গত বছর আবাদ তেমন না হওয়ায় ঈশ্বরদীর লিচুবাগান মালিকরা লোকসান গুনেছেন। তবে এবার তারা লিচু থেকে লাভের আশা করছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাড়ে ৩ লাখের বেশি গাছের প্রতিটিতে অসংখ্য লিচু। বাম্পার ফলনের আশা লিচুসংশ্লিষ্ট সবার। এক মাস পরেই কৃষক, ব্যাপারী লিচু বাজারজাত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।
কৃষকরা বলছেন, গরমের তীব্রতা একটু বেশি থাকলেও লিচু আবাদের অনুকূলে রয়েছে আবহাওয়া। লিচু পরিপক্ব হতে এখন গরম, বৃষ্টি দুটোরই প্রয়োজন রয়েছে। কয়েক দিন আগে বৃষ্টি যেমন হয়েছে, পাশাপাশি গরমও পড়ছে। তবে গরমের তীব্রতা এখনকার চাইতে আরও বেশি হলে লিচুর জন্য ক্ষতি হতে পারে।
উপজেলা কৃষি বিভাগও মনে করছে, লিচু পরিপক্ব হওয়ার আগ পর্যন্ত আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে, তাহলে এবার ঈশ্বরদীর লিচুর অর্থনীতি হবে ৬০০ কোটি টাকা।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহজুড়ে ঈশ্বরদীতে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করছে। ২০ এপ্রিল ৩৬ দশমিক ৫, ২১ এপ্রিল ৩৭, ২২ এপ্রিল ৩৮, ২৩ এপ্রিল ৩৬ দশমিক ২, ২৪ এপ্রিল ৩৭ দশমিক ২ এবং ২৫ এপ্রিল তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈশ্বরদীতে তিন হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ রয়েছে। লিচু বাগানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৬০টি। গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০। প্রতিটি গাছে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার লিচু ধরে থাকে। এ ছাড়া লিচু আবাদ হয়ে থাকে এমন সব এলাকার বাড়ি, বাড়িসংলগ্ন ভিটা জমিতে ২ থেকে ৪টি করে লিচুগাছ রয়েছে। প্রতিবছর লিচুর গাছের সংখ্যা বাড়ছে। উপজেলার ছলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় শত শত লিচুর বাগান রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি লিচু বাগান রয়েছে ছলিমপুর ও সাহাপুর ইউনিয়নে। ঈশ্বরদীতে মোজাফফর ও বোম্বাই জাতের লিচুর বেশি আবাদ হয় বলে এখানকার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
উপজেলার লিচু বাগানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ দেখা যায়। অনেক ব্যবসায়ীরা মুকুল দেখে লিচুবাগান ক্রয় করেন। তবে বেশির ভাগ বাগান মালিক নিজেই পরিচর্যা করে লিচু আবাদ করছেন। গাছে লিচু ধরে রাখতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন।
দুই-তিনজন লিচুবাগান মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতবারের চাইতে এবার বেশির ভাগ গাছে লিচুর মুকুল আসে। মুকুল থেকে লিচু এখন পরিপক্ব হচ্ছে। এক মাস মধ্যে লিচু পরিপূর্ণ হবে। পরিপূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত বড় ধরনের যদি কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না আসে তাহলে ঈশ্বরদীতে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হবে। কৃষকরা লাভবান হবেন।
উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের মধ্য সাহাপুর মন্ত্রীর মোড় মালিথা পাড়া এলাকার ১৫০ লিচুগাছের মালিক আবুল বাশার মালিথা বলেন, কয়েক দিনের গরমে তার শুধু একটি গাছ থেকে বেশ কিছু লিচুর গুটি ঝরে পড়েছে। বাকি অন্যসব গাছের অবস্থা ভালো। তিনি প্রথম থেকে সময়মতো গাছে পানি দেওয়া এবং নিয়মমাফিক কীটনাশক স্প্রে করছেন। তিনি জানান, আবহাওয়া এখনো লিচু আবাদের অনুকূলে আছে। এক মাসের মধ্যে লিচু পরিপক্ব হবে। তবে এ সময়ের মধ্যে তাপমাত্রার তীব্রতা যদি এখনকার চাইতে বেশি বেড়ে যায় তাহলে লিচুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ অবস্থায় নিজের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শে লিচুর গুটি ধরে রাখার জন্য পরিচর্যা করা হচ্ছে।
কোনো ব্যাপারীর কাছে গাছ বিক্রি না করে নিজেই দেখভাল করে লিচু বিক্রি করবেন এমন ৫০০ লিচুগাছের মালিক উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের দিয়াড় সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিটি গাছে অসংখ্য লিচু ধরেছে। শুরুতেই এবার গাছে গাছে চোখ-মন ভরানো মুকুল ছিল। তিনি জানান, ৩৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠা লিচুবাগানের ৫০০ গাছ বছরজুড়ে পরিচর্যা করা হয়। অপেক্ষায় থাকা হয় লিচু মৌসুমের। মৌসুম শুরু হলে গাছ পরিচর্যা থেকে শুরু করে লিচু পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত রাত-দিন ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়। তিনি বলেন, গুটি থেকে পরিপূর্ণ লিচু হওয়ার সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আবহাওয়া লিচুর অনুকূলে থাকলে ফল আর লাভ দুটোই এবার পাওয়া যাবে। তিনি জানান, মে মাসের শেষে অথবা জুনের প্রথম সপ্তাহে লিচু পরিপক্ব হবে। পরিপক্ব হওয়ার আগ পর্যন্ত সার্বিকভাবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৫০০ গাছ থেকে ৫০ লাখ টাকার লিচু বিক্রির আশা করছেন চাষি আরিফুল ইসলাম।
সাহাপুর ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, গাছে গাছে শুধু লিচু আর লিচু। লিচুগাছের মালিকরা অত্যন্ত খুশি। তারা এখন লিচুগাছ পরিচর্যা ও লিচুর গুটি রক্ষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেননা, সাহাপুর ইউনিয়নে লিচুগাছের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চাষিদের লিচু আবাদের বিষয়ে পরামর্শ প্রদানের পাশাপাশি উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক সহযোগিতা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, ঈশ্বরদীর লিচুর খ্যাতি রয়েছে দেশব্যাপী। উপজেলায় এবার ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ রয়েছে। গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০টি। দেশি মোজাফফর, বোম্পে চায়নাজাতের লিচুর আবাদ বেশি হয় ঈশ্বরদীতে। ইতোমধ্যে কয়েকবার আমরা লিচুর বাগানগুলো ঘুরে দেখেছি। গাছে গাছে শুধু লিচু আর লিচু। দেখে মনে হচ্ছে এবার লিচুর বাম্পার ফলন হবে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে আবহাওয়ার ওপর। তাপমাত্রার যথেষ্ট তীব্রতা রয়েছে। তবে এর চাইতে বেশি হলে লিচুর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি জানান, লিচুগাছের সংখ্যা ও গাছ প্রতি লিচুর ফলন অনুযায়ী আশা করা যায় এবার ঈশ্বরদীতে লিচুর অর্থনীতি হবে ৬০০ কোটি টাকা।