সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোডিংয়ের কাজটিকে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন এআই স্টার্টআপ ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদেই।
একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আগামী বছরগুলোতে মানুষের নিজস্ব দক্ষতা, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং এআই-কেন্দ্রিক শিল্পগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে।
ভারতীয় উদ্যোক্তা নিখিল কামাথের একটি পডকাস্টে অংশ নিয়ে আমোদেই আলোচনা করেন কীভাবে এআই মানুষের ক্যারিয়ার, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে। পাশাপাশি তরুণ পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ-উপযোগী দক্ষতা অর্জনের বিষয়েও পরামর্শ দেন তিনি।
কোন কোন শিল্পে এআই-এর কারণে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে আমোদেই জানান, সফটওয়্যার উন্নয়ন খাত দিন দিন এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় সবার আগে কোডিংয়ের দিন শেষ হয়ে যাবে।’
তার মতে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরও বড় ও জটিল দায়িত্বগুলো সামলানোর আগেই এআই মডেলগুলো কোডিংয়ের কাজকে পুরোপুরি নিজের দখলে নিয়ে নেবে।
তবে তিনি যোগ করেন, ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সামগ্রিক কাজটির নিয়ন্ত্রণ নিতে একটু বেশি সময় লাগলেও, এক সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিই এআই-এর মাধ্যমে হওয়া সম্ভব।’
অবশ্য আমোদেই উল্লেখ করেছেন, সফটওয়্যার উন্নয়নের কিছু ক্ষেত্রে মানুষের সম্পৃক্ততা সবসময়ই প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রোডাক্ট ডিজাইন বা পণ্যের নকশা করা, ব্যবহারকারীর চাহিদা বোঝা, বাজারের চাহিদা চিহ্নিত করা এবং এআই সিস্টেমের দলগুলোকে পরিচালনা করা।
মানুষ যদি কাজের কেবল একটি ছোট অংশও করে, তবুও এআই-এর সহায়তায় উৎপাদনশীলতা নাটকীয়ভাবে বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি যদি কাজের মাত্র ৫ শতাংশও করেন এবং বাকি ৯৫ শতাংশ কাজ এআই করে দেয়, তবে আপনার উৎপাদনশীলতা ২০ গুণ বেড়ে যাবে।’
বর্তমান তরুণদের কোন ধরনের দক্ষতা অর্জন করা উচিত- এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যানথ্রোপিক প্রধান পরামর্শ দেন, এআই-এর সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করে বরং এমন ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া উচিত যা এআই-এর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তিনি সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার পাশাপাশি মানবিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পেশাগুলোর ওপর জোর দেন।
আমোদেই আরও জানান, এআই-চালিত এই পৃথিবীতে ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা অন্যতম মূল্যবান দক্ষতা হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, যেহেতু এআই যেকোনো কিছু তৈরি বা জেনারেট করতে পারে, তাই মৌলিক বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনার দক্ষতাই হবে সফলতার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দিন দিন এআই-দ্বারা তৈরি ছবি ও ভিডিও এত বেশি বাস্তবসম্মত হয়ে উঠছে যে আসল এবং নকল তথ্যের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতা এবং উপস্থিত বুদ্ধির ব্যবহার এখন অত্যন্ত জরুরি।
অতিরিক্ত মাত্রায় এআই-নির্ভরতার নেতিবাচক দিক নিয়েও সতর্ক করেন এই এআই প্রধান।
তিনি বলেন, অসতর্কভাবে এর ব্যবহার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতাগুলোকে নষ্ট করে দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করার প্রবণতাকে তিনি মূলত ‘হোমওয়ার্কে ফাঁকি দেওয়া’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি জানান, অ্যানথ্রোপিকের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা গেছে, কোডিংয়ের জন্য এআই-এর কিছু ভুল ব্যবহার মানুষের দক্ষতা কমিয়ে দেয়, যেখানে চিন্তাভাবনা করে সঠিক উপায়ে এর ব্যবহার মানুষের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
আগামী দশকে এআই মানুষকে আরও কম বুদ্ধিমান বা ‘বোকা’ বানিয়ে দেবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে আমোদেই বলেন, এর ফলাফল নির্ভর করবে সমাজ কীভাবে এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে তার ওপর।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি অসতর্কভাবে এআই ব্যবহার করি, তবে হ্যাঁ, মানুষ সত্যিই বোকা হয়ে যেতে পারে। তবে কোনো কাজে এআই আপনার চেয়ে সবসময় ভালো করলেও, আপনি নিজে সেই কাজটি শিখতে পারেন এবং নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটাতে পারেন।’ সূত্র: এনডিটিভি
আজহার/অমিয়/