জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সর্বোচ্চ আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তিনটি বিধিবদ্ধ পর্ষদ- সিনেট, সিন্ডিকেট ও অর্থ কমিটি (এফসি) দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের শূন্যতা নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিন পর্ষদের মোট ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে।
তবে একাধিক শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি, বিভিন্ন কারণে নিষ্ক্রিয় ও কার্যত অনুপস্থিত সদস্যদের হিসেব করলে অকার্যকর পদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, অংশীজনের প্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতামূলক সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন পদের প্রতিনিধিদের পদত্যাগ, অপসারণ, অব্যাহতি কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার কারণে এই শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়েও এসব পদে নতুন নির্বাচন বা মনোনয়নের উদ্যোগ না নেওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
সিনেটে ১৪ পদ শূন্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও বাজেট অনুমোদনকারী পর্ষদ সিনেটে মোট সদস্য ৯৪। এর মধ্যে বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪টি পদ শূন্য রয়েছে। খালি থাকা পদগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের পদ।
এ ছাড়া স্পিকার কর্তৃক মনোনীত পাঁচজন সংসদ সদস্য, চারজন কলেজ অধ্যক্ষ এবং দুইজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধির পদও দীর্ঘদিন ধরে পূরণ হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক বলছেন, কাগজে-কলমে শূন্যপদের সংখ্যা ১৪ হলেও কার্যত অকার্যকর সদস্যের সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাছুটিতে বিদেশে চলে যাওয়া, প্রশাসনিক জটিলতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া কিংবা বিভিন্ন কারণে অধিবেশনে অংশ না নেওয়া একাধিক সদস্য রয়েছেন। ফলে বাস্তবে সিনেটের কার্যকর সদস্য সংখ্যা আরও কমে গেছে।
গত বছরের ৪২তম সিনেট অধিবেশনে কোরাম সংকট দেখা দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর অধিবেশন শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) কর্তৃক মনোনীত পাঁচজন শিক্ষার্থী প্রতিনিধির মধ্যে সম্প্রতি দুজনের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। ফলে তাদের সিনেট সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়েও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩- এর ধারা ১৯(২) অনুযায়ী, শিক্ষার্থী সদস্যদের মেয়াদ এক বছর এবং অন্য সদস্যদের মেয়াদ তিন বছর। একই ধারায় বলা হয়েছে, উত্তরসূরি নির্বাচিত, মনোনীত বা দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সদস্যরা পদে বহাল থাকতে পারবেন।
তবে পরবর্তী শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারালে বা ছাত্র না থাকলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনেট সদস্যপদ হারাবেন।
উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, যখন তাদের (শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের) মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন। সামনের সিনেট অধিবেশনের জন্য যখন তাদের চিঠি দেওয়া হয়েছে তখনও তাদের ছাত্রত্ব ছিল। এখন বিষয়টি নিয়ে আইনি পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
তবে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া দুই প্রতিনিধির সদস্যপদ বাতিল হলে জাকসু নতুন করে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ’চলে গেলো মানে চলে গেলো।’ তার এই বক্তব্যে নতুন মনোনয়নের সুযোগ নেই বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সিন্ডিকেটে অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান পর্ষদ সিন্ডিকেটের মোট সদস্যসংখ্যা ২০। বর্তমানে এর ১১টি পদই শূন্য। খালি থাকা পদগুলোর মধ্যে রয়েছে একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত দুইজন কলেজ অধ্যক্ষের পদ, শিক্ষকদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ছয়জন প্রতিনিধি, সিনেট কর্তৃক মনোনীত দুইজন সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের একজন বিশিষ্ট নাগরিকের পদ। এ ছাড়া পদাধিকারবলে থাকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের পদটিও বর্তমানে শূন্য রয়েছে।
অর্থ কমিটিতেও শূন্যতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক নীতি, বাজেট ও ব্যয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অর্থ কমিটির ১২টি পদের মধ্যে বর্তমানে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক মনোনীত একজন ডিন, সিনেট কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য এবং সিন্ডিকেট কর্তৃক মনোনীত অর্থবিষয়ক দুই বিশেষজ্ঞের মধ্যে একজনের পদ এখনও পূরণ হয়নি।
আইনের ধারা ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ২২(৩) ধারা অনুযায়ী, সিন্ডিকেট সদস্যদের মেয়াদ সাধারণত দুই বছর। তবে উত্তরসূরি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সদস্যরা পদে বহাল থাকতে পারেন। তবে একই ধারার শর্তে বলা হয়েছে, কলেজ অধ্যক্ষ, শিক্ষক প্রতিনিধি, সিনেট প্রতিনিধি বা সরকারি মনোনীত ব্যক্তিরা নিজ নিজ পদে বা দায়িত্বে বহাল থাকা সাপেক্ষেই সদস্যপদ ধরে রাখতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক মনে করেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাঁরা চাকরি হারিয়েছেন, পদত্যাগ করেছেন কিংবা দায়িত্বে নেই, তাঁদের অনেকের সদস্যপদ কার্যত অবসান হয়েছে। কিন্তু নতুন নির্বাচন বা মনোনয়ন না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়ে গেছে।
গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ’বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্পিরিটই হলো গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব। দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ বডিগুলো অপূর্ণ রেখে পরিচালনা করা স্বায়ত্তশাসনের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এই সংকট গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচন ও মনোনয়নের মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরণ করা প্রয়োজন।’
জীববিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মাফরুহি সাত্তার বলেন, ’বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিধিবদ্ধ বডি গণতান্ত্রিকভাবে পূর্ণাঙ্গ হওয়া প্রয়োজন। তবে জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি বিলম্বিত হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই এসব বডি পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব হবে।’
প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবেদা সুলতানা বলেন, ’বিভিন্ন বডি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানানো হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে কিছুটা সময় লাগছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, ’সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো পুনরায় চালু করা হবে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এখন আমরা দ্রুত এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ’আগের কিছু সদস্য বিভিন্ন কারণে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তাই শূন্যপদগুলো পূরণের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা হবে। সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাবির স্বায়ত্তশাসন ও অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখতে হলে সিনেট, সিন্ডিকেট ও অর্থ কমিটির শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা জরুরি। অন্যথায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিনিধিত্বের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।
আমানউল্লাহ খান/খাদিজা রুমি/