যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আর এর বড় ধাক্কা লেগেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই। এরই মধ্যে দেশটির কৌশলগত তেল মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ-এসপিআর) ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গেল সপ্তাহে দেশটির কৌশলগত তেল মজুত ৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ৩১৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগ্যান প্রশাসনের সময়ের পর এটিই সর্বনিম্ন মজুত।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার (৮ জুলাই) সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানে হামলা চালায়, তখনই তেলের দাম বেড়ে যায়, এবারও তাই হয়েছে।’ গত বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার মূল্য ১৯ জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়। দিন শেষে ব্রেন্ট তেলের দাম দাঁড়ায় প্রতি ব্যারেল ৭৮ দশমিক ০২ ডলারে। আগের দিনের তুলনায় যা ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস থেকে তেল কিনতে প্রতিযোগিতায় নামবে। এতে বৈশ্বিক বাজারে দাম বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের ভোক্তাদের ওপর। কৌশলগত তেল মজুত মূলত জরুরি পরিস্থিতির জন্য রাখা হয়। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বড় ধরনের সরবরাহ-সংকটে সরকারকে সময় দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। এটি কোনো সংকটের পুরো সমাধান নয়।
টেক্সাসের হিউস্টনে অবস্থিত রাইস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি স্টাডিজের (সিইএস) অনাবাসিক ফেলো অভি রাজেন্দ্রন বলেন, ‘এ ধরনের সংকটের জন্যই এই মজুত রাখা হয়। এটি একটি নিরাপত্তা বাফার, যা দাম নিয়ন্ত্রণে এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।’
স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) কী?
স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেল মজুত ব্যবস্থা। যেখানে বিভিন্ন ধরনের অপরিশোধিত তেল রয়েছে। ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র এই তেল মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গালফ উপকূলের চারটি স্থানে মাটির নিচে লবণের গুহায় এই তেল সংরক্ষণ করা হয়।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র এসপিআর থেকে ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ে। এতে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও জরুরি মজুত অনেক কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ এরপর আবার তেল কিনে মজুত পূরণের চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান উত্তেজনার মধ্যে মজুতের পরিমাণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে না এলেও এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি এখনো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই পরিবহন করা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালি দিয়ে তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ তেল আমদানি করে। তবে দেশটির অনেক মিত্র ও বাণিজ্যিক অংশীদার এই পথের তেল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে এসব দেশকে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে তেলের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিশ্ববাজারে দাম আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এসপিআরে থাকা ৩১৯ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেলের সবটুকু ব্যবহারযোগ্য কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজেন্দ্রনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত কিছু তেল বর্তমান পরিশোধনাগার বা রপ্তানির জন্য পুরোপুরি উপযোগী নাও হতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা