মব সহিংসতা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না, বরং এই অপরাধ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে। মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করেই অনেকে উন্মাদের মতো ‘মব সন্ত্রাস’ চালিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পরিকল্পিতভাবে বা টার্গেট করে মব সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে পুলিশের মনোবল ও সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে সংঘবদ্ধ মব সহিংসতা ঘটাতে শুরু করে, যা পরে একধরনের ‘মব কালচারে’ রূপ নেয়। সেই ভয়ানক তৎপরতার মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা কমলেও মব সহিংসতার ধারাবাহিকতা এখনো যথেষ্ট চলমান।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় ঢুকে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সংঘবদ্ধভাবে থানা ভবনে ভাঙচুর ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মারপিটের শিকার হয়ে কষ্টে-দুঃখে কান্নায় ভেঙে পড়েন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সচেতন মহলসহ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেক পুলিশ সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে চরম ক্ষোভ ও সমাজের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেন।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) সারা দেশে ৩১৯ পুলিশ সদস্য মব বা সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন বা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, মব সন্ত্রাসের ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটে আসছে। কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থেকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ব্যক্তিগত শত্রুতার ফলে টার্গেট করে এবং গুজবসহ নানা প্রেক্ষাপটে একের পর এক যেভাবে মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে, তা রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে চরম আঘাত হেনেছে। মবের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের একধরনের সমর্থন বা উসকানি দেখা যায়।
এ ছাড়া ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ভঙ্গুর’ অবস্থার সুযোগে এ ধরনের বেআইনি অপতৎপরতা ব্যাপক বেড়ে যায়। সে সময় সরকারের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা মব সন্ত্রাসকে যৌক্তিক করার জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ নানা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, বর্তমানে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসার পরেও মব সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বরং সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছেই। সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের এই অধ্যাপক।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, “মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং একধরনের ‘বৈধতা পায়’, তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়। কেউ কেউ মনে করেন, এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না, যা সচেতন নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ফলে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।”
বারবার টার্গেটের শিকার হচ্ছে পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, কর্তব্যরত অবস্থায় অপরাধী ও দুষ্কৃতকারীদের মব সন্ত্রাস বা বিভিন্নভাবে পুলিশের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ছয় মাসে (জানুয়ারি থেকে জুন) দেশজুড়ে মোট ৩১৯ জন পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন করে পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন। পরের মাসগুলোতে এই প্রবণতা আরও বাড়ে, যেখানে মার্চে ৬৩ জন, এপ্রিলে ৬৬ জন, মে মাসে ৫৫ এবং গত জুনে ৫১ জন পুলিশ সদস্য বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলার শিকার হন।
গত ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে ‘কবজি কাটা’ নামে পরিচিত একটি ছিনতাইকারী চক্রের আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ চাপাতির কোপে আহত হন। তার আগে ১১ জুন শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত হন দুই পুলিশ সদস্য।
এমনকি দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় অনন্য ভূমিকা রাখা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও বাদ যাচ্ছেন না মব সহিংসতা থেকে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হেঁয়াকো বাজারের একটি শপিংমলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেরিতে পৌঁছানোর অভিযোগ তুলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মারধর এবং গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক আইজি মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘আগেও পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষও মবের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন। ফলে এসব বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান করতে হবে। সরকার এসব বিষয়ে নিশ্চয়ই কাজ করছে, সে কারণে আগের চেয়ে এই প্রবণতা কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
নব্য ‘মব সংস্কৃতি’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান-জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি
একটি গুজবকে কেন্দ্র করে বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়ায় থানায় সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর ন্যক্কারজনক আক্রমণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন বলেন, আগৈলঝাড়া থানা পুলিশ স্থানীয় রিয়াজ ফকির (২৬) নামে এক আসামিকে চুরির মামলায় গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে থানায় মাদকের মামলা ছিল। রিয়াজ ফকির সে সময়েও ছিলেন মাদকাসক্ত। মাদকের প্রভাবে তিনি থানা হাজতে নিজের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত জখম হন। এতে রিয়াজ ফকির অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ সেই রাতেই রিয়াজ ফকিরকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য গভীর রাতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
অথচ রিয়াজ ফকিরের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়লে কতিপয় ব্যক্তি আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় তারা দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। গুজবনির্ভর এ ধরনের হামলা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকিস্বরূপই নয়, বরং বাংলাদেশে গড়ে ওঠা নব্য ‘মব সংস্কৃতি’, প্রকারান্তরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার-প্রক্রিয়া ও জননিরাপত্তার প্রতি মারাত্মক হুমকি, যা একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বাংলাদেশ পুলিশ তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে তাদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন আশঙ্কা করছে।
কারা কী কারণে করছে, খুঁজে বের করতে হবে
মুহাম্মদ নুরুল হুদা
আইনকানুন নিজের হাতে উঠিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পুলিশ আগেও মব হামলার শিকার হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তবে মব কেন ঘটছে এবং কারা, কী কারণে করছে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালেও মবের অনেক ঘটনা ছিল। ওই সময়ের পরিসংখ্যান দেখলে সেটি বোঝা যাবে। তখনো মানুষ মনে করেছিল, দেশ স্বাধীন, আমরাও স্বাধীন হয়েছি, তাই কোনো পরোয়া না করেই যেকোনো কিছুই করা যাবে। ঠিক ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও অনেকে মনে করেছে, তারা স্বাধীন, সেজন্য দেশে এমন মব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, অভ্যুত্থানের পর যত মব হয়েছিল, সেই পরিমাণ মবের ঘটনা নিশ্চয়ই এখন নেই। এরপরও সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে সেটিও কমে আসবে বলে আশা করছি। মবের ঘটনায় যেসব মামলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি সেগুলোর চার্জশিট ও বিচার করা গেলে মব কালচার বা মব সন্ত্রাস কমে যাবে।
এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকারি দল মবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে মব সন্ত্রাস দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি দেশের যে জায়গাগুলোতে মব ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে সতর্ক থাকা এবং যারা মব সৃস্টির চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাবেক আইজিপি
মবের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে
মনজিল মোরসেদ
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৮ মাস ধরে যেভাবে মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে, এখন এটি কমতে সময় লাগবে। কিন্তু এটি কমাতে চাইলে/বন্ধ করতে চাইলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তো মব সন্ত্রাসের চর্চা হয়েছে। এখন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। তার মানে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। কিন্তু কেবল কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলে হবে না, সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে দেখলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রনেতা একজন অভিনেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘ওই মহিলাকে যে জুতার বাড়ি মারতে পারবে তারে ১ লাখ টাকা পুরস্কার দেব। জুতার বাড়ি মেরে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিতে পারলে ২ লাখ টাকা। এখন কেউ মব উস্কানি বলতে আসলে ওইডারে ভরা বাজারে পিটামু।’ এ রকম সাইবার মবও হচ্ছে এখন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তো শুনলাম না। সশরীরে মব হচ্ছে, সাইবার মব হচ্ছে–কিন্তু এসবের কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে, আবার কোনোটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে না। তাতে তো মব সন্ত্রাস বন্ধ হবে না। বন্ধ করতে হলে সরকারকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতেই হবে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ
ড. তৌহিদুল হক
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে মব সহিংসতার নানা ধরন প্রকাশ পাচ্ছে। কোনো একটি সমাজে কিংবা দেশে আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে মব সহিংসতা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ওপর সংঘটিত কোনো অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অবিচারের বিচার করতে উদ্যত হয়। বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সরকারের উচিত, এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
বাংলাদেশে মানুষের নাগরিক প্রাপ্যতা কিংবা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্নে দায়িত্বশীল আচরণ এবং সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে প্রত্যাশিত সূচক অত্যন্ত নিম্নগামী। আইনের প্রয়োগ এবং রাষ্ট্র কর্তৃক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সামাজিক পরিচয় কিংবা শ্রেণি বিভাজনের কারণে সৃষ্ট সামাজিক কদর অর্থাৎ রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো ব্যক্তি কত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিবেচ্য।
এই বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের সত্যতাও নানা সময়ে নানাভাবে প্রমাণিত। যখন আইনের প্রয়োগ কিংবা আইনের দৃষ্টি সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তখন রাষ্ট্র বিচার করবে এমন বিশ্বাস ব্যক্তি করতে পারে না। তখন নিজেই বিচার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং নানা ধরনের আইন পরিপন্থি ব্যবস্থা নেয়।
বাংলাদেশে মব সহিংসতার রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ পুরোনো। দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষণীয় যে কোনো দল কিংবা অর্থ-ক্ষমতার বিচারে প্রভাবশালী ব্যক্তি কতিপয় লোক একত্রিত করে চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীত অবস্থানে থাকা কাউকে অভিযুক্ত করে শায়েস্তা করা বা উচিত শিক্ষা দেওয়ার নামে আইনবিরোধী ব্যবস্থা নেয়। আবার চলমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে যারা আছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিয়ে এই ধরনের মব সহিংসতা চালালে সেটি সমাজের মধ্যে একটি শ্রেণি আছে যারা চলমান রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাস করে, তারা এই ঘটনার সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদন করে।
মবের মতো আইনবিরুদ্ধ কাজও সমাজে যখন প্রতিনিয়ত ঘটে এবং বৈধতা পায় তখন একটা শ্রেণির কাছে তা ‘স্বাভাবিক’ বলে বৈধতা পায়। কেউ কেউ মনে করে এভাবেও বিচার করা যায় বা বিচার হয়।
আইনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা বা ব্যক্তিস্বার্থ অর্জনের জন্য নিজের শক্তি কিংবা শক্তি ভাড়া করে অন্যের ওপরে অন্যায়ভাবে প্রয়োগ করার প্রেক্ষাপট কোনো একটি দেশে সার্বিক শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশে এই বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সূত্র ধরে মব সহিংসতা ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ক্ষমতা এবং অর্থের বিচারে শক্তিশালী ব্যক্তিরা নিজ নিজ স্বার্থ আদায় এবং সমাজকে একটি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে অস্থিরতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি, যা আইনমান্যকারী নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা ছড়াচ্ছে। মব সহিংসতা থেকে পরিত্রাণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মবের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ ও মবের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কঠোরতা অনুসরণ করা দরকার।
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়