বিশ্বকাপ ফুটবল ক্রমেই ইউরোপীয় লড়াইয়ে মোড় নিচ্ছে। ইউরোপের দুই ভিন্ন গল্প এবার এসে মিলেছে একই মঞ্চে। একদিকে বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদার ইংল্যান্ড, অন্যদিকে ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর নরওয়ে।
শনিবার (১১ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে এই দুই দল মুখোমুখি হবে কোয়ার্টার ফাইনালে। ম্যাচের পুরস্কার একটাই-সেমিফাইনালের টিকিট, যেখানে অপেক্ষায় থাকবে আর্জেন্টিনা কিংবা সুইজারল্যান্ড।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ডকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে নরওয়ের লক্ষ্য ছিল নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া। কিন্তু টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়ে বদলে দিয়েছে সেই ধারণা। দুই যুগ পর বিশ্বকাপে খেলতে এসে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে ওঠার পর পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে বিদায় করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা।
অন্যদিকে স্বাগতিক মেক্সিকোর ভয়ঙ্কর পরিবেশ, উচ্চতা এবং ৭০ হাজারের বেশি দর্শকের চাপ সামলেও ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহামের জোড়া গোল এবং হ্যারি কেইনের পেনাল্টি ইংল্যান্ডকে এনে দিয়েছে টানা তৃতীয় জয়।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভয়ংকর স্ট্রাইকার নিঃসন্দেহে নরওয়ের আর্লিং হালান্ড। পাঁচ ম্যাচে সাত গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে ভালোভাবেই দৌড়ে আছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার নেওয়া শটের ৩৯ শতাংশই গোলে পরিণত হয়েছে, যা ১৯৮৬ সালের পর অন্তত ১৫টি শট নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্যের হার।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের আক্রমণে রয়েছেন জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেইন, বুকায়ো সাকা ও ফিল ফোডেনের মতো তারকারা। শেষ তিন ম্যাচে প্রতিটিতেই অন্তত দুটি করে গোল করেছে থ্রি লায়ন্স।
দুই দলের অতীত মুখোমুখি লড়াই ইংল্যান্ডের পক্ষেই কথা বলছে। এখন পর্যন্ত ৯ ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতেছে ৭টি, নরওয়ে মাত্র ২টি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিশ্বকাপে কোনো ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে এখনো জয় পায়নি নরওয়ে। গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ চার দেখায় একটিও গোল করতে পারেনি তারা। তবে পরিসংখ্যান সবকিছু নয়। অন্তত এবারের বিশ্বকাপে নরওয়ের বেলায় নয়। পরিসংখ্যানের বাইরে বর্তমান নরওয়ে ভিন্ন এক দল। ব্রাজিলকে হারানোর পর তাদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে।
মেক্সিকোর বিপক্ষে লাল কার্ড দেখায় এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না জারেল কোয়ানসাহ। চোটের কারণে পুরো বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জর্ডান হেন্ডারসন। তবে মার্ক গেহি, ডেকলান রাইস ও রিস জেমসকে নিয়ে বড় কোনো শঙ্কা নেই। ফলে ইংল্যান্ড প্রায় পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই মাঠে নামবে।
ব্রাজিল ম্যাচে চোট পেলেও বাঁ-প্রান্তের নরওয়ের ডিফেন্ডার ডেভিড মোলার উলফে পুরোপুরি ফিট হয়ে অনুশীলনে ফিরেছেন। ফলে কোচ স্টালে সলবাক্কেনের হাতে রয়েছে পুরো স্কোয়াড। অস্কার বব ও আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের দারুণ পারফরম্যান্স একাদশ নির্বাচনে বাড়তি প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে।
টুখেলের ইংল্যান্ড এবার বাস্তববাদী ফুটবল খেলছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে মাত্র ৩৩.২ শতাংশ বলের দখল রেখেও তিন গোল করেছে তারা। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ ও সংগঠিত রক্ষণই এখন তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অন্যদিকে স্টেল সোলবাকেনের নরওয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবলে বিশ্বাসী। বিশ্বকাপে তাদের পাঁচ ম্যাচেই গোল হয়েছে উভয় প্রান্তে। তারা করেছে ১২ গোল, আবার হজম করেছে ৯টি।
এ কারণেই ম্যাচটি হতে পারে কৌশল বনাম গতির লড়াই। ম্যাচ নিয়ে ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল বলেন, ‘নরওয়েকে শুধু হালান্ডের দল ভাবার সুযোগ নেই। তারা ব্রাজিলকে হারিয়েছে, সেটাই তাদের মানসিক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমাদের সেরা ফুটবল খেলতে হবে।’
নরওয়ে কোচ স্টেল সোলবাকেন বলেন, ‘এই দল ইতিহাস লিখছে। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছি ভয় পেতে নয়, নিজেদের ফুটবল খেলতে। ইংল্যান্ড ফেবারিট, কিন্তু মাঠে নামার পর অতীতের কোনো মূল্য থাকে না।’
ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ‘বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে ছোট বড় কোনো দল নেই। নরওয়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছে। আমাদের ধৈর্য ধরে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
নরওয়ে অধিনায়ক আর্লিং হালান্ড বলেন, ‘সব চাপ ইংল্যান্ডের ওপর। তারা টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট। আমরা শুধু নিজেদের সেরাটা দিতে চাই। ব্রাজিলকে হারিয়ে আমরা দেখিয়েছি, অসম্ভব বলে কিছু নেই।’
বিশ্বকাপের এই কোয়ার্টার ফাইনাল তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি অভিজ্ঞতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার লড়াই, ঐতিহ্য ও নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্নের সংঘর্ষ। একদিকে ইংল্যান্ড তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরেকটি ধাপ পেরোতে চায়, অন্যদিকে নরওয়ে চায় রূপকথার যাত্রাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে। শনিবার মায়ামিতে তাই ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।