জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি) প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) খন্দকার নাজমুল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত ও নিয়মবহির্ভূতভাবে গাছ লাগানো হচ্ছে। যত্রতত্র এভাবে গাছ রোপণের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান এবং ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি লাইন (বিদ্যুৎ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা ক্যাম্পাসের নান্দনিক পরিবেশকে ব্যাহত করছে। এখন থেকে ক্যাম্পাসের যেকোনো স্থানে গাছ রোপণের পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক। অনুমতি ছাড়া ক্যাম্পাসের কোনো স্থানেই বৃক্ষরোপণ না করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই বলছেন, পরিবেশ সুরক্ষা ও সবুজায়নের স্বার্থে বৃক্ষরোপণকে উৎসাহিত করা উচিত, সেখানে গাছ লাগানোর আগে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার শর্ত অপ্রয়োজনীয়।
কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বৃক্ষরোপণের মতো ইতিবাচক উদ্যোগের ওপর এমন নিয়ন্ত্রণ আরোপ কতটা যুক্তিসঙ্গত।
আবার কেউ ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেছেন, "গাছ কাটা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে এবার গাছ লাগানোই কঠিন করে দিল প্রশাসন।"
তবে অন্য একটি অংশের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, পরিকল্পিত সবুজায়ন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের অনুমতি নেওয়ার বিধান ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের অজুহাতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানের গাছ অপসারণের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রধান সড়ক প্রশস্তকরণের কাজের অংশ হিসেবে সড়কের দুই পাশের গাছ কাটার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে অপসারিত গাছের পরিবর্তে কোথায় এবং কীভাবে নতুন গাছ রোপণ করা হবে কিংবা ক্যাম্পাসের সবুজায়ন রক্ষায় কোনো সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে কি না- সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো সুস্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
ধারাবাহিকভাবে গাছ কমে যাওয়ায় ক্যাম্পাসের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ছায়াবৃক্ষের সংকটের কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলাচল ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাড়ছে দুর্ভোগ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ক্লাবের সভাপতি মো. আবু সুফিয়ান সাদী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যায়ের পরিবেশসচেতন শিক্ষার্থীরা অবশ্যই বৃক্ষরোপণ করবে, এখন যেহেতু বৃক্ষরোপণের উপযুক্ত মৌসুম। কিন্তু সম্প্রতি আমরা দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে নিয়মিত গাছ কাটা হচ্ছে বা গাছগুলো স্থানান্তর করা হচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের কষ্ট করে লাগানো গাছগুলো কাটা পড়ে যাচ্ছে। এর পেছনে বড় একটি কারণ হচ্ছে, আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত নকশাটিই এখনো জানি না। আমাদের ক্যাম্পাসে অনেক কনস্ট্রাকশন কাজ চলমান, কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই বলতে পারবে না কোনটা আসলে কী। উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, এবং আমরা চাই না কোনো প্রাণের বিনাশ হোক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিনক্যাম্পাস সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিজেদের পছন্দমতো স্থানে নিজেদের পছন্দের গাছ রোপণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনার ওপর সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তথাকথিত মাস্টারপ্ল্যান আসলে কেমন প্ল্যান? আর যে প্ল্যান বছর বছর পাল্টে যায়, সেটি কীভাবে মাস্টার প্ল্যান হয়? প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন বছর আগে কদমতলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় গেট-সংলগ্ন সড়কের পশ্চিম পাশে প্রশাসনের উদ্যোগে গাছ লাগানো হয়েছিল। এখন আবার প্রশাসন সেই গাছগুলো তুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাই কি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামীর পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের নমুনা?
এখানেই শেষ নয়। এমন অসংখ্য উদাহরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা দপ্তর ইতোপূর্বে সৃষ্টি করে রেখেছে। পরিকল্পনা দপ্তরের পরিকল্পনা কতখানি নির্ভরযোগ্য ও ভরসাযোগ্য তার কোনো সুরাহা নেই, স্থানীয় পরিবেশ ও বিদ্যমান প্রকৃতির সঙ্গে পরিকল্পনা কেন সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় না? প্রশ্ন থেকে যায়, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের নামে বৃক্ষনিধনের মহাযজ্ঞ হতে যাচ্ছে না কিনা, প্রকৃতির সুরক্ষা ও উন্নয়ন একটি আরেকটির পরিপূরক হলেও উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৃতিকে সাংঘর্ষিকভাবে দেখানোর কারণ কী?’
তাসনিম হক/হীরা/