বিংশ পর্ব
দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সাহিত্যকে পাকিস্তানীকরণে ওই কবির আগ্রহ কিছুকাল পরের ঘটনা। অন্যটি ছিল গল্পের বই, আবু রুশদের লেখা ‘রাজধানীতে ঝড়’। অল্প কিছুদিন আগে সেটা প্রকাশিত হয়েছে। কলকাতা থেকে আসার সময় হাতে করে কেউ নিয়ে এসে থাকবেন। বইয়ের একটি গল্প, হয়তো প্রথমটিই, মাসিক মোহাম্মদীতে ছাপা অবস্থায় আমার আগেই পড়া ছিল। কী বই পড়ছি দেখতে কৌতূহলী এক মুরব্বি বইটি নেড়েচেড়ে দেখে মন্তব্য করছিলেন, ‘বাব্বা, এটা তো বড়দের বই; পড়লে আমাদেরই মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা।’ শুনে আমার মা কোনো মন্তব্য করেননি, কিন্তু প্রসন্ন বদনে একটি হাসি হেসেছিলেন, যার অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা এ রকমের যে, কিশোরদের পড়ার মতো বই যে পাড়ায় নেই সেটা তো আপনাদের অপারগতা।
সেবার আমরা গ্রামে ছিলাম দুই সপ্তাহের কিছু বেশি। আমাদের জন্য বিশেষ বিনোদন ছিল পদ্মায় নৌকাভ্রমণ। নদীকে আগে কখনো অমনভাবে পাইনি। আমার বিশেষ আব্দারেই মামারা রাজি হতেন নৌকা নিয়ে নদীতে যেতে। তারা যে উপভোগ করতেন না তা-ও অবশ্য নয়। খালাম্মার কাছ থেকে গ্রামোফোন ও কিছু রেকর্ড চেয়ে নিতে ভুল হতো না। খোলা আকাশের নিচে খোলা নৌকায় কৌতুকপ্রবণ বাতাসে আন্দোলিত হয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও জগন্ময় মিত্রের গান শোনার অভিজ্ঞতা তখন তো আনন্দের ব্যাপার ছিলই, তার স্মৃতি এখনো সুখের। উপভোগ্য ছিল পদ্মায় জেলেদের ইলিশ মাছ ধরার ব্যস্ততা। ছায়াছবির মতো মনে হতো। তাজা মাছ সঙ্গে না নিয়ে আমরা ফিরতাম না। ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে, রান্না হচ্ছে, সকালবেলা চিতোই পিঠার ভেতরে বসানো হচ্ছে, দুপুরে কোনো কোনো দিন ইলিশ-পোলাও পাওয়া যাচ্ছে–মনে পড়ে সেসব ঘটনা।
এর মধ্যেই এসে গেল চৌদ্দই আগস্ট। আমরা গেছি ভাগ্যকূলের স্টিমার ঘাটে। স্বাধীনতার উৎসব দেখব। উৎসব তেমন কিছু নয়। স্টিমার আসবে গোয়ালন্দ থেকে, স্টিমারের সামনে পত্ পত্ করে উড়বে স্বাধীন পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা, বেশ বড় আকারের; আওয়াজ তুলবেন স্টিমারে যাত্রীরা; এপার থেকে জবাব দেব আমরা, এমনই অলিখিত আয়োজন। এবং ঠিক তেমনটাই ঘটল। পড়ন্ত বিকেলে পুরাতন স্টিমারটি এল নতুন সাজে। সামনে উড়ছে জাতীয় পতাকা। স্টিমারজুড়ে দড়িতে বাঁধা কাগজের পতাকা; কাপড়ের পতাকাও কোনো কোনো যাত্রীর হাতে। এপারে স্টিমার ঘাটেরও একই রকমের সাজসজ্জা। ঘাটে পৌঁছার আগেই স্টিমার থেকে জোর গলায় আওয়াজ ভেসে এল ‘নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়েদে আজম জিন্দাবাদ’, আমরা যারা পতাকা হাতে পন্টুনে এবং নানা ধরনের নৌকায় দাঁড়িয়ে ছিলাম তারাও জবাবে সাড়া দিলাম সমস্বরে, গলা ফাটিয়ে। স্টিমারের যাত্রীরা ওঠানামা করলেন। তার পর সিঁটি বাজিয়ে স্টিমার চলে গেল। আমরাও নৌকায় উঠে রওনা দিলাম বাড়ির উদ্দেশে।
নৌকা চলছে। আমরা ফিরছি। ফেরার পথে উল্লাস ছিল কী? মনে পড়ে না। বরং একটা স্তব্ধতা ছিল। উৎসব শেষ হলে যেমনটা ঘটে থাকে। পরে বুঝেছি ওই স্তব্ধতা কেবল যে আমাদের নৌকায় ছিল তা নয়, ছিল সমস্ত এলাকাজুড়ে। হিন্দুপাড়ায় তো স্তব্ধতা নয়, ছিল মানুষের চাপা কান্নাই।
তাদের অনেকের জন্যই স্বাধীনতা কোন ধরনের অভিজ্ঞতা বয়ে এনেছিল তারই একটা ধারণা দিয়েছেন সংবেদনশীল এক বিক্রমপুরবাসী–জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়; তার লেখা ওপারের ছেলেবেলা, ১৯৩১-১৯৪৭ বইতে। যে চৌদ্দই আগস্ট পতাকা দুলিয়ে আমরা পাকিস্তান জিন্দাবাদ আওয়াজ দিয়েছিলাম ঠিক সেদিনই উল্টো পথে পদ্মাপাড় থেকেই স্টিমার ও ট্রেনের সাহায্য নিয়ে কিশোর জয়ন্তানুজ গিয়ে হাজির হয়েছেন কলকাতায়, হাতে বোনের ঠিকানাটুকু মাত্র সম্বল। কলকাতায় তার ভগ্নিপতি পুলিশের সামান্য একজন কনস্টবল এবং ভগ্নিপতির বাসায় আশ্রিত ছিলেন আরও দুজন আত্মীয়। জয়ন্তানুজের বয়স তখন ষোলো। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ তিনি দেখেছেন। সেটা ছিল গণহত্যা। গ্রামে মৃতদেহ সৎকার করবে এমন মানুষেরও অভাব দেখা দিয়েছিল। নদীতে লাশ ভাসত। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত চতুর্দিকে। জয়ন্তানুজের বাবা ছিলেন গ্রামের স্কুলের গ্র্যাজুয়েট টিচার। তাদের স্কুলটির প্রতিষ্ঠা ১৮৮৩ সালে। মন্বন্তরে পরিবারটির দশা দাঁড়িয়েছিল ভিক্ষুকের। চাল কিনবার পয়সা ছিল না ঘরে। অনেক কষ্টে গ্রামের বাজারে শেষ পর্যন্ত একটা লঙ্গরখানা খোলা হয়। চাল-ডাল ও সামান্য সবজি মিলিয়ে পাতলা খিচুড়ি (লাপসি) তৈরি করা হতো। সারি সারি কংকাল লাইন দিয়ে বাজারের গলিতে বসত। কে হিন্দু আর কেই-বা মুসলমান তা আলাদা করার প্রশ্ন ছিল না, উপায়ও ছিল না। কলাপাতার ওপরে বড় বালতি থেকে এক হাতা লাপসি ফেলে দেওয়া হতো। জয়ন্তানুজ স্মরণ করেছেন–
সেটুকু চেটেপুটে খেয়ে প্রত্যেকেই আরও চাইত। কিন্তু রেশন ছিল শুধু এক হাতাই। নইলে এত লোককে দেওয়া সম্ভব হতো না। তখন তাদের চিৎকার আর মানুষের চিৎকার বলে মনে হতো না। একজন ছোট স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমি নিজ হাতে কংকালদের এক হাতা করে লাপসি পরিবেশন করেছি। সে অভিজ্ঞতা আমাকে মানুষের জীবন আর সমাজ সম্বন্ধে সারা জীবনের মতো গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে, আর গভীর ব্যথায় ভরে রেখেছে আমার অন্তরকে। কিন্তু এই লঙ্গরখানা বেশি দিন চলেনি। কয়েক দিন পরেই অর্থ এবং চাল-ডাল আর জোগাড় করা সম্ভব হলো না। কংকালসার মানুষ আর বাজারে এল না।
কংকালদের সেই দেশে এরপর দেখা দিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আতঙ্ক। তার পর যখন ‘স্বাধীনতা’ দেশভাগের আকারে এসে হাজির হলো তখন সংখ্যালঘু হিন্দুদের জন্য কেমন যে অন্ধকার নেমে এসেছিল সে খবর তাদের মুসলমান প্রতিবেশীরা রাখবার ফুরসৎ পায়নি। আর ‘মহৎপ্রাণ’ যে হিন্দুরা হিন্দুদের বাঁচাবে বলে বাংলাকে কেটে দু-টুকরো করার জন্য ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছিল তাদের দৃষ্টির আলো তো পূর্ববঙ্গের এই হিন্দুদের অন্ধকারকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি।
কলকাতায় জয়ন্তানুজ তো একাই প্রথমে গেলেন। কয়েক মাস পরে গোটা পরিবারকেই চলে যেতে হয়েছে, তাদের ‘সত্তার সাকিন’ বজ্রযোগিনী গ্রাম ছেড়ে, এবং সেখানে গিয়ে ছিন্নমূল পরিবারটিকে বানভাসা খড়কুটোর মতো আশ্রয় খুঁজতে হয়েছে। তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ভীষণ কঠিন এক সংগ্রামে।
চলবে...