গরমকাল ফুরিয়ে যায় যায়। এ সময় হঠাৎ একটা ফুল দেখে মনে হলো তার ফোটা বোধহয় শুরু হয়েছে। এ যেন ‘তোমার হলো শুরু/ আমার হলো সারা’ অবস্থা। গ্রীষ্ম ফুরালেও ফুল ফুরায় না। অলকানন্দা ফুলেরা গ্রীষ্মকালেও ফোটে। তবে বর্ষাকালে ওরা যেন নবধারা জলে স্নান সেরে হয়ে ওঠে দারুণ স্নিগ্ধ ও সুন্দরী। হলদে ঘণ্টার মতো ফুল ফুটে লতানো গাছটি যেন চারপাশ আলোকিত করে তোলে। অলকানন্দার এ রূপ এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি।
কিন্তু এমন একটা রূপ অলকানন্দার দেখব তা ছিল কল্পনারও অতীত। মাইকের চোঙা বা ঘণ্টার মতো অলকানন্দা ফুলগুলো ফোটে এক সারি পাপড়ি নিয়ে। জাত ও প্রজাতিভেদে তার আকার ও আকৃতি হয় ভিন্ন। রং প্রধানত হলুদ হলেও এখন এ দেশে অন্তত পাঁচ রঙের অলকানন্দা ফুল দেখা যাচ্ছে–হলুদ, সাদা, ঘিয়া, মেরুন ও গোলাপি। তাই বলে ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা? ঘন পাপড়িগুলো এমনভাবে রয়েছে যেন গোলাপ ফুল। গত ১৩ জুন মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের নার্সারির ভেতরে একটা গাছে সে রকম কিছু ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুল দেখলাম। মালিরা বললেন, এ জাতের গাছ আগে ছিল না, নতুন এসেছে। বৃক্ষমেলায় নেওয়ার জন্য টব রেডি করছি।
অ্যাপোসাইনেসি গোত্রের অ্যালামান্ডাগণের উদ্ভিদগুলো এ দেশে সাধারণভাবে বাংলায় অলকানন্দা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ১৭৭১ সালে সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস অ্যালামান্ডা-গণকে শ্রেণিবিন্যস্ত ও বর্ণনা করেন। তিনি সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক ফ্রেডেরিক লুই অ্যালামান্ডের (১৭৩৬-১৮০৯) সম্মানে এ গণের নামকরণ করেন অ্যালামান্ডা। ‘উইলিয়ামসি’ নামটি ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ উদ্যানতত্ত্ব বিষয়ক প্রকাশনা ‘গার্ডেন’-এ প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় এই ফুল ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। পরে বিশ শতকের প্রথম দিকে উদ্ভিদবিজ্ঞানী এল এইচ বেইলি একে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকা ভার উইলিয়ামসি নামে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্বতন্ত্র জাত হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
অ্যালামান্ডা-গণে সারা পৃথিবীতে ১২ থেকে ১৫টি প্রজাতির গাছ রয়েছে। বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত প্রজাতি পাওয়া গেছে দুটি। গাছটি এসেছে ব্রাজিল থেকে। বিদেশি সেই ফুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় অলকানন্দা নাম দিয়ে আপন করে নিয়েছেন- ‘রাত্রিজাগর রজনীগন্ধা-/ করবী রূপসীর অলকানন্দা-/ গোলাপে গোলাপে মিলিয়া মিলিয়া রচিবে মিলনের পালা।’ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা কালজয়ী আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানেও অলকানন্দার উল্লেখ পাওয়া যায়- ‘পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেন,/ এমন সময় ঝড় এলো, এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।’ কিন্তু কবিদের এই অলকানন্দাই আসল হলদে অলকানন্দা। ডাবল পাপড়ির অলকানন্দা ফুলও হলুদ, তবে যেন একটু বেশি হলুদ, সুমিষ্ট ঘ্রাণ আর ব্যতিক্রমী রূপ যেন অলকানন্দাদের জগতে তাকে আলাদা আসন দিয়েছে। ডাবল অলকানন্দার ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে গোল্ডেন ট্রাম্পিট ভাইন, প্রজাতিগত নাম Allamanda cathartica var. williamsii. কেউ কেউ একে পৃথক প্রজাতি হিসেবে অ্যালামান্ডা উইলিয়ামসি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কিউ সায়েন্সের ‘প্ল্যান্টস অব দ্য অনলাইন’ অনুসারে একে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং তাকে ১৯৩৩ সালে অ্যালামান্ডা ক্যাথার্টিকার একটি জাত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্য অলকানন্দা গাছের মতো এটিও লতানে গুল্ম প্রকৃতির চিরসবুজ গাছ। পাতা সবুজ, চকচকে, উজ্বল, আয়তাকার থেকে বর্শাকৃতি, দৈর্ঘ্য ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ।
এ গাছের ডাল ভাঙলে সাদা দুধের মতো কষ বা রস বের হয়। এই কষ অনেক সময় ত্বকে লাগলে ত্বক চুলকায়। তাই গাছ ছাঁটার সময় সতর্ক থাকতে হয়। আধো-ছায়া জায়গায় এ গাছ ভালো জন্মে। নিয়মিত পানি দিতে হয়। প্রায় সারা বছরই ফুল ফোটে, তবে বর্ষাকালে বেশি ফোটে। ফুল ঘণ্টাকৃতির হলেও তার পাপড়ি থাকে দুই স্তরে সাজানো। বাইরের স্তরে পাঁচটি পাপড়ির অগ্রপ্রান্ত বিযুক্ত, ভেতরের স্তরে থাকা পাপড়িগুলো গুচ্ছিত ও কুঁচকানো। পাপড়ির রং উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা-হলুদ, সুগন্ধ আছে। পূর্ণ ফোটা ফুলের পাপড়ির বিস্তার প্রায় তিন ইঞ্চি। বাগানের যে অংশের মাটি স্যাঁতসেঁতে বা ভেজা ও কিছুটা ছায়াময় থাকে সেখানে এ গাছ লাগানো যায়। লতাকে কোনো অবলম্বনে বাইয়ে দিলে ঝোপ করতে পারে। বড় পাত্র বা ড্রামে লাগালে প্রতি বছর গাছ ছাঁটতে হয়। না হলে গাছের লতা বা ডালপালা ছড়িয়ে বেয়াড়া ও বেঢপ হয়ে পড়ে। শীতের শেষে বা বসন্তের শুরুতে গাছ ছাঁটা ভালো। কেটে ফেলা শক্ত কাঠের ডাল কাটিং করে চারা তৈরি করা যায়। যেকোনো বাগানে ডাবল অলকানন্দা বৈচিত্র্য আনতে পারে।