ঢাকা ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
দুপুরেরর মধ্যে ১৬ জেলায় ঝড়ের আশঙ্কা বোয়ালমারীতে মন্দিরে চুরি, চোর ধরতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার ২ পুরোহিতকে জরিমানা মতলব সেতুর সংযোগ সড়কে ধস, দুর্ঘটনার শঙ্কা হাতিয়ায় ৯০ গ্রাম প্লাবিত, পানিবন্দি অর্ধলক্ষ মানুষ শুভসন্ধ্যা সৈকতে পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার গজারিয়ায় আধুনিকতার ছোঁয়ায়  উদ্বোধন ‘ন্যাচার লাউঞ্জ’ বৃষ্টির পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ঢাকায় মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ স্কুলছাত্রের মরদেহ উদ্ধার গোরানের বাসা থেকে লালমাটিয়া কলেজের শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার মায়ামিতে ইতিহাস বনাম স্বপ্ন কোরআনে বর্ণিত চারটি সুপারফুড ‘আগুনে পরশমণি’ পরীক্ষা আর্জেন্টিনার মুক্তাগাছায় বিলের পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্ব পাবে ঋণচুক্তি আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন অনুষ্ঠানেও যুদ্ধের ছায়া শিবগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় বৃদ্ধের মৃত্যু সোনারগাঁয় যুবদল নেতার চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন এমপিপুত্র সাতক্ষীরায় রাতভর রেকর্ড বৃষ্টি: তীব্র জলাবদ্ধতায় স্থবির জনজীবন শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ পাহাড়ধসে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা যুদ্ধ বন্ধে তৎপর মধ্যস্থতাকারীরা সোনারগাঁয় পানাম নগরীর ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন সেতু পুনর্নির্মাণের দাবি বন্যায় পানিবন্দি লাখ লাখ মানুষ যমুনার ভাঙনে ধুনটে হুমকির মুখে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত তলানিতে মেসিদের সুইস দেয়াল ভাঙার চ্যালেঞ্জ কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা! সাতকানিয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করছেন প্রায় ৫০ লাখ কর্মী (বয়স ২৫-৪৯)

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। একে অনেকেই বোঝা মনে করলেও আসলে তা জনসম্পদ। জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের জনসংখ্যাই বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন। বয়সের দিক দিয়ে তারা কাজের উপযোগী। কৃষি, শিল্প, সেবা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

  • বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম (১৫–৬৪ বছর), যা দেশের জন্য একটি বড় জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ তৈরি করেছে।
  • গুণগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি; ফলে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই এখনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি

রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছেন। বিদেশেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। রেমিট্যান্স, প্রবাসী আয়েও রেকর্ড করছেন এই তারাই। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়নি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার বয়স কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সুযোগ বা সম্ভাবনা। এর পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের দেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি।

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করছে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি অতিক্রম করে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থাকা মানে একটি দেশের উন্নতি সাধন করার অপার সম্ভবনার দুয়ারে অবস্থান করা। কর্মক্ষম জনসংখ্যা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপি) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেটা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তখনই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। জনমিতির হিসাবে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে একটি রাষ্ট্রের জন্য উৎপাদনশীল, কর্মমুখী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সক্রিয় বিবেচনা করা হয় এবং একটি দেশের মানবগোষ্ঠীর এ পর্যায়কে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ হিসেবে দেখা হয়।

১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যা বেশি

বিবিএস বলছে, ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যাই দেশে বেশি, যা ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মানুষ ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। তারাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে এই বয়সের (২৫-৪৯) প্রায় ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। এই তালিকার বাইরেও কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের অবদান রয়েছে রপ্তানি আয়ে। তাদের অবদানের কারণেই বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে রপ্তানি আয়।

২৫ থেকে ৪৯ বছরের লাখ লাখ মানুষ কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সদ্য সমাপ্ত বছরে মোট ৩৫.৫৬ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ) ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তবে প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে বিশ্ববাজারে তাদের মাসিক বেতন অনেক কম। তাই এ বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল কাজে লাগানো যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেকার বা কর্মহীন মানুষ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষিত মানুষ বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। বিআইডিএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার তিন বছর পরও শিক্ষার্থীদের ২৮ শতাংশ বেকার থাকছেন।

বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্‌ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল-২০২৬ ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপপরিচালক (ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ উইং) মো. আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তা অনুপাত ইকোনমিক সাপোর্ট রেশিও (ইএসআর) ১৯৯১ সালে ০.৫৫ থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২ সালে ০.৯১-এ পৌঁছেছে। ২০৪১ সালের দিকে প্রায় ০.৯৮-এ পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ২০৪১ সালকে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় সময় নির্দেশ করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, ২০৪১ সালের পর ইএসআর ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে ২০৭১ সালে ০.৮৬-এ নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ ২০৭১ সালের পর থেকে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতার চাপ বাড়বে। জনমিতিক লভ্যাংশের পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. কিশোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা বোঝা না। কারণ নির্ভরশীলতার চেয়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যাই বেশি। ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ (মুনাফা) আসছে। দিন বদলের ধাক্কায় অধিকাংশ পরিবারে আয়মুখী মানুষ বাড়ছে। নির্ভরশীলতা কমছে। তবে যত মুনাফা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যায়নি। কারণ সম্প্রতি বেকারত্বের হার বেড়েছে। দক্ষ জনশক্তি বাড়ছে না। কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো যায়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তরুণদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।’

কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
কাজে লাগছে না কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী
তৈরি পোশাকশিল্পে কাজ করছেন প্রায় ৫০ লাখ কর্মী (বয়স ২৫-৪৯)

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। একে অনেকেই বোঝা মনে করলেও আসলে তা জনসম্পদ। জনসংখ্যার ৬৪ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম। তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই বয়সের জনসংখ্যাই বিভিন্ন খাতে কর্মরত আছেন। বয়সের দিক দিয়ে তারা কাজের উপযোগী। কৃষি, শিল্প, সেবা ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

  • বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম (১৫–৬৪ বছর), যা দেশের জন্য একটি বড় জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ তৈরি করেছে।
  • গুণগত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি; ফলে শিক্ষিত বেকারত্বও বাড়ছে।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তাই এখনই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি

রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছেন। বিদেশেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। রেমিট্যান্স, প্রবাসী আয়েও রেকর্ড করছেন এই তারাই। তারপরও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়নি ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার বয়স কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সুযোগ বা সম্ভাবনা। এর পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের দেশ এখনো অর্জন করতে পারেনি।

আজ ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই প্রথমবারের মতো ৯০টি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করছে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটি অতিক্রম করে। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থাকা মানে একটি দেশের উন্নতি সাধন করার অপার সম্ভবনার দুয়ারে অবস্থান করা। কর্মক্ষম জনসংখ্যা ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপি) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে এবং সেটা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, তখনই তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। জনমিতির হিসাবে, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে একটি রাষ্ট্রের জন্য উৎপাদনশীল, কর্মমুখী ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সক্রিয় বিবেচনা করা হয় এবং একটি দেশের মানবগোষ্ঠীর এ পর্যায়কে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ হিসেবে দেখা হয়।

১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যা বেশি

বিবিএস বলছে, ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মানুষের সংখ্যাই দেশে বেশি, যা ৬৫ দশমিক ১ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের মানুষ ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। তারাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অবদান রাখছেন। তৈরি পোশাক শিল্পে এই বয়সের (২৫-৪৯) প্রায় ৫০ লাখ কর্মী কাজ করছেন। এই তালিকার বাইরেও কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের অবদান রয়েছে রপ্তানি আয়ে। তাদের অবদানের কারণেই বিদায়ী (২০২৫-২৬) অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন (৪ হাজার ৮০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়েছে রপ্তানি আয়।

২৫ থেকে ৪৯ বছরের লাখ লাখ মানুষ কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সদ্য সমাপ্ত বছরে মোট ৩৫.৫৬ বিলিয়ন (৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ) ডলারের রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। তবে প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাবে বিশ্ববাজারে তাদের মাসিক বেতন অনেক কম। তাই এ বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য, যেন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুফল কাজে লাগানো যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেকার বা কর্মহীন মানুষ বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতি বছর ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষিত মানুষ বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। বিআইডিএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যার মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার তিন বছর পরও শিক্ষার্থীদের ২৮ শতাংশ বেকার থাকছেন।

বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েই চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় কৃষি খাত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, এসএমই শিল্প এবং রুগ্‌ণ ও বন্ধ কলকারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল-২০২৬ ঘোষণা করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) উপপরিচালক (ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ উইং) মো. আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহায়তা অনুপাত ইকোনমিক সাপোর্ট রেশিও (ইএসআর) ১৯৯১ সালে ০.৫৫ থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২ সালে ০.৯১-এ পৌঁছেছে। ২০৪১ সালের দিকে প্রায় ০.৯৮-এ পৌঁছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ২০৪১ সালকে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাময় সময় নির্দেশ করা হচ্ছে। মনে রাখা দরকার, ২০৪১ সালের পর ইএসআর ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে ২০৭১ সালে ০.৮৬-এ নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ ২০৭১ সালের পর থেকে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীলতার চাপ বাড়বে। জনমিতিক লভ্যাংশের পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে গুণগত শিক্ষা, শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আবু হাসনাত মো. কিশোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা বোঝা না। কারণ নির্ভরশীলতার চেয়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যাই বেশি। ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ (মুনাফা) আসছে। দিন বদলের ধাক্কায় অধিকাংশ পরিবারে আয়মুখী মানুষ বাড়ছে। নির্ভরশীলতা কমছে। তবে যত মুনাফা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যায়নি। কারণ সম্প্রতি বেকারত্বের হার বেড়েছে। দক্ষ জনশক্তি বাড়ছে না। কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো যায়নি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তরুণদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।’

পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫২ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
পুলিশকে বারবার টার্গেট, অপ্রতিরোধ্য মব সহিংসতা!
ছবি: খবরের কাগজ

মব সহিংসতা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না, বরং এই অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করেই অনেকে উন্মাদের মতো ‘মব সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিকল্পিতভাবে বা টার্গেট করে মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের মনোবল ও সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ মব সহিংসতা ঘটাতে শুরু করে, যা পরে একধরনের ‘মব কালচারে’ রূপ নেয়। সেই ভয়ানক তৎপরতার মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কমলেও মব সহিংসতার ধারাবাহিকতা এখনো যথেষ্ট চলমান। 

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় ঢুকে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সংঘবদ্ধভাবে থানা ভবনে ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারপিটের শিকার হয়ে কষ্টে-দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতন মহলসহ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক পুলিশ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে চরম ক্ষোভ ও সমাজের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন। 

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ৩১৯ পুলিশ সদস্য মব বা সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন বা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। 

এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলে টার্গেট করে এবং গুজবসহ নানা প্রেক্ষাপটে একের পর এক যেভাবে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, তা রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে চরম আঘাত হেনেছে। মবের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের সমর্থন বা উসকানি দেখা যায়।

এ ছাড়া ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ভঙ্গুর’ অবস্থার সুযোগে এ ধরনের বেআইনি অপতৎপরতা ব্যাপক বেড়ে যায়। সে সময় সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিক করার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ নানা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসার পরেও মব সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছেই। সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক। 

এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, “মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং একধরনের ‘বৈধতা পায়’, তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়। কেউ কেউ মনে করেন, এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, যা সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ফলে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।” 

বারবার টার্গেটের শিকার হচ্ছে পুলিশ

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, কর্তব্যরত অবস্থায় অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের মব সন্ত্রাস বা বিভিন্নভাবে পুলিশের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশজুড়ে মোট ৩১৯ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন করে পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। পরের মাসগুলোতে এই প্রবণতা আরও বাড়ে, যেখানে মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ এবং গত জুনে ৫১ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলার শিকার হন। 

গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ‘কবজি কাটা’ নামে পরিচিত একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ চাপাতির কোপে আহত হন। তার আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

এমনকি দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় অনন্য ভূমিকা রাখা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও বাদ যাচ্ছেন না মব সহিংসতা থেকে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো বাজারের একটি শপিংমলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ তুলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মারধর এবং গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগেও পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষও মবের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। ফলে এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে হবে। সরকার এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই কাজ করছে, সে কারণে আগের চেয়ে এই প্রবণতা কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। 

নব্য ‘মব সংস্কৃতি’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি

একটি গুজবকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় থানায় সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ন্যক্কারজনক আক্রমণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। 

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ স্থানীয় রিয়াজ ফকির (২৬) নামে এক আসামিকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে থানায় মাদকের মামলা ছিল। রিয়াজ ফকির সে সময়েও ছিলেন মাদকাসক্ত। মাদকের প্রভাবে তিনি থানা হাজতে নিজের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম হন। এতে রিয়াজ ফকির অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ সেই রাতেই রিয়াজ ফকিরকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

অথচ রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে কতিপয় ব্যক্তি আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপই নয়, বরং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতি’, প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার-প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি, যা একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বাংলাদেশ পুলিশ তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আশঙ্কা করছে।

কারা কী কারণে করছে, খুঁজে বের করতে হবে

মুহাম্মদ নুরুল হুদা
আইনকানুন নিজের হাতে উঠিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পুলিশ আগেও মব হামলার শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে মব কেন ঘটছে এবং কারা, কী কারণে করছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালেও মবের অনেক ঘটনা ছিল। ওই সময়ের পরিসংখ্যান দেখলে সেটি বোঝা যাবে। তখনো মানুষ মনে করেছিল, দেশ স্বাধীন, আমরাও স্বাধীন হয়েছি, তাই কোনো পরোয়া না করেই যেকোনো কিছুই করা যাবে। ঠিক ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও অনেকে মনে করেছে, তারা স্বাধীন, সেজন্য দেশে এমন মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, অভ্যুত্থানের পর যত মব হয়েছিল, সেই পরিমাণ মবের ঘটনা নিশ্চয়ই এখন নেই। এরপরও সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সেটিও কমে আসবে বলে আশা করছি। মবের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি সেগুলোর চার্জশিট ও বিচার করা গেলে মব কালচার বা মব সন্ত্রাস কমে যাবে।
এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকারি দল মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের যে জায়গাগুলোতে মব ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সতর্ক থাকা এবং যারা মব সৃস্টির চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

সাবেক আইজিপি

মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে

মনজিল মোরসেদ

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৮ মাস ধরে যেভাবে মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে, এখন এটি কমতে সময় লাগবে। কিন্তু এটি কমাতে চাইলে/বন্ধ করতে চাইলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে। এখন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। তার মানে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। কিন্তু কেবল কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলে হবে না, সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা একজন অভিনেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উস্কানি বলতে আসলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’ এ রকম সাইবার মবও হচ্ছে এখন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তো শুনলাম না। সশরীরে মব হচ্ছে, সাইবার মব হচ্ছে–কিন্তু এসবের কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, আবার কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে না। তাতে তো মব সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। বন্ধ করতে হলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ

ড. তৌহিদুল হক 

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে মব সহিংসতার নানা ধরন প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো একটি সমাজে কিংবা দেশে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে মব সহিংসতা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ওপর সংঘটিত কোনো অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অবিচারের বিচার করতে উদ্যত হয়। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সরকারের উচিত, এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।

বাংলাদেশে মানুষের নাগরিক প্রাপ্যতা কিংবা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্নে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে প্রত্যাশিত সূচক অত্যন্ত নিম্নগামী। আইনের প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সামাজিক পরিচয় কিংবা শ্রেণি বিভাজনের কারণে সৃষ্ট সামাজিক কদর অর্থাৎ রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো ব্যক্তি কত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিবেচ্য। 
এই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের সত্যতাও নানা সময়ে নানাভাবে প্রমাণিত। যখন আইনের প্রয়োগ কিংবা আইনের দৃষ্টি সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তখন রাষ্ট্র বিচার করবে এমন বিশ্বাস ব্যক্তি করতে পারে না। তখন নিজেই বিচার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং নানা ধরনের আইন পরিপন্থি ব্যবস্থা নেয়। 

বাংলাদেশে মব সহিংসতার রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ পুরোনো। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষণীয় যে কোনো দল কিংবা অর্থ-ক্ষমতার বিচারে প্রভাবশালী ব্যক্তি কতিপয় লোক একত্রিত করে চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীত অবস্থানে থাকা কাউকে অভিযুক্ত করে শায়েস্তা করা বা উচিত শিক্ষা দেওয়ার নামে আইনবিরোধী ব্যবস্থা নেয়। আবার চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে যারা আছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিয়ে এই ধরনের মব সহিংসতা চালালে সেটি সমাজের মধ্যে একটি শ্রেণি আছে যারা চলমান রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাস করে, তারা এই ঘটনার সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদন করে। 

মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং বৈধতা পায় তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে বৈধতা পায়। কেউ কেউ মনে করে এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। 

আইনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা বা ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের জন্য নিজের শক্তি কিংবা শক্তি ভাড়া করে অন্যের ওপরে অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করার প্রেক্ষাপট কোনো একটি দেশে সার্বিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতা এবং অর্থের বিচারে শক্তিশালী ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ আদায় এবং সমাজকে একটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে অস্থিরতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি, যা আইনমান্যকারী নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। মব সহিংসতা থেকে পরিত্রাণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার।  

সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

চলছে সাইবার মব!

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
চলছে সাইবার মব!
ছবি: সংগৃহীত

যখন-তখন যেখানে-সেখানে যে-কেউ মব বা অন্যায়ভাবে শারীরিক সহিংসতার শিকার হতে পারেন। দেশব্যাপী এমন বাস্তবতা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি বেড়ে গেছে সাইবার মব। অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কাউকে নাজেহাল করার চেষ্টা। দেশব্যাপী সাইবার মবের তৎপরতা এমন যে, প্রধানমন্ত্রীর পরিবার থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য বা সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষও এতে বিদ্ধ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বটবাহিনীর তাণ্ডবও এক ধরনের সাইবার মব।

সাইবার মবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকার চেয়ে কেউ কেউ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সাইবার মবের সাম্প্রতিক আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য।

এই মন্তব্যের অভিযোগের পর গত ২২ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কিশোর কলেজছাত্রকে (১৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ওই কলেজছাত্র একটি ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন শনিবার রাতে আখাউড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ মিয়া ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রিফাতুল ইসলাম আখাউড়া থানায় পৃথকভাবে অভিযোগ করেন।

তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জাইমা রহমানের মানহানি করা হয়েছে এবং সামাজিকভাবে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ওই কলেজছাত্রকে আখাউড়া থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারক তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে চলতি সপ্তাহের আরেকটি ঘটনায়ও সাইবার মব প্রসঙ্গটি খুব আলোচনায় আসে। এতে মদের বোতল সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যাচাই করে দেখা গেছে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।
ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে–‘এক বোতল মদ একাই খেয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।’

গত ৭ জুলাই ছবিটি পোস্ট করা হয়। এর দুই দিন আগে ৪ জুলাই এক ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি মাদকবিরোধী বক্তব্য দেন। লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’।

চারদিকে মাদকের থাবার মধ্যে প্রত্যন্ত গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’ খেলাধুলায় এতটা উদ্যমী ও উদ্যোগী! তাই তিনি আয়োজক ও বিজয়ী দলকে মডেল হিসেবে দেখিয়ে তার সংসদীয় পুরো আসনে এমন খেলাধুলার আয়োজন করবেন বলেও সেখানে ঘোষণা দেন। এতে মাদকের থাবা কমে আসবে বলে বিশ্বাস সংসদ সদস্যের।

বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। কেউ যদি মাদকসেবীদের ধরে থানায় সোপর্দ করে, তাহলে তাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব।

এআই দিয়ে বানানো ছবি ফেসবুকে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি গতকাল শুক্রবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, এই ঘটনায় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করেছি। এটি যে এআই দিয়ে বানানো ছবি, তা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। ফ্যাক্টচেক করে গণমাধ্যমে এই নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। আমার দেওয়া মাদকবিরোধী বক্তব্যের কারণে তারা আমার চরিত্রহননের চেষ্টার অংশ হিসেবে এটা করেছে। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এখন হরহামেশাই এমন সাইবার মব হচ্ছে। তবুও মাদকবিরোধী অবস্থানে আমি দৃঢ় আছি। কিছু করার নেই। মাদক আর বেয়াদবে সমাজটা ভরে গেছে। দৃঢ় অবস্থান না নিলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এআই দিয়ে বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম একটি বিছানায় বসে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিছানার অপর প্রান্তে বসে আছেন আরও দুই ব্যক্তি। জ্যাকব মিল্টন (Jacob Milton) নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, বিছানার মাঝখানে একটি ট্রেতে মদের বোতল, বাটিভর্তি চানাচুর, গ্লাস ও একটি জগসদৃশ বস্তু।

এদিকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে সম্প্রতি অভিনেত্রী, নির্মাতা, প্রযোজক ও সংগীতশিল্পী মেহের আফরোজ শাওনের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে ‘অবমাননাকর’ বলছেন কেউ কেউ। এই নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১ জুলাই ফেসবুকে নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহ উদ্দীন আম্মারের একটি ঘোষণা আসে। এতে আম্মার শাওনকে জুতার বাড়ি মারতে পারলে ১ লাখ টাকা এবং জুতার আঘাতে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

পোস্টে আম্মার লেখেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উসকানি বলতে এলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে শাওন গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, আমি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিইনি। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে আমি এখনো কিছু ভাবিনি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমেই আমি এই নিয়ে কথা বলেছি। এই প্রসঙ্গে আমি নতুন করে কিছু বলব না।’
সম্প্রতি তিনি সামাজিক মাধ্যমে তার বক্ত্যব্যের ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, তিনিও ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।

ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাদের সন্তান মারা গেছে, যার ভাই মারা গেছে বা যার পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেছে। কিন্তু আমার স্ট্যাটাস তাদের প্রতি ছিল না। আমার স্ট্যাটাস ছিল যারা জুলাই যুদ্ধটাকে সাজিয়েছে। যারা সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ করেছেন।

ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের পর শাওনকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও সহিংস কর্মসূচির ঘোষণা এবং ইঙ্গিত করতেও দেখা গেছে। এই অবস্থায় শাওনের পাশে দাঁড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মডেল পিয়া জান্নাতুল। 

তিনি বলছেন, আজকে শাওন আপার সঙ্গে যেটা হয়েছে; এ ঘটনা একটি সভ্য সমাজ ও দেশে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু শাওন আপা নয়; একটা মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের মবের কথা হলে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সেটা যে পার্টিই হোক না কেন, একটা মেয়ের সঙ্গে যদি এটা হয়, তা কোনোভাবেই একটা সভ্য দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো মানুষের সঙ্গেই মব করা হলে, তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মেহের আফরোজ শাওন ইস্যুতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি এসব মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি অন্য শিল্পীদেরও শাওনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে উপহাস এবং এর স্মৃতিস্তম্ভ অবমাননার অভিযোগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানা নামের আরেক নারীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান গত শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন এই জিডি করেছে। আইনি পদক্ষেপের বাইরে শাওন, পিয়া জান্নাতুল ও মাহিদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে অব্যাহতভাবে চলছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অশ্রাব্য পোস্ট-মন্তব্য।

প্রাক-নিকার সভায় থাকবে আরও নতুন থানার প্রস্তাব

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:১৭ এএম
প্রাক-নিকার সভায় থাকবে আরও নতুন থানার প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে নতুন থানা, নৌ থানা ও পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের একাধিক প্রস্তাব নিয়ে প্রাক-নিকার সচিব কমিটিতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে দুপুর আড়াইটায় প্রাক-নিকার সচিব কমিটির এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ সংক্রান্ত নোটিশে এ কথা বলা হয়েছে।

সভায় কক্সবাজারে একটি নতুন থানা, ভোলায় একটি পূর্ণাঙ্গ নৌ থানা এবং বগুড়া ও কুমিল্লায় দুটি নতুন পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

সভার আলোচ্যসূচির মধ্যে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানাকে বিভক্ত করে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের বটতলী এলাকায় ‘মাতামুহুরী থানা’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন এ থানার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮টি নতুন পদ সৃষ্টি, ২৯টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করারও প্রস্তাব রয়েছে। এ বাবদ বছরে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় হবে। প্রস্তাবটিতে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও বিভাগীয় কমিশনারের সুপারিশ রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সার-সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ভোলা জেলায় নৌ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোর আওতায় পূর্ণাঙ্গ ‘ধলী গৌরনগর নৌ থানা’ স্থাপনের প্রস্তাবও সভায় উঠছে। এ থানার জন্য ৩৫টি পদ সৃষ্টি, ১২টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ টাকা।

বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের কামতারা এলাকায় নতুন ‘কামতারা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র’ স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য ৩১টি পদ, ১৩টি যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংযোজন প্রস্তাবের পাশাপাশি এর জন্য বছরে প্রায় এক কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় হবে এমন উল্লেখ রয়েছে সার-সংক্ষেপে।

একই সঙ্গে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানাধীন ‘সুলতানপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্র’ স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ তদন্তকেন্দ্র পরিচালনায় ২২টি পদ সৃষ্টি ও ৫টি যানবাহন টিওঅ্যান্ডইভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, চারটি প্রস্তাবই পুলিশ অধিদপ্তরের সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, রেঞ্জ ডিআইজি ও বিভাগীয় কমিশনারের মতামত নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাক-নিকার সভায় প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা শেষে নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেলে পরে সেগুলো প্রাক-নিকার সচিব কমিটির অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ও সেবার পরিধি বাড়বে, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রাম মহানগরের প্রাণকেন্দ্রখ্যাত লালখান বাজার। এ বাজারসংলগ্ন চারটি পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছেন প্রায় ৫ হাজার মানুষ। পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে গত রবিবার থেকে প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে একটি পরিবারও সেখান থেকে সরছে না। বসবাসকারীদের শঙ্কা পাহাড় ছেড়ে গেলে বাড়িঘর বেদখল হবে। তাই প্রাণ গেলেও তারা পাহাড় ছাড়তে রাজি নন।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন লালখান বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বিরিয়ানি বিতরণ করবেন, এ খবর ছড়িয়ে পড়লে গত বুধবার রাতে পাহাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৩০০ মানুষ সেখানে অবস্থান নেয়।  তবে বিরিয়ানি বিতরণ শেষে আশ্রয়কেন্দ্র খালি হয়ে যায়। অর্থাৎ ত্রাণ নিয়ে তারা আবার পাহাড়ের বসতিতে ফিরে গেছেন। 

বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) লালখান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লালখান বাজার ও সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী ভবনের পাশ দিয়ে মতিঝর্ণা, বাটালী হিল, এ কে খান ও পানির ট্যাংকি পাহাড়ে প্রবেশ সড়কের দুই পাশে সারি সারি বসতি। লালখান বাজার দিয়ে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে উঁচু পাহাড়। এসব পাহাড়ের মালিক জেলা প্রশাসন, ওয়াসা ও রেলওয়ে। পাহাড়ের ঢালে টিনশেড ঘরের পাশাপাশি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছে চার, পাঁচ এমনকি ছয়তলা ভবন। এসব অবৈধ বসতিতে রয়েছে বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। এলাকার ৪ নম্বর গলিতে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গেছে সরু পথ। সেখানে রয়েছে বহুতল ভবনসহ অসংখ্য বাসা। এখানে ভাড়াবাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন রুবেল মিয়া নামের এক রিকশাচালক। পাহাড়ধসের ঝুঁকি জেনেও তিনি বসবাস করে আসছেন। তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। 

তিনি বলেন, ‘এখানে গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎসহ মাসে ছয় হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়া কম, তাই ঝুঁকি জেনেও এখানে পরিবার নিয়ে থাকি।’
ওই এলাকায় বসবাসকারীদের প্রায় সবাই নিম্নআয়ের মানুষ। কেউ রিকশাচালক, ভ্যানচালক, হকার্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। কিন্তু দখলদার জমিদারদের কেউই এখানে থাকেন না। দখলদারদের মধ্যে পুলিশ, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন।

পাহাড়ের একটি ভবনের মালিক চট্টগ্রাম আদালতের শিক্ষানবিস আইনজীবী মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি জানান, এক দশক আগে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তাদের পরিবার অনেক বছর ধরে এখানে বসবাস করছে। 

এখানে বসবাসে ঝুঁকির বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তবে তিনি জানান, এত বছরেও তারা স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের মুখে পড়েননি। 

এখানকার একটি গলির মুখে মুদির দোকান করেন অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ সদস্য। তার ছেলেও পুলিশে চাকরি করেন। তিনি পরিচয় না দিয়ে বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। পর্যায়ক্রমে ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন নিয়েছি। এখনো কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়নি।
প্রায় ২৪ বছর ধরে মতিঝর্ণা পাহাড়ে বসবাস করছেন রহিমা বেগম। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণের সময় প্রশাসনের মাইকিং শুনেছি। পরিবার নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু যাইনি। ফিরে এসে যদি বাসা না পাই? 

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি ২৬টি পাহাড়ে বর্তমানে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে রয়েছে আরও ৩৮৩টি পরিবার। সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি রয়েছে ফয়'স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল পাহাড়ে, যেখানে প্রায় ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার বসবাস করছে। কিন্তু সরকারি এ হিসাবের বাইরে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করে পাহাড়ে। বায়েজিদ লিংক জঙ্গলসলিমপুর ও আলীনগরে প্রত্যেকটি পাহাড়ে অবৈধ বসতি রয়েছে, যা সরকারি হিসাবের মধ্যে নেই।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। আমাদের টিম এ দুযোর্গ পূর্ণ পরিবেশে কাজ করেছে। কিন্তু কেউই নির্দেশনা মানেন না। ফলে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

১৯ বছরে ২৫৩ প্রাণহানি

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানির মিছিল থামছে না। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৮ জুলাই টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম নগরে দুটি পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় দেয়ালধসে একজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জুন এক দিনেই প্রাণ হারান ১২৭ জন। ওই ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকা প্রণয়ন, উচ্ছেদ অভিযান এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে মতিঝর্ণা, বাটালী হিল, আকবর শাহ, বায়েজিদ, ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় বারবার পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এসব ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ২৫১ জন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে দুজনের মৃত্যুসহ মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৩ জনে।

স্থানীয়রা জানান, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল মাটি এবং টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের আগে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপর সবাই ভুলে যায়।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা খবরের কাগজকে বলেন, ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস পেলেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাইকিংয়ের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের সরিয়ে যে স্থানে বসবাস করতে দেব, সেখানে তারা যেতে চান না। কারণ হিসেবে দেখায়–সেখানে কাজ নেই, জীবনযাত্রার মান ভালো না। এটা হচ্ছে আসল বাস্তবতা। এর পরও দখলদার যারা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পাহাড় কাটা ও দখল কমে গেছে অনেকটা।