মানুষের ইতিহাসে প্রযুক্তি যেমন সভ্যতার অগ্রযাত্রার অনিবার্য সঙ্গী, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি কখনো কখনো সেই সভ্যতার জন্যই নতুন সংকট ডেকে আনে। আজকের পৃথিবীতে সেই সংকটের নাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একসময় শিশুর হাতে থাকত গল্পের বই, রঙিন পেনসিল, ঘুড়ির সুতা কিংবা ফুটবল। এখন সেই হাতের অধিকাংশ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের আলোকিত পর্দা। মাঠের সবুজ ঘাসের পরিবর্তে তারা স্পর্শ করছে কাচের স্ক্রিন; প্রকৃত বন্ধুত্বের বদলে খুঁজছে ভার্চুয়াল অনুসারী; কল্পনার রাজ্যের পরিবর্তে ডুবে যাচ্ছে অন্তহীন স্ক্রলের অন্ধকারে।
আজকের শিশুরা আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় তথ্যসমৃদ্ধ, কিন্তু তারা কি সমানভাবে কল্পনাশক্তিতে সমৃদ্ধ? প্রযুক্তির বিস্ময়কর সুবিধা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাই যখন নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা সৃজনশীলতা, মনন, সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
বিশ্বজুড়ে গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা এবং আত্মসম্মানবোধের অবক্ষয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিশোর-কিশোরীদের বিকাশমান মস্তিষ্ক বারবার ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়া, চিন্তা করা, লেখা বা নতুন কিছু উদ্ভাবনের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা ব্যবহারকারীর মনোযোগকে যতক্ষণ সম্ভব আটকে রাখে। প্রতিটি লাইক, মন্তব্য কিংবা নোটিফিকেশন মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতায় রূপ নেয়। শিশু-কিশোররা বুঝতেই পারে না কখন তারা নিজের সময়ের মালিকানা হারিয়ে ফেলেছে।
সৃজনশীলতা জন্ম নেয় নির্জনতা, একাগ্রতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনার সংমিশ্রণে। একজন কবি, বিজ্ঞানী, শিল্পী কিংবা উদ্ভাবকের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম উদ্দীপনা মানুষের মনকে খণ্ডিত করে দেয়। এক মিনিটের ভিডিও, কয়েক সেকেন্ডের রিল কিংবা অন্তহীন স্ক্রল ধীরে ধীরে দীর্ঘ মনোযোগের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে। ফলে শিশুরা বই পড়তে বিরক্ত হয়, দীর্ঘ লেখা লিখতে অনীহা বোধ করে, গবেষণামূলক চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক বিনোদনকেই জীবনের স্বাভাবিক অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করে।
বাংলাদেশেও এ পরিবর্তন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম¬–সবখানেই শিশুর হাতে স্মার্টফোন। অনেক অভিভাবক ব্যস্ততার কারণে শিশুকে শান্ত রাখতে ফোন তুলে দেন। প্রথমে এটি সাময়িক সমাধান মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সেটাই হয়ে ওঠে আসক্তির বীজ। পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে থেকেও একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ স্ক্রিনে ডুবে থাকে। পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়, বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এর প্রভাব উদ্বেগজনক। অনলাইন শিক্ষার সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি একই ডিভাইসেই পড়াশোনার পাশাপাশি অবিরাম বিনোদনের দরজাও খোলা। ফলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ পড়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় ব্যয় করছে। পরীক্ষায় মুখস্থ জ্ঞান হয়তো অর্জিত হচ্ছে, কিন্তু বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীল চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এ কারণে বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার আইন পাস করে, যা বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। আইনটির উদ্দেশ্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং অনলাইন ক্ষতি কমানো।
শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, বিশ্বের অন্তত ৭৯টি দেশে বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর পেছনে মূল যুক্তি–শিক্ষার পরিবেশে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা এবং শিশুদের সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী ভাবছে? বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণের অভিযাত্রায় প্রযুক্তি অবশ্যই অপরিহার্য। কিন্তু প্রযুক্তির প্রসার যদি ডিজিটাল শৃঙ্খলার সঙ্গে না আসে, তাহলে উন্নয়নের সুফলই একসময় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে এখনো শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মে বয়সসীমা থাকলেও বাস্তবে তা সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়। ফলে অল্প বয়সেই শিশুরা এমন কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।
এ অবস্থায় কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
প্রথমত, পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে স্মার্টফোন দিয়ে ব্যস্ত রাখার পরিবর্তে তার সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা জরুরি। শিশু তার অভিভাবকের আচরণ থেকেই সবচেয়ে বেশি শেখে। তাই বড়দেরও দায়িত্বশীল ডিজিটাল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শৃঙ্খলা নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। শিক্ষার প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। বিদ্যালয়কে আবারও পাঠাগার, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা ও খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারকে শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বয়স যাচাই ব্যবস্থা, অনলাইন নিরাপত্তা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়ে আধুনিক আইন ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোরও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। শিশুদের মনোযোগকে পণ্যে পরিণত করে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চমত, গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রযুক্তির সুবিধা প্রচার নয়, এর ঝুঁকি সম্পর্কেও ধারাবাহিক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেমন–একসময় ধূমপানের ক্ষতি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমনি আজ প্রয়োজন সুস্থ ডিজিটাল জীবনযাপনের আন্দোলন।
যে শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে, সে হয়তো সাময়িক আনন্দ পাচ্ছে; কিন্তু একই সময়ে সে হারিয়ে ফেলছে গল্প কল্পনা করার ক্ষমতা, নতুন প্রশ্ন করার সাহস, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং মানুষের সঙ্গে মুখোমুখি কথোপকথনের দক্ষতা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শিশুদের কল্পনাশক্তি। সেই কল্পনাই যদি স্ক্রিনের অ্যালগরিদমের কাছে বন্দি হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতের উদ্ভাবক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী কিংবা দার্শনিক কোথা থেকে আসবে?
একটি জাতি কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উন্নত হয় না; উন্নত হয় তখনই, যখন তার শিশুরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে, বইয়ের গন্ধ চিনতে শেখে, মাঠের ঘাসে দৌড়াতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, স্বপ্ন দেখতে শেখে।
আমরা যদি আজ তাদের হাতে কেবল একটি স্মার্টফোন তুলে দিই, অথচ একটি বই, একটি মাঠ, একটি গাছ, একটি আকাশ কিংবা একটি মুক্ত শৈশব ফিরিয়ে দিতে না পারি–তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। স্ক্রিনে বন্দি শৈশব কোনো ডিজিটাল অর্জন নয়; এটি সভ্যতার জন্য এক নীরব সতর্কবার্তা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়–আমরা কি অ্যালগরিদমের কাছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে সমর্পণ করব, নাকি প্রযুক্তিকে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রেখে সৃজনশীল, মানবিক ও মুক্ত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের মানচিত্র।
লেখক: লেখক ও কবি
[email protected]

