যে মেসির খেলা দেখার জন্য গোটা বিশ্ব চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত। যে আর্জেন্টিনার খেলা দেখার জন্য মানুষ নিজেদের ব্যস্ততা বাইরে রেখে খেলা দেখার সময় বের করত। জয়ে করত উচ্ছ্বাস প্রকাশ, হারে হতো ব্যথিত। হঠাৎ করে সেই মেসি, সেই আর্জেন্টিনার ‘হেটার্স’ বেড়ে গেছে। আর্জেন্টিনা একটি করে ম্যাচ খেলছে আর ‘হেটার্স’ বাড়ছে।
এবারের বিশ্বকাপে বিষয়টি চরম আকার ধারণ করেছে। আর্জেন্টিনার ছন্দ, মেসির নান্দিকতার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। আর্জেন্টিনার বিদায় এখন তাদের কাছে পরম চাওয়া হয়ে উঠেছে। আর্জেন্টিনা বিদায় নিলে তাদের আনন্দের সীমা থাকবে না। আর জিতে সেমিতে উঠে গেলে দেখা যাবে সেখানেও কোনো না কোনো ভুল ধরা হচ্ছে।
অন্য দল পেনাল্টি পেলে বা তাদের বিপক্ষে গোল বাতিল হলে কোনো রিয়েকশন দেখা না গেলেও আর্জেন্টিনার পক্ষে এ রকম সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ মনোভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর সমালোচনার তীর খুব বেশি করে বিদ্ধ হচ্ছে। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ১৩ মিনিটের ঝলকে আর্জেন্টিনার ‘অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন’-এর গল্প প্রশংসার পরিবর্তে সমালোচিত হচ্ছে বেশি। অবস্থা এমন আকার ধারণ করেছে যে ‘ভিএআর’ নিয়ে ফিফাকে পর্যন্ত বিবৃতি দিতে হয়েছে। অনেকেই এমনও বলাবলি করছেন আর্জেন্টিনা আর মেসির হাতে ট্রফি তুলে দেওয়ার অপেক্ষায় আছে ফিফা! আগামীকাল সকাল ৭টায় সেমিতে উঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে তাই শুধু সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেই লড়তে হবে না, প্রতিকুল পরিস্থিতির বিপক্ষেও লড়তে হবে। মেসি আর আর্জেন্টিনাকে এখন তাই আগুনের পরশমণি হতে হবে।
মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর সমালোচনার ডাল-পালা এমন বিস্তার করেছিল যে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিশ্বকাপের খেলা যে এখনো বাকি আছে, সেটিই আড়ালে পড়ে গিয়েছিল। বোস্টনে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের ‘জলতরঙ্গ’ নৈপুণ্য দেখিয়ে ২-০ গোলে জয়ে মানুষ আবার ফুটবলমুখি হয়েছে। সুইসদের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে কোয়ার্টারে ফাইনালের তিনটি খেলা শেষ হয়ে যাবে। নিশ্চিত হয়ে যাবে সেমির তিন দল। আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পাওয়া যাবে চতুর্থ ও শেষ দল। এই ম্যাচগুলো মানুষকে আবার ফুটবলে প্রেমে নিমজ্জিত করবে। মেতে উঠবেন তারা ফুটবলের অপার সৌন্দর্য্যে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় যত গড়াচ্ছে আর্জেন্টিনাকে ততই শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে। গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা সহজেই ৩-০ গোলে আলজেরিয়াকে, ২-০ গোলে অস্ট্রিয়াকে, ৩-১ গোলে জর্ডানকে পরাস্ত করলেও শেষ বত্রিশে এসে কেপ ভার্দের সামনে প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণ ভাঙা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তারপরও মেসির নেতৃত্বে তারা একবার করে রক্ষণ ভাঙে, কেপ ভার্দে সমতা আনে। এমনি করে দুইবার সমতা আনার পর অবশেষে ৩-২ গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। মিসরের বিপক্ষে তো হারের মুখেই পড়েছিল ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে। পরে হঠাৎ করে বদলে যায় ম্যাচের চিত্রনাট্য। রচিত হয় ১৩ মিনিটের খণ্ডচিত্র। যেখানে তিন গোল দিয়ে আর্জেন্টিনা ম্যাচ বের করে নেয়। শতভাগ জয় নিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা কোয়ার্টারে দাঁড়িয়ে আছে। স্বপ্ন দেখছে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনাল খেলার। সে জন্য অবশ্য তাদের কোয়ার্টারের পর সেমির ধাপও অতিক্রম করতে হবে।
স্বপ্ন পূরণের সেই বাঁধা ডিঙ্গিয়ে সেমির দরজায় পৌঁছাতে আর্জেন্টিনার সামনে ফিফার সদর দপ্তরের দেশ সুইজারল্যান্ড পাহাড় সমান বাঁধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুইসদের সামনে নতুন ইতিহাসের হাতছানি। আগে বারোবার খেলে ‘আলপাইনরা কখনো কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পার হতে পারেনি। সর্বশেষ তারা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল নিজেদের দেশের আয়োজনে ১৯৫৪ সালে। সময়ের হিসাবে তারা শেষ আটে উঠে এসেছে ৭২ বছর পর। গ্রুপ পর্বে কাতারের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে আসর শুরু করার পর তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়েনি। বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে ৪-১ ও কানাডাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে গ্রুপসেরা হয়ে শেষ বত্রিশে উঠে আসার পর আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে পরাজিত করে জায়গা করে নেয় শেষ ষোলোতে।
এখানে কলম্বিয়াও তাদের সামনে বাঁধা হতে পারনি। টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে তারা নতুন ইতিহাস গড়ার লক্ষ্যে আলবিসেলেস্তেদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। শেষ আটে আর্জেন্টিনাকে পেয়েই আলপাইনদের কোচ মুরাত ইয়াকিন দিয়েছেন হুংকার। জানিয়েছেন আর্জেন্টিনা অপরাজেয় নয়। হারানো সম্ভব। তাদের হারানোর জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
মুকিত ইয়াকিন হুংকার দিলেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাদের জয়ের কোনো রেকর্ড নেই। সাতবারের দেখায় পাঁচবারই জয় আর্জেন্টিনার। দুইবার হয়েছে ড্র। বিশ্বকাপের মঞ্চে দুইবারের দেখাতে দুইবারই জয়ী আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে ২-০ গোলে জয়ের পর ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর টানটান উত্তেজনার লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ের ১১৮ মিনেটে ডি মারিয়ার গোলে জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
সময় যত গাড়াচ্ছে আর্জেন্টিনা ততই সংঘবদ্ধ হচ্ছে।
গ্রুপ পর্বে তারা ছিল শুধুই মেসি নির্ভর। প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ গোলের সব কটিই ছিল মেসির। ক্রমান্বয়ে তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। প্রয়োজনের সময় যে কেউ জ্বলে উঠে গোল করছেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে মেসি ছাড়াও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ গোল পেয়েছিলেন। মিসরের বিপক্ষেও একইভাবে মেসি ছাড়া গোলের দেখা পান রোমেরো ও এনজো মার্তিনেজ। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ নির্ভারতা ছড়ালেও রক্ষণ কিন্তু দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে।
এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে দুইটি করে চারটি গোল হজম করতে হয়েছে। কোচ লিওনেল স্কোলানিকে এই ব্যাপারে আরও সতর্ক হতে হবে। রক্ষণে লিসান্দ্র মার্তিনেজ-রোমেরো-মেদিনা-মন্তিয়েল বা অন্য যারা খেলতে পারেন, তাদের বিশেষ বার্তা দিয়ে রাখতে হবে। সুইস অধিনায়ক গ্রানাইট জাকা, ব্রেল এম্বোলো, রুবেন ভার্গাসদের ঠেকাতে হবে। এরা সবাই এক থেকে একাধিক গোল পেয়েছেন।
অবশ্য ইনজুরির কারণে আক্রমণ ভাগের প্রাণ তিনটি গোল ও দুইটি এসিস্ট করা জোহান মানজাম্বিকের না খেলাটা আর্জেন্টিনার রক্ষণের জন্য স্বস্তি। তবে তাদের বড় স্বস্তি কোনো ইনজুরি বা কার্ড সমস্যা নেই। দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ খেলোয়াড় যাকে আগামীতে মেসির বিকল্প ভাবা হচ্ছে সেই নিকো পাজ সুইজারল্যান্ডকে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘সুইজারল্যান্ড খুবই ভালো দল। পরের ধাপে যেতে হলে আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে হবে। মিসরের বিপক্ষে যেসব ভুল হয়েছে, সেগুলো শুধরে নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই, বিশ্বকাপ জয়।’
সুইসদের প্রধান ভরসা তাদের রক্ষণ। গোলে পোস্টে ব্রুসিয়া ডর্টমুন্ডের গ্রেগর কোবেল আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। গ্রুপ পর্বে তিন গোল হজম করলেও নকআউট পর্বে এসে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠেছেন। কোনো গোল হজম করেননি। প্রি-কোয়ার্টারে তিনি আবার কলম্বিয়ার কুচো হার্নান্দেজের চতুর্থ শট ঠেকিয়ে দলের জয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন। তার সামনে থাকা ডেনিস জাকারিয়া, ম্যানুয়েল আকাঞ্জি, নিকো এলভেদি, রিকোর্ডো রদ্রিগেজ আছেন প্রথম আক্রমণ ঠেকাতে। তবে ইতিহাস সৃষ্টির দ্বারপ্রান্তে থাকা এমন ম্যাচে কোচ মুকিত ইয়াকিন ইনজুরির কারণে আক্রমণভাগের মানজাম্বিককে ছাড়াও পাবেন না মাঝমাঠের মিচেল এবিশার ও রক্ষণের লুকা জ্যাকুয়েজকেও। দলে কার্ডজনিত কোনো সমস্যা নেই।
গ্রুপ পর্বে সুইজারল্যান্ড ১-১ গোলে কাতারের সঙ্গে ড্র করার পর বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে ৪-১ ও কানাডাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে। নকআউট পর্বের শেষ বত্রিশে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে পরাস্ত করার পর প্রি-কোয়ার্টারে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে পরাজিত করে ১৯৫৪ সালের পর আবার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসে।