রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে। কিন্তু এ সময়টাতে সে অনুযায়ী কার্যকর ও সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। মাঠপর্যায়ের বর্তমান যে চিত্র দেখা যায়, তাতে এ বিষয়টি স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। খবরের কাগজের সরেজমিন প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রাজধানীতে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে খাল, নালা, ড্রেন ও পরিত্যক্ত স্থানে পানি জমে রয়েছে। অনেক স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, আবর্জনায় ভরা স্থির পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ফগিং হলেও লার্ভা ধ্বংস ও জমে থাকা পানি অপসারণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
জানা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন; বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ডেঙ্গু ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির সদস্যরা রাজধানীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছেন। ইতোমধ্যে রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গু মোকাবিলায় একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় এডিস মশার ঘনত্বের সূচক এখন ২০-এর বেশি। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং রোগীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করে তৈরি পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। এ ছাড়া গত দুই বছরের অভিজ্ঞতাও তেমন সন্তোষজনক পর্যায়ে নেই। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ এবং প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। সেই অভিজ্ঞতায় এবার বর্ষার শুরুতেই সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপও আগেভাগেই দেখা দিয়েছে। কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার অভাবে ডেঙ্গু এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা, লার্ভা ধ্বংস এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়িয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। সময়মতো এসব ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ ঠেকাতে সরকারকে মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ইতোমধ্যেই আমরা জেনেছি, রাজধানীর দক্ষিণ সিটির ২৭টি ওয়ার্ডকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং উত্তর সিটির ২৪টি ওয়ার্ড উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানে লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। তাই এখন থেকেই মাঠপর্যায়ে লার্ভি সাইডিং, নিয়মিত ফগিং, খাল-নালা পরিষ্কার এবং আবর্জনা অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতেও পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার দ্রুত এসব উদ্যোগ নিলে মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গুর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।