দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে পানি। ঘরে বন্দি অসহায় বৃদ্ধের মরদেহ ভেসে উঠেছে বানের পানিতে। নৌকাডুবিতে প্রাণ গেছে কিশোরীর। পানির তোড়ে সড়ক ভেঙেছে। ভেসে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের খেত। পানিবন্দি লোকালয়ে এখন হাহাকার–‘একটু চাল পাওয়া যাবে? শিশুরা কাঁদছে।’
বান্দরবানের সাঙ্গু, মাতামুহুরী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির আভাস মিললেও চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুরে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
বাঁধ ভেঙে প্লাবিত গ্রাম, পানিবন্দি লাখো মানুষ
মৌলভীবাজারের মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে জেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। সড়কের কালভার্ট ভেঙে পড়েছে। পানির স্রোতে ধানখেত ও শাকসবজির ক্ষতি হচ্ছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, ধলাই নদীর মখাবিল এলাকা ও মনু নদীর উজিরপুর এলাকা দিয়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। মনু ও ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেসব স্থানে ঝুকিপূর্ণ বাঁধ আছে, তা মেরামতের চেষ্টা চলছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। শিশু-বৃদ্ধসহ গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পানিবন্দি পরিবারগুলো। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর বাঁধ ভেঙে যায়।
ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এলাকায় বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল নামছে। এর প্রভাবে তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর ও কুশিয়ারা, দোয়ারাবাজারের খাসিয়ামারা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রক্তি, সদর উপজেলার চলতি নদে পানি বেড়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা, দুর্গাপুর পয়েন্টে পানি উঠেছে। এসব পয়েন্টে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যার সতর্কতা জারি করেছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, জেলায় ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র, ১ হাজার ২০১ জন নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও ইরা, ব্র্যাক ও রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মেডিকেল টিম, শুকনো খাবার, ওষুধও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভারতের গজলডোবা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির এই আকস্মিক বৃদ্ধিতে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি শত শত পরিবার পানিবন্দি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। পানির চাপ বাড়লে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদীর তীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে জানান ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠেছে। এতে তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বন্যা দেখা দিতে পারে।’
শেরপুরে চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ২০৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলায়ও। মহারশি নদীর পানি বেড়ে ঝিনাইগাতী সদর বাজারে ঢুকে পড়েছে। এ ছাড়া সোমেশ্বরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শ্রীবরদী উপজেলার রানী শিমুল, গোবিন্দপুর, চক্রপুর ও বড়ইকুচি এলাকায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। নাকুগাঁও পয়েন্টে ভোগাই নদী এবং নালিতাবাড়ী পয়েন্টের নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
১০৯ মিলিমিটার ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে গেছে যশোর পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল। জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যশোর পৌরসভার ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। অবিরাম বৃষ্টিতে চুয়াডাঙ্গা শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দারা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশের মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
খাদ্যসংকট
টানা আট দিনের ভারী বর্ষণে ভোলার মনপুরায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২০ হাজার মানুষ। মনপুরা উপজেলার বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তিন থেকে চার ফুট পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। এসব এলাকায় নিম্ন আয়ের বহু পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকায় বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অসহায় পরিবারগুলো দ্রুত শুকনো খাবার, চাল-ডাল ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তা চেয়েছে।
ঝালকাঠি জেলার নিম্নাঞ্চলে কৃষি শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মাঠে পানি জমে থাকায় দিনমজুররা কাজে যেতে পারছেন না।
ঝালকাঠি সদরের বিষখালী নদীতীরবর্তী চর ভাটারকান্দা এলাকায় নদীভাঙনের তীব্র আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কিছু স্থানে ব্লক দিয়ে ভাঙনরোধের চেষ্টা করা হলেও নদীর তীব্র স্রোতে নতুন নতুন এলাকা বিলীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অসহায় বৃদ্ধের মৃত্যু
এদিকে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামে মনু নদের বাঁধ ভেঙে যায়। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ আশরাফ মিয়া কোথাও যেতে পারেননি। বন্যার পানি বাড়তে থাকে রাতে। পরে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে ফিরে দেখেন ঘরের ভেতরে পানিতে ভাসছে আশরাফ মিয়ার মরদেহ। টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিন মিয়া বন্যার পানিতে ডুবে ওই বৃদ্ধের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গতকাল সকালে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিতে যাওয়ার পথে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ঝর্ণা (১২) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যার পানিতে ডুবে মোহাম্মদ আশিক (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে
অতি বর্ষণের কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল সড়কে নুরজাহান চা-বাগানের গোয়ালবাড়ী নামক স্থানে একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে। আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। বান্দরবানের সঙ্গে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ধসে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সাঙ্গু, মাতামুহুরি ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নৌ-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যার কারণে চকরিয়া ও পেকুয়ার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে নিমজ্জিত। বহু এলাকার সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে বন্যার পানিতে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই সড়ক ব্যবহারকারী হাজারও মানুষ।
বন্যা পরিস্থিতির সুখবর নেই
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ধীরগতিতে হ্রাস পেতে পারে, যাতে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও ভুগাই-কংস নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা ঘটাতে পারে। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীসংলগ্ন এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি ধীরগতিতে হ্রাস পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এ ছাড়া ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।