তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের পর গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বিনিয়োগ, শিল্পকারখানা নির্মাণ, ২০২০ সালের নির্বাচন, অভিবাসন, তেলের দামসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বিভ্রান্তিকর ও অসত্য দাবি করেন। ট্রাম্পের সেই দাবির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রে কাল্পনিক বিনিয়োগের দাবি
ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন, বর্তমান মেয়াদের মাত্র এক বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। খোদ হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই মেয়াদে ১০ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের ঘোষণা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা ১৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়নের চেয়ে অনেক কম। এমনকি হোয়াইট হাউসের এই দাবিটিও অতিরঞ্জিত।
গত অক্টোবরে সিএনএন-এর এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হোয়াইট হাউস প্রকৃত বিনিয়োগের পরিবর্তে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক বিনিময়ের মতো অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারকেও এখানে বিনিয়োগ হিসেবে গণনা করেছে। গত মাসে প্রকাশিত ফেডারেল তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকৃত বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২৩২ বিলিয়ন ডলার।
কারখানা নির্মাণ নিয়ে অসত্য তথ্য
ট্রাম্প দাবি করেন, ‘আমাদের দেশের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয়ে গাড়ি, এআই, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ রেকর্ডসংখ্যক কারখানা তৈরি হচ্ছে।’ কিন্তু ফেডারেল তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদে উৎপাদন খাতে নির্মাণ ব্যয় ব্যাপক বাড়লেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তা ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে; যা ২০২৪ সালের মে মাসের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম। একইভাবে বাইডেন প্রশাসনের শেষ পূর্ণ মাস ডিসেম্বর ২০২৪-এর তুলনায়ও ব্যয় প্রায় ২৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এমনকি ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ মাস (ফেব্রুয়ারি ২০২৫)-এর চেয়েও এই ব্যয় ২৬ শতাংশ কমেছে।
নির্বাচন নিয়ে পুরোনো মিথ্যাচার
২০২০ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়া নিয়ে ট্রাম্প আবারও মিথ্যা দাবি করে বলেন, ‘আমি সব বিষয়েই সব সময় সঠিক ছিলাম। আমি তিনবার প্রেসিডেন্ট হয়েছি এবং তিনটি নির্বাচনে জিতেছি।’ তিনি আবারও দাবি করেন, ২০২০ সালের নির্বাচন তিনি জিতেছিলেন, তবে সেটিকে ট্রাম্প ‘কারচুপির নির্বাচন’ বলে চিহ্নিত করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প কেবল দুবার নির্বাচনে জিতেছেন এবং দুবারই প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি জো বাইডেনের কাছে সম্পূর্ণ বৈধ ও সুষ্ঠু উপায়ে পরাজিত হয়েছিলেন।
ভেনেজুয়েলার কারাগার ও অভিবাসী
ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরো প্রসঙ্গে ট্রাম্প তার চিরচেনা দাবিটি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘মাদুরো তার দেশের কারাগারগুলো খুলে দিয়েছিলেন এবং বন্দিদের আমাদের দেশে (যুক্তরাষ্ট্রে) আসার সুযোগ করে দিয়েছেন।’ তবে মাদুরো প্রশাসন অভিবাসনের উদ্দেশ্যে কারাগার খালি করেছিল–এমন কোনো প্রমাণ ট্রাম্প বা তার দল কখনোই দিতে পারেনি। ভেনেজুয়েলার ‘অবজারভেটরি অব ভায়োলেন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা রবার্তো ব্রিসেনিও-লিওন সিএনএনকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা সরকার বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশে পাঠানোর জন্য তাদের কারাগার খালি করছে–এমন কোনো প্রমাণ নেই। লন্ডনের বার্কবেক ইউনিভার্সিটির বৈশ্বিক কারাগার বিশেষজ্ঞ হেলেন ফেয়ারও জানিয়েছেন, বিশ্বের কোনো দেশ তাদের বন্দিদের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জন্য কারাগার খালি করেছে–এমন কোনো নজির মেলেনি।
বাইডেন আমলের অভিবাসী সংখ্যা
অভিবাসন প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, বাইডেন প্রশাসনের সময় ২ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে। কিন্তু সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাইডেন প্রশাসনের শেষ পূর্ণ মাস ডিসেম্বর ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী মোট ১ কোটি ১০ লাখের কম অভিবাসীর প্রবেশ রেকর্ড করেছিল। এ ছাড়া সীমান্ত ফাঁকি দিয়ে প্রবেশকারী বা ‘গেটঅ্যাওয়ে’ হিসেবে চিহ্নিত আনুমানিক ২২ লাখ মানুষকে যোগ করলেও মোট সংখ্যা ট্রাম্পের উল্লিখিত ২ কোটি ৫০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছায় না।
জ্বালানি তেলের দাম
ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময়ের তুলনায় এখন তেলের দাম কম। তবে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু নাকি ইরান যুদ্ধ শুরুর সময়কে বোঝাচ্ছেন, তা স্পষ্ট করেননি। যদি যুদ্ধ শুরুর সময়কে বোঝানো হয়ে থাকে, তাহলে বক্তব্যটি সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক ও মার্কিন বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত বুধবার যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। যদিও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর তেলের দাম কিছুটা কমেছিল, সাম্প্রতিক নতুন হামলা, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে যাওয়ার মন্তব্যের পর আবারও দাম বাড়তে শুরু করেছে। সূত্র: সিএনএন