বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথরেখা নির্মাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এখনো একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে: প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে গড়ে তোলা কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সত্যিকার অর্থে সফল গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
এ উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ৩ জুন ২০২৬ তারিখে, যখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব, যিনি দলের অন্যতম অভিজ্ঞ নেতা, ঘোষণা করেন যে বিএনপি বাংলাদেশে একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা, মতামত প্রকাশ এবং জনগণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা উচিত।
গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদে বিশ্বাসী অনেকের কাছে এ বক্তব্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। ‘সব রাজনৈতিক দল’ বলতে কি তিনি সেই দলগুলোকে বোঝাতে চেয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য, যিনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, সতর্ক করে বলেছিলেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। সে সময় এই সতর্কবার্তাটি খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু আজ তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন বর্জনমূলক রাজনীতির সম্ভাব্য গুরুতর পরিণতি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী হিসেবে তারা একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানেন–রাজনৈতিক নজির প্রায়শই সেই পরিস্থিতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যার প্রেক্ষাপটে সেগুলো সৃষ্টি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ঘটনাবলির পর যে বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। একটি বড় রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের পদক্ষেপের সমর্থকরা হয়তো যুক্তি দিতে পারেন যে, অসাধারণ পরিস্থিতিতে অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক বর্জন খুব কম ক্ষেত্রেই তার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একবার কোনো নজির প্রতিষ্ঠিত হলে, ভবিষ্যতের সরকারগুলো প্রায়ই একই অস্ত্র নতুন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।
এটাই সম্ভবত আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি, একই সঙ্গে বিএনপির জন্যও।
বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, আজ যে রাজনৈতিক অস্ত্র একটি শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সেটা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কখনোই স্থায়ী নয়। নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তিত হয়, জনমত বদলায়, রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠিত হয়, সরকার আসে এবং সরকার যায়।
যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলকে আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার একই নীতি বিএনপির বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করতে পারে।
এই আশঙ্কা কাল্পনিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা পরিবর্তন করেছে। একের পর এক সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করেছে, এবং পরবর্তীতে নিজেরাই একই ধরনের ব্যবস্থার শিকার হয়েছে।
বিশেষ করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও গভীর। তাদের অনেকেই এখন সত্তরের কোঠায় এবং কয়েক দশক ধরে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তারা জানেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলে আজ যেসব নজিরকে কেউ কেউ স্বাগত জানাচ্ছেন, সেগুলোই একদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। অভিযোগ, মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্পত্তির ওপর হুমকিও তখন দেখা দিতে পারে।
এ কারণেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের সুরক্ষার জন্য নয়, বরং ক্ষমতাসীনদেরও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য।
তদুপরি, রাজনৈতিক বর্জন প্রায়শই স্থিতিশীলতার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। বিরোধীদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিলে দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে কমতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত অসন্তোষ দূর হয় না। বরং তা আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং ভবিষ্যতের অস্থিরতা ও সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।
বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা রাজনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। একটি অস্থিতিশীল বা বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে, আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে। ফলে বর্জনমূলক রাজনীতির প্রকৃত মূল্য শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; সাধারণ জনগণকেই পরিশোধ করতে হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন এবং জাতীয় গর্বের বিষয়। তবে এমন মর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়তি মনোযোগ ও পর্যালোচনাও নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, তখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও গভীর নজরে আসবে।
গত দুই বছরের রাজনৈতিক উত্তরণের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি–রাজনৈতিক দলের ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার মতো বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রমাণ করা যে, তার গণতান্ত্রিক উত্তরণ এখনো অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণ এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিএনপির সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। দলটি চাইলে অতীতের বর্জনমূলক রাজনৈতিক চক্রকে অব্যাহত রাখতে পারে, অথবা একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিতে পারে।
দ্বিতীয় পথটি শুধু জাতীয় স্বার্থই নয়, বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করবে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, রাজনৈতিক বৈধতা বৃদ্ধি করবে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করবে এবং ভবিষ্যতে একই বর্জনমূলক নজির বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি কমাবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বর্জনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হবে না। বরং তা পরিমাপ করা হবে এমন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সক্ষমতার মাধ্যমে, যা আইনের শাসনের অধীনে সব অংশীজনকে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশ যদি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তবে তা শুধু গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না; বরং টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির জন্যও প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করবে। এটাই কোটি কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশিত ভবিষাৎ আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হতে পারে কেবল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে, বর্জনের মাধ্যমে নয়।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব


