ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে মরক্কো। তবে দলের বিদায়ের পরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দলটির তারকা গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু। প্রথমার্ধে কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি রুখে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজের আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেন ৩৫ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। সেই সঙ্গে গড়েছেন গৌরবের রেকর্ড।
বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল ফ্রান্স ও মরক্কো। ম্যাচের ২৯ মিনিটে ফরাসি অধিনায়ক এমবাপ্পের পেনাল্টি শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দারুণ দক্ষতায় রুখে দেন মরক্কোর প্রাচীর ইয়াসিন বুনু। ভিএআর রিভিউয়ের কারণে প্রায় তিন মিনিট সময় নষ্ট হওয়ায় এমবাপ্পের মনোযোগ ব্যাহত হয়েছিল। আর সেই সুযোগটিকেই নিজের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে কাজে লাগান সৌদি আরবের ক্লাব আল-হিলালে খেলা বুনু। এই সেভের মাধ্যমে বুনো বিশ্বকাপের ইতিহাসে (টাইব্রেকারসহ) সর্বোচ্চ ৪টি পেনাল্টি সেভ করে ইকার ক্যাসিয়াস ও ডমিনিক লিভাকোভিচের মতো কিংবদন্তিদের পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এ কারণে বুনুকে এখন বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ‘পেনাল্টি স্টপার’ বলা হচ্ছে। তিনি বিশ্বকাপে মোট চারটি পেনাল্টি সেভ করে ১৯৬৬ সালের পর থেকে যৌথভাবে সর্বোচ্চ পেনাল্টি সেভ করা গোলরক্ষকদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। বিশ্বকাপে মুখোমুখি হওয়া ৯টি পেনাল্টির মধ্যে তিনি মাত্র ২টিতে গোল হজম করেছেন। তার সেভ করা ৪টি পেনাল্টির পাশাপাশি প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রা ৩টি শট গোলে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এটা ঠিক গোলরক্ষকদের ভাগ্যে করতালির চেয়ে দীর্ঘশ্বাসই বেশি লেখা থাকে! একটি ভুল পুরো দলকে ডুবিয়ে দেয়, অথচ শত শত সেভও কখনো কখনো হারিয়ে যায় পরাজয়ের অন্ধকারে। মরক্কোর ইয়াসিন বুনু সেই নিষ্ঠুর সত্যেরই আরেক নাম। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে যিনি নিজের দুই হাতে মরক্কোকে আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম সেমিফাইনালে তুলেছিলেন, চার বছর পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত প্রহরীদের দীপ্তি ম্লান হয় না। ফুটবল একার খেলা নয়। বুনুর অবিশ্বাস্য সেভও শেষ পর্যন্ত মরক্কোকে রক্ষা করতে পারেনি। ম্যাচের বাকি সময়ে ফ্রান্স দুটি গোল করে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে বুনুর চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক যোদ্ধার নিঃশব্দ বেদনা। তিনি হেরেছেন, কিন্তু আত্মসমর্পণ করেননি।
সাড়ে তিন বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে বুনোর উত্থান ছিল রূপকথার মতো। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে একের পর এক শট ঠেকিয়ে তিনি গোটা বিশ্বকে বিস্মিত করেছিলেন। পর্তুগালের বিপক্ষেও ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। সেই বিশ্বকাপেই মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে ইতিহাস গড়ে, আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটির নাম ছিল ইয়াসিন বুনু। ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেও তিনি একই দৃঢ়তা ধরে রেখেছেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে টাইব্রেকারে দুর্দান্ত সেভ করে মরক্কোকে শেষ ষোলোতে তুলেছেন। এরপর কানাডার বিপক্ষে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে থেকে দলকে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দেন। আর ফ্রান্সের বিপক্ষে এমবাপ্পের পেনাল্টি রুখে দিয়ে আবারও প্রমাণ করেছেন, বিশ্বের সেরা গোলরক্ষকদের আলোচনায় তার নাম উচ্চারণ করা কোনো আবেগ নয়, বাস্তবতার স্বীকৃতি।
বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তার হাতে ওঠেনি। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপেই তিনি জিতেছেন কোটি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। কারণ ট্রফি কেবল বিজয়ীদের হাতে যায়, আর সম্মান যায় সেইসব যোদ্ধাদের কাছে, যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে জানেন। বিদায়ের পর বুনু বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি। ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। তাদের বিপক্ষে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে খেলেছি। বিদায় অবশ্যই কষ্টের, কিন্তু এই দল নিয়ে আমি গর্বিত।’
মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বুনুর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘বুনু পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই অসাধারণ ছিল। ফ্রান্সের বিপক্ষেও সে আমাদের ম্যাচে রেখেছিল। এমবাপ্পের পেনাল্টি সেভ বিশ্বমানের গোলরক্ষকের কাজ। এমন একজন খেলোয়াড়কে দলে পাওয়া যেকোনো কোচের জন্য সৌভাগ্যের।’
দলের অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি বলেন, ‘বুনু আমাদের অনুপ্রেরণা। শুধু এই ম্যাচ নয়, পুরো বিশ্বকাপজুড়েই সে অবিশ্বাস্য ছিল। আমরা জানি, তার মতো একজন গোলরক্ষক থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই লড়াই করা সম্ভব। আমরা হেরেছি, কিন্তু বুনুর পারফরম্যান্স আমাদের গর্বিত করেছে।’