দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিক্ষার্থীদের কল্যাণে দুইশত ২৫ টি কাজ ও উদ্যোগ করেছে। এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের চারমাসে এসে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জেরে ক্ষমা প্রকাশ করে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত ফেসবুকে গ্রুপে দুঃখ প্রকাশ করে এ ঘোষণা দেন সর্বমিত্র। পরে নিজের ফেসবুক পেজেও এক পোস্টে এ তথ্য জানান সর্বমিত্র। এ প্রসঙ্গে তার সঙ্গে মুঠোফোনে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
ওই স্ট্যাটাসে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়ে লিখেন, ‘আমি বিভিন্ন জায়গায় হাত দিয়েছি, একা। চেষ্টা করেছি সমাধানের, নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়েও। যত যাই হোক, আইন তো আইনই। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনের ঊর্ধ্বেও যেতে হয়েছে পরিস্থিতি মোকাবেলায়-নিরাপত্তা বিধানে। যা আমার ব্যক্তিগত জীবন, মানসিক অবস্থা বিষিয়ে তুলেছে। আমার আর কন্টিনিউ করার সক্ষমতা নেই। আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এর আগে মধুর ক্যান্টিনের সামনে ‘ডাকসুর চার মাস: কার্যবিবরণী ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডাকসু নেতারা। এসময় সর্বমিত্রের পদত্যাগের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, ‘সাধারণত পদত্যাগ সংক্রান্ত কোনো ইস্যু এলে সেটি লিখিত আকারে আমার কাছে আসার কথা। এখন পর্যন্ত আমি তেমন কিছু পাইনি। এর বাইরে অন্য কোন বক্তৃতা, কোন পোস্ট কিংবা কোন ফিডব্যাক আমার কাছে বিবেচনার বিষয় নয়।’
গত রবিবার কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলতে আসা বহিরাগত ২৫-৩০ জন কিশোরকে কানে ধরিয়ে উঠবস করানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা মুখে পড়ে সর্বমিত্র। এমন কর্মকাণ্ড সর্বমিত্র পরিচালনা করতে পারে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ বলেন, ‘সর্বমিত্র চাকমার কর্মকাণ্ডের বৈধতা প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা কাম্য নয়। এভাবে করা উচিত নয়।’
এছাড়া ওই সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর দায়িত্বগ্রহণের চার মাসে ২২৫ কাজ ও উদ্যোগের বিবরণী উত্থাপন করা হয়। জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ‘আমরা ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা আমাদের যে ইশতেহার দিয়েছিলাম এবং অন্যান্য যারা নির্বাচিত হয়েছিল তাদের সবার ইশতেহারগুলো নিয়ে নোট ডাউন করেছিলাম। যতগুলো ইশতেহার ছিল আমরা সবগুলোতে কাজ করার চেষ্টা করেছি। এমন কোন ইশতেহার নেই যে আমরা যেগুলোতে কোন কাজ করিনি বা উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। সবগুলো জায়গায় আমরা কাজ করেছি কিংবা কাজের উদ্যোগ নিয়েছি। এরপরেও যদি শিক্ষার্থীদের চোখে কোন বিষয়ে মনে হয় আমরা কোন কাজ করিনি সেটি আমাদের জানালে আমরা সেটি নিয়ে অবশ্যই কাজ করবো।’
সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল বাজেটের অভাব। দীর্ঘদিন ধরে ডাকসু কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। আজ বিশ্ববিদ্যালয় ১০৪ বছরে পা রেখেছে, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে; অথচ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা চায় না শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর থাকুক, চায় না স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমরা চাইলে বলতে পারতাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ড পাইনি, তাই কাজ করতে পারিনি। কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নিইনি। আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আজ পর্যন্ত প্রায় ২২৫টি কাজ সম্পন্ন করেছি, যা ৩৩টি খাতে বিভক্ত। এর বিস্তারিত তথ্য আমাদের ওয়েবসাইট ও আপনাদের হাতে দেওয়া বুকলেটে প্রকাশ করা হয়েছে।’
এসময় সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে ডাকসুর কমনরুম- রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীমউদ্দীন খান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সমাজ সেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেসারী (এবি যুবায়ের), ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ, মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়াসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা গত চার মাসে ডাকসুর কাজের মধ্যে রয়েছে: ডাকসু নির্বাচনকে একাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রেজুলেশন আকারে প্রস্তাব পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট পাঠানো, ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদের এখতিয়ার বহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ারকন্ডিশনসহ জরুরি সংস্কার কাজ, ১৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার ছাত্রী হল নির্মাণ দ্রুততর করার লক্ষ্যে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে দফায় দফায় আলোচনা, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২৮০০ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে কাজ করা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫টি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সম্মতি আদায়, ছাত্রীদের ইবাদতের জন্য কার্জন হলের কমনরুমে নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কারের কাজ শুরু করা, কমনরুমসমূহ ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট প্রদান করা হয়েছে, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালু করা, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ১০টি এয়ার কন্ডিশনার ও এক্স-রে মেশিন-ইসিজি মেশিন-এনালাইজার- মাইক্রোস্কোপসহ হাসপাতাল বেড ও আলমিরা-চেয়ার- ডেস্ক প্রভৃতি প্রদানসহ সম্পূর্ণ মেডিকেল সেন্টার সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা, ৫০% ছাড়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের সাথে সমঝোতা স্বাক্ষর করা, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা, হল ভিত্তিক মোট ১৮ বার ছারপোকার ঔষধ দেওয়া৷
উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আরও রয়েছে: একাডেমিক এরিয়া-সহ ছাত্রী হলসমূহে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, সোচ্চার-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে ‘সেরেনিটি সেশন: ব্রিদ অ্যান্ড ব্লুম’ শীর্ষক ইন্টারাক্টিভ সেশন আয়োজন করা, সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ‘ব্রেস্ট ক্যান্সার অ্যাওয়ারনেস’ শীর্ষক সেমিনার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সহযোগিতায় দুটি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রায় ৩০০০ শিক্ষার্থীকে দেওয়া, বারডেম হাসপাতালের সহযোগিতায় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বল্পখরচে ব্রেস্ট ক্যান্সার চেকআপের সুযোগ প্রদান।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ডাকসু সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুনির চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার শীর্ষক স্মরণিকার জন্য লেখা আহ্বান, ‘বিজয়ের রঙতুলি’ শীর্ষক আলপনা উৎসব, বিজয় দিবসে ‘বিজয় সাইকেল র্যালি ও স্ট্যান্ট শো’ আয়োজন, ‘যুদ্ধ দিনের গল্প শুনি’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান, ‘বিজয়ের কথা’ শীর্ষক প্রকাশনার জন্য লেখা আহ্বান, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে৷ এছাড়াও ডাকসু সীরাতুন্নবী (সা.) সন্ধ্যা ও সীরাত প্রতিযোগিতা, নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসবসহ কয়েকটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এছাড়াও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য চারটি সেমিনার আয়োজন, ৭টি প্রসিদ্ধ জার্নালে ফ্রি অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আলো স্বল্পতা দূর করতে লাইটিং ও বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে নতুন ফ্যান সংযোজন করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পরীক্ষার হল বরাদ্দ প্রথা বাতিল করা, শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষণের আয়োজন, ৪টি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ আয়োজন, স্পোকেন ইংলিশের ৪টি কোর্স চালু করা, বিভিন্ন সেক্টরের প্রফেশনালস এবং শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ স্কিল সামিট আয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ২৯টি ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এছাড়াও ডাকসুর উদ্যোগে বিএনসিসি ও রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার সদস্যদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী ‘ফায়ারফাইটিং, সার্চ এন্ড রেসকিউ, ফার্স্ট এইড অ্যান্ড আরথকোয়েক ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং’ সম্পন্ন, লাইফ স্কিল প্রশিক্ষণের আওতায় ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ টি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ক ১৮ টি প্রশিক্ষণ প্রদান, দুটি ইনস্টিটিউট এবং তিনটি ছাত্রী হলে মোট পাঁচটি সেলফ ডিফেন্স প্রশিক্ষণ প্রদান, ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিমনেসিয়াম নির্মাণের কাজ শুরু করা, দুই দফায় ১৮ টি হলে মোট ৩৬ বার পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কর্মসূচি, শব্দ দূষণ রোধে ডিউআরসির সহ-উদ্যোগে ১০ কিমি রান সম্পন্ন করা, সিওপি-৩০ জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে ঢাবি টু জাবি সাইকেল র্যালি আয়োজন করা হয়েছে।
পরিবহন খাতে ডাকসুর কাজের মধ্যে রয়েছে জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তন এবং ট্রিপ ও সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউজিসিসহ অংশীজনদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেটের ব্যবস্থা করা, সকল রুটে বহুল কাঙ্ক্ষিত সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু করা, ক্যাম্পাসে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু করা, সব ছাত্রী হলকে ক্যাম্পাস শাটলের আওতাভুক্ত করা, ক্ষণিকা রুটের বাসগুলোর এক্সপ্রেসওয়ে টোল ফ্রি করে পরিবহন অফিসের সাথে সমন্বয় করা।
আরিফ জাওয়াদ/এসএন