ঢাকা ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
জলের আঙুল মেঘ আষাঢ়ের জলাভিসার আষাঢ়ের মুখ যদিও এই সজল বর্ষা প্রাইমারি স্কুলের অনিয়মে নজর দিন হবিগঞ্জে বাঁধ ভাঙনে ২৫ গ্রাম পানিবন্দি, ভোগান্তিতে ৩০ হাজার বাসিন্দা মেঘের সৌধ থেকে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ফুটবল আবেগ এক নতুন সম্ভাবনা বৃষ্টি ভেজার কাঁপন বরষা, এ চল্লিশে আষাঢ়ের রূপ বাউরি বর্ষার ঝোড়ো রাত আষাঢ়ি পূর্ণিমায় স্ক্রিনে বন্দি শৈশব-কৈশোর আষাঢ়ের বাদলধারা বৃষ্টিস্নাত বিশেষত তোমাকে বাদলফকির ফ্রান্সের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলেন মরক্কোর কোচ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার লাভ-ক্ষতি আওয়ামী লীগের জন্ম দিল্লিতে, দাফনও হয়েছে সেখানেই: সারজিস আলম এসেছ আজ কী মহাসমারোহে উপভোগ্য ছিল পদ্মায় ইলিশ ধরা গ্রাফিতিতে বিশ্বকাপ, ফুটবল উন্মাদনায় ভাসছে জাককানইবি মরক্কোকে বেছে নেওয়ায় আফসোস নেই বুয়াদির নজরুলের অভিযান কবিতার এক শ বছর দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার বাঁশখালীতে জামায়াত আমিরের বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন স্পেনকে হারাতে নিখুঁত ম্যাচ খেলতে হবে: লুকাকু লালপুরে হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার লাভ-ক্ষতি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার লাভ-ক্ষতি
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ তার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টের নাটকীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং পরবর্তী ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথরেখা নির্মাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে এখনো একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে: প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে গড়ে তোলা কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি সত্যিকার অর্থে সফল গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করতে পারে?

এ প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় ৩ জুন ২০২৬ তারিখে, যখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব, যিনি দলের অন্যতম অভিজ্ঞ নেতা, ঘোষণা করেন যে বিএনপি বাংলাদেশে একটি সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা, মতামত প্রকাশ এবং জনগণের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ থাকা উচিত।

গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদে বিশ্বাসী অনেকের কাছে এ বক্তব্য আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। ‘সব রাজনৈতিক দল’ বলতে কি তিনি সেই দলগুলোকে বোঝাতে চেয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ স্থায়ী কমিটির সদস্য, যিনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, সতর্ক করে বলেছিলেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। সে সময় এই সতর্কবার্তাটি খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু আজ তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এখন বর্জনমূলক রাজনীতির সম্ভাব্য গুরুতর পরিণতি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী হিসেবে তারা একটি সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সত্য জানেন–রাজনৈতিক নজির প্রায়শই সেই পরিস্থিতির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যার প্রেক্ষাপটে সেগুলো সৃষ্টি হয়েছিল।

২০২৪ সালের ঘটনাবলির পর যে বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে। একটি বড় রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এ ধরনের পদক্ষেপের সমর্থকরা হয়তো যুক্তি দিতে পারেন যে, অসাধারণ পরিস্থিতিতে অসাধারণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, রাজনৈতিক বর্জন খুব কম ক্ষেত্রেই তার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। একবার কোনো নজির প্রতিষ্ঠিত হলে, ভবিষ্যতের সরকারগুলো প্রায়ই একই অস্ত্র নতুন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়।

এটাই সম্ভবত আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি, একই সঙ্গে বিএনপির জন্যও।

বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন যে, আজ যে রাজনৈতিক অস্ত্র একটি শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সেটা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কখনোই স্থায়ী নয়। নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তিত হয়, জনমত বদলায়, রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠিত হয়, সরকার আসে এবং সরকার যায়।

যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলকে আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার একই নীতি বিএনপির বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করতে পারে।

এই আশঙ্কা কাল্পনিক নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা পরিবর্তন করেছে। একের পর এক সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করেছে, এবং পরবর্তীতে নিজেরাই একই ধরনের ব্যবস্থার শিকার হয়েছে।

বিশেষ করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও গভীর। তাদের অনেকেই এখন সত্তরের কোঠায় এবং কয়েক দশক ধরে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তারা জানেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটলে আজ যেসব নজিরকে কেউ কেউ স্বাগত জানাচ্ছেন, সেগুলোই একদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। অভিযোগ, মামলা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা, এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্পত্তির ওপর হুমকিও তখন দেখা দিতে পারে।

এ কারণেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের সুরক্ষার জন্য নয়, বরং ক্ষমতাসীনদেরও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য।
তদুপরি, রাজনৈতিক বর্জন প্রায়শই স্থিতিশীলতার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। বিরোধীদের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দিলে দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সাময়িকভাবে কমতে পারে, কিন্তু অন্তর্নিহিত অসন্তোষ দূর হয় না। বরং তা আরও গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং ভবিষ্যতের অস্থিরতা ও সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।

বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগীরা রাজনৈতিক পূর্বানুমানযোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। একটি অস্থিতিশীল বা বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে, আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ধীর করে দিতে পারে। ফলে বর্জনমূলক রাজনীতির প্রকৃত মূল্য শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; সাধারণ জনগণকেই পরিশোধ করতে হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন এবং জাতীয় গর্বের বিষয়। তবে এমন মর্যাদা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়তি মনোযোগ ও পর্যালোচনাও নিয়ে আসে।

বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, তখন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও গভীর নজরে আসবে।

গত দুই বছরের রাজনৈতিক উত্তরণের সময় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি–রাজনৈতিক দলের ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার মতো বিষয় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে, এটাই স্বাভাবিক।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রমাণ করা যে, তার গণতান্ত্রিক উত্তরণ এখনো অন্তর্ভুক্তি, অংশগ্রহণ এবং মৌলিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিএনপির সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। দলটি চাইলে অতীতের বর্জনমূলক রাজনৈতিক চক্রকে অব্যাহত রাখতে পারে, অথবা একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্ব দিতে পারে।

দ্বিতীয় পথটি শুধু জাতীয় স্বার্থই নয়, বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করবে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবে, রাজনৈতিক বৈধতা বৃদ্ধি করবে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করবে এবং ভবিষ্যতে একই বর্জনমূলক নজির বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি কমাবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বর্জনের মাধ্যমে পরিমাপ করা হবে না। বরং তা পরিমাপ করা হবে এমন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সক্ষমতার মাধ্যমে, যা আইনের শাসনের অধীনে সব অংশীজনকে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।

বাংলাদেশ যদি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তবে তা শুধু গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না; বরং টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির জন্যও প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করবে। এটাই কোটি কোটি বাংলাদেশির প্রত্যাশিত ভবিষাৎ আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হতে পারে কেবল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে, বর্জনের মাধ্যমে নয়।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

স্ক্রিনে বন্দি শৈশব-কৈশোর

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
স্ক্রিনে বন্দি শৈশব-কৈশোর
নাঈমুল মাসুম

মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি যেমন সভ্যতার অগ্রযাত্রার অনিবার্য সঙ্গী, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি কখনো কখনো সেই সভ্যতার জন্যই নতুন সংকট ডেকে আনে। আজকের পৃথিবীতে সেই সংকটের নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একসময় শিশুর হাতে থাকত গল্পের বই, রঙিন পেনসিল, ঘুড়ির সুতা কিংবা ফুটবল। এখন সেই হাতের অধিকাংশ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের আলোকিত পর্দা। মাঠের সবুজ ঘাসের পরিবর্তে তারা স্পর্শ করছে কাচের স্ক্রিন; প্রকৃত বন্ধুত্বের বদলে খুঁজছে ভার্চুয়াল অনুসারী; কল্পনার রাজ্যের পরিবর্তে ডুবে যাচ্ছে অন্তহীন স্ক্রলের অন্ধকারে।

আজকের শিশুরা আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু তারা কি সমানভাবে কল্পনাশক্তিতে সমৃদ্ধ? প্রযুক্তির বিস্ময়কর সুবিধা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাই যখন নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা সৃজনশীলতা, মনন, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়।

বিশ্বজুড়ে গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা এবং আত্মসম্মানবোধের অবক্ষয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের বিকাশমান মস্তিষ্ক বারবার ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। 
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়া, চিন্তা করা, লেখা বা নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর মনোযোগকে যতক্ষণ সম্ভব আটকে রাখে। প্রতিটি লাইক, মন্তব্য কিংবা নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়। শিশু-কিশোররা বুঝতেই পারে না কখন তারা নিজের সময়ের মালিকানা হারিয়ে ফেলেছে।

সৃজনশীলতা জন্ম নেয় নির্জনতা, একাগ্রতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনার সংমিশ্রণে। একজন কবি, বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা উদ্ভাবকের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম উদ্দীপনা মানুষের মনকে খণ্ডিত করে দেয়। এক মিনিটের ভিডিও, কয়েক সেকেন্ডের রিল কিংবা অন্তহীন স্ক্রল ধীরে ধীরে দীর্ঘ মনোযোগের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। ফলে শিশুরা বই পড়তে বিরক্ত হয়, দীর্ঘ লেখা লিখতে অনীহা বোধ করে, গবেষণামূলক চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনকেই জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে।

বাংলাদেশেও এ পরিবর্তন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম¬–সবখানেই শিশুর হাতে স্মার্টফোন। অনেক অভিভাবক ব্যস্ততার কারণে শিশুকে শান্ত রাখতে ফোন তুলে দেন। প্রথমে এটি সাময়িক সমাধান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটাই হয়ে ওঠে আসক্তির বীজ। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ স্ক্রিনে ডুবে থাকে। পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়, বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব।

শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। অনলাইন শিক্ষার সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি একই ডিভাইসেই পড়াশোনার পাশাপাশি অবিরাম বিনোদনের দরজাও খোলা। ফলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় ব্যয় করছে। পরীক্ষায় মুখস্থ জ্ঞান হয়তো অর্জিত হচ্ছে, কিন্তু বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এ কারণে বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আইন পাস করে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আইনটির উদ্দেশ্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং অনলাইন ক্ষতি কমানো।

শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বিশ্বের অন্তত ৭৯টি দেশে বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর পেছনে মূল যুক্তি–শিক্ষার পরিবেশে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা এবং শিশুদের সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী ভাবছে? বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের অভিযাত্রায় প্রযুক্তি অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসার যদি ডিজিটাল শৃঙ্খলার সঙ্গে না আসে, তাহলে উন্নয়নের সুফলই একসময় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশে এখনো শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মে বয়সসীমা থাকলেও বাস্তবে তা সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে অল্প বয়সেই শিশুরা এমন কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

এ অবস্থায় কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে স্মার্টফোন দিয়ে ব্যস্ত রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি। শিশু তার অভিভাবকের আচরণ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই বড়দেরও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলা নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। শিক্ষার প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। বিদ্যালয়কে আবারও পাঠাগার, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

তৃতীয়ত, সরকারকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বয়স যাচাই ব্যবস্থা, অনলাইন নিরাপত্তা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আধুনিক আইন ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের মনোযোগকে পণ্যে পরিণত করে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পঞ্চমত, গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রযুক্তির সুবিধা প্রচার নয়, এর ঝুঁকি সম্পর্কেও ধারাবাহিক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেমন–একসময় ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমনি আজ প্রয়োজন সুস্থ ডিজিটাল জীবনযাপনের আন্দোলন।

যে শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে, সে হয়তো সাময়িক আনন্দ পাচ্ছে; কিন্তু একই সময়ে সে হারিয়ে ফেলছে গল্প কল্পনা করার ক্ষমতা, নতুন প্রশ্ন করার সাহস, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি কথোপকথনের দক্ষতা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শিশুদের কল্পনাশক্তি। সেই কল্পনাই যদি স্ক্রিনের অ্যালগরিদমের কাছে বন্দি হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতের উদ্ভাবক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক কোথা থেকে আসবে?

একটি জাতি কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উন্নত হয় না; উন্নত হয় তখনই, যখন তার শিশুরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে, বইয়ের গন্ধ চিনতে শেখে, মাঠের ঘাসে দৌড়াতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, স্বপ্ন দেখতে শেখে।

আমরা যদি আজ তাদের হাতে কেবল একটি স্মার্টফোন তুলে দিই, অথচ একটি বই, একটি মাঠ, একটি গাছ, একটি আকাশ কিংবা একটি মুক্ত শৈশব ফিরিয়ে দিতে না পারি–তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। স্ক্রিনে বন্দি শৈশব কোনো ডিজিটাল অর্জন নয়; এটি সভ্যতার জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়–আমরা কি অ্যালগরিদমের কাছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সমর্পণ করব, নাকি প্রযুক্তিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রেখে সৃজনশীল, মানবিক ও মুক্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের মানচিত্র।

লেখক: লেখক ও কবি
[email protected]

মাদক ও বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
মাদক ও বিচারহীনতার বিষবৃক্ষ
ড. আলা উদ্দিন

যখন সমাজ মাদকের গ্রাসে পড়ে, তখন মানবিক বোধ লোপ পায় এবং পেশিশক্তির দাপটে আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই রক্তক্ষরণ থামাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের অস্তিত্ব এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তার খাতিরেই এই অন্ধকার ভাঙতে হবে।...

ময়মনসিংহের ঘটনাটি কেবল একটি খুনের খবর নয়। এটি আমাদের সমাজের গভীরে বাসা বাঁধা দুটি ভয়ংকর ব্যাধির সম্মিলিত বিষক্রিয়ার প্রকাশ। একদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অন্যদিকে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন। যখন একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার কুৎসিত লালসার বলি হিসেবে বেছে নেয় এক গৃহকর্ত্রীকে, আর সেই অসহায় পরিবারের সন্তানরা আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে নিজেরাই খুনের পথ বেছে নেয়, তখন বোঝা যায়, আমাদের সমাজ কতটা ভারসাম্যহীন অবস্থায় পৌঁছেছে।

আমাদের দেশে ধর্ষণ, বলাৎকার কিংবা নারী নির্যাতনের খবর এখন প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ, গার্মেন্টসকর্মী থেকে মাদ্রাসা ছাত্র, কেউই এই ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ নয়। যখন চার সন্তানের জননী, যার সন্তানরা ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সের টগবগে যুবক, তিনিও নিজের বাড়িতে লাঞ্ছিত হন, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ধারণাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা তলানিতে ঠেকেছে।

রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষা ও সম্মানের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকরা নিজেরাই সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। একে বলা যায় বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক অনিবার্য ফসল। মানুষ যখন দেখে দিনের পর দিন নির্যাতনের অভিযোগগুলো কেবল কাগজে-কলমেই আটকে আছে, অথবা আইনি জটিলতায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের ভেতরে এক ধরনের প্রচণ্ড ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই ক্ষোভই একসময় বিস্ফোরণ ঘটায়। ময়মনসিংহের ওই চার ভাই হয়তো মনে করেছে, আইন তাদের মাকে বিচার দেবে না, বরং উল্টো তাদের পরিবারকেই হয়তো আরও হেনস্তার শিকার হতে হবে। তাই তারা নিজেরাই বিচারক হয়েছে, নিজেরাই রায় দিয়েছে এবং সেই রায় কার্যকর করেছে। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাদের সমর্থন দিচ্ছেন। তারা বলছেন, মায়ের নির্যাতনের বদলা নিয়েছে যোগ্য সন্তানরা; তাদের মুক্তির দাবিও উঠছে। কীসের ইঙ্গিত এটি? এটিই সেই বার্তা–যেখানে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, সেখানে অরাজকতা ডানা মেলে।

এখানেই বড় বিপদ। যখন সমাজ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়াকে সমাধানের পথ হিসেবে বেছে নেয়, তখন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে যে বিচার পাওয়া অসম্ভব, তখন ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা প্রতিহিংসায় রূপ নেয়। আর এই প্রতিহিংসা কখনো সুস্থ সমাজ গঠন করতে পারে না। আজকের এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এমন এক পরিবেশের ফল যেখানে নারীরা পদে পদে অপমানিত হচ্ছে এবং প্রতিকারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না পেয়ে সাধারণ মানুষ আত্মরক্ষার জন্য ভয়ংকর সব পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

আমাদের সমাজে নারীর সম্মান রক্ষাকে কেন্দ্র করে যে পরিবারতান্ত্রিক ধারণা গড়ে উঠেছে, তা অনেক ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একটি মেয়ে বা একজন মা নির্যাতিত হলে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। তাদের ওপর এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা ভর করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন সেই সুরক্ষা দেওয়ার কাঠামোটি নড়বড়ে থাকে, তখন তারা চরম অস্থিরতায় ভোগে। নিজের ঘরের মধ্যে মা লাঞ্ছিত হলে একজন সন্তানের কাছে সেই মুহূর্তটি পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। কিন্তু সেই যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য খুনের পথ বেছে নেওয়া কি সমাধান? অবশ্যই নয়। কিন্তু আমরা তাদের অন্য কোনো পথ খোলা রেখেছি কি?

আমরা যদি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার দিকে তাকাই, তবে দেখব সেখানে মামলাজট, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে ন্যায়বিচার পাওয়াটা এক ধরনের বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে আদালতের বারান্দা মানেই দিনের পর দিন হয়রানি। ফলে, প্রান্তিক মানুষের মনে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আইনি লড়াই মানেই শক্তির অপচয় এবং সময়ের অপচয়। ময়মনসিংহের এ ঘটনার পেছনে থাকা ক্ষোভ সেই অবিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি। তারা যখন দেখল বাড়িওয়ালি হওয়ার পরও নিজের ঘরে তারা অনিরাপদ, তখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদটাই প্রধান হয়ে উঠল।

আমাদের সমাজ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিটি পরিবার তাদের কন্যা বা নারীদের নিয়ে শঙ্কায় থাকে। এই শঙ্কা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ঘরের বারান্দা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–কোথাও কি নারী নিরাপদ? এই অনিরাপদ বোধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পায়। তারা তখন অপরাধী আর আইনের পার্থক্য বোঝে না, তারা শুধু বোঝে টিকে থাকতে হবে, অপমান থেকে বাঁচতে হবে।

ময়মনসিংহের এ ঘটনায় রুবেলের চরিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সে কেবল একজন শ্লীলতাহানিকারীই ছিল না, ছিল মাদকের নেশায় মগ্ন এক অস্থির সত্তা। আজকের বাংলাদেশে ধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের সিংহভাগ ঘটনার নেপথ্য অনুসন্ধান করলে একটি বড় অংশের সঙ্গেই মাদকের যোগসূত্র পাওয়া যায়। ইয়াবা, হেরোইন কিংবা গাঁজার নেশায় মগ্ন মানুষগুলো যখন তাদের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ও মানবিক অনুভূতি হারিয়ে ফেলে, তখন তারা পশুতে রূপান্তর হয়। তারা আর বুঝতে পারে না কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল। রুবেলের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, সে ভাড়াটিয়া হিসেবে এসে মাদকের আড্ডা জমিয়েছিল, যা সমাজের শান্ত পরিবেশকে কলুষিত করছিল। এ ধরনের মানুষগুলো যখন মাদকের নেশায় থাকে, তখন তাদের কাছে নারীর সম্মান বা অন্যের অধিকার–কোনোটিরই মূল্য থাকে না।

মাদক আজ আমাদের দেশের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য এক মহামারি। এটি কেবল শরীরকে ধ্বংস করছে না, এটি ভেঙে দিচ্ছে আমাদের পারিবারিক কাঠামোকেও। আমরা প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনামে দেখি, মাদকের টাকার জন্য সন্তান তার বাবা-মাকে হত্যা করছে, কিংবা সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বৃদ্ধ মা-বাবাকে করছে নির্যাতন। নেশার টাকা জোগাড় করতে মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, তা আমাদের কল্পনার অতীত। এই রুবেলরা যখন নেশার ঘোরে থাকে, তখন তারা নিজেকে বাড়ির মালিকের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর মনে করে। তারা লাথি মেরে দরজা ভাঙতে পারে, মানুষের গায়ে হাত তুলতে পারে। কারণ তারা জানে যে, তাদের হাতে রয়েছে নেশার উত্তাল শক্তি এবং তারা এটাও জানে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা তাদের খুব একটা বড় কোনো শাস্তির মুখোমুখি করবে না।

আমাদের এই সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে মাদকের ভূমিকাটি আজ আর গোপন কিছু নয়। ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী খুনের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অপরাধীর রক্তে নেশার আধিক্য। নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক মানুষের মধ্যে পৈশাচিক প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। আর এই পৈশাচিকতা যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ তার নিজের ঘরকেও নিরাপদ মনে করতে পারে না। ময়মনসিংহের ওই মা যখন তার সন্তানদের নিয়ে নিজের বাড়িতেই লাঞ্ছিত হন, তখন এটি কেবল তার ব্যক্তিগত অপমান নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থার এক করুণ আত্মসমর্পণ।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর মাদকের মহামারি–এই দুইয়ে মিলে আজ আমাদের সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। যতক্ষণ না আমরা মাদকের সরবরাহ ও এর কুপ্রভাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাব এবং যতক্ষণ না প্রতিটি অপরাধের বিচার স্বচ্ছ ও দ্রুত নিশ্চিত করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের নৃশংসতা চলতেই থাকবে। আমরা কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক সমাজ উপহার দিতে চাই, যেখানে কেবল পেশিশক্তি আর প্রতিহিংসার রাজত্ব চলবে?

ময়মনসিংহের ঘটনাটি আমাদের সমাজের গভীর অসুস্থতার প্রতিফলন। যখন সমাজ মাদকের গ্রাসে পড়ে, তখন মানবিক বোধ লোপ পায় এবং পেশিশক্তির দাপটে আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই রক্তক্ষরণ থামাতে রাষ্ট্রকে মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে আমরা কেবল অরাজকতার দিকেই এগিয়ে যাব। আমাদের অস্তিত্ব এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তার খাতিরেই এই অন্ধকার ভাঙতে হবে। আইন শুধু দলিলে নয়, বরং বাস্তবে কার্যকর হোক। আমরা কি বিচারহীনতার অন্ধকারে বাস করব, নাকি মানবিক মর্যাদার পথে হাঁটব? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

রাজনীতির পালাবদলে বদলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
রাজনীতির পালাবদলে বদলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর কোথাও তোলাবাজির অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগে কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ছবি সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ধৃতকে কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়।...

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে পালটে যাচ্ছে অনেককিছুই। অভ্যাসও পাল্টাচ্ছে, পালটে যাচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদ জানাতে, ধিক্কার জানাতে সম্প্রতি তৃণমূলকর্মীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। বাদ পড়েননি তৃণমূল কংগ্রেসের যুবরাজ তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কুণাল ঘোষ, স্বরূপ বিশ্বাসসহ এক সময়ের হেভি ওয়েট সব নাম। শুধু কি তাই? টালিপাড়ার সিনেমা জগতের কোন্দলেও ছোড়া হয়েছে ডিম, টম্যাটো। এই সংস্কৃতিকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না সোনারপুর দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক, তথা বাংলার সিনিয়র অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।

রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ডিম ছোড়াটা আমার কাছে এখন অবধি সুস্থ সমাজের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না। ওটা আমার একেবারেই ভালো লাগছে না। এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের বড্ড নীচে নামিয়ে এনেছি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ এতকাল রাজনীতিনির্ভর ছিলেন। তাদের অর্থ, তাদের জীবন, খাওয়া-পরা সবই হয়ে উঠেছিল রাজনীতিনির্ভর। আজ তোলাবাজি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই কিছু একটা করে তো হল্লা করতে হবে। শান্তভাবে আর ভদ্রভাবে চলা, ঠিকভাবে গাড়ি পার্ক করা এগুলো যারা করেন তাদের ন্যাকা আখ্যা দেওয়া হয়। কেউ ভালোভাবে কথা বললে তাকে ন্যাকা বলা হয়। ভালোভাবে কথা বললে সে নাকি অভিনয় করছে, এমনটাই মনে করা হয়। সমাজ তো আর বাইরের জগৎ থেকে কেউ এসে পালটে দিতে পারে না।’

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ট্রোল করা প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘উনি তিনবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। ওর রাজনৈতিক দলের ভাঙন অবশ্যম্ভাবী ছিল। দল ভেঙে গেছে কি না গেছে, সেগুলো আলাদা বিষয়। আদর্শ ছিল না, তাই এটা হওয়ার ছিল। প্রথম বছরের পর থেকে উনি দলকে সামলে রাখতে পারেননি। নির্বাচনে জেতার জন্য এমন কাজ করেছেন, যার ফলে দলে অনেক বেনো জল ঢুকে গিয়ে সবটা শেষ করে দিল। উনি দলকে কন্ট্রোল করতে পারেননি, এটা অন্য বিষয়। কিন্তু উনি তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী, এটাও সত্যি কথা। ওর সম্বন্ধে কথা বলতে গেলে একটু সমঝে, বুদ্ধি করে, সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে আমরা বাধ্য। আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী নিজেকে এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি না, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের বাইরের লোক আমাদের খারাপ ভাববে, পরিহাস করবে।’

পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর কোথাও তোলাবাজির অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগে কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ছবি সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ধৃতকে কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। ফলতার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী ধৃত জাহাঙ্গীর খানেরও এমন একাধিক ছবি সামনে এসেছে। জাহাঙ্গীর খানের স্ত্রীর করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেছেন, কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, কোনো ব্যক্তির মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ফলতার তৃণমূল নেতা ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ফলতার পুনর্নির্বাচনের পর থেকে বেপাত্তা ছিলেন জাহাঙ্গীর। পরে নেপাল সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা রয়েছে, তা জানতে চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তার স্ত্রী রেজিনা বিবি। পাশাপাশি কোমরে দড়ি পরিয়ে প্যারেড করানোর অভিযোগ করা হয়।

বিচারপতি বলেন, কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারি আইনজীবী তখন বলেন, কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানোর বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েও অনেক কিছু করা যায়। পুলিশের থেকে রিপোর্ট নিয়ে আমি আমার বক্তব্য রাখব। রাজ্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি জানান, জাহাঙ্গীর খানের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় এমন কোনো পদক্ষেপ করা যাবে না।

ধৃতের কোমরে দড়ি পরানো নিয়ে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, আমরা তো বারবার বলছি, কেউ অপরাধ করে থাকলে, দেশের যে আইন রয়েছে, সেই আইনের অধীনে বিচার হবে। তার বদলে কারও অপরাধ কী জানা গেল না, কেউ কাউকে দাগিয়ে দিল, তার পর তার ওপর হামলা করা, নিগ্রহ করা, জামাকাপড় খুলিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া। এটার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বাহুবলী ক্ষমতার গ্যালারি শো রয়েছে। কিন্তু, তার সঙ্গে সেই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কী দোষ করেছিল, দোষী হলে দেশের আইনে তার কী শাস্তি প্রাপ্য, তার সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।

এদিকে বাংলার জেলায় জেলায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দলত্যাগ করে বসে যাচ্ছেন। তবে সবারই লক্ষ্য বিজেপির দয়াদাক্ষিণ্যের দিকে। শুভেন্দু অধিকারী বাহিনী যদি তাদের পদ্মাসনে বসার সুযোগ দেন, তাহলে তারা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ যাকে জেলার শীর্ষপদ দিচ্ছেন, পরদিনই তিনি বলছেন, তার নাকি ‘ভীষণ শরীর খারাপ’। এই অজুহাতেই দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন মমতার একসময়ের প্রিয় সঙ্গীসাথীরা।

জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা বালু যেমন তার মধুমেয় রোগের কথা জানিয়ে দলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তেমন নরেনও শারীরিক অসুস্থতার কথাই উল্লেখ করেছেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠিতে। ভোটে বিপর্যয়ের পরে সংগঠনে মমতা যে রদবদল করেছিলেন, সেখানে দলের জাতীয় কর্মসমিতিতে রাখা হয়েছিল বালুকে। আবার নরেনকে দেওয়া হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ জেলার সভাপতির পদ। তারা দুজনেই পদ ছেড়ে দিয়েছেন। আবার রদবদলের ঋতব্রতের বদলের শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মলয়। তার ভাই যোগ দিয়ে দিলেন ঋতব্রতের সঙ্গে। ফলে শুক্রবার সবদিক থেকেই মমতা ধাক্কা খেলেন।

শুক্রবার তিনি বিদায় নিলেন। কোন ঢেউ এসে বালুর নাম মুছে দিল বোঝা কঠিন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই মমতার সঙ্গে রয়েছেন ছিলেন খড়গপুরের প্রদীপ সরকার। ২০১৯ সালে খড়গপুর সদরে দিলীপ ঘোষের ছেড়ে যাওয়া আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন। সেই জয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। গত মঙ্গলবার জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের সময় প্রদীপকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পরের দিনই দলকে চিঠি লিখে প্রদীপ জানিয়ে দিয়েছেন এই দায়িত্ব পালনে তিনি অপারগ। পূর্ব বর্ধমানের দুই নেতা গত দুই দশক ধরে মমতার আস্থাভাজন; রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং স্বপন দেবনাথ। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে মমতা যখন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে টানা ধর্নায় বসেছিলেন, সেই পর্বে বর্ধমান থেকে পালা করে লোকলস্কর পাঠানোর ভার নিয়েছিলেন রবি। সেই সাংগঠনিক জোরই মমতার খাতায় তার নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিল। একে একে সবাই যখন তাকে ছেড়ে যাচ্ছে, তখন ভরসা করে রবিকে পূর্ব বর্ধমান জেলা সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পদ ফিরিয়ে রবি বুঝিয়ে দিলেন, তিনিও আর মমতার সঙ্গে নেই। কংগ্রেসে তিনি যখন কোণঠাসা, তখন তাকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান করেছিলেন মমতা, আবদুল মান্নানদের আপত্তি গ্রাহ্য না করে। তার পর জোড়া খুনের মামলায় নাম জড়ায় মানসের। দল ছেড়ে তৃণমূলের যোগ দিতেই হইচই বন্ধ হয়ে যায় সেই মামলা ঘিরে। মানসকে প্রথম রাজ্যসভায় পাঠান মমতা, তার পর রাজ্যের মন্ত্রী। এবারের ভোটে খাসতালুক সবংয়ে হেরে মন ভেঙে গিয়েছে মানসের। মমতাকে ত্যাগ দিয়েছেন, রাজনীতিকে নয়। গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে মালদহের ভূতনির চর বিপন্ন, তার চেয়েও করুণ দশা তৃণমূলের সংসদীয় দলের। ২০ জন সাংসদ তৃণমূল থেকে বেরিয়ে মিশে গিয়েছেন নতুন দল এনসিপিআইতে। যারা গেছেন, তাদের অধিকাংশের সঙ্গেই মমতার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। যেমন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝে তার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল মমতার, দল ছেড়েছিলেন। আবার ফিরে এসে সাংসদ হয়েছেন। সুদীপের স্ত্রী নয়নাকে বিধায়ক করে সুসম্পর্কের প্রতিদান দিয়েছেন মমতা। শেষ মুহূর্তে সুদীপ কীভাবে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন, তৃণমূলের অনেকের কাছে সেটা এখনো বিস্ময়। একই কথা খাটে কাকলি ঘোষ দস্তিদার সম্পর্কে। মমতার সঙ্গে তার চার দশকের যোগাযোগের কথা নিজেই বলেছেন কাকলি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন দলের ঝামেলা, তখন কাকলিকে সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক করেছিলেন মমতা। আর এখন কাকলি তো দল ছেড়েছেনই, বিয়েতে দেওয়া মমতার উপহারও ফিরিয়ে দিচ্ছেন কাকলির ছেলে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

ছায়া বৃক্ষের নীরব বিদায়

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
ছায়া বৃক্ষের নীরব বিদায়
রাজেকুজ্জামান রতন

এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন। একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।...

নিঃশব্দে চলে গেলেন প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক। সারাজীবন সরব ছিলেন প্রতিটি প্রশ্নে, ব্যাখ্যা করেছেন, নিজের মতো তুলে ধরেছেন, ভাবিয়েছেন চারপাশের মানুষকে। আর শোনা যাবে না তার বেদনা আর বিষাদে মেশানো কণ্ঠস্বর। তার বেদনা শ্রোতাদের হতাশ করত না বরং ভাবিয়ে তুলত, জাগিয়ে রাখত এবং এই প্রত্যয় তৈরি করত যে, বেদনার কারণগুলো দূর করতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা একাডেমিতে, টিএসসিতে, জাদুঘরে কিংবা প্রকাশ্য সভায় আর কখনো আমরা শুনব না ইতিহাস ও রাজনীতির বিশ্লেষণ, তীব্র সমালোচনা আর ভবিষ্যতের আশাবাদ মেশানো তার অনবদ্য আলোচনা। তার হার না মানা জীবন ছিল আমাদের অনেকের কাছে সাহসের দৃষ্টান্ত। কণ্ঠস্বরের তীব্রতার চাইতেও যুক্তির শক্তি যে প্রবল ছাপ ফেলে তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। ক্লাসে এবং আলোচনাসভায় যারা তার কথা শুনেছেন তারাই স্বীকার করবেন যে, তার যুক্তিধারা প্রভাবিত করেছে তার ছাত্র ও শ্রোতাদের।

সংখ্যার হিসাবে তার বয়স ছিল ৮৫ বছর। কিন্তু কর্তব্যবোধ দ্বারা তাড়িত মানুষের কাছে বয়স কেবলমাত্র সংখ্যা। মানুষের জীবন তাদের কাছে দেওয়া এবং নেওয়ার সংযোগ সেতু। সমাজের কাছ থেকে নিয়ে যে জীবন গড়ে ওঠে, বিকশিত হয় সেই জীবনকেই আবার ব্যয় করতে হয় সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে। ফলে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ মানুষের তো বয়স হিসাব করার সময় থাকে না বরং কতটা কাজ বাকি আছে, কতটা পথ আরও চলতে হবে সেই ভাবনা তাদের অনুক্ষণ তাড়া করে। তাদের জীবনে কি ব্যর্থতা আসে না? ব্যর্থ হয়ে মুষড়ে পড়া নয় বরং কারণ খুঁজে তা জেনে পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে দেওয়া তারা কর্তব্য মনে করেন। তাদের কাছে হতাশা এক ধরনের মধ্যবিত্তসুলভ বিলাসিতা। সে কারণেই হতাশার কাছে পরাস্ত হওয়া নয়, হতাশাকে পরাজিত করার দৃঢ়তা ছিল তার জীবনব্যাপী।

হতাশ হওয়ার মতো ঘটনা কি তার জীবনে আসেনি? কিন্তু এ ব্যাপারে তার চিন্তা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকে হতাশ হতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, মানুষ অনেক সময়ই সংকটে পড়ে। আবার সেই সংকট অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যাওয়ার জন্য প্রথমে কিছু মানুষ চেষ্টা শুরু করে। পরে বহু মানুষ তাতে যুক্ত হয়। সংকটও কেটে যায়। কিন্তু জীবনধারার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক সংকট কেটে গেলে আরেক সংকট সামনে আসে। সমস্যার সমাধান করে যাওয়াই মানুষের কাজ।’ সমস্যা আসবে এবং সমাধানের পথও বের করতে হবে। সমাজের অভ্যন্তরের এই শক্তিতেই তো সমাজ এগিয়ে চলে। কোনো নির্দিষ্ট দলের সদস্য না হলেও তিনি মার্কসবাদী–এই চিন্তা দ্বারাই সমাজ ও জীবনকে বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থনীতি সমাজের ভিত্তি, তার ওপর গড়ে ওঠে রাজনীতি, সংস্কৃতি, একটা অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা। সমাজ যেমন পরিবর্তিত হয়, জীবনও তেমনি এগিয়ে চলে আর সংস্কৃতিরও থাকে গতিময়তা। ফলে শিকড়বিহীন হওয়া নয়, আবার কোথাও আটকে থাকারও বিরোধীও ছিলেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘সংস্কৃতি তো একটা বিমূর্ত ধারণা। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, জাতিতে-জাতিতে এই ধারণার ভিন্নতা আছে। ব্যক্তি ও জাতির পুরো কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। অনেকে গান-নাচ-নাটক-বিনোদন–এসবের মধ্যেই সংস্কৃতিকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এ বাস্তবতায় বলতে পারি, বাংলাদেশে জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান আমলে নানা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি প্রকাশ পেয়েছে।’ 

স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, সে সম্পর্কেও তার বক্তব্য ছিল যুক্তি দ্বারা পুষ্ট। আবেগের বাষ্পে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি ঝাঁপসা হতে দেননি। কীভাবে শাসকরা ভূখণ্ড ভাগ করার আগে মনোজগতে বিভক্তি আনে তা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছেন। যেভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে তার যুক্তি অনস্বীকার্য। তিনি বলেছেন, ‘এ ভূখণ্ডে একসময় হিন্দু সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী রূপ পায়। পরিণতিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। তবে পাকিস্তানবাদীরা চেষ্টা করেছিলেন একটি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ এবং পাকিস্তানি জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। এর বিপরীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা। সেই সংস্কৃতি ছিল প্রতিবাদী। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–এসবকিছুর মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি ও স্বাধীন বাংলাদেশ।’ লাখো মানুষের জীবন ও সংগ্রামে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত তা তিনি যুক্তিতে ও মননে লালন করতেন।

স্বাধীন দেশের মানুষের জীবনে ও সংস্কৃতিতে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছেনি কেন, সে বেদনা তাকে কষ্ট দিয়েছে সবসময়। স্বাধীনতার বয়স বেড়েছে কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি মানুষ যে বঞ্চিত বা প্রতারিত হচ্ছে, সে কথা বলার পরিবেশটাও যেন নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। গভীর বেদনায় তাই তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে, স্বাধীনভাবে যারা চিন্তা করতে চান, তারা সেটা করার কোনো সাহসই পাচ্ছেন না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন করা হয়েছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে জননিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের আইন তৈরি করা কিংবা জারি রাখার চেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যারা উন্নত চিন্তাচেতনার চর্চা করেন, তাদের জন্য স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে সব দলেরই রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা লাভবান হবেন। চিন্তা দমনের নীতি কারও জন্যই ভালো হয় না।’ তার সতর্কবাণী শাসকদের কানে যায়নি কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি, চেষ্টা চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। এ ক্ষেত্রে তিনি এক অনুকরণীয় চরিত্র।

যেকোনো জাতির ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ আর নেই। অতীতের সাফল্য যেমন গর্বের, ব্যর্থতা তেমনি সতর্কতার। সাফল্যের মতো ব্যর্থতারও কারণ আছে। তাই তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায়, ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষা নিতে চায় না। বাংলাদেশ এখন যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে, তার পরিবর্তন ও উন্নতির জন্য প্রায় দেড় হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনীতির চর্চা একান্ত দরকার।’ পরিকল্পিতভাবে যুবসমাজের মধ্যে অতীত অস্বীকার বা অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার যে মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে সেই বিপদ তিনি বুঝতে পেরে সতর্ক করেছেন।

বিদ্বেষ এবং বিভক্তি অনেক ভালো উদ্যোগকে ধ্বংস করে দেয়। যে তরুণরা আগামীর দেশ গড়বে সেই তরুণদের প্রতি তার আন্তরিক পরামর্শ ছিল, ‘দৃঢ়চিত্ত তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অথচ এখানে ঐক্যের একান্ত অভাব। কেউ কাউকে মানতে চায় না। সংগঠন গড়ে তোলার জন্য একটা ক্ষমতাকাঠামোর প্রয়োজন হয়। দেখা যায় যে সভাপতি প্রার্থীর জন্য একসঙ্গে অনেকেই থাকেন। সংগঠনের একজন সভাপতি হলে বাকিদের তাকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্য যে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন প্রয়োজন গত ৫০ বছরেও তা দেখা যায়নি।’ তার এই উচ্চারণ ছিল বেদনার। তিনি প্রাণপনে চাইতেন তরুণরা এগিয়ে আসুক এবং নীতির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকুক।

বেদনা তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। তার প্রিয় সন্তানকে সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থিরা হত্যা করেছিল। কষ্ট বুকে চেপে তিনি সন্তানের নৃশংস হত্যা দেখেছেন কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি কারণ তিনি জানতেন তা হবে বিচারের নামে প্রহসন। বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন দেশের জনগণের শুভ বুদ্ধির কাছে। এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন।

একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার হবে কবে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার হবে কবে
মাসুদ আহমেদ

একজন বিশিষ্ট পত্রলেখক সম্প্রতি এই কাগজের পাতায় বিভিন্ন ভরাট ও দখল করা খাল পুনরুদ্ধার করার নানা উপকারিতা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ঢাকা শহরে, মরহুম স্থপতি মোবাশ্বির হাসানের মতে, খালের সংখ্যা ছিল ১৭৩। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার মতেও কমবেশি এ সংখ্যা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে উল্লিখ করা হয়েছে। শহরের যেসব স্থানে, ধরা যাক ১৯৭০ সাল থেকেই এসব খাল বিদ্যমান ছিল, সেসব স্থানে এগুলোর কাজ ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং আশপাশের বিভিন্ন জনবসতিতে পতিত বৃষ্টির পানি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে মূলত বুড়িগঙ্গা নদীতে পৌঁছে দেওয়া। ফলে শহরের কোথাও কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। এ ছাড়া খালের পাশে সবুজ বনানী, অবকাশ যাপনের জন্য পার্ক এবং খালের পানিতে নানাবিধ দেশজ মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণী বিচরণ করে নগরে তাপ, অক্সিজেন, ছায়া ইত্যাদির চমৎকার ভারসাম্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ করত।

বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরের চারদিকের বিভিন্ন জেলা থেকে জীবন ও জীবিকা যাপনের লক্ষ্যে আরও মানুষ প্রবেশের ফলে খালগুলোর একাংশ ক্রমে ভরাট হয়ে পড়ে। আরেক বৃহৎ অংশ পূর্ণ হয় এই বর্ধিত জনসংখ্যার উৎপাদিত গৃহস্থালি ও অন্যান্য শক্ত বর্জ্য ফেলার কারণে। তার পরও কোনো কোনো খালের মধ্যাংশে ক্ষীণকায়া পানির স্রোত বহন করে তাদের পূর্ব স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করে চলছিল। শহরের জনসংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ ৩ কোটি ২৬ লাখে উন্নীত হওয়ায় এসব খালবিলের ভগ্নাবশেষও আর তাদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। সর্বত্রই হয়েছে নির্মাণকাজ। ইট, পাথর, সিমেন্ট, রড, লোহা, প্লাস্টিক, রাবার, পলিথিন ইত্যাদির মহাসম্মেলনে এসব খালকে পূর্ণ আবৃত করে প্রথমত নানা ধরনের ভবন তৈরি হয়। চাহিদার কারণে রিহ্যাব কোম্পানির শুভাগমনের পর, আগে যে স্থানে এক বা দোতলা বাড়িতে ১০ জন মানুষ বসবাস করতেন সেখানে আকাশচুম্বী ২৬, ৩২, ৪০ এমনকি ৫২ তলা ইমারত, টাওয়ার ও ভবন নির্মিত হয়েছে। সেখানে বসবাস করছেন এই ৩ কোটি ২৬ লাখ মানুষের একটি বৃহৎ অংশ। সেখানে সংযুক্ত হয়েছে পয়ো, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অন্তর্জালের বিশাল বিশাল টাওয়ার। অল্প স্থানে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সংস্থাপন হওয়ার ফলে কাঁচা মাটি, অনাবৃত স্থানের মতো কোনো কিছু আর অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগও খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তেমনি বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম আয়তনের ড্রেন তৈরি করতে হয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত স্থান ছিল না। সেখানে স্তূপীকৃত বর্জ্য আর নড়ছে না। তেমনি বৃষ্টির পানিও না সরতে পারার ফলে আধা ঘণ্টার বারিপাতেই সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধপূর্ণ জলাবদ্ধতা। পয়োবর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং চিকিৎসাবর্জ্য একসঙ্গে মিলিত হয়ে তরল ও ঘনীভূত স্রোত এমনকি নিউমার্কেটের মতো চমৎকার এলাকাটিতেও বুকপর্যন্ত উঠে আসছে। নগরবিদ ও স্থপতিদের মতে, ভরাট খালগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে হবে।

প্রথমত, প্রত্যেক মালিক তাদের মালিকানা আইনত প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতিতে নিজ নামীয় খারিজ খতিয়ান ও দলিল রেজিস্ট্রির মতো একান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাগজ সরকারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জারি করেছেন। এ ছাড়া অনেকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। উত্তরাধিকারীর নামে এই সম্পত্তির বা এর অংশবিশেষ হস্তান্তর করেছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগের সমুদয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। ভূমি কর, পৌর কর এবং আয়কর পরিশোধের পদ্ধতিতে এই সম্পত্তির নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু এই খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত সম্পত্তিগুলোকে অবৈধ প্রমাণ করে উৎখাত করা ছাড়া খালটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত গন্তব্য হচ্ছে এই ভূমিকে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে প্রত্যাবর্তন করানো। যার অর্থ একটি রিসেট বাটনে চাপ দিতে হবে। যার মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি, খারিজা পর্চা, কর পরিশোধ–এই তিনটি মৌলিক প্রক্রিয়াকে আইনত অকার্যকর করতে হবে। দেশে গড়ে ১১টি শুনানি ছাড়া কোনো ভূমির সেটেলমেন্ট স্থির করা যায় না। এ ছাড়া দখল করা খালের ওপর কারখানা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মোটরগাড়ির কারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, দরগাহ, সিনেমা হল, ক্লাব, বিপণিবিতান ইত্যাদিও রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে ধর্মীয় সহানুভূতিসম্পন্ন স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করতে হবে, যা ওয়াকফ আইনের পরিপন্থি। এমনিতে সাধারণভাবে ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত বৈধতা বা অবৈধতা আদালতে প্রমাণ করতে এমনকি ৩২ বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

কথা হলো ১৭৩টি খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বেআইনি দখল, নির্মাণ ও হস্তান্তর-সংক্রান্ত কাজগুলো অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে কত বছর সময় লাগবে? তা বিবেচ্য। ক্রেতাদের মধ্যে আইনপ্রণেতা, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী এবং সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালীও রয়েছেন। রয়েছেন রেজিস্ট্রেশন ও ভূমি অফিসের পদস্থ ব্যক্তিরা। তাদের উপস্থিতিতে কোনো কর্তৃপক্ষ এই কর্মসম্পাদন করতে পারবেন কি না, তা বিবেচ্য। এক নম্বর খাস খতিয়ানকে ব্যক্তিগত ভূমি হিসেবে প্রথমত যারা বিক্রি করেছেন সময়ের দীর্ঘ পরিসরে তারা অনেকে মৃত, অনেকে বিদেশে বসবাসরত। অন্যদিকে ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সিংহভাগ অবসরে গেছেন। তাদেরও শনাক্ত করা একটি তুঘলকি কারবার হবে। আর রাজউকের যেসব কর্মকর্তা এসব নির্মাণের নকশা ও পরিকল্পনা অনুমোদন এবং নির্মাণ তদারকি করেছেন তাদের অধিকাংশই হয় মৃত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত। অথচ দায়ী প্রত্যেকেই। অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রের কোয়ারসিভ বা বলপ্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এদের উৎখাত করতে গেলে কিংবা আদালতে মামলা করলে হাইকোর্টের একটি বাধার সম্মুখীন হতে হবে। যাতে বলা আছে দখল করা ভূমির প্রকৃতি যাই হোক উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কাউকে তার দখল করা স্থান থেকে উৎখাত করা যাবে না। কাজেই জলাবদ্ধতা, ছায়া, গাছপালা, তথা সুন্দর পরিবেশের চেয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।

খাল পুনরুদ্ধার করতে হলে খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় সমাহিত যে মাটিসহ বিভিন্ন বর্জ্য রয়েছে সেগুলো খনন করতে হবে। এগুলো এবং বহুতল স্থাপনাগুলো ভেঙে অপসারণ করতে হবে। এই বর্জ্য এবং ভগ্নাবশেষ রাখার শূন্যস্থান কোথায় আছে তাও নির্ণয় করতে হবে। ১৭৩টি খাল থেকে খনন করা এবং প্রাপ্ত এই বর্জ্যের আয়তন কয়েক লাখ ঘনফুট হবে। এই খরচ এবং শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আবার সময়ের দীর্ঘ পরিসরে হস্তান্তর, বিক্রয় ইত্যাদি সূত্রে যে উত্তরাধিকারীদের উত্থান হয়েছে তাদের দাবি বা প্রমাণ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ এবং নতুন করে বসবাসের জমি দিতে হবে। আমাদের বাজেট প্রতি বছরই ডেফিসিট। সামান্য ৫ কাঠা, ১০ কাঠা, হুকুম দখল করা জমির ক্ষতিপূরণ মামলা নিষ্পত্তি করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেগুলোর ক্ষতিপূরণ দিতে গড়ে ১০-১২ বছর লাগে। যেমন কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েক হাজার পরিবারের দখল করা ভূমির ক্ষতিপূরণ ৬৭ বছরেও পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে দিতে পারেনি।

খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে করা প্রয়োজন, সে প্রসঙ্গে অগ্রগতি তো দূরের কথা ১৯৭২ সাল থেকে তাতে অধোগতি হয়েছে। সর্বশেষ পরিবেশ উপদেষ্টাকে এ বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি জলাশয়ও উদ্ধার করতে না পারলেও অন্তত এ-সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা দিয়ে গেছেন। এই কথাটি একান্ত অসত্য, কারণ ভূমি-সংক্রান্ত যেকোনো নীতিমালা আসলে দিয়ে গেছেন ব্রিটিশ শাসকরা। তারা ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভের (সিএস) মাধ্যমে জমিকে নালা জমি, চালা জমি, বসতভিটা ও পুকুর এবং ওয়াকফ ইত্যাদি শ্রেণিতে ভাগ করে গেছেন। আমরা জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপে সেই সিএস খতিয়ানকে লঙ্ঘন কর জমির যেকোনো শ্রেণির ওপর বসতবাড়ি ও ভবন নির্মাণ করার অনুমতি দিয়েছি। ফলে জলাশয়, পুকুর ও বনভূমি বলে কোনো কিছু আর প্রায় অবশিষ্ট নেই বলেই এই খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। কাজেই নতুন করে কোনো নীতিমালা দেওয়ার আবশ্যকতা নেই। সেই ব্রিটিশদের প্রণীত সিএস খতিয়ান অনুসরণ করাই একমাত্র সমাধান এবং তা করতে হলে এক সন্তানবিশিষ্ট পরিবার গঠন করে জনসংখ্যা জরুরিভাবে হ্রাস করার পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা শহরের খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তেমন একটা সফলতার মুখ দেখবে না।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]