বাংলাদেশের নারী শিল্পচর্চার ইতিহাসে যে নামটি প্রায় বিস্মৃত, অথচ যিনি ছিলেন পথিকৃৎ- তিনি নবাবজাদি মেহেরবানু খানম। ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য, নবাব স্যার আহসানউল্লাহর কন্যা এবং নবাব সলিমুল্লাহর বোন এই মহীয়সী নারী ছিলেন উপমহাদেশের প্রাচীনতম মুসলিম নারী চিত্রশিল্পীদের একজন। ১৯ শতকের শেষ ভাগ থেকে ২০ শতকের প্রথম দশকে নারীর ঘরোয়া গণ্ডি পেরিয়ে তিনি হাতে নিয়েছিলেন রংতুলি। যা ছিল সময়ের সীমা ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ বিপ্লব।
মেহেরবানু এমন এক পরিবারে জন্মেছিলেন, যেখানে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছিল গভীর ঐতিহ্য। নবাব আহসানউল্লাহ নিজে ছিলেন শিক্ষানুরাগী, আর তার কন্যারা পরীবানু, মেহেরবানু ও আখতারবানু এই উত্তরাধিকার বহন করেছিলেন গর্বের সঙ্গে। মায়ের স্মরণে তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কামরুননেসা বালিকা বিদ্যালয়, যা ছিল সে সময়ের অন্যতম অগ্রণী নারী শিক্ষা উদ্যোগ।
নবাববাড়ির পরিবেশ ছিল বই, সাহিত্য ও শিল্পে ভরপুর। ইউরোপীয় শিল্পীদের আঁকা ছবি, প্রবন্ধ সংকলন, রাজনৈতিক পুস্তিকা সব মিলিয়ে ঘরটা যেন এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই পরিমণ্ডলেই ছোটবেলা থেকে শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন মেহেরবানু খানম। অন্যদিকে, বিয়ের পর তিনি পা রাখেন আরও এক প্রাজ্ঞ পরিবারে। তার স্বামী খান বাহাদুর খাজা মোহাম্মদ আজম ছিলেন সাহিত্যিক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও রাজনীতিক। উর্দু সাহিত্যে তার অবদান ছিল ব্যাপক, আর শিল্পসাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ স্ত্রীকে প্রভাবিত করে। নবাববাড়ির সংসার, সন্তান, অতিথি সব সামলিয়েও মেহেরবানু খুঁজে নিয়েছিলেন নিজের সৃজনশীল জগৎ।
মেহেরবানুর আঁকা ছবিতে মানুষ বা প্রাণীর চিত্র দেখা যেত না। তিনি প্রকৃতি, নদী, আলো-ছায়া এবং ইসলামি চেতনা আঁকতেন। তার একটি বিখ্যাত চিত্রে দেখা যায় ‘তাওহীদের তরুণী’, যেখানে পাপের উত্তাল নদীতে মাঝিহীন নৌকা ডুবছে, আর ঈমানদাররা বেঁচে যাচ্ছেন আল্লাহর অনুগ্রহে। এই ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বলা হয়, মেহেরবানুর আঁকা সেই চিত্র থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নজরুল রচনা করেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘খেয়াপারের তরণী’। সাহিত্য ও চিত্রকলার এই যুগল সংযোগ মেহেরবানুর শিল্পযাত্রাকে দিয়েছে এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য।
১৯২০ সালে মোসলেম ভারত পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তার দুটি চিত্রকর্ম- যার একটি ছিল ধর্মীয় প্রতীকভিত্তিক, অন্যটি ছিল বিক্রমপুরের প্রাকৃতিক দৃশ্য। লেখক সৈয়দ এমদাদ আলী এই ছবিগুলোর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘আলো-ছায়ার সমন্বয়ে নদীর তরঙ্গ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।’ এই প্রকাশনা শুধু একটি শিল্পীর নয়, বরং মুসলিম নারীর সাংস্কৃতিক মুক্তির এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল।
মেহেরবানুর পরিবারও ছিল শিল্পচর্চার ধারক। তার পুত্র খাজা মোহাম্মদ আদিল ছিলেন কবি ও চলচ্চিত্র অভিনেতা; অপর পুত্র খাজা মোহাম্মদ আজমল ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র দ্য লাস্ট কিস-এর নায়ক ও প্রযোজক। এমনকি তার মেয়ে হুরবানু খানমও বিবাহসূত্রে যুক্ত হন সেই চলচ্চিত্র পরিবারের সঙ্গেই। শুধু শিল্পী নন, তিনি ছিলেন সমাজসেবীও। ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। এতিম শিশুদের লালনপালন করতেন এবং বহু দরিদ্র পরিবারের পাশে থেকেছেন নীরবে।
১৯২৫ সালের ৩ অক্টোবর বয়স যখন মাত্র চল্লিশের কোঠায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তার আঁকা অধিকাংশ ছবি হারিয়ে গেছে ইতিহাসের ধুলোয়, তবু কয়েকটি চিত্র, কিছু আলোকচিত্র ও নজরুলের কবিতা আজও সাক্ষ্য দেয় একজন নারী শতবছর আগে সমাজের সব বেড়াজাল পেরিয়ে ক্যানভাসে এঁকে গিয়েছিলেন মুক্তির ভাষা।
মেহেরবানু খানম ছিলেন এমন এক নারী, যিনি শিল্পের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন- নারীর সৃজনশীলতা কোনো প্রাসাদ বা অন্তঃপুরে বন্দি থাকে না। তার তুলির আঁচড়ে যে ঢাকার প্রথম নারী চিত্রশিল্পীর পরিচয় রচিত হয়েছিল, তা আজও নারীর শিল্প-অধিকারের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকরেখা হয়ে আছে।
/এসএল
.jpg)