লিওনেল মেসির সামনে আর মাত্র তিনটি ম্যাচ। এই তিন ধাপ পেরোতে পারলেই টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ হবে আর্জেন্টিনার। তবে সেই পথের প্রথম বাধা সুইজারল্যান্ড। ইতিহাস অবশ্য স্পষ্টভাবে আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলে। সাতবার মুখোমুখি হয়ে একবারও জিততে পারেনি সুইসরা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু ইতিহাস দিয়ে নকআউটের ম্যাচ জেতা যায় না। তাই রবিবার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে মেসিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সুইজারল্যান্ডের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যেমন নাটকীয়ভাবে এগোচ্ছে, সুইজারল্যান্ডও তেমনি নীরবে নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১৪ মিনিটে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে লিওনেল স্কালোনির দল। তার আগে কেপ ভার্দের বিপক্ষেও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের পথ ছিল ভিন্ন। গ্রুপ পর্বে কাতারের সঙ্গে ড্র করলেও পরে বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে ৪-১ এবং সহ-আয়োজক কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে শেষ ষোলোতে ওঠে তারা। এরপর আলজেরিয়াকে হারিয়ে এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে শেষ আটে জায়গা করে নেয়। ১৯৫৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছে সুইসরা।
ইতিহাসও অবশ্য আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রাখছে। দুই দলের সাত দেখায় আর্জেন্টিনার জয় ছয়টি, একটি ম্যাচ ড্র। গোলের ব্যবধানও একপেশে; ১৫-৩। বিশ্বকাপে দুইবার দেখা হয়েছে, দুবারই জিতেছে আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালে ২-০ এবং ২০১৪ সালে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার অতিরিক্ত সময়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় আলবিসেলেস্তেরা।
তবে ইতিহাসের পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় ভরসা এখন লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সী অধিনায়ক চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা (৮টি)। শুধু গোলই নয়, আক্রমণ সাজানো, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন। মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেও পরে গোল করে দলকে ম্যাচে ফেরানোর অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হেড কোচ স্কালোনির সবচেয়ে বড় স্বস্তি, পুরো স্কোয়াডই এখন প্রায় ফিট। মিসরের বিপক্ষে গোল করার পর ক্রিস্তিয়ান রোমেরো পায়ের পেশিতে টান নিয়ে মাঠ ছাড়লেও সেটি ছিল কেবল ক্র্যাম্প। তিনি সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে প্রস্তুত। তবে শুরুর একাদশে দুটি জায়গা নিয়ে এখনো ভাবছেন স্কালোনি। ডান প্রান্তে নাহুয়েল মোলিনা নাকি গঞ্জালো মন্টিয়েল, আর মেসির সঙ্গী হিসেবে হুলিয়ান আলভারেজ নাকি লাওতারো মার্তিনেজ; এই দুটি সিদ্ধান্তই শেষ মুহূর্তে নেবেন তিনি।
সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সংগঠিত রক্ষণ। পুরো বিশ্বকাপ ও বাছাইপর্ব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচেই পিছিয়ে পড়েনি মুরাত ইয়াকিনের দল। মাঝমাঠে গ্রানিত জাকা ও রেমো ফ্রয়লারের অভিজ্ঞতা, রক্ষণে ম্যানুয়েল আকাঞ্জি ও রিকার্দো রদ্রিগেজের দৃঢ়তা, আর গোলবারে গ্রেগর কোবেলের নির্ভরতা সুইসদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। সামনে ব্রিল এমবোলোও আছেন দারুণ ছন্দে। শেষ ১৭ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৩টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।
তবু কাগজে-কলমে ফেবারিট আর্জেন্টিনাই। ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারের পর বিশ্বকাপে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত স্কালোনির দল। এই সময়ে প্রতিটি ম্যাচেই অন্তত দুটি করে গোল করেছে তারা। পাশাপাশি গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ১২টি জয়ও আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে নকআউট ফুটবলের নিয়ম একটাই; একটি ভুল, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি প্রতিআক্রমণ বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের চিত্র। তাই ইতিহাস, পরিসংখ্যান কিংবা মেসির জাদু; সবকিছুর পরও আর্জেন্টিনাকে জিততে হলে ভাঙতেই হবে সুইজারল্যান্ডের সুসংগঠিত সেই ‘সুইস দেয়াল’।