ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে চাঁদার বিনিময়ে দোকান বসানোর বিষয়কে ঘিরে শাখা ছাত্রদল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে। এ ঘটনায় ডাকসুর প্রতিনিধিরা ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্র শক্তির নেতা-কর্মীসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে প্রজেক্টরের মাধ্যমে ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করেছে। পাল্টা অভিযোগে ছাত্রদল ডাকসুর বিতর্কিত প্রতিনিধিসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাতে ক্যাম্পাসের একটি ভাসমান দোকান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদার অভিযোগ ওঠে জাতীয় ছাত্র শক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল গণি সগীর এবং মাস্টারদা সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল কাউসারসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। একইদিন রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে ডাকসু ও হল সংসদের নেতাসহ শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষোভ পরবর্তী সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘আপনার চাঁদাবাজদের থামান, নাহলে ছাত্রলীগকে যেভাবে বিতারিত করা হয়েছিল সেভাবে এদেরও বিতারিত করবে ছাত্রজনতা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে চাঁদাবাজি ধরা পড়েছে। এটি প্রমাণ করে আরও শত শত চাঁদাবাজি হয়েছে। এই চাঁদাবাজরা টিএসসি, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, নীলক্ষেত, মেট্রোরেলের নিচে থেকে চাঁদাবাজি করে। আমি চাই, আমার জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্যাম্পাসে কোনো চাঁদাবাজি হোক না।’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ২টায় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ দায়েরের কথা জানানো হয়। রবিবার সকালেই ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়েরের পাঠানো বার্তায় জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল কর্তৃক চাঁদাবাজির প্রমাণাদি প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে।
দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চাঁদাবাজির অভিযোগসংক্রান্ত ভিডিওচিত্র ডকুমেন্টারি আকারে প্রদর্শন করে ডাকসুর প্রতিনিধিরা। এতে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইয়েদ হাসান সাদ, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবিদ আব্দুল্লাহ, চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজের রাতুল, ফারসি বিভাগের কাউসার মাহমুদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সানি সরকারসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘আজকের এই ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চাঁদাবাজমুক্ত করা। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ ও দুর্নীতিবাজদের মুক্ত করা যায়, তাহলে সারা বাংলাদেশ থেকেও এসব অপকর্ম দূর করা সম্ভব।’
এর আগে সকালেই ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল লিখিত অভিযোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিসে।
অভিযোগে ছাত্রদল দুটি দাবি উত্থাপন করে
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দোকানপাট পরিচালনার নিয়মনীতির বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা প্রদান ও যথাযথ প্রচার নিশ্চিত করা; উত্থাপিত অভিযোগ অনুসারে চাঁদাবাজি, দোকান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের সিন্ডিকেটে যুক্ত বিতর্কিত ডাকসু প্রতিনিধিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাতের মধ্যে তদন্তের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে ফলাফল প্রকাশ করবে। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, সে আমাদের সংগঠনের হোক বা অন্য কোনো সংগঠনের, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করতে হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন ছাত্রশক্তির নুরুল গণি সগীর। বিকেলে মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আছে, সেটার প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আমি স্বেচ্ছায় কান ধরে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে যাব। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, তারা প্রমাণ দিন; না হলে আমি আইনি ব্যবস্থা নেব।’
ক্যাম্পাসে ভ্রাম্যমাণ ও ক্ষুদ্র দোকান ঘিরে চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও উচ্ছেদের অভিযোগের ভিত্তিতে চার সদস্যের ‘সত্যানুসন্ধান কমিটি’ গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মিরাজ কোবাদ চৌধুরী। এছাড়া সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. শান্টু বড়ুয়া এবং এস্টেট ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) ফাতেমা বিনতে মুস্তফা সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরিফ/রিফাত/