হরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন চূড়ান্ত সমঝোতার পথ খুঁজছে, তখন বিশ্ববাজারে তেলের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি কেমন হবে তা নির্ধারণ করছে চীন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ চীন ইতোমধ্যে তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি কমিয়ে, বিশাল মজুত ব্যবহার করে এবং পরিবেশবান্ধব ক্লিন এনার্জির (স্বচ্ছ জ্বালানি) ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে তেলের উচ্চমূল্যের ধাক্কা সামাল দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হলেও, চীনের এ বিপর্যয় সামাল দিতে বেগ পেতে হয়নি। অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারেও।
২০২৬ সালের শুরুতে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের কারণে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা করেছিলেন, অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেলের সংকট থাকলেও তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়েনি। এর প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা চীনের ভূমিকাকেই সামনে আনছেন।
জ্বালানি বিষয়ক থিঙ্ক-ট্যাংক 'এম্বার' এর প্রধান ড্যান ওয়াল্টার বলেন, ’চীন এখানে এশিয়ার বাকি দেশগুলোর জন্য একটি বাফার (সুরক্ষা কবচ) হিসেবে কাজ করেছে, যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছে।’
সোমবার (২২ জুন) বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড 'ব্রেন্ট ক্রুড'-এর দাম প্রতি ব্যারেলে ৭৮ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা দ্রুত স্বাভাবিক বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে। এমন পূর্বাভাসের পরই তেলের দাম কমতে শুরু করে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের আগের সপ্তাহগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ৭০ ডলারের নিচে, যা গত মে মাসের শুরুতে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১৪ ডলারে পৌঁছেছিল।
চীনের 'অদৃশ্য হাত'
জুন মাসের শুরুতে ফরাসি বহুজাতিক ব্যাংক 'সোসাইটি জেনারেল' এর বিশ্লেষকেরা জানান, ১৯৭৩ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞার সময় বৈশ্বিক সরবরাহে মাত্র ৭ শতাংশ ঘাটতির কারণে তেলের দাম ১৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এবারের ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের সরবরাহ ১৪ শতাংশ ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও দাম সে অনুপাতে বাড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখানে বাজার নিয়ন্ত্রণে 'অদৃশ্য হাত' হিসেবে কাজ করেছে। দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি কমিয়েছে, যা প্রায় জাপানের মোট দৈনিক চাহিদার সমান।
যুদ্ধ শুরুর আগেই রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে কম দামে প্রচুর তেল কিনে নিজেদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত গড়ে তুলেছিল চীন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'রাইস্ট্যাড এনার্জি'-এর তেল বাজার বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনিভ শাহ বলেন, চীনের কাছে বর্তমানে ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা দেশটি মে মাস থেকে ব্যবহার করা শুরু করেছে। এ ছাড়াও দেশের বাজারে সরবরাহ ঠিক রাখতে চীন ডিজেল ও পেট্রোলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করেছে। ফলে চীনের শোধনাগারগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করে দেয়।
এ ছাড়াও চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) অভাবনীয় বিপ্লব খনিজ তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া প্রতি দুটি যাত্রীবাহী গাড়ির একটিই পরিবেশবান্ধব বা বৈদ্যুতিক গাড়ি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-র হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির কারণে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের ব্যবহার কমেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, চীন চিরকাল এই মজুত তেলের ওপর নির্ভর করবে না। তেলের দাম কিছুটা কমলেই চীন আবারও বিশ্ববাজার থেকে তেল কিনে নিজেদের শূন্য ভাণ্ডার পূরণ করা শুরু করবে।
ঘাটতির পরে হতে পারে সরবরাহের প্লাবন
ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তেল সংকটের পর, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এখন বলছে, হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে আটকে থাকা প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল একযোগে বাজারে চলে আসবে। ফলে আগামী বছর বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত আইইএ-র মাসিক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন স্বাভাবিক হলে আগামী বছর চাহিদার তুলনায় দৈনিক ৪৭ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল বাজারে আসবে।
তবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ইতোমধ্যেই গ্রীষ্মকালীন তেলের চাহিদা মিটিয়ে ফেলেছে। এ অবস্থায় বাজারে ভারসাম্য ফেরাতে চীনের সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই মুহূর্তে বাজারে তেলের অতিরিক্ত জোগান শুষে নেওয়ার ক্ষমতা কেবল চীনেরই আছে। এখন প্রশ্ন হলো, ’চীন কী দামে এবং কত পরিমাণ তেল কিনতে চাইবে?’
থিওটোনিয়াস/