শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনকে একটি ইঞ্জিনিয়ার্ড, নিয়ন্ত্রিত, অসম ও অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের শাবিপ্রবি শাখা।
রবিবার (৭ ডিসেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন ছাত্র ইউনিয়নের শাবিপ্রবি শাখার সংগঠক নাজনীন লিজা।
এ সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, শাবিপ্রবি সংসদ গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে- শাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনকে ঘিরে চলমান প্রক্রিয়া আজ সম্পূর্ণভাবে অবিশ্বস্ত, অস্বচ্ছ ও প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকেই এর নিরপেক্ষতা নিয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করে এসেছি। বাস্তবতা হলো- এই কমিশন থেকে ইতোমধ্যে চারজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। এ রকম ঘটনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেই প্রমাণ করেছে যে, তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম কাঠামো ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন ভঙ্গুর ও বিতর্কিত কমিশনের হাতে একটি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হবে?
এর পাশাপাশি আমরা কমিশনের কাছে তিন দফা যৌক্তিক দাবি উত্থাপন করেছিলাম সম্মেলন মারফত। দাবিগুলো ছিল-
একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ‘উইনিং পার্টি’ এবং একজন সম্ভাব্য প্রার্থীকে তাদের সবচেয়ে বড় নেতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে উপাচার্যের করা প্রহসনমূলক মন্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য ক্যাম্পাসের সব অংশীজনের সঙ্গে অবিলম্বে আলাপ করতে হবে।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার সঙ্গে কথা বলে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করে শাকসু আয়োজন করতে হবে।
আমরা দাবি করেছিলাম সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে হলে সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি, শাকসুর কথিত উইনিং পার্টি ও ক্ষমতাকাঠামোর লেজুড় স্বার্থান্বেষী কতিপয় শিক্ষার্থী ছাড়া কারও সঙ্গে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। নীরবতা, দায় এড়ানোর প্রবণতা এবং অস্বচ্ছতা স্পষ্ট ইঙ্গিত করে, আদতে সবজনের শাকসু আয়োজন করার তাড়না তারা বোধ করেন না।
স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কিছু ব্যক্তি আমাদের সংগঠনের প্রতি সরাসরি অবমূল্যায়ন, বিদ্বেষ ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছে। ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী কত ভোট পাবেন সেই সংখ্যাও নির্ধারণ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, এই সমস্ত ঘটনাই ক্ষমতার কাঠামোর গায়ে চাষ করা ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের মন্তব্য নির্বাচনের আগে ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, মাঠে অসম মানসিক পরিবেশ তৈরি করে এবং প্রশাসনের ছায়া-সুরক্ষায় থাকা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর দাপটকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।
এর পাশাপাশি আমাদের প্যানেলের প্রার্থীদের হুমকি-ধামকি, ক্যাটকলিং, নানানভাবে অপদস্থ করার চেষ্টা, এমনকি আমাদের বিরুদ্ধে মব উসকানি এসব আচরণ গত কয়েকদিনে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আমরা বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তারা কার্যত নীরব, নিষ্ক্রিয় এবং একপাক্ষিক। প্রশাসনের আচরণেই প্রতীয়মান হচ্ছে তারা সমান সুযোগ চান না, বরং তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট ফল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ন্যায়চক্ষু বন্ধ রেখে পক্ষপাতমূলক পরিবেশকে বৈধতা দিতে তৎপর।
(প্রসঙ্গত উল্লেখ করি, আমাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আমরা প্যানেলের একাংশ, সমমনা শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে আসলেও দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে মাত্র দুইজন থাকি। আমাদের প্যানেলে চা-বাগানের প্রতিকূলতা অতিক্রম করা ছাত্র ছিল, আদিবাসী ছাত্র ছিল, ভোকাল ফিমেইল ক্যান্ডিডেট যেমন ছিল; তেমনি ছিল মডারেট মুসলিম ফিমেইল যারা আমাদের সঙ্গে, আমাদের বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণায় আমাদেরকে সমর্থন করেন। প্রথম সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে, স্রেফ চা খাচ্ছি এমন জুনিয়র দেখলেও এই অংশ এদের ছবি তুলে বাসায় পাঠানো, নানান রকম হুমকি-ধামকি দেওয়ায় এদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত হই। তাদেরকেও ধারণা দেওয়া হয়, এই নির্বাচন করতে আসলে তাদেরকে এই নোংরামির ধারা মেনে নিয়েই করতে হবে। অথচ অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই পরিবেশ সরাসরি পতিত স্বৈরাচার আমলের অপরাজনীতি চর্চারই ধারা। আজকে যখন জেনোসাইডারের দোসর সংগঠনকে নর্মালাইজ করার পায়তারা চলে, যখন তাদেরকে একচ্ছত্র অধিপতি ঘোষণার সমস্ত আয়োজন চলে, তখন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ও সমর্থকদের উপর এরূপ আচরণ আমাদের মনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরো জাশিকরণের জন্যেই ওনাদের এই আয়োজন কিনা।) ঢাবি, জাবি, রাবি, চবি আওব জায়গায় একই প্যাটার্ন আমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়।)
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গ্রুপকে- যারা শাকসু নির্বাচনে অংশ নেবে - অনুষ্ঠান, টেন্ট স্থাপন, সাংস্কৃতিক আয়োজনসহ নানান কার্যক্রমের অনুমতি দিচ্ছে। অথচ ছাত্র ইউনিয়নের ক্ষেত্রে চলছে স্পষ্ট বৈষম্য ও প্রশাসনিক অসহযোগিতা। আমরা বাউল নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘বাউল সন্ধ্যা’ করতে চাইলে প্রশাসন বিনা কারণে তা বাতিল করেছে। কিন্তু একই ধরনের অনুষ্ঠান একটি প্রশাসন-সমর্থিত গ্রুপকে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল সাংস্কৃতিক বঞ্চনা নয়- এটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একটি সংগঠিত প্রয়াস।
সব মিলিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ কমিশন, প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, আমাদের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার, রাজনৈতিক চাপ, ভয় দেখানো, হুমকি, ক্যাম্পাসে মব-উসকানির অবাধ বিস্তার এবং সমান সুযোগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এই নির্বাচনকে একটি ইঞ্জিনিয়ার্ড, নিয়ন্ত্রিত, অসম ও অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছে। এখানে কোনো অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নেই, নেই নিরাপত্তা, নেই সমান অধিকার।
এই পরিস্থিতিতে ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়, গ্রহণযোগ্য নয়, এবং এতে অংশ নেওয়া মানে এই প্রহসনকে বৈধতা দেওয়া।
সুতরাং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন শাবিপ্রবি সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে শাকসু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিচ্ছে। আমরা গণতন্ত্রের লড়াই থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি না - বরং ভুয়া গণতন্ত্রের মুখোশ ছিন্ন করতেই আমাদের এই অবস্থান।
অমিয়/