কয়েকদিনের টানা প্রবল বর্ষণে কক্সবাজারের পেকুয়া ও চকরিয়ার পাহাড়ি জনপদে নেমে এসেছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। পাহাড়ধসে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগে অন্তত ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে মারা গেছে ১৯ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলায় ৫ জন করে এবং রাঙামাটি জেলায় ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাটিচাপা পড়ে ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ট্র্যাজেডির পেছনে কেবল বৈরী প্রকৃতিই দায়ী নয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলার অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড এ বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
পেকুয়ার শিলখালী, টৈটং ও বারবাকিয়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার পরিবার চরম ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে। আধুনিক দালানকোঠা বা পাকা-সেমিপাকা, মাটির ও কাঁচা বাড়ির মোহে পাহাড়ের বুক কেটে খাড়া করে ফেলা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই মাটির বাঁধন আলগা হয়ে সেই বিশাল স্তূপ ধসে পড়ছে নিচের ঘরবাড়ির ওপর।
অনুসন্ধানে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ শুকনো মৌসুমের চেয়ে বর্ষাকালেই পাহাড় কাটায় বেশি মেতে ওঠে। তাদের ধারণা, শুকনো সময়ে এস্কেভেটর বা কোদাল দিয়ে মাটি কাটলে বন বিভাগ মামলা দেবে। কিন্তু বৃষ্টির দিনে পাহাড় কাটলে প্রশাসনের কেউ দেখতে আসবে না। বৃষ্টির পানিতে কাটার দাগও মুছে যাবে। এই বিপজ্জনক ও অবৈজ্ঞানিক কৌশলের কারণে পাহাড়ের মাটির বাঁধন আলগা হয়ে ধসের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। যাতে ঘটছে হতাহতের ঘটনা।
পেকুয়ায় প্রায় ৮ হাজার একর সরকারি রিজার্ভ বনভূমি রয়েছে, যার বেশির ভাগই এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মগনামা, উজানটিয়া, রাজাখালী ও কুতুবদিয়ার মতো উপকূলীয় নিম্ন অঞ্চলের মানুষ এই পাহাড় কাটার মূল কারিগর। ওইসব এলাকা লবণাক্ত ও বর্ষায় জোয়ারের পানিতে প্লাবিত থাকায় তারা স্থায়ী আবাসের জন্য পাহাড়ি অঞ্চলকে বেছে নিচ্ছে। একসময়ের স্থানীয় দখলদাররা এখন এই নবাগতদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকায় সরকারি রিজার্ভের জায়গা অবৈধভাবে বিক্রি করছে। সমতল ভূমির মতো এখানেও ইট-কংক্রিটের দালান তোলার প্রতিযোগিতা চলায় চারপাশের পাহাড়গুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ–এই পাহাড়খেকো বাণিজ্যের নেপথ্যে রয়েছেন বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং স্থানীয় মাঝি (দালাল) সিন্ডিকেট। মাসোহারা বা বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা পাহাড় কাটায় পরোক্ষ সহযোগিতা দেন এবং আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচানোর নিশ্চয়তা দেন। তবে কোনো কর্মকর্তা বদলি হওয়ার সময় হলে বা ওপরের মহলের চাপ থাকলে তড়িঘড়ি করে কিছু মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে পাহাড়ের অস্তিত্ব আর থাকে না। সচেতন মহলের দাবি, গত দুই বছর আগে থেকে যদি কঠোর আইন প্রয়োগ করা হতো, তবে আজকে এই মৃত্যুর মিছিল দেখতে হতো না।
অনুসন্ধানে পাহাড়ধসের একটি প্রধান কারিগরি কারণ উঠে এসেছে। পাহাড়ি এলাকায় যারা বাড়ি তৈরি করছে, তারা শুধু নিজেদের সীমানার ভেতরের পাহাড়ের অংশটুকু কেটে সমতল করছে। এর ফলে ঠিক তার পাশেই থাকা অন্যজনের জমির পাহাড়ের অংশটি খাড়া দেয়ালের মতো উঁচুতে ঝুলে থাকছে। প্রাকৃতিকভাবে ঢালু পাহাড়কে এভাবে সোজা (৯০ ডিগ্রি) খাড়া করে কেটে ফেলায় ওপরের অংশটির পুরো ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে যখনই ভারী বর্ষণ হয়, তখন ওপরের ওই খাড়া ও অরক্ষিত অংশটির মাটি নরম হয়ে হুড়মুড় করে নিচের তৈরি করা ঘরের ওপর ভেঙে পড়ে। মানুষের এই অবিবেচক ও আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের কারণেই পাহাড়ধসের ঘটনাগুলো ঘটছে।
নির্বিচারে পাহাড় ও বনের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন গর্জন গাছ কাটার ফলে স্থানীয় জলবায়ুর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চকরিয়া ও পেকুয়ার পাহাড়গুলো এভাবে বিলীন হতে থাকলে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যাবে।
পাহাড় কাটা রোধে প্রশাসন ও বন বিভাগের অভিযান চললেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। তবে বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খাইরুল আলম বলেন, আমি এখানে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরে পাহাড় কাটা ও গর্জন গাছ পাচারের বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি পাহাড় কাটা রোধে রাতের বেলা দুর্গম এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে আমাদের বন কর্মীদের ওপর স্থানীয় সিন্ডিকেটের হামলা ও আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় যারাই অন্যায় করবে, তাদের কাউকে একচুলও ছাড় দেওয়া হবে না।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া পাহাড়ধসের অন্যতম প্রধান কারণ অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটা। যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে পরিবেশের ক্ষতি করছে, বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
লোকদেখানো মামলা দিয়ে পেকুয়া-চকরিয়ার এই মহাবিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়। পাহাড় ও পরিবেশ বাঁচাতে হলে অনতিবিলম্বে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা দালাল সিন্ডিকেট নির্মূল করতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন করতে হবে এবং বন বিভাগের ভেতরের দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃতির এই প্রতিশোধ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
চট্টগ্রামে বৃষ্টি কমায় স্বস্তি, রয়ে গেছে পাহাড়ধসের শঙ্কা
চট্টগ্রাম ব্যুরো: টানা পাঁচ দিনের রেকর্ড বর্ষণ ও জোয়ারের পানির দাপট কাটিয়ে অবশেষে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম নগরীতে। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসায় মহানগরের প্রধান প্রধান সড়ক ও নিচু এলাকাগুলো থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। এতে পাঁচ দিন ধরে চলা নজিরবিহীন জলাবদ্ধতার ধকল কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে নগরজীবন। তবে মহানগরের সড়কগুলো থেকে পানি নামলেও পাহাড়ধসের শঙ্কা রয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগরীর চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদের মতো বাণিজ্যিক এবং নিচু এলাকার মূল সড়কগুলো থেকে পানি অনেকটাই নেমে গেছে। কয়েকদিন ধরে এসব এলাকার যেসব দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে ছিল, পানি কমায় শুক্রবার সেগুলোতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। সড়কে পানি কমে আসায় গণপরিবহন ও রিকশা চলাচলও অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত ৫ দিনে চট্টগ্রামে ১০২০ মিলিমিটারের বেশি ঐতিহাসিক রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টির বেগ ও স্থায়িত্ব কমে এসেছে। যদিও সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এখনো বহাল রয়েছে।
এদিকে পানি নেমে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার কষ্ট কমলেও নগরীর পাহাড়গুলোতে তৈরি হয়েছে চরম উৎকণ্ঠা। টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ নরম হয়ে যাওয়ায় লালখান বাজার, মতিঝরনা, আকবরশাহ, বায়েজিদ বোস্তামী ও খুলশী এলাকার পাহাড়ধসের তীব্র ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে মহানগরে পাহাড় ও দেয়াল ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে আগে থেকেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পক্ষ থেকে জোরদার মাইকিং ও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। নগরীর আকবরশাহ ও খুলশী এলাকার পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী বেশ কিছু পরিবারকে জোরপূর্বক চসিকের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের দখল ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি নয় বসতিরা। তাই পাহাড় থেকে মানুষকে সরাতে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহেদুল ইসলাম মিঞা বলেন, মহানগরে পাহাড়ধসে আর যেন কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সেজন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং আশ্রয় নেওয়া দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল ভূঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামে শুক্রবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৫৪ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আগামী রবিবার থেকে আরও স্বাভাবিক হবে আবহাওয়া। তবে বৃষ্টিপাত কমলেও পাহাড়ধসের শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। কারণ পাহাড়ের মাটি নরম।
১০০ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা
টানা বর্ষণ ও সম্ভাব্য পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রাম মহানগর ও বাঁশখালীর ১০০টি পরিবারকে আগাম আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা)। জার্মান ফেডারেল ফরেন অফিসের অর্থায়নে এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পের আওতায় এ সহায়তা দেওয়া হয়।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, আবহাওয়া ও দুর্যোগের পূর্বাভাস বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় ‘নো রিগ্রেট পলিসি’ অনুসারে আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে ৮ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ৯ জুলাই বাঁশখালী উপজেলার পাহাড়ধস-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী ১০০টি পরিবারকে নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়।