ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে একটি মন্দিরে চুরির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গিয়ে উল্টো দুই পুরোহিতকে ভ্যান চুরির অপবাদ দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আহত করার অভিযোগে ওই দুই পুরোহিতকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে চোর শনাক্ত করা না যাওয়ায় এবং ধস্তাধস্তিতে আহত ব্যক্তির চিকিৎসা বাবদ তাদের এ জরিমানা করা হয় বলে অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ ঘটনার পর পুরোহিতরা ভীত থাকায় আইনি পদক্ষেপ নিতেও অনাগ্রহী।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় বোয়ালমারী পৌরসভার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড বটতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে পৌরসভার কামারগ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ জিউর নিত্যসেবা অঙ্গন আখড়াবাড়ি মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটে। সে সময় পুরোহিতরা দুপুরের খাবার শেষে বিশ্রামে ছিলেন। এ সুযোগে দুর্বৃত্তরা মন্দির থেকে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কেজি কাঁসা-পিতলের থালা, বাটি, গ্লাস ও কলস একটি বাজারের ব্যাগে ভরে ভ্যানে করে পালিয়ে যায়।
মন্দিরের পাশের এক নারী একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ব্যাগ নিয়ে বের হতে দেখে বিষয়টি সেবায়েতদের জানান। পরে মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সহকারী পুরোহিত সুমন কৃষ্ণ দাস ওরফে সজিব মণ্ডল (২০) ও সেবায়েত শান্ত বিশ্বাস সন্দেহভাজনদের খুঁজতে বের হন।
তাদের দাবি, বোয়ালমারী পৌর বাজারের কৃষি ব্যাংকসংলগ্ন এলাকায় ফুটেজে দেখা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে থামতে বললে তারা ভ্যানে করে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তাদের গতিরোধ করা হলে তারা চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় রাজু নামে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তি দেয়ালের ওপর পড়ে মাথায় আঘাত পান। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে ভর্তি করেন।
এরপর ভ্যান চুরির অভিযোগ তুলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে উপস্থিত লোকজন দুই পুরোহিতের হাত পিঠমোড়া করে রশি দিয়ে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। এ সময় তাদের কাছে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ও নগদ কিছু টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
খবর পেয়ে পুলিশ ও পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর শেখ আজিজুল হক গিয়ে দুই পুরোহিতকে উদ্ধার করেন।
ভুক্তভোগী সহকারী পুরোহিত সুমন কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘আমাদের মারধর করা হয়েছে, খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। দুটি মোবাইল ফোন ও কিছু নগদ টাকা নিয়ে গেছে। তবে অভিযুক্তদের পরিচয় নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।’
এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি অন্য একটি মামলার সাক্ষ্য দিতে বাইরে ছিলাম। পরে জানতে পেরেছি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘সালিশে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে আহত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য ১৮ হাজার টাকা ধার্য করা হয়েছে। তবে আমি বৃষ্টির কারণে পৌঁছানোর আগেই সালিশ শেষ হয়ে যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, ‘সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়াতে ঘটনাটি একপেশেভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে।’
এ ঘটনায় হিন্দু অধ্যুষিত কামারগ্রাম এলাকায় উদ্বেগ ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর শেখ আজিজুল হক বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে চোরের মুখ স্পষ্ট বোঝা যায়নি। ঘটনাস্থলে হাতাহাতিতে একজন আহত হয়েছেন। তার চিকিৎসা ব্যয় বাবদ সালিশে ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।’
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কোনো পক্ষ এ বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এনকেবি নয়ন/অমিয়/