যখন-তখন যেখানে-সেখানে যে-কেউ মব বা অন্যায়ভাবে শারীরিক সহিংসতার শিকার হতে পারেন। দেশব্যাপী এমন বাস্তবতা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সম্প্রতি বেড়ে গেছে সাইবার মব। অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কাউকে নাজেহাল করার চেষ্টা। দেশব্যাপী সাইবার মবের তৎপরতা এমন যে, প্রধানমন্ত্রীর পরিবার থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য বা সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষও এতে বিদ্ধ হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বটবাহিনীর তাণ্ডবও এক ধরনের সাইবার মব।
সাইবার মবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিকার চেয়ে কেউ কেউ আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সাইবার মবের সাম্প্রতিক আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অশালীন মন্তব্য।
এই মন্তব্যের অভিযোগের পর গত ২২ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক কিশোর কলেজছাত্রকে (১৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ওই কলেজছাত্র একটি ফেসবুক আইডি থেকে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন শনিবার রাতে আখাউড়া উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পলাশ মিয়া ও পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রিফাতুল ইসলাম আখাউড়া থানায় পৃথকভাবে অভিযোগ করেন।
তাদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জাইমা রহমানের মানহানি করা হয়েছে এবং সামাজিকভাবে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ওই কলেজছাত্রকে আখাউড়া থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের পুরোনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। বিচারক তাকে সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে চলতি সপ্তাহের আরেকটি ঘটনায়ও সাইবার মব প্রসঙ্গটি খুব আলোচনায় আসে। এতে মদের বোতল সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যাচাই করে দেখা গেছে, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।
ফেসবুকে পোস্ট করা ওই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে–‘এক বোতল মদ একাই খেয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম।’
গত ৭ জুলাই ছবিটি পোস্ট করা হয়। এর দুই দিন আগে ৪ জুলাই এক ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি মাদকবিরোধী বক্তব্য দেন। লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’।
চারদিকে মাদকের থাবার মধ্যে প্রত্যন্ত গ্রাম ‘জাফরনগর স্মার্ট ভিলেজ’ খেলাধুলায় এতটা উদ্যমী ও উদ্যোগী! তাই তিনি আয়োজক ও বিজয়ী দলকে মডেল হিসেবে দেখিয়ে তার সংসদীয় পুরো আসনে এমন খেলাধুলার আয়োজন করবেন বলেও সেখানে ঘোষণা দেন। এতে মাদকের থাবা কমে আসবে বলে বিশ্বাস সংসদ সদস্যের।
বক্তব্যে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। কেউ যদি মাদকসেবীদের ধরে থানায় সোপর্দ করে, তাহলে তাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব।
এআই দিয়ে বানানো ছবি ফেসবুকে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি গতকাল শুক্রবার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, এই ঘটনায় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে মামলা করেছি। এটি যে এআই দিয়ে বানানো ছবি, তা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। ফ্যাক্টচেক করে গণমাধ্যমে এই নিয়ে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। আমার দেওয়া মাদকবিরোধী বক্তব্যের কারণে তারা আমার চরিত্রহননের চেষ্টার অংশ হিসেবে এটা করেছে। রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে এখন হরহামেশাই এমন সাইবার মব হচ্ছে। তবুও মাদকবিরোধী অবস্থানে আমি দৃঢ় আছি। কিছু করার নেই। মাদক আর বেয়াদবে সমাজটা ভরে গেছে। দৃঢ় অবস্থান না নিলে সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।
এআই দিয়ে বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ছবিতে দেখা যায়, সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম একটি বিছানায় বসে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন। বিছানার অপর প্রান্তে বসে আছেন আরও দুই ব্যক্তি। জ্যাকব মিল্টন (Jacob Milton) নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ছবিটি পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যায়, বিছানার মাঝখানে একটি ট্রেতে মদের বোতল, বাটিভর্তি চানাচুর, গ্লাস ও একটি জগসদৃশ বস্তু।
এদিকে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গে সম্প্রতি অভিনেত্রী, নির্মাতা, প্রযোজক ও সংগীতশিল্পী মেহের আফরোজ শাওনের দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্টকে ‘অবমাননাকর’ বলছেন কেউ কেউ। এই নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১ জুলাই ফেসবুকে নিজ অ্যাকাউন্ট থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাহ উদ্দীন আম্মারের একটি ঘোষণা আসে। এতে আম্মার শাওনকে জুতার বাড়ি মারতে পারলে ১ লাখ টাকা এবং জুতার আঘাতে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
পোস্টে আম্মার লেখেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উসকানি বলতে এলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’
এর পরিপ্রেক্ষিতে জানতে চাইলে শাওন গতকাল দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, আমি কোনো আইনি ব্যবস্থা নিইনি। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে আমি এখনো কিছু ভাবিনি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমেই আমি এই নিয়ে কথা বলেছি। এই প্রসঙ্গে আমি নতুন করে কিছু বলব না।’
সম্প্রতি তিনি সামাজিক মাধ্যমে তার বক্ত্যব্যের ব্যাখ্যায় জানিয়েছেন, তিনিও ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন।
ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাস সম্পর্কে সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, যাদের সন্তান মারা গেছে, যার ভাই মারা গেছে বা যার পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেছে। কিন্তু আমার স্ট্যাটাস তাদের প্রতি ছিল না। আমার স্ট্যাটাস ছিল যারা জুলাই যুদ্ধটাকে সাজিয়েছে। যারা সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ করেছেন।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টের পর শাওনকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও সহিংস কর্মসূচির ঘোষণা এবং ইঙ্গিত করতেও দেখা গেছে। এই অবস্থায় শাওনের পাশে দাঁড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মডেল পিয়া জান্নাতুল।
তিনি বলছেন, আজকে শাওন আপার সঙ্গে যেটা হয়েছে; এ ঘটনা একটি সভ্য সমাজ ও দেশে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু শাওন আপা নয়; একটা মেয়ের সঙ্গে এ ধরনের মবের কথা হলে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সেটা যে পার্টিই হোক না কেন, একটা মেয়ের সঙ্গে যদি এটা হয়, তা কোনোভাবেই একটা সভ্য দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো মানুষের সঙ্গেই মব করা হলে, তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে মেহের আফরোজ শাওন ইস্যুতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি এসব মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি অন্য শিল্পীদেরও শাওনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নিয়ে উপহাস এবং এর স্মৃতিস্তম্ভ অবমাননার অভিযোগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন ও মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানা নামের আরেক নারীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান গত শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠন এই জিডি করেছে। আইনি পদক্ষেপের বাইরে শাওন, পিয়া জান্নাতুল ও মাহিদের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে অব্যাহতভাবে চলছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও অশ্রাব্য পোস্ট-মন্তব্য।