যুগে যুগে নারীরা ঘর থেকে বাইরে বেরিয়েছেন, সংসারের কাজ থেকে সামলেছেন দেশের কাজ। দেশের কাজ সামলে একসময় তারা অন্য দেশে গিয়ে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। তেমনই একজন আলেকজান্দ্রা কোলেনটাই, যিনি বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত। আলেকজান্দ্রার জন্ম ১৮৭২ সালের ৩১ মার্চ রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে।
আলেকজান্দ্রা কোলেনটাই একজন রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবী ছিলেন। তিনি প্রথম মেনশেভিকের সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯১৪ সালে তিনি বলশেভিকের সদস্য হন। ছোটবেলা থেকেই আলেকজান্দ্রা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কোলেনটাই ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে আগ্রহী হন এবং ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন।
১৮৯০-এর দশকে তিনি মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের লেখা পড়তে শুরু করেন। এই সময় তার ধারণা গঠনে কার্ল মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’ বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৮৯৬ সালে কোলেনটাই যখন শিকাগো শহরের শ্রমিক ধর্মঘটের সময় শ্রমিকদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেন তখন এটি তার রাজনৈতিক চিন্তার ওপরে গভীর প্রভাব ফেলে। তার এই চিন্তা তাকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার রক্ষার কাজে প্রেরণা দেয়। একপর্যায়ে আলেকজান্দ্রা রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আলেকজান্দ্রা কোলেনটাই লেনিনের বলশেভিক পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তবে বলশেভিকদের মধ্যে নারী মুক্তির বিষয় নিয়ে তার বিশেষ অবস্থান ছিল। কোলেনটাই মনে করতেন, ‘নারী মুক্তি শুধু ভোটাধিকার বা আইনি সমতার মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং অর্থনৈতিক সমতা ও ব্যক্তিগত জীবনের স্বাধীনতা নারীর প্রকৃত মুক্তি এনে দিতে পারে।’
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর কোলেনটাই বলশেভিক সরকারের অধীনে নারীবিষয়ক দপ্তরের প্রধান হন। এই দপ্তরটি বিশেষত নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করত। তিনি নারীদের ভোটাধিকার, শ্রম অধিকার এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়গুলোয় বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার প্রচেষ্টায় সোভিয়েত রাশিয়ায় নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার, গর্ভপাতের বৈধতা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো আইনি পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য।
১৯২৩ সালে তাকে নরওয়েতে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা তাকে ইতিহাসের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত করে তোলে। একজন বিপ্লবী, রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি কোলেনটাই ছিলেন একজন প্রতিভাবান লেখক এবং তাত্ত্বিক। তার রচনাগুলোর মধ্যে নারী মুক্তি, শ্রমিক আন্দোলন এবং যৌন সম্পর্কের ওপর তার চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়েছে। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ রচনা যেমন- ‘The Social Basis of the Woman Question’ এবং ‘Communism and the Family’ নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দার্শনিক ভিত্তি তুলে ধরে।
এসব রচনায় তিনি সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে নারীর মুক্তির পথে আইনি ও সামাজিক বাধাগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন। কোলেনটাইয়ের জীবনের শেষ পর্বে তিনি আরও কূটনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মূলধারার রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে চলে যান। ১৯৫২ সালে তার মৃত্যু হয়।
কলি
.jpg)