জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের আগে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের, বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং ও সমালোচনা প্রচারণা একটি উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। এতে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তি ও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তত ১৫টি ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ অত্যধিক সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অনলাইন প্রচারণার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকার কারণে জনপ্রিয় কিছু ফেসবুক পেজসহ সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হওয়া ভুঁইফোড় কিছু পেইজ ও অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে একপাক্ষিক ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে- JU Update, JU Family, JU Insiders, Jucsu News, JU Sarcasm ও JU Crush & Confession-এর মতো পেজগুলোকে বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সমালোচনা ও মানহানিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, ছাত্রদল, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন যে, তারা সমন্বিতভাবে অনলাইন হয়রানি ও মানহানি প্রচারণার শিকার হচ্ছেন। অনেকেই দাবি করেছেন যে এই বট অ্যাকাউন্টগুলো ইসলামী ছাত্র শিবির দ্বারা পরিচালিত। যদিও কেউ সরাসরি গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেননি, তবে তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নারীদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোই এর পেছনে আছে।
সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের থেকে জাকসু সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে সম্ভাব্য প্রার্থী শরণ আহসান বলেন, “আমাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অ্যাকাউন্টগুলো শিবিরের সঙ্গে যুক্ত। লক্ষ্য শুধু নারীরা নয়, আদিবাসী ও সাধারণ ছাত্ররাও যারা মৌলবাদী মতবাদের বিরোধী তাদের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে। এই বট অ্যাকাউন্টগুলো নির্বাচনের ফলাফলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং নিরপেক্ষতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।”
তিনি জানান, এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই তারা নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন।
জাবি শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল হোসাইন বলেন, “একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী জাকসু প্রার্থীদের, বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে সমালোচনা প্রচারণা চালাচ্ছে। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো নারীদের নেতৃত্বের ভয় পায়। তাদের লক্ষ্য নারীদের প্রার্থী হওয়ার ও ভোট দেওয়ার আগ্রহ নষ্ট করা।”
জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ফায়জা মেহজাবিন বলেন, “এই পেজগুলো একটি মৌলবাদী গোষ্ঠীর পরিচালনায় রয়েছে। তাদের মূল লক্ষ্য নারীদের প্রার্থী হওয়া ও অংশগ্রহণকে হ্রাস করা। নির্বাচন কমিশন যদি ব্যবস্থা না নেন, তাহলে নির্বাচন স্বচ্ছতা ও সমতল খেলোয়াড়ের মাঠের প্রশ্ন উঠবে।”
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থী তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম বলেন, “মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো মূলধারার রাজনীতিতে নারীদের বিরোধী হয়ে সমালোচনা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর প্রচারণাও করছে।”
ইসলামী ছাত্র শিবিরের জাবি শাখার অফিস সেক্রেটারি ও শিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী মজহারুল ইসলাম এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা কোনো ফেক পেজ বা বট অ্যাকাউন্ট চালাই না। আমাদের প্যানেলের নারী প্রার্থীরাও অনলাইনে হেট-কমেন্টের শিকার হন। আমরাও নির্বাচন কমিশনের কাছে এই সমালোচনা প্রচারণার বিরুদ্ধে স্মারকলিপি জমা দিয়েছি।”
ডিজিটাল মিডিয়া গবেষক এবং সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাঈদ আল-জামান সতর্ক করে বলেন, “বট নেটওয়ার্কগুলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য বড় হুমকি, বিশেষ করে নিরপেক্ষ ভোটারদের জন্য। সঠিক তথ্যের প্রবাহ যখন প্রপাগান্ডা দ্বারা বন্ধ হয়, তখন ন্যায্য অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে চলমান সব প্রপাগান্ডা পেজকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করা উচিত, শুধু নির্বাচনের সময় নয়। নারীরা সাইবার বুলিংয়ের সবচেয়ে সহজলভ্য লক্ষ্য।”
নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, “এই সমালোচনা প্রচারণাগুলো আইডিওলোজিক্যালভাবে পরিচালিত। তারা নারীদের দৃশ্যমানতা কমাতে চায়। ফেক পেজ মোকাবিলা করা এককভাবে কমিশনের ক্ষমতার বাইরে, এর জন্য জাতীয় সংস্থা যেমন বিটিআরসির সহায়তা প্রয়োজন। কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে।”
প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) প্রফেসর সোহেল আহমেদ বলেন, “নির্বাচন কমিশন যদি সুপারিশ করে, প্রশাসন প্রপাগান্ডা পেজ ব্লক করতে বিটিআরসির সহায়তা চাইবে। দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সর্বশেষ জাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯২ সালে।
আমানউল্লাহ/মেহেদী/