টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৯০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে উপজেলার জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
কিছু এলাকায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও এখনো অন্তত ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘরবাড়িতে পানি ওঠায় এবং রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার পরিবারে খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, শাকসবজির খেত এবং অসংখ্য মাছের ঘের। ফলে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যচাষিরা। দ্রুত পানি নিষ্কাশন ও দুর্গতদের সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, সোনাদিয়া, হরনী, চানন্দী, চরকিং, সুখচর, নলচিরা, জাহাজমারা, তমরদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নসহ হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, টানা বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নিচু এলাকার পানি বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামের রাস্তাগুলো তলিয়ে যাওয়ায় যানচলাচল প্রায় বন্ধ। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের।
ওছখালী ব্যবসায়ীরা খবরের কাগজকে বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এমন অবস্থা হয়। যদি এই সমস্যা স্থায়ী সমাধান না করা হয় তাহলে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হবে। ঠিক মতো পানি নামতে না পারা, খাল-নালা ভরাট এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
সোনাদিয়া ইউনিয়নের কৃষক মো. সৌরাভ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমনের বীজতলা, সবজিখেত ও মাছের ঘের সব শেষ কয়েক মাসের পরিশ্রম এক বৃষ্টিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চাষ করার মতো পুঁজিও নেই।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা আইয়ুব আলি খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের চারপাশে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। জোয়ার এলেই পানি উঠে যায়। এবার ছয় দিনের বৃষ্টিতে রান্নাঘর ডুবে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। দ্রুত পানি না নামলে আরও বিপদ হবে।
হাতিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আনিসুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, হাতিয়া উপজেলায় প্রায় ৮০-৯০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতি রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল ইকবাল খবরের কাগজকে বলেন, হাতিয়া নদীবেষ্টিত একটি উপজেলা। কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় একহাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে বৃষ্টি কমলেও এখনো অনেক এলাকায় পানি নামেনি।
দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
হানিফ/এএফ