আবুল কাসেম ফজলুল হকের ওপর লিখতে গিয়ে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। তিনি শোষিত মানুষের সংগ্রামের কথা বলতেন, লিখতেন। সেটা ছিল তার চিন্তার একান্ত ভুবন। তিনি তার মত ও পথ থেকে পিছপা হননি। স্বদেশ ভাবনা ও নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তায় তিনি ছিলেন ঋদ্ধ, ছিলেন আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক ও সমাজ সচেতন। বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চায় তার অবস্থান অনস্বীকার্য। তিনি নিজের আলোয় বিকশিত হয়েছেন, এখানেই তিনি স্বতন্ত্র।...
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তার জীবন ও কর্মে সুপরিচিতি। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তার পরিচয় কেবলই শিক্ষকতায় থেমে থাকেনি, কর্মসাধনার গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশিষ্ট সমাজচিন্তক, লেখক ও গবেষক, যার প্রভা ছড়িয়েছিল সমাজের নানা স্তরে। ৮৬ বছর বয়সে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি ৫ জুলাই। মৃত্যুর আগে বছর দুয়েক বাংলা একাডেমির সভাপতির পদে আসীন হয়েছিলেন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় সন্ধিক্ষণে।
তার আকস্মিক মৃত্যুর খবরটি বেশ বেদনাদায়ক, যা সবাইকে ব্যথিত করেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, আবুল কাসেম ফজলুল হক দেহত্যাগ করেছেন, খুব একটা অপরিণত বয়সে নয়, তিনি ছেড়ে গেছেন তার ৮৬ বছরের জীবন, যে জীবনকে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন নিজের একান্ত বিশ্বাস ও বিচার-বিশ্লেষণে। এভাবে পথ চলার পক্ষ যেমন থাকে, থাকে শক্ত প্রতিপক্ষও। এই কৃতী অধ্যাপক ছিলেন একাধারে প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও সমাজবিশ্লেষক। ১৯৪০ সাল থেকে জীবনের যে যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন সে যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে ২০২৬ সালে।
আমার পেশাগত জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়, যেখানে প্রয়াত বন্ধুবর প্রাবন্ধিক ও কবি সৈয়দ আবুল মকসুদসহ জনাকয়েক মানুষ আমরা সাংবাদিকতা পেশার বাইরেও গড়ে তুলেছিলাম সাহিত্য ও সমাজচিন্তার একটি ছোট্ট জগৎ। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তরকালে, সেই ১৯৭০-এর দশক থেকেই আমরা ম্যাগাজিন প্রকাশ করতাম, মন খুলে লিখতাম, জীবন ও সমাজ নিয়ে ভাবতাম। যদিও রাজনৈতিক ভাবনার জগতে আমি ও সৈয়দ আবুল মকসুদ অনেক সময়েই এক অবস্থানে থাকতে পারিনি, মত ও পথের প্রার্থক্য হয়েছে, তথাপি ব্যক্তিগত জীবনে আমরা কখনো একজন আরেকজনের কাছ থেকে দূরে সরে যাইনি, বন্ধুই থেকেছি। রাজনীতি-দর্শন বিবেচনায় সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হকের কাছের মানুষ, সেই সুবাদে তাদের ঘনিষ্ঠতাও গড়ে ওঠে।
দেখাশোনার সুবাদে আমিও পরিচিত হই, সময়ে-অসময়ে নানা কথাবার্তা ঘটে, কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব, পুরানা পল্টনের বাস ভবন কিংবা অন্যত্র। আমরা তিনজন একে অপরের চিন্তা ও চেতনা লেনদেন করি, সবকিছুতে সবাই একমত পোষণ করি তা নয়। এভাবেই চলেছে আমাদের ’৮০, ’৯০ ও ২০০০ সাল অব্দি। অবশ্য পরের বছরগুলোতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ভুগেছি আমরা। আজ আবুল কাসেম ফজলুল হকের ওপর লিখতে গিয়ে দিনগুলো মনে পড়ে। মনে পড়ে তিনি রাজনীতির গতানুগতিক ধারার পরিবর্তনের কথা ভাবতেন, নিজস্ব চিন্তায় বামপন্থি মনোভাব পোষণ করতেন, শোষিত মানুষের সংগ্রামের কথা বলতেন, লিখতেন। সেটা ছিল তার চিন্তার একান্ত ভুবন; যা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলা যাবে না। কিন্তু তিনি তার মত ও পথ থেকে পিছপা হননি। এখানেই তার স্বাতন্ত্রতা।
অধ্যাপনার দীর্ঘ জীবনে আবুল কাসেম ফজলুল হক অগণিত শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন, তার সাদামাটা জীবনযাপন ও নীতিবোধ শিক্ষার্থীদের চোখে তাকে বিশেষ আসনে বসিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডির মধ্যেই তিনি নিজেকে বন্ধ রাখেননি, কর্মের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তির নানা অঙ্গনে। নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তায় তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন, গণমানুষের মুক্তি, গণতন্ত্র ও প্রগতির প্রশ্নে নতুন পথ বাতলে কলম ধরেছেন। ‘লোকায়ত’ নামের একটি মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন ১৯৮২ সাল থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান অধ্যাপক ও স্বাধীন চিন্তার বাতিঘর আহমদ শরীফ প্রতিষ্ঠিত ‘স্বদেশ চিন্তা সংঘ’-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন অনেক বছর। ব্যক্তিগত জীবনে নিরহংকারী ছিলেন আবুল কাসেম ফজলুল হক, জীবনবোধে ছিলেন পরিপূর্ণভাবে অসাম্প্রদায়িক; বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ সাদামাটা জীবন–যা ছিল গতানুগতিক প্রথার বাইরে। এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে স্বতন্ত্র আসন করে নেওয়ার কৃতিত্ব ছিল তার।
তার জীবনে একটি বড় আঘাত আসে ২০১৫ সালে। প্রগতিশীল প্রকাশনী জাগৃতির স্বত্বাধিকারী, তার একমাত্র ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন উগ্র ধর্মপন্থিদের নৃসংশ হামলায় নিহত হন এ বছর। ঘটনাটি দেশের মুক্তিযুদ্ধপন্থি মুক্তমনা প্রগতিশীল মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলে, ধর্মান্ধ ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির কুশিলবদের ক্রমবর্ধমান উত্থানে বড় আতঙ্ক দেখা দেয়, চারদিকে হত্যাকারীদের বিচারের জোর দাবি ওঠে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আমি তার পরীবাগের বাড়িতে যাই সমবেদনা জানাতে। কিন্তু তিনি ছিলেন অটল ও ধীরস্থির, সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার চাননি তিনি! তার সেই অবস্থান নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন একজন রাজনৈতিক দার্শনিক, রাষ্ট্র, সমাজ, দর্শন ও মনোবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে তিনি সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে নিজস্ব যুক্তিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার সব লেখা বা সব পুস্তক আমার পড়া হয়নি, সংগ্রহেও নেই, তবে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’ এবং ‘বাঙলাদেশের রাজনীতিতে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা’ পড়েছি। বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতা ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস নিয়েও নিজস্ব মত পোষণ করেছেন তিনি, যার সঙ্গে আমার একমত হওয়া সম্ভব হয়নি।
অনস্বীকার্য, আবুল কাসেম ফজলুল হক তার রাজনৈতিক চিন্তার জগতে স্বতন্ত্র আসন লাভ করেছেন। তার চিন্তা ও তত্ত্ব সর্বগ্রাহ্য হয়েছে–এমনটা হয় না কখনো। বহুবিধ স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি, সম্মাননা লাভ করেছেন। তার স্বদেশ ভাবনা ও নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তায় তিনি ছিলেন ঋদ্ধ, ছিলেন আমৃত্যু অসাম্প্রদায়িক ও সমাজ সচেতন। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিকচর্চায় তার অবস্থান অনস্বীকার্য। আমাদের সমাজের দুর্ভাগ্য যে, আমরা প্রায় সবাই মত ও পথের মুক্ত বিকাশের কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে ভিন্নমত গ্রহণ করতে ব্যর্থ হই, অথচ মত ও পথের ভিন্নতার মধ্যেই সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। আবুল কাসেম ফজলুল হক তার নিজের আলোয় বিকশিত হয়েছেন, এখানেই তিনি স্বতন্ত্র।