পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর কোথাও তোলাবাজির অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগে কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ছবি সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ধৃতকে কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়।...

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে পালটে যাচ্ছে অনেককিছুই। অভ্যাসও পাল্টাচ্ছে, পালটে যাচ্ছে প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদ জানাতে, ধিক্কার জানাতে সম্প্রতি তৃণমূলকর্মীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। বাদ পড়েননি তৃণমূল কংগ্রেসের যুবরাজ তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কুণাল ঘোষ, স্বরূপ বিশ্বাসসহ এক সময়ের হেভি ওয়েট সব নাম। শুধু কি তাই? টালিপাড়ার সিনেমা জগতের কোন্দলেও ছোড়া হয়েছে ডিম, টম্যাটো। এই সংস্কৃতিকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না সোনারপুর দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক, তথা বাংলার সিনিয়র অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়।
রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ডিম ছোড়াটা আমার কাছে এখন অবধি সুস্থ সমাজের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে না। ওটা আমার একেবারেই ভালো লাগছে না। এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেদের বড্ড নীচে নামিয়ে এনেছি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষ এতকাল রাজনীতিনির্ভর ছিলেন। তাদের অর্থ, তাদের জীবন, খাওয়া-পরা সবই হয়ে উঠেছিল রাজনীতিনির্ভর। আজ তোলাবাজি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই কিছু একটা করে তো হল্লা করতে হবে। শান্তভাবে আর ভদ্রভাবে চলা, ঠিকভাবে গাড়ি পার্ক করা এগুলো যারা করেন তাদের ন্যাকা আখ্যা দেওয়া হয়। কেউ ভালোভাবে কথা বললে তাকে ন্যাকা বলা হয়। ভালোভাবে কথা বললে সে নাকি অভিনয় করছে, এমনটাই মনে করা হয়। সমাজ তো আর বাইরের জগৎ থেকে কেউ এসে পালটে দিতে পারে না।’
রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ট্রোল করা প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, ‘উনি তিনবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। ওর রাজনৈতিক দলের ভাঙন অবশ্যম্ভাবী ছিল। দল ভেঙে গেছে কি না গেছে, সেগুলো আলাদা বিষয়। আদর্শ ছিল না, তাই এটা হওয়ার ছিল। প্রথম বছরের পর থেকে উনি দলকে সামলে রাখতে পারেননি। নির্বাচনে জেতার জন্য এমন কাজ করেছেন, যার ফলে দলে অনেক বেনো জল ঢুকে গিয়ে সবটা শেষ করে দিল। উনি দলকে কন্ট্রোল করতে পারেননি, এটা অন্য বিষয়। কিন্তু উনি তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী, এটাও সত্যি কথা। ওর সম্বন্ধে কথা বলতে গেলে একটু সমঝে, বুদ্ধি করে, সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে আমরা বাধ্য। আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী নিজেকে এমন কোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারি না, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের বাইরের লোক আমাদের খারাপ ভাববে, পরিহাস করবে।’
পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর কোথাও তোলাবাজির অভিযোগে কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগে কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ছবি সামনে এসেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ধৃতকে কোমরে দড়ি পরিয়ে রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। ফলতার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী ধৃত জাহাঙ্গীর খানেরও এমন একাধিক ছবি সামনে এসেছে। জাহাঙ্গীর খানের স্ত্রীর করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেছেন, কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, কোনো ব্যক্তির মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ফলতার তৃণমূল নেতা ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ফলতার পুনর্নির্বাচনের পর থেকে বেপাত্তা ছিলেন জাহাঙ্গীর। পরে নেপাল সীমান্ত থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা রয়েছে, তা জানতে চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তার স্ত্রী রেজিনা বিবি। পাশাপাশি কোমরে দড়ি পরিয়ে প্যারেড করানোর অভিযোগ করা হয়।
বিচারপতি বলেন, কোনো অভিযুক্তের কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো কখনই আইনত সমর্থনযোগ্য নয়। সরকারি আইনজীবী তখন বলেন, কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানোর বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েও অনেক কিছু করা যায়। পুলিশের থেকে রিপোর্ট নিয়ে আমি আমার বক্তব্য রাখব। রাজ্যের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি জানান, জাহাঙ্গীর খানের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় এমন কোনো পদক্ষেপ করা যাবে না।
ধৃতের কোমরে দড়ি পরানো নিয়ে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, আমরা তো বারবার বলছি, কেউ অপরাধ করে থাকলে, দেশের যে আইন রয়েছে, সেই আইনের অধীনে বিচার হবে। তার বদলে কারও অপরাধ কী জানা গেল না, কেউ কাউকে দাগিয়ে দিল, তার পর তার ওপর হামলা করা, নিগ্রহ করা, জামাকাপড় খুলিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়া। এটার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বাহুবলী ক্ষমতার গ্যালারি শো রয়েছে। কিন্তু, তার সঙ্গে সেই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কী দোষ করেছিল, দোষী হলে দেশের আইনে তার কী শাস্তি প্রাপ্য, তার সঙ্গে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই।
এদিকে বাংলার জেলায় জেলায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দলত্যাগ করে বসে যাচ্ছেন। তবে সবারই লক্ষ্য বিজেপির দয়াদাক্ষিণ্যের দিকে। শুভেন্দু অধিকারী বাহিনী যদি তাদের পদ্মাসনে বসার সুযোগ দেন, তাহলে তারা ‘জয় শ্রীরাম’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ যাকে জেলার শীর্ষপদ দিচ্ছেন, পরদিনই তিনি বলছেন, তার নাকি ‘ভীষণ শরীর খারাপ’। এই অজুহাতেই দল থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন মমতার একসময়ের প্রিয় সঙ্গীসাথীরা।
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বা বালু যেমন তার মধুমেয় রোগের কথা জানিয়ে দলের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন, তেমন নরেনও শারীরিক অসুস্থতার কথাই উল্লেখ করেছেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে লেখা চিঠিতে। ভোটে বিপর্যয়ের পরে সংগঠনে মমতা যে রদবদল করেছিলেন, সেখানে দলের জাতীয় কর্মসমিতিতে রাখা হয়েছিল বালুকে। আবার নরেনকে দেওয়া হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ জেলার সভাপতির পদ। তারা দুজনেই পদ ছেড়ে দিয়েছেন। আবার রদবদলের ঋতব্রতের বদলের শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মলয়। তার ভাই যোগ দিয়ে দিলেন ঋতব্রতের সঙ্গে। ফলে শুক্রবার সবদিক থেকেই মমতা ধাক্কা খেলেন।
শুক্রবার তিনি বিদায় নিলেন। কোন ঢেউ এসে বালুর নাম মুছে দিল বোঝা কঠিন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই মমতার সঙ্গে রয়েছেন ছিলেন খড়গপুরের প্রদীপ সরকার। ২০১৯ সালে খড়গপুর সদরে দিলীপ ঘোষের ছেড়ে যাওয়া আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন। সেই জয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। গত মঙ্গলবার জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের সময় প্রদীপকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পরের দিনই দলকে চিঠি লিখে প্রদীপ জানিয়ে দিয়েছেন এই দায়িত্ব পালনে তিনি অপারগ। পূর্ব বর্ধমানের দুই নেতা গত দুই দশক ধরে মমতার আস্থাভাজন; রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং স্বপন দেবনাথ। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে মমতা যখন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে টানা ধর্নায় বসেছিলেন, সেই পর্বে বর্ধমান থেকে পালা করে লোকলস্কর পাঠানোর ভার নিয়েছিলেন রবি। সেই সাংগঠনিক জোরই মমতার খাতায় তার নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিল। একে একে সবাই যখন তাকে ছেড়ে যাচ্ছে, তখন ভরসা করে রবিকে পূর্ব বর্ধমান জেলা সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পদ ফিরিয়ে রবি বুঝিয়ে দিলেন, তিনিও আর মমতার সঙ্গে নেই। কংগ্রেসে তিনি যখন কোণঠাসা, তখন তাকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান করেছিলেন মমতা, আবদুল মান্নানদের আপত্তি গ্রাহ্য না করে। তার পর জোড়া খুনের মামলায় নাম জড়ায় মানসের। দল ছেড়ে তৃণমূলের যোগ দিতেই হইচই বন্ধ হয়ে যায় সেই মামলা ঘিরে। মানসকে প্রথম রাজ্যসভায় পাঠান মমতা, তার পর রাজ্যের মন্ত্রী। এবারের ভোটে খাসতালুক সবংয়ে হেরে মন ভেঙে গিয়েছে মানসের। মমতাকে ত্যাগ দিয়েছেন, রাজনীতিকে নয়। গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে মালদহের ভূতনির চর বিপন্ন, তার চেয়েও করুণ দশা তৃণমূলের সংসদীয় দলের। ২০ জন সাংসদ তৃণমূল থেকে বেরিয়ে মিশে গিয়েছেন নতুন দল এনসিপিআইতে। যারা গেছেন, তাদের অধিকাংশের সঙ্গেই মমতার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। যেমন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝে তার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল মমতার, দল ছেড়েছিলেন। আবার ফিরে এসে সাংসদ হয়েছেন। সুদীপের স্ত্রী নয়নাকে বিধায়ক করে সুসম্পর্কের প্রতিদান দিয়েছেন মমতা। শেষ মুহূর্তে সুদীপ কীভাবে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন, তৃণমূলের অনেকের কাছে সেটা এখনো বিস্ময়। একই কথা খাটে কাকলি ঘোষ দস্তিদার সম্পর্কে। মমতার সঙ্গে তার চার দশকের যোগাযোগের কথা নিজেই বলেছেন কাকলি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন দলের ঝামেলা, তখন কাকলিকে সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক করেছিলেন মমতা। আর এখন কাকলি তো দল ছেড়েছেনই, বিয়েতে দেওয়া মমতার উপহারও ফিরিয়ে দিচ্ছেন কাকলির ছেলে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

