আমাদের সমাজে নারী হেনস্তা, অপহরণ, ধর্ষণ ইত্যাদি ঘটনাগুলো সামনে এলে অনেকের মধ্যেই ‘পর্দা’ নিয়ে প্রচণ্ড আলাপন দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে, নারীরা যথাযথ পর্দা করলে এরকম বিপদে পড়তে হয় না। পর্দার বিধান শুধু নারীদের জন্যই নাজিল হয়েছে, ব্যাপারটা আসলে এমন নয়। বরং পর্দা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই অবশ্য পালনীয়।
তবে নারী-পুরুষের পর্দার জন্য আল্লাহপাক প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মহান আল্লাহতায়ালা নারীদের পর্দার আগে পুরুষের পর্দার কথা বলেছেন, এর বিশেষ তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। সমাজের বেশির ভাগ ধর্ষণ, নারী হেনস্তামূলক ওকারেন্সে পুরুষকেই অগ্রগামী দেখা যায়। তাই পুরুষ তার দৃষ্টি সংযত রাখলে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করলে সমাজ থেকে এ জাতীয় অশ্লীলতা ও পাপাচার অনেকাংশে কমে যাবে।
শব্দটি মূলত ফারসি। যার আরবি প্রতিশব্দ হিজাব। পর্দা বা হিজাবের বাংলা অর্থ আবৃত করা, ঢেকে রাখা, আবরণ, আড়াল, অন্তরায়, আচ্ছাদন, বস্ত্রাদি দ্বারা সৌন্দর্য ঢেকে নেওয়া, আবৃত করা বা গোপন করা ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, নারী-পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জনের নিমিত্তে উভয়ের মাঝে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত যে আড়াল বা আবরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তাকে পর্দা বলা হয়। মূলত হিজাব বা পর্দা অর্থ শুধু পোশাকের আবরণই নয়, বরং সামগ্রিক একটি সমাজব্যবস্থা, যাতে নারী-পুরুষের মধ্যে অপবিত্র ও অবৈধ সম্পর্ক এবং নারীর প্রতি পুরুষের অত্যাচারী আচরণ রোধের বিভিন্ন ব্যবস্থা রয়েছে।
আল্লাহতায়ালা নারী ও পুরুষদের প্রতি পর্দা পালনের বিষয়টি কোরআনুল কারিমে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে নবি! আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, এটা তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে বিষয়ে অবগত এবং হে নবি! আপনি ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিচু রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।
তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্ত দাসী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনরা, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা নুর, ৩০-৩১)
আবার নারী এবং পুরুষের পর্দার স্বরূপ কেমন হবে, হাদিসে পাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসেই প্রমাণ পাওয়া যায়।
বিশ্বনবি (সা.)-এর অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.)-এর আগমনে প্রিয়নবির নসিহতটি নারী-পুরুষ উভয়ের মনে রাখা প্রয়োজন।
উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আমি একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছিলাম। উম্মুল মুমিনিন মায়মুনা (রা.)-ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
এমন সময় আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম উপস্থিত হলেন। এটি ছিল পর্দা বিধানের পরের ঘটনা। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা তার সামনে থেকে সরে যাও। আমরা বললাম, তিনি তো অন্ধ, আমাদের দেখছেন না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখছ না? (আবু দাউদ, ৪১১২; তিরমিজি, ২৭৭৯)
উল্লেখিত হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, কোনো নারী পর্দার ভেতরে থেকে কোনো পুরুষকে দেখাও বৈধ নয়। পুরুষের জন্য যেমন নারীদের সঙ্গে অবাধ দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ নয়; ঠিক তেমনি নারীদের জন্য পুরুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ নয়।
আল্লাহতায়ালা অন্যত্র আয়াতে জানিয়ে দেন, নারীদের কীভাবে ঘর থেকে বের হওয়া লাগবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে। ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা আহজাব, ৫৯)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহতায়ালা মুমিন নারীদের আদেশ করেছেন, যখন তারা কোনো প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবে, তখন যেন মাথার ওপর থেকে ওড়না/চাদর টেনে স্বীয় মুখমণ্ডল আবৃত করে। আর (চলাফেরার সুবিধার্থে) শুধু এক চোখ খোলা রাখে। (ফাতহুল বারি ৮/৫৪)
ইবনে সিরিন বলেন, আমি (বিখ্যাত তাবেয়ি) আবিদা [সালমানি (রাহ.)]-কে উক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, কাপড় দ্বারা মাথা ও চেহারা আবৃত করবে এবং এক চোখ খোলা রাখবে।
নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দা পালন করা ফরজ। ইসলামে উভয়কেই পর্দা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্দা পালন করা মুসলিম নারীর অনন্য রুচিবোধ ও সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। পর্দা পুরুষের উন্নত চরিত্র গঠনের মাধ্যম; পাশাপাশি নারীর মানসম্মান, ইজ্জত-আবরুর রক্ষাকবচও বটে।
সুতরাং নারী ও পুরুষের জন্য পর্দা পালন করা সমভাবে প্রযোজ্য। এই অসুস্থ সমাজব্যবস্থায় দ্বীন ও ঈমান নিয়ে টিকে থাকতে চাইলে পর্দাকে পরিপূর্ণভাবে ধারণ করার বিকল্প নেই।
লেখক: শিক্ষার্থী
আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়