কিলিয়ান এমবাপ্পে যখন তার বিশ্বকাপগুলোর দিকে ফিরে তাকাবেন, তখন হয়তো তিনি সেগুলোকে এমন প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখবেন, যেখানে তার ফুটবলজীবন সবচেয়ে জীবন্তভাবে লেখা হয়েছে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ, যখন তিনি ছিলেন সেই কিশোর, যিনি রক্ষণভাগ চিরে এগিয়ে যেতেন, ফাইনালে গোল করেছিলেন এবং ফ্রান্সকে আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আসনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছিলেন। ২০২২ সালের কাতার, যখন তিনি ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, তবু পরাজিত দলের সদস্য হিসেবেই শেষ করেছিলেন; তাকে টপকাতে পেরেছিলেন শুধু লিওনেল মেসি এবং সেই নিয়তি, যা যেন মেসিকে ঘিরেই জমাট বেঁধেছিল। আর এখন আমেরিকার এই গ্রীষ্মে, যেখানে ফ্রান্স আবারও শিখরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এবং এমবাপ্পে আবারও প্রতিযোগিতাটিকে এমন অনুভূতি দিয়েছেন, যেন তা প্রায় স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতিভার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
২৮ বছর বয়সেই তিনি ইতোমধ্যে তিনটি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। ২০ ম্যাচে তিনি করেছেন ২০ গোল এবং জিতেছেন ১৭টি ম্যাচ। একটি বিশ্বকাপ শিরোপা ইতোমধ্যে তার, আরেকটি ফাইনাল পরাজয়ের মধ্যেও বহন করে তার প্রতিভার ছাপ, আর এখন তার সামনে আছে আরও দুটি ম্যাচ– যা যোগ হতে পারে এমন এক রেকর্ডে, যা ধীরে ধীরে কিংবদন্তির মতো মনে হতে শুরু করেছে। মেসি, তার প্রজন্মের সেরা এবং হয়তো যেকোনো প্রজন্মেরই সেরা, নিজের উত্তরাধিকারের একটি বড় অংশ হয়ে ওঠা সেই বিশাল টুর্নামেন্ট-অর্জন গড়ে তুলতে খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপ ও ৩১টি ম্যাচ। এমবাপ্পে নিজস্ব বিশ্বকাপ গল্প শেষ হওয়ার আগেই পৌঁছে গেছেন প্রায় একই রকম বিরল উচ্চতায়।
শুধু সংখ্যার কারণে নয়, যদিও সেগুলোই যুক্তি প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। এমবাপ্পেকে সব সময় এই মঞ্চে হালকা দেখিয়েছে, যেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা তার জন্য সহ্য করার কোনো বিষয় নয়, বরং এমন এক জায়গা যেখানে তিনি স্বভাবগতভাবেই নিজের স্থান খুঁজে পান। হয়তো সেই স্বাচ্ছন্দ্যের শুরু হয়েছিল কুপ ৯৩-এ, সেই স্কুল টুর্নামেন্টে, যেটিকে তিনি পরে তার প্রথম বিশ্বকাপ বলে বর্ণনা করেছিলেন। পুরস্কার ছিল মাত্র দুই ইউরোর একটি প্লাস্টিক ট্রফি, কিন্তু শিশুদের কাছে সেটি ছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মানের সমান। এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘আমরা ২ ইউরোর ট্রফির জন্য খেলতাম যেন এটি জুল রিমে ট্রফি। হয়তো আপনি ভাববেন আমি বাড়িয়ে বলছি, কিন্তু এটি সত্যিই আমাদের কাছে সবকিছু ছিল।’
সেই টুর্নামেন্টই তাকে দিয়েছিল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি মুহূর্ত। এমবাপ্পের বয়স তখন ১১, যখন তার দল গাগনির একটি আসল স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে ওঠে। মাঠের বিশালত্ব আর দর্শকদের ভিড়ে তিনি অভিভূত হয়ে যান। ‘আমি প্রায় দৌড়াইনি, এতটাই ভয় পেয়েছিলাম। বলও ঠিকমতো ছুঁতে পারিনি,’ পরে তিনি স্মরণ করেছিলেন। এর পর তার মা মাঠে ঢুকে তার দুই কান ধরে টানেন। খারাপ খেলেছিলেন বলে নয়, ভয় পেয়েছিলেন বলে। মা তার সন্তানকে বলেছিলেন, ‘তোমাকে সব সময় নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, এমনকি ব্যর্থ হলেও। তুমি ৬০টা গোল মিস করতে পারো। কেউ পরোয়া করবে না। কিন্তু তুমি যদি ভয় পেয়ে খেলতেই অস্বীকার করো, সেই ব্যাপারটা সারা জীবন তোমাকে তাড়া করতে পারে।’
এমবাপ্পে বলেছেন, ওই কথাগুলো তাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল যে, ‘আমার সারা জীবনে ফুটবল মাঠে আমি আর কখনো ভয় পাইনি।’ এর পর থেকে তিনি যেভাবে বিশ্বকাপকে আপন করে নিয়েছেন, সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা। স্টেডিয়ামগুলো এখন আরও বড়, কোলাহল আরও জোরালো এবং এর ফলাফল অপরিসীম, কিন্তু তিনি খুব কমই এমনভাবে খেলেছেন যেন এর কোনো কিছুই তাকে ভয় দেখাতে পারে।
২০১৮ সালে কিশোর বয়সে যখন তিনি বিশ্বকাপে এসেছিলেন, তখন কোনো শিক্ষানবিশি বা মঞ্চের প্রতি কোনো বিনয় ছিল না। তিনি দৌড়েছেন, গোল করেছেন এবং জিতেছেন। ২০তম জন্মদিনের আগেই তিনি ফাইনালে গোল করেছিলেন এবং ট্রফি তুলে নিয়েছিলেন। চার বছর পর কাতারে, তিনি এমন এক ফাইনাল পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছিলেন যা একজন বিজয়ীরই প্রাপ্য, কারণ খেলাধুলায় পরাজয়ের পর এমন আড়ম্বরপূর্ণ আচরণের সুযোগ খুব কমই মেলে। ফ্রান্স তখন ডুবছিল, তার পর হাঁসফাঁস করছিল এবং প্রায় হেরেই গিয়েছিল, কিন্তু এমবাপ্পে বারবার দলটিকে টেনে বাতাসে ভাসিয়ে তুলছিলেন। তিনি ৯৭ সেকেন্ডের মধ্যে একবার গোল করেন, তার পর আবার গোল করেন এবং অতিরিক্ত সময়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে তিনটি গোল, তবু তাকে দেখতে হয়েছিল মেসি ট্রফি নিয়ে মাঠ ছাড়ছেন।
আর এখন, এমবাপ্পে আরও একবার ফ্রান্সকে টুর্নামেন্টের গভীরে নিয়ে গেছেন। নিজের পরিসংখ্যানকে এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছেন যা রেকর্ড বইয়ের পুরোনো কিংবদন্তিদের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তার সর্বশেষ গোলটি সেই মানসিকতার আরও একটি ঝলক দেখিয়েছে যা তাকে এত সফল করে তুলেছে। এমবাপ্পে মরক্কো ম্যাচে একটি পেনাল্টি মিস করেন, কিন্তু সেই মিসটি বেশিক্ষণ তার মনে থাকেনি। বেশির ভাগ ফরোয়ার্ডের জন্য, একটি নষ্ট হওয়া সুযোগ মনে গেঁথে যেতে পারে এবং পরের সুযোগটি নষ্ট করে দিতে পারে। এমবাপ্পে যেন ব্যর্থতা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা মুছে ফেলেন। বিশ্বকাপে প্রিয় শিষ্য ২০ গোল করার পর কোচ দিদিয়ের দেশম বলেন, ‘যখন কিলিয়ান থাকে, তখন কোনো সমস্যাই হয় না। সে নিজেকে নিয়ে কখনোই সন্দেহ করে না, যদিও গোল করার আগে সে আরও একটি সুযোগ পেয়েছিল।’
একটি সুযোগ নষ্ট হলেও, এমবাপ্পে বল চাইতেই থাকে। আরেকটি সুযোগ নষ্ট হলেও, সে পরের টাচের ওপর আস্থা রাখে। বাইরের বিশ্ব যদি এখনো তাকে একাকী তারকা, নিজের সাম্রাজ্য হিসেবে দেখতে চায়, তবে দেশম এই বিশ্বকাপের বেশির ভাগ সময় ধরেই সেই চিত্রকে খণ্ডন করে চলেছেন। তার কথায়, ‘অনেকে বলে কিলিয়ান একজন স্বৈরাচারী, সে শুধু নিজের কথাই ভাবে। কিন্তু সে অধিনায়ক এবং সে অনুকরণীয়।’ বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ ও অধিনায়ক একাধিকবার একই প্রসঙ্গে ফিরে এসেছেন, ‘কিলিয়ান সম্পর্কে আপনাদের যে ধারণা, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। প্রথম দিন থেকেই আমি বলে আসছি যে তার মধ্যে স্পিরিট আছে, সে অ্যাথলেটিক প্রচেষ্টা চালায় এবং যখন সে কথা বলে, তখন পুরো দলের হয়েই বলে। অবশ্যই, মাঠে তার পারফরম্যান্সের জন্য সে স্পটলাইটে থাকে, কিন্তু এটা দলীয়।’
এটা সেই ফ্রান্স দলেরও বর্ণনা, যার নেতৃত্ব এখন এমবাপ্পে দিচ্ছেন। এই দলটি কোনো একজনকে কেন্দ্র করে সাজানো নয়, কিংবা কোনো রাজাকে ঘিরে গড়া রাজসভাও নয়। এমবাপ্পে নিঃসন্দেহে নেতা, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম। তিনি উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিসের সঙ্গে আক্রমণভাগে খেলেন, এমন দুজন ফুটবলার যাদের মৌসুমগুলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে তারা তার পাশাপাশি ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় স্থান করে নিয়েছেন। তবু এই ত্রয়ী উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাত হিসেবে নয়, বরং তাদের একটি অংশীদারত্ব হিসেবে কাজ করেছে। দেশম বলেন, ‘এটা একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনের লড়াই নয়। তাদের মধ্যে একটি চমৎকার মানবিক সম্পর্ক রয়েছে। যখন দেম্বেলে হ্যাটট্রিক করেছিল, কিলিয়ান খুশি হয়েছিল। তারা একে অপরের সাফল্যে একটি দল হিসেবে খুশি হয়।’
এটা যেকোনো পরিসংখ্যানের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ফ্রান্সের আগেও এমন দল ছিল যা প্রতিভায় পরিপূর্ণ ছিল, কিন্তু সব সময় সম্প্রীতিতে আশীর্বাদপুষ্ট ছিল না। ২০১০ সালের ঘটনাটি একটি সতর্কতামূলক উদাহরণ, যখন কোচ রেমন্ড ডোমনেককে মৌখিকভাবে অপমান করার জন্য নিকোলাস আনেলকাকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। সংহতি প্রকাশ করে, খেলোয়াড়রা নাইসনাতে অনুশীলন করতে অস্বীকার করে এবং প্রতিবাদস্বরূপ তাদের টিম বাসে চড়ে বসে। এই ফ্রান্স ভিন্ন। দেশম এটিকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছেন। এমবাপ্পেকে একজন দলীয় খেলোয়াড় হিসেবে এবং দলীয় ঐক্যকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার যে জেদ, তা স্মৃতি থেকে গড়া এক দর্শন। তিনি জানেন যে বিশ্বকাপ জেতে কাগজে-কলমে সেরা নামের দল নয়, বরং সেই দলই জেতে যাদের প্রতিভা চাপ, অহংকার এবং টুর্নামেন্ট জীবনের অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতাকে জয় করে টিকে থাকে।
সেই অর্থে, এমবাপ্পে শুধু ফ্রান্সের সেরা খেলোয়াড়ই নন। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে ঘিরে বহু উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহাবস্থান করতে শিখেছে। তার কর্তৃত্ব দেম্বেলে বা ওলিসকে ছোট করার ওপর নির্ভর করে না। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব তাকে শক্তিশালী করে এবং তাদের সাফল্যে তার আনন্দ পুরো দলকে শক্তিশালী করে। সম্ভবত এই সহজাত প্রবৃত্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায় বন্ডিতে, ফ্রান্সের এই সম্প্রদায় তাকে গড়ে তুলেছিল ফ্রান্স তাকে নিজেদের রাজপুত্র হিসেবে গ্রহণ করার আগে। এমবাপ্পে একটি বহু সংস্কৃতির পরিবারে বড় হয়েছেন, এএস বন্ডির স্টেডিয়ামের দিকে মুখ করা একটি ফ্ল্যাটে, যেখানে তার বাবা উইলফ্রিড যুব দলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি ছয় বছর বয়সে ক্লাবে যোগ দেন এবং শীঘ্রই তাকে তার চেয়ে বড় ও শক্তিশালী ছেলেদের বিরুদ্ধে খেলায় নামিয়ে দেওয়া হয়।
তবে, বন্ডি কেবল একটি ক্রীড়া-রূপকথার মনোরম সূচনাবিন্দু ছিল না। ২০০৫ সালের অস্থিরতা যখন প্যারিসের শহরতলিতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এমবাপ্পের বয়স ছিল ৬ বছর। এই অস্থিরতা বর্জন, বৈষম্য এবং পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভকে উন্মোচিত করেছিল। তিনি এটা জেনেই বড় হয়েছেন যে, শহরতলিগুলোকে প্রায়শই কেবল তাদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চিত্র দিয়েই বর্ণনা করা হতো। একবার এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘আমাদের পাড়াটি বিভিন্ন সংস্কৃতির এক অবিশ্বাস্য মিলনস্থল– ফরাসি, আফ্রিকান, এশীয়, আরব, বিশ্বের প্রতিটি অংশ।’ ফ্রান্সের বাইরের লোকেরা সব সময় শহরতলির কথা খারাপভাবে বলে, কিন্তু আপনি যদি এখানকার না হন, তা হলে আসলে বুঝতে পারবেন না এখানকার জীবনটা কেমন।
বন্ডির প্রতি এই সমর্থন, নিজস্ব উপায়ে, এমবাপ্পের প্রতি দেশমের সমর্থনের মতোই। দুটোই একটি সরলীকৃত জনচিত্রের বিরুদ্ধে যুক্তি: এলাকাটিকে দেখানো হয় কেবল বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে, আর অধিনায়ককে দেখানো হয় কেবল ক্ষমতা ও অহংকারের মাধ্যমে। এমবাপ্পে স্মরণ করেন, কীভাবে তিনি বন্ডির সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু পুরুষকে তার দাদির জন্য বাজার বয়ে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতির এই দিকগুলো আপনি খবরে কখনো দেখতে পাবেন না। আপনি কেবল খারাপ দিকটাই শোনেন, ভালোটা কখনো নয়।’ এলাকাটি তাকে শিখিয়েছিল যে কঠোরতা এবং উদারতা একে অপরের বিপরীত নয়, শক্তি মানেই স্বার্থপরতা নয়। সম্ভবত এ কারণেই তিনি তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈপরীত্যগুলোর সঙ্গে বাঁচতে শিখেছেন: সুপারস্টার, সতীর্থ, অধিনায়ক, সর্বোপরি সবার মধ্যে সেরা, ফ্রান্সের সবচেয়ে পরিচিত খেলোয়াড় এবং তার কোচের মতে, অন্যতম ভুল বোঝা খেলোয়াড়।
বিশ্বকাপে তার ভূমিকা কতটা বদলে গেছে, সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১৮ সালে তিনি ছিলেন বিস্ময়বালক, যার সমস্ত শক্তি ছিল গতি আর দুঃসাহসে ভরপুর। ২০২২ সালে তিনি ছিলেন প্রতিশোধক, সেই ফুটবলার যিনি ফাইনালের স্মৃতিকে কিছুতেই ভুলতে দেননি। ২০২৬ সালে তাকে তার বয়সের চেয়ে বেশি পরিণত মনে হয়; তার প্রতিভা কমে গেছে বলে নয়, বরং টুর্নামেন্টের স্মৃতিশক্তি আরও গভীর হয়েছে বলে। মস্কোর জয় তাকে শিখিয়েছিল যে ট্রফিটা তারও হতে পারে; দোহায় পরাজয় তাকে শিখিয়েছিল, কত নির্মমভাবে তা কেড়ে নেওয়া যেতে পারে।
ক্লাব ফুটবল, তার সমস্ত জাঁকজমক ও চাকচিক্য সত্ত্বেও এই বৈপরীত্যকে কেবল আরও প্রকট করেছে। প্যারিস সেন্ট-জার্মেইতে এমবাপ্পে এমনই গোলমেশিন ছিলেন যে গোল করাটা তার জন্য নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রিয়াল মাদ্রিদে, তিনি সেই ভূমিকায় থিতু হয়েছেন। তবু সম্ভবত তিনি তার সবচেয়ে খাঁটি সত্তাটাকে সব সময় ফ্রান্স এবং বিশ্বকাপের জন্যই তুলে রেখেছেন। আর এভাবেই সংখ্যাগুলো বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যেই ২০টি গোল। ১৭টি জয়। একটি বিজয়ীর পদক, পরাজয়ের ম্যাচে ফাইনালে একটি হ্যাটট্রিক এবং আরও একটি ধারাবাহিক জয়যাত্রা– যা ফ্রান্সকে আবারও শিরোপার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। কাতারে করা আটটি গোলকে ছাড়িয়ে যেতে এই টুর্নামেন্টে তার হাতে আর দুটি ম্যাচ বাকি।
পেলে যখন ১৭ বছর বয়সী ছিলেন, বিশ্বকাপ তাকে অমর করে তোলে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা মেক্সিকো ছেড়েছিলেন এমন একটি টুর্নামেন্ট নিয়ে, যা চিরকাল তার নাম বহন করবে। ২০০২ সালে রোনালদো তার ভুল শুধরে নিয়েছিলেন। মেসি তার ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় এই শিরোপার পেছনে ছুটেছেন, অবশেষে কাতারে তিনি এটিকে তার গল্পের চূড়ান্ত অধ্যায়ে পরিণত করেন। এই প্রতিযোগিতার সঙ্গে এমবাপ্পের সম্পর্কটা ছিল ভিন্ন। এর জন্য কোনো দীর্ঘসূত্রতা ছিল না। বিশ্বকাপ তাকে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহণ করে নিয়েছিল।
এমবাপ্পে ইতোমধ্যে বিস্ময় বালক, চ্যাম্পিয়ন এবং দুর্দান্ত পরাজিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এখন তিনি অধিনায়ক, তারকায় ভরা এক ঐক্যবদ্ধ দলের নেতা। আরেকটি শিরোপা জয়ের পথে ফ্রান্সের সামনে এখনো দুটি বাধা রয়েছে। তবে ফুটবল এতটাই নিষ্ঠুর যে সবচেয়ে নিশ্চিত ভাগ্যকেও পাল্টে দিতে পারে। কিন্তু ফ্রান্স যদি আবারও সেই শেষ ধাপটি অতিক্রম করে, তবে ‘এল সেনিওর দেল মুন্দিয়াল’ পুরোনো স্প্যানিশ প্রবাদটি এমন একটি উপাধি বলে মনে হবে যা তিনি নিজের করে নিয়েছেন। অর্থাৎ বিশ্বকাপের প্রভু।