেন্টে আপনারা অভিজ্ঞ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের দেখছেন, যেমন–লুকা মদ্রিচ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, ম্যানুয়েল নয়্যার এবং এ ধরনের আরও অনেকে। এরপর রয়েছে লামিনে ইয়ামাল বা জুড বেলিংহামের মতো উদীয়মান তরুণরা, যারা এখনও বেশ তরুণ এবং এখন তাদের সামনে অনুসরণ করার মতো আদর্শ রয়েছে। আমি যদি ফ্লোরিয়ান উইর্টজে হতাম এবং এই মুহূর্তে মেসি ও রোনালদোকে দেখতাম, তাহলে ভাবতাম–আমি যদি নিজের যত্ন নিই এবং আশা করি বড় কোনো চোট না পাই, তাহলে আমার সামনে এখনও ১৫-১৮ বছরের ক্যারিয়ার পড়ে আছে। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য দারুণ একটি দিকনির্দেশনা।

বিশ্বকাপে লাল-হলুদের ঝড়

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ এএম
বিশ্বকাপে লাল-হলুদের ঝড়
ছবি: সংগৃহীত

২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ যতই শেষের দিকে এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মাঠের উত্তাপ। গোল, নাটকীয়তা ও অঘটনের পাশাপাশি আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে রেফারিদের দেখানো হলুদ ও লাল কার্ডের সংখ্যাও। কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগেই টুর্নামেন্টটি শৃঙ্খলাভঙ্গের দিক থেকে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর তুলনায় অনেক বেশি কঠোর চেহারা ধারণ করেছে।

বৃহস্পতিবার রাতে ফ্রান্স ও মরক্কোর মধ্যকার প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালের আগ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১৩টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছে। যা ২০১৮ ও ২০২২ এই দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে দেখানো মোট লাল কার্ডের (৮টি) চেয়েও বেশি। অর্থাৎ শেষ হওয়ার আগেই উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু লাল কার্ডই নয়, এখন পর্যন্ত হলুদ কার্ডেরও রেকর্ড হয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনাল শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রেফারিরা ৩৩৫টিরও বেশি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন। এবারের বিশ্বকাপে গোলের জোয়ারের পাশাপাশি মাঠের কঠোর ফুটবল এবং ফাউলের কারণে কার্ডের সংখ্যাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের দুই বিশ্বকাপের তুলনায় ২০২৬ আসরের একই পর্যায় পর্যন্ত কার্ডের ব্যবহার দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দেখানো হয়েছিল ১৮৩টি হলুদ কার্ড। আর ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে এই সংখ্যা ছিল ১৮৯টি।

নকআউট পর্বে ম্যাচের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, রেফারিদের সবচেয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে খেলোয়াড়দের আগ্রাসী ট্যাকল, বিপজ্জনক ফাউল ও অসদাচরণের কারণে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড দেখিয়ে আলোচনায় আসেন ম্যাচ অফিসিয়ালরা। এরপর গ্রুপ পর্ব জুড়েই ধারাবাহিকভাবে লাল কার্ডের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নকআউট পর্বেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে, যেখানে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর)-এর সহায়তায় একাধিক কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ফিফার বর্তমান শৃঙ্খলা নীতিমালা অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ড কিংবা একই ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড পেলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে পরের ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হয়। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও বাড়ানো হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে ম্যাচসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নকআউট লড়াইয়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্ডের সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল সামনে রেখে শৃঙ্খলা ধরে রাখা এখন প্রতিটি দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মোট ৪টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র ১টি ছিল সরাসরি লাল কার্ড। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও মোট ৪টি লাল কার্ড ছিল, যার মধ্যে ২টি ছিল সরাসরি। অর্থাৎ টানা দুই বিশ্বকাপেই লাল কার্ডের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এর আগে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে মোট ১০টি লাল কার্ড দেখানো হয়, যার মধ্যে ৭টি ছিল সরাসরি। ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মোট ১৭টি লাল কার্ডের মধ্যে ৯টি ছিল সরসারি। আর ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে রেকর্ড ২৮টি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল, যার মধ্যে ৯টি ছিল সরাসরি। সেই আসর এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি লাল কার্ডের জন্য পরিচিত। ২০২৬ আসরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এখন পর্যন্ত দেখানো ১৩টি লাল কার্ডের একটিও দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের মাধ্যমে আসেনি। অর্থাৎ প্রতিটি ঘটনাতেই রেফারিরা সরাসরি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ভিএআরের সহায়তা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কারণে রেফারিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে ২৩তম বিশ্বকাপ সরাসরি লাল কার্ডের সংখ্যা ও হলুদ কার্ডের জন্যও আলাদাভাবে আলোচিত হয়ে উঠেছে।

সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ এএম
সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ
কেপ ভার্দের ভোজিনহা, প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল, ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ

কেপ ভার্দের ভোজিনহা, প্যারাগুয়ের অরল্যান্ডো গিল, ইরানের আলিরেজা বেইরানভান্দ, কুরাসাওয়ের এলয় রুম, অস্ট্রেলিয়ার প্যাট্রিক বিচ, মিসরের মোস্তফা শোবেইর এবং নরওয়ের ওরইয়ান নাইল্যান্ড–সাত দেশের এই সাত গোলরক্ষক নিজেদের পারফরম্যান্সে প্রমাণ করেছেন, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন শুধু গোলদাতাদের কাঁধে ভর করে এগোয় না; গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া নির্ভরযোগ্য হাতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের নিয়েই বিশেষ আয়োজন ‘সাত প্রাচীরের বিশ্বকাপ’।

ভোজিনহা: কেপ ভার্দের রূপকথার নায়ক
বিশ্বকাপে ভোজিনহার পরিসংখ্যানই বলে দেয় তিনি কতটা দুর্দান্ত ছিলেন। ৫ ম্যাচে ১৮টি সেভ, হজম করেছেন ৫টি গোল, রেখেছেন ২টি ক্লিনশিট। টাইব্রেকার কিংবা নির্ধারিত সময়ে কোনো পেনাল্টি সেভ না থাকলেও তার অসাধারণ শট-স্টপিং কেপ ভার্দেকে প্রতিটি ম্যাচেই লড়াইয়ে রেখেছে। 

তার সেরা পারফরম্যান্স আসে গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক উপহার দেন ভোজিনহা। পেদ্রি, ফেরান তোরেস ও মিকেল ওইয়ারসাবালের মতো তারকাদের নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করে ম্যাচসেরার মতোই পারফরম্যান্স করেন তিনি। সেই ম্যাচেই গোটা ফুটবল বিশ্ব প্রথমবার উপলব্ধি করে, কেপ ভার্দের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে আছেন অসাধারণ এক অভিভাবক।

নকআউট পর্বেও ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষকের দৃঢ়তা কমেনি। ক্লাবহীন এই ফুটবলার শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লিওনেল মেসিদের একের পর এক আক্রমণ সামলে ম্যাচটিকে দীর্ঘ সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে রাখেন। শেষ পর্যন্ত কেপ ভার্দে হারলেও ভোজিনহার একাধিক অবিশ্বাস্য সেভ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমনকি অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের পারফরম্যান্স ছিল সেটি।

অরল্যান্ডো গিল: পরাজয়েও মাথা উঁচু
কয়েক বছর আগেও সংসার চালাতে নিজের প্রিয় জার্সি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার খরচ জোগাতে একে একে বিক্রি করেছিলেন নিজের মূল্যবান স্মৃতিগুলো। সেই অরল্যান্ডো গিলই আজ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত গোলরক্ষকদের একজন। ২০২৬ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই ২৬ বছর বয়সী গোলরক্ষকের।

১.৯৮ মিটার উচ্চতার গিল বর্তমানে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান লোরেঞ্জো দে আলমাগ্রোর হয়ে খেলেন। বিশ্বকাপে গিল ছিলেন প্যারাগুয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার। চার ম্যাচে তিনি ১৫টি সেভ করেছেন, ৬টি গোল হজম করেছেন এবং ১টি পেনাল্টি সেভ করে আলোচনায় আসেন। দুটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে গোলশূন্যও রাখেন। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণেই প্যারাগুয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় এবং জার্মানির মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। 

বিশ্বকাপে তার সেরা ম্যাচ নিঃসন্দেহে জার্মানির বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে জার্মান ফরোয়ার্ডদের হতাশ করেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া একটি হেড অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। সেই সেভটিই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকসুলভ মুহূর্ত হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে।

শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের বিপক্ষেও গিল নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পেদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দীর্ঘ সময় ম্যাচে প্যারাগুয়েকে টিকিয়ে রাখেন। শেষ পর্যন্ত একটি পেনাল্টির গোলে ১-০ ব্যবধানে হারলেও গিলের কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন সেভ ফরাসি আক্রমণভাগকে বারবার হতাশ করেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, গোলরক্ষকের অসাধারণ নৈপুণ্য না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। 

বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইউরোপের ক্লাবগুলোরও নজর কেড়েছে। ইতালির ক্লাব তুরিনো তাকে দলে ভেড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যিনি কেবল দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলেই পরিচিত ছিলেন, বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ইউরোপের ট্রান্সফার বাজারের আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন। 

আলিরেজা বেইরানভান্দ: মরুভূমির রাখাল, বিশ্বকাপের মহাপ্রাচীর
৩৩ বছর বয়সী বেইরানভান্দ বর্তমানে ইরানের শীর্ষ ক্লাব ট্রাক্টরের হয়ে খেলছেন। বিশ্ব ফুটবলে তার পরিচিতি অবশ্য অনেক আগেই। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিলেন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অভিজ্ঞতা আরও পরিণত রূপে ফুটে উঠেছে। 

চলতি বিশ্বকাপে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দেখা দেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি ৪৬টি সেভ করে গোলরক্ষকদের তালিকায় শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছেন। অসংখ্য নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দিয়ে তিনি ইরানকে একাধিক ম্যাচে লড়াইয়ে রাখেন। তবে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাকে।

বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স আসে বেলজিয়ামের বিপক্ষে। পুরো ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করেও বেলজিয়াম গোলের দেখা পায়নি। কেভিন ডি ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকুদের একের পর এক প্রচেষ্টা অবিশ্বাস্য দক্ষতায় প্রতিহত করেন বেইরানভান্দ। সেই ম্যাচে তিনি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ইরানকে মূল্যবান গোলশূন্য ড্র এনে দেন। অনেক বিশ্লেষক এটিকে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকসুলভ পারফরম্যান্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

শুধু বেলজিয়াম নয়, পুরো টুর্নামেন্টে তার অবস্থানজ্ঞান, বল ধরার দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ইরানের রক্ষণভাগকে দিয়েছে আলাদা আত্মবিশ্বাস। প্রতিপক্ষের ক্রস কিংবা দূরপাল্লার শট–সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বিপজ্জনক আক্রমণ নষ্ট করার দক্ষতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

বেইরানভান্দের জীবনও যেন রূপকথার মতো। ছোটবেলায় যাযাবর পরিবারের সন্তান হিসেবে ভেড়া চরিয়েছেন, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে ঘর ছেড়ে রাজধানী তেহরানে এসে কখনও কার ওয়াশে, কখনও পিৎজার দোকানে, কখনও রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করেছেন। সেই সংগ্রামী কিশোরই আজ ইরানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। 

এলয় রুম: ক্যারিবীয় ফুটবলের নতুন গর্ব
বিশ্বকাপের মঞ্চে বড় দলগুলোর তারকাদের ঝলকানিই সাধারণত সবচেয়ে বেশি আলো কাড়ে। কিন্তু প্রতিটি আসরেই এমন কিছু ফুটবলার উঠে আসেন, যাদের পারফরম্যান্স দলীয় সাফল্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব ফুটবলের শ্রদ্ধা আদায় করে নেয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলয় রুম ছিলেন তেমনই একজন। ছোট্ট ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটির জার্সিতে তিনি যে দৃঢ়তা, সাহস এবং অসাধারণ গোলরক্ষকসুলভ দক্ষতা দেখিয়েছেন, তা তাকে টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত গোলরক্ষকে পরিণত করেছে।

৩৬ বছর বয়সী এলয় রুম দীর্ঘদিন ধরেই কুরাসাও জাতীয় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব মায়ামি এফসির হয়ে খেলেন। এর আগে তিনি নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্লাবেও খেলেছেন। অভিজ্ঞতা, শান্ত স্বভাব এবং দুর্দান্ত রিফ্লেক্সই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

বিশ্বকাপে কুরাসাও তুলনামূলক কম শক্তিশালী দল হলেও এলয় রুমের নৈপুণ্যের কারণে প্রতিপক্ষকে সহজে গোলের দেখা পেতে হয়নি। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে নিজের দলকে একাধিক ম্যাচে লড়াইয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে কাছ থেকে নেওয়া শট ঠেকানো এবং ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে তার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল চোখে পড়ার মতো।

তার সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্স আসে দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইকুয়েডরের বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে একের পর এক অসাধারণ সেভ করেন তিনি। প্রথমার্ধেই কয়েকটি নিশ্চিত গোল রুখে দিয়ে ম্যাচে কুরাসাওকে টিকিয়ে রাখেন। দ্বিতীয়ার্ধেও তার দৃঢ়তা ভাঙতে প্রতিপক্ষকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফল নিজেদের পক্ষে না এলেও এলয় রুমই ছিলেন ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।

বিশ্বকাপের যাত্রা হয়তো কুরাসাওয়ের জন্য দীর্ঘ হয়নি, কিন্তু এলয় রুম দেখিয়ে দিয়েছেন, ছোট দেশের একজন গোলরক্ষকও বিশ্বমঞ্চে সমান উজ্জ্বল হতে পারেন।

প্যাট্রিক বিচ: অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রহরী
২০২৬ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় আবিষ্কার যদি একজন ফুটবলারের নাম বলতে হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সেই নাম প্যাট্রিক বিচ। মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি এমন পরিণত গোলরক্ষকের পরিচয় দিয়েছেন, যা ফুটবলবিশ্বের দৃষ্টি কাড়তে বাধ্য করেছে। অভিজ্ঞ গোলরক্ষকদের ভিড়ে তরুণ এই অস্ট্রেলিয়ান প্রমাণ করেছেন, বয়স নয়–সাহস, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিভাই বড় মঞ্চে পার্থক্য গড়ে দেয়।

মেলবোর্নে জন্ম নেওয়া প্যাট্রিক বিচ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন সিটি এফসির হয়ে খেলেন। ক্লাব পর্যায়ে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে তিনি জাতীয় দলে সুযোগ পান। বিশ্বকাপের মতো বিশাল আসরে প্রথমবার খেলেই নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছেন তিনি।

টুর্নামেন্টজুড়ে বিচের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার অসাধারণ রিফ্লেক্স। কাছ থেকে নেওয়া শট ঠেকানো, দ্রুত নিচু হয়ে বল ধরার ক্ষমতা এবং কর্নার থেকে উড়ে আসা বল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংগ্রহ করার দক্ষতা অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগকে দিয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। প্রতিপক্ষের চাপের মুহূর্তেও তাকে খুব কমই বিচলিত হতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপে তার অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স আসে শক্তিশালী প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে রাখেন তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে পরপর কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন সেভ দর্শকদের মুগ্ধ করে। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের কোচও তার প্রশংসা করতে বাধ্য হন।

নকআউট পর্বেও বিচ নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন। বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইউরোপের কয়েকটি ক্লাব ইতোমধ্যেই তার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ফুটবল বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, খুব শিগগিরই তিনি ইউরোপের শীর্ষ কোনো লিগে খেলবেন। বয়স তার পক্ষে, আর উন্নতির সুযোগও অনেক।

অস্ট্রেলিয়া হয়তো এবার বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। কিন্তু দলটি ভবিষ্যতের জন্য যে সবচেয়ে বড় সম্পদ খুঁজে পেয়েছে, তার নাম প্যাট্রিক বিচ। গোলপোস্টের নিচে তার আত্মবিশ্বাস, পরিণত মানসিকতা এবং অসাধারণ প্রতিক্রিয়াশীলতা প্রমাণ করেছে, আগামী এক দশক অস্ট্রেলিয়ার গোলবার নিরাপদ হাতেই থাকবে।

মোস্তাফা শোবেইর: মিসরের প্রাচীর
আফ্রিকার ফুটবল ঐতিহ্যে গোলরক্ষকদের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এক সময় এসাম এল-হাদারি, পরে মোহাম্মদ এল শেনাওয়ি–এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন এক নাম উঠে এসেছে, মোস্তফা শোবেইর। টুর্নামেন্টজুড়ে তার দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং অসাধারণ শট-স্টপিং মিসরকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবলই উপহার দেয়নি, বরং বিশ্ব ফুটবলেও নতুন এক গোলরক্ষকের আগমনী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

২৫ বছর বয়সী শোবেইর বর্তমানে মিসরের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আল আহলির গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন। কিংবদন্তি গোলরক্ষক ও টেলিভিশন বিশ্লেষক আহমেদ শোবেইরের ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তবে বিশ্বকাপে তিনি প্রমাণ করেছেন, পরিচয়ের চেয়ে নিজের পারফরম্যান্সই একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তার সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স আসে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ এবং আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ম্যাচজুড়ে মিসরের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করলেও শোবেইর একাধিক দুর্দান্ত সেভ করে দলকে দীর্ঘ সময় লড়াইয়ে রাখেন। বিশেষ করে প্রথমার্ধে মেসির কাছ থেকে নেওয়া নিচু শট এবং দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া একটি হেড ফিরিয়ে দেওয়া ছিল ম্যাচের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। যদিও শেষ পর্যন্ত মিসর জয় পায়নি, তবু ম্যাচসেরার আলোচনায় উঠে আসে শোবেইরের নাম। আর মেসির পেনাল্টি শট রুখে দেওয়া তো রয়েছেই।

গ্রুপ পর্বেও তিনি ধারাবাহিক ছিলেন। প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে সহজে গোলের সুযোগ নিতে দেননি। তার রিফ্লেক্স, পজিশনিং এবং বলের গতিপথ বোঝার ক্ষমতা মিসরের রক্ষণকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। অনেক সময় ডিফেন্ডারদের ভুলও নিজের দক্ষতায় সামলে দেন তিনি। মিসর হয়তো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, কিন্তু দলটি নতুন এক নির্ভরতার প্রতীক খুঁজে পেয়েছে। মোস্তফা শোবেইর দেখিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে নাম নয়, প্রয়োজন সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম।

ওরইয়ান নাইল্যান্ড: গোলমুখে নরওয়ের ভরসা
২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের সাফল্যের কথা উঠলে সবার আগে উচ্চারিত হয় আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নাম। কিন্তু টুর্নামেন্টজুড়ে নরওয়ের রক্ষণভাগের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক ওরইয়ান নাইল্যান্ড। ৩৫ বছর বয়সী নাইল্যান্ড বর্তমানে স্পেনের শীর্ষ লিগের ক্লাব সেভিয়ার হয়ে খেলছেন। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আরও পরিণত করেছে। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলনই দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে।

নরওয়ের আক্রমণভাগ যেমন প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে, তেমনি রক্ষণভাগে শেষ ভরসা ছিলেন নাইল্যান্ড। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। প্রতিপক্ষের দ্রুতগতির আক্রমণ, দূরপাল্লার শট কিংবা কর্নার থেকে ভেসে আসা বল–সব ক্ষেত্রেই ছিল তার আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। গোললাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে বল ক্লিয়ার করার দক্ষতাও নরওয়ের রক্ষণকে আরও সুসংগঠিত করেছে।

বিশ্বকাপে তার সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স আসে ব্রাজিলের বিপক্ষে। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি ম্যাচজুড়ে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালালেও নাইল্যান্ড একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করে নরওয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে কাছ থেকে নেওয়া দুটি শট প্রতিহত করে তিনি দর্শকদের দাঁড়িয়ে অভিবাদন কুড়ান। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রাও তার প্রশংসা করতে বাধ্য হন।

বিশ্বকাপে নরওয়ের অগ্রযাত্রায় হালান্ডদের গোল যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছিল নাইল্যান্ডের সেভগুলো। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো নরওয়ের জন্য ঐতিহাসিক ট্রফি এনে দিতে পারুক বা না পারুক, ওরইয়ান নাইল্যান্ড নিজের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে এই আসরের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন ইতোমধ্যে।

বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৬:০০ এএম
বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতা
ছবি: সংগৃহীত

শুধু রোনালদো নাজারিও পেরেছিলেন। আর কেউ পারেননি। বাকিদের গৌরবময় অধ্যায়ে ছায়া পড়েছিল দলের ব্যর্থতায়। বলা হচ্ছে সেসব হতভাগার কথা, যাদের আলোকিত পারফরম্যান্সও বিশ্বকাপের মঞ্চে যথেষ্ট ছিল না সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরার জন্য। ধরা যাক, জাস্ট ফন্তেইনের কথা। বিশ্বকাপের এক আসরে আজও সর্বোচ্চ গোলদাতা ফরাসি কিংবদন্তি। কিন্তু তার ১৩ গোলের পরও সুইডেনে ১৯৫৮ বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ফ্রান্স।

এক আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকাটাই যেন হতভাগাদের মিলনমেলা। যেমন–২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট (৮ গোল) জিতেও ফ্রান্সকে শিরোপা পাইয়ে দিতে পারেননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই তালিকায় (সেরা ১০ জনের মধ্যে) সৌভাগ্যবান কেবল রোনালদো নাজারিও। কোরিয়া ও জাপানের যৌথ আয়োজনে ২০০২ বিশ্বকাপে তার ৮ গোলে ভর করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ব্রাজিল। এবার তিন দেশের যৌথ আয়োজনে চলমান বিশ্বকাপে রোনালদো নাজারিওর এই সংখ্যা ইতোমধ্যে ছুঁয়েছেন লিওনেল মেসি। এক গোল কম নিয়ে তার পেছনে এমবাপ্পে এবং আর্লিং হালান্ড।

এবারও কি সর্বোচ্চ গোলদাতা হতভাগাদের খাতায় নাম লেখাবেন? নাকি সৌভাগ্যবান হবেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদোর মতো? প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে আগামী ১৯ জুলাই, নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালের পর।

১। জাস্ট ফন্তেইন- ১৩ গোল
সুইডেন ১৯৫৮
তখন বয়স ছিল ২৪ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৬, গোল: ১৩
মিনিট: ৫৪০
গড় গোল ২.১৭
প্রতি ৪২ মিনিটে এক গোল
তার দল ফ্রান্স তৃতীয় হয়েছিল

২। সান্দোর কোচসিচ- ১১ গোল
সুইজারল্যান্ড ১৯৫৪
তখন বয়স ছিল ২৪ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৫, গোল: ১১
মিনিট: ৪৮০
গড় গোল ২.২০
প্রতি ৪৪ মিনিটে এক গোল
তার দল হাঙ্গেরি রানার্সআপ হয়েছিল

৩। গার্ড মুলার- ১০ গোল
মেক্সিকো ১৯৭০
তখন বয়স ছিল ২৪ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৬, গোল: ১০
মিনিট: ৬০০
গড় গোল ১.৬৭
প্রতি ৬০ মিনিটে এক গোল
তার দল ওয়েস্ট জার্মানি তৃতীয় হয়েছিল

৪। আডেমির ডি মেনেজেস- ৯ গোল
ব্রাজিল ১৯৫০
তখন বয়স ছিল ২৭ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৬, গোল: ৯
মিনিট: ৫৪০
গড় গোল ১.৫০ মিনিট
প্রতি ৬০ মিনিটে এক গোল
তার দল ব্রাজিল রানার্সআপ হয়েছিল

৫। ইউসেবিও- ৯ গোল
ইংল্যান্ড ১৯৬৬
তখন বয়স ছিল ২৪ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৬, গোল: ৯
মিনিট: ৫৪০
গড় গোল ১.৫০
প্রতি ৬০ মিনিটে এক গোল
তার দল পর্তুগাল রানার্সআপ হয়েছিল

৬। গুইলের্মো স্টাবিলে- ৮ গোল
উরুগুয়ে ১৯৩০
তখন বয়স ছিল ২৫ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৪, গোল: ৮
মিনিট: ৩৬০
গড় গোল ২.০০
প্রতি ৪৫ মিনিটে এক গোল
তার দল আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হয়েছিল

৭। লিওনেল মেসি- ৮ গোল
২০২৬ (চলমান)
এখন তার বয়স ৩৯ বছর
তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৫, গোল: ৮
মিনিট: ৪১০
গড় গোল ১.৬০
প্রতি ৫১ মিনিটে এক গোল

৮। কিলিয়ান এমবাপ্পে- ৮ গোল
কাতার ২০২২
তখন বয়স ছিল ২৩ বছর
তার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৭, গোল: ৮
মিনিট: ৫৯৭
গড় গোল ১.১৪
প্রতি ৭৫ মিনিটে ১ গোল
তার দল ফ্রান্স রানার্সআপ হয়েছিল

৯। রোনালদো নাজারিও- ৮ গোল
কোরিয়া/জাপান ২০০২
তখন বয়স ছিল ২৫ বছর
তার তৃতীয় বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৭, গোল: ৮
মিনিট: ৫৫২
গড় গোল ১.১৪
প্রতি ৬৯ মিনিটে এক গোল
তার দল ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল

১০। আর্লিং হালান্ড- ৭ গোল
২০২৬ (চলমান)
এখন তার বয়স ২৫ বছর
তার প্রথম বিশ্বকাপ
ম্যাচ: ৪, গোল: ৭
মিনিট: ৩৬০
গড় গোল ১.৭৫
প্রতি ৫১ মিনিটে এক গোল