জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক চাপ ও সীমিত কর্মসংস্থানের প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত এ বাজেট নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুর রাব্বি হাসান ওয়ালিদ
আকার নয়, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
মো. রবিউস সানি জোহা
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড জিওগ্রাফি বিভাগ
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সম্ভাব্য ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জের মুখে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় অর্থনীতিবিদরা এটিকে সতর্ক ও বাস্তবসম্মত বলছেন। বাজেটটিতে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার ওপর। পরিশেষে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করাই হবে এই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ।
জনবান্ধব বাজেটের প্রত্যাশা
মো. রুহুল আমিন
ব্যবস্থাপনা বিভাগ
জাতীয় বাজেট সর্বজনীন ও জনকল্যাণমুখী হওয়া উচিত, যা উচ্চবিত্তের সুবিধা না বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিত্যপণ্যের দাম সহনশীল রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব বাড়াতে বিলাসবহুল পণ্যে কর বৃদ্ধি করা গেলেও, মধ্যবিত্তের বাহন মোটরসাইকেলের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ অযৌক্তিক। হামের মতো রোগের বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ধর্ষণ, সহিংসতা ও বিচারহীনতা রোধে সুশাসন নিশ্চত এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তরুণদের দক্ষ করতে কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি দূরদর্শী ও জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নই এখন সময়ের দাবি।
কেন্দ্রীয়করণ প্রবণতা দূর করুন
আফিয়া আলম
সমাজকল্যাণ বিভাগ
জাতীয় বাজেট জনগণের সার্বিক কল্যাণের জন্য হলেও এর সুফল সর্বত্র দেখা যায় না। বাজেট মূলত কেন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় তৃণমূল পর্যায়ে পর্যাপ্ত বরাদ্দ মেলে না। ফলে স্থানীয় মানুষ ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। জেলা ও উপজেলাগুলোয় মাঠ প্রশাসনের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে অনেক প্রকল্প শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে তার প্রয়োগ ঘটে না। নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সুবিধা পাওয়ার এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাজেটের একপাক্ষিক কেন্দ্রীয় প্রবণতা দূর করা জরুরি।
দেশের সর্বাঙ্গীণ ও সামগ্রিক উন্নতির লক্ষ্যে সর্বক্ষেত্রে পরিমিত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায় সর্বস্তরের জনগণ বাজেট সুবিধা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।
রাজস্ব আদায়ে নীতিগত পরিবর্তন জরুরি
মোছা. আহসানা হাবিবা অরনা
পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ
একটি দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আগামী এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব বা জাতীয় বাজেটের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাজেটের মেরুদণ্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অধিকাংশ অর্থবছরেই পূরণ হয় না, যা বাজেট ঘাটতি তৈরি করে। রাজস্ব বিভাগের দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব ও আধুনিকায়নের ঘাটতি এর প্রধান কারণ।
এ ছাড়া উচ্চ কর-হারের কারণে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব ফাঁকির প্রবণতা বাড়ে, যা অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করে। এই সংকট কাটাতে করের হার কিছুটা কমিয়ে যুগোপযোগী ও নৈতিক উপায়ে রাজস্ব আদায় করা প্রয়োজন।
তাই বাজেট ঘাটতি নিরসনে রাজস্বনীতির পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে সরকারের নজরদারি বাড়ানো উচিত।
বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করুন
সাবিকুন নাহার অন্তি
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা না বাড়িয়ে, করের আওতা সম্প্রসারণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, অপচয় কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জ্বালানি ও কর্মসংস্থানে বরাদ্দ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা কমানো জরুরি। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী না হয়ে বাজেটটি যেন বাস্তবায়নযোগ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।