ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নির্বাসনে থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে তিনি দেশের আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে রয়টার্সকে দেওয়া দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানান। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে এটিই শেখ হাসিনার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎকার।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। দীর্ঘ দুই বছর পর এবারই প্রথম তিনি দেশে ফেরার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করলেন।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে। তাও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালানো হচ্ছে। মৃত্যু যদি আসেই, তবে আমি চাই তা যেন আমার নিজের মাটিতেই হয়। সেখানে আমার বাবা-মা শুয়ে আছেন এবং তাদের রক্ত মিশে আছে।’
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জানান, তার দলের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেকে আত্মগোপনে আছেন। তাই তিনি দলের সবাইকে একসঙ্গে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তবে রয়টার্স অন্য নেতাদের অবস্থান বা তাদের বক্তব্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
শেখ হাসিনা আরও উল্লেখ করেন, দেশে ফেরার এই পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ঢাকার সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের গোপন আলোচনা বা যোগাযোগ করেননি। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার কোনো গোপন আলোচনার বিষয় নয়।’ একই সঙ্গে তিনি আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান এবং চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দেন।
শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মোড় নিতে পারে। গত দুই বছর ধরে চলমান অস্থিরতার পর বর্তমান সরকার যখন স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, তখন তার এই ঘোষণা রাজনৈতিক বিভাজন আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। ঢাকা তাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতকে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে। এই বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। আমি নিজেই চলে যাব।’
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত এপ্রিলে তারা জানিয়েছিল, বাংলাদেশের হস্তান্তরের অনুরোধটি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে এবং তারা ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও, তার বিরুদ্ধে ভিন্নমত ও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের দমন-নির্যাতন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের সেই গণ-অভ্যুত্থানের সময় অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।
নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ভুলত্রুটি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দীর্ঘদিন সরকার চালালে কিছু ভুল হতেই পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে সরকারের ভালো-মন্দ বিচারের অধিকার একমাত্র জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’
আদালতের রায়ের কারণে নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, দলকে পুনর্গঠনের জন্য তিনি ইতোমধ্যে ১২৫টি সংসদীয় আসনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তারা আমাকে সাজা দিতেই পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? আমরা যদি খারাপ কিছু করে থাকি, তবে জনগণই তা নির্ধারণ করবে।’ সূত্র: রয়টাস, বিবিসি