বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীরা এখন সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই অফিসে যেতে পারবেন- এমন উদ্যোগ এসেছে সরকারের নতুন শ্রমনীতি প্রস্তাবে। এটি শুধু একটি আইনগত পরিবর্তন নয়, বরং নারী কর্মজীবনের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও বড় পরিবর্তনের সূচনা। মাতৃত্ব আর কাজ- দুইয়ের ভারসাম্য আনতে এই পদক্ষেপ কর্মক্ষেত্রে মানবিকতার নতুন অধ্যায় রচনা করেছে।
বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীরা দীর্ঘদিন ধরেই লড়ছেন এক অদৃশ্য সীমারেখার বিরুদ্ধে। যেখানে মাতৃত্ব যেন হয়ে ওঠে পেশার পথে বাধা। সন্তান জন্মের পর অফিসে ফেরা অনেক নারীর কাছেই পরিণত হয় মানসিক চাপ, সামাজিক সমালোচনা আর দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষায়। কাজের টেবিলের পাশে শিশুর কোলাহল এখনো বাংলাদেশের অফিস সংস্কৃতিতে অচেনা এক দৃশ্য।
অথচ এই দৃশ্যই এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে নতুন শ্রমনীতি প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে। সরকারের সদ্য ঘোষিত নীতিতে কর্মজীবী নারীরা চাইলে সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই অফিসে যেতে পারবেন। এটি একদিকে মাতৃত্বের প্রতি সামাজিক স্বীকৃতি, অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে মানবিকতার নতুন অধ্যায় রচনা করছে। এটি শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং নারীর কর্মজীবনে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের এক প্রতীক হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান নারী কর্মসংস্থান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে বদলে দিচ্ছে। কিন্তু সেই উন্নতির পথের সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল মাতৃত্বকালীন কর্মক্ষেত্রে সহায়তার অভাব।
অনেক নারীই সন্তান জন্মের পর চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন, কারণ শিশুর যত্ন নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সরকার সম্প্রতি যে শ্রমনীতি প্রস্তাব দিয়েছে, তা নারীর পেশাজীবনে এক নতুন আশার আলো জ্বেলেছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি নারী কর্মী বেশি থাকেন, তাহলে সেখানে একটি ডে-কেয়ার বা শিশুকক্ষ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রয়োজনে কর্মজীবী মায়েরা নিজের সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই অফিসে যেতে পারবেন। এতে মাতৃত্বকালীন নারীর পেশাগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং শিশুদের জন্যও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
সরকারের এই উদ্যোগকে নারী অধিকার কর্মী, সমাজবিজ্ঞানী ও শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন যুগান্তকারী। বিশ্বের অনেক দেশে এমন নীতি বহু আগেই চালু। কানাডা, সুইডেন, জাপান বা অস্ট্রেলিয়ায় বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানে ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি ওয়ার্কস্পেস’ বাধ্যতামূলক। সেই ধারায় বাংলাদেশও এগিয়ে যাচ্ছে ধীর কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপে।
তবে শুধু নীতি প্রণয়নই নয়, বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক বেসরকারি অফিসে জায়গার অভাব, বাজেট সংকট বা প্রশাসনিক অনীহা এসব কারণে নিয়মটি প্রয়োগে বাধা আসতে পারে। অফিসে শিশু রাখার সুযোগ শুধু নারী কর্মীদেরই নয়, প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাকেও বাড়াবে। মা যদি নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন, তাহলে তার কর্মদক্ষতা ও মনোযোগ দুটোই বাড়ে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও তৈরি হয় সহানুভূতির এক সংস্কৃতি, যেখানে মাতৃত্ব আর পেশা একে অপরের বিপরীতে নয়, বরং পরিপূরক হয়ে ওঠে।
সরকারি ও বেসরকারি কিছু দপ্তরে ইতোমধ্যেই পরীক্ষামূলকভাবে ‘মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কর্নার’ চালু করা হয়েছে। এসব জায়গায় কর্মজীবী মায়েরা নির্দিষ্ট সময়ে শিশুকে খাওয়ানো বা বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ পান। এই ছোট উদ্যোগগুলোই দেখিয়ে দিয়েছে, নারী কর্মীদের জন্য মানবিক পরিবেশ তৈরি করা অসম্ভব নয় বরং ইচ্ছা থাকলেই সম্ভব।
এই নতুন শ্রমনীতি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীরা আর মাতৃত্ব ও ক্যারিয়ারের মাঝে টানাপোড়েনে ভুগবেন না। বরং তারা হয়ে উঠবেন আরও আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীন। কারণ মাতৃত্ব কোনো বাধা নয়। এটি জীবনের এক স্বাভাবিক ও সুন্দর অধ্যায়, যার মর্যাদা কর্মক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাপ্য।
তথ্যসূত্র: নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রমনীতি খসড়া ২০২৫
/এস লুপিন
.jpg)