ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দেশটির পবিত্র নগরী মাশহাদে দাফন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শিয়া মুসলিম ধর্মীয় স্থান ইমাম রেজা মাজারে তার মরদেহ দাফন করা হয়। এর মাধ্যমে ইরান ও প্রতিবেশী ইরাকের পাঁচটি শহরে টানা ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এ জানাজা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাপ্তি হলো। তবে দাফনের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় পুরো আয়োজনজুড়ে যুদ্ধের ছায়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সকালে ইরাক থেকে একটি বিমান খামেনি, তার নাতনি, জামাতা, মেয়ে এবং মোজতবার স্ত্রীর মরদেহ নিয়ে মাশহাদে পৌঁছায়। কালো পোশাক পরা হাজারও শোকাহত মানুষ মাশহাদের প্রধান সড়কে সমবেত হন। অনেকের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মৃত্যুদণ্ডের দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা যায়।
দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টাহামলার কারণে যুদ্ধ অবসানে প্রাথমিক সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যেই এ দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অভিযোগ করে, খামেনির দাফন অনুষ্ঠানকে ম্লান করে দিতে যুক্তরাষ্ট্র রাতের আঁধারে তেহরান থেকে মাশহাদগামী রেলপথের দুটি সেতুতে বোমা হামলা চালিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন তেহরানে নিজ বাসভবনে ইসরায়েলি হামলায় খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। তার মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে একই হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার খবরের পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। তেহরান ও কোমে অনুষ্ঠিত জানাজা কিংবা মাশহাদের দাফন অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা যায়নি।
ইমাম রেজা ছিলেন শিয়াদের দ্বাদশ ইমামদের মধ্যে অষ্টম। নবম শতকে নির্মিত তার সুবিশাল সোনালি গম্বুজ ও মিনারসমৃদ্ধ মাজারে প্রতিবছর লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষ তীর্থযাত্রা করেন। ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদেই খামেনির জন্ম। সেখানকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে তিনি কোমে যান, যা ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় ৩৭ বছর ক্ষমতায় থেকে তিনি দেশটির রাজনীতি ও সশস্ত্র বাহিনীর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও জানুয়ারির সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর জাতীয় ঐক্য ও শক্তির বার্তা দিতেই খামেনির শোকানুষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে শোকানুষ্ঠানের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন করে হামলা-পাল্টাহামলায় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) টানা দ্বিতীয় রাতের হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। জবাবে আইআরজিসি জানায়, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী।
তিন সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সব ধরনের শত্রুতা বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই মাসের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে একমত হয়েছিল।
গত সপ্তাহে মধ্যস্থতাকারী কাতার জানায়, দোহায় পরোক্ষ বৈঠকে উভয় পক্ষ অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং খামেনির শোকানুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আবার আলোচনা শুরু হবে।
সূত্র: বিবিসি