‘যাবার কোনো জায়গা নাই হামার। স্কুলত উঠছি। যেমন করি ভাঙগে, দুই দিনত স্কুলত ভাঙি যাইবে। হামাক শ্যাষ করি দিছে নদী। বাচ্চাদের নিয়ে কী খামো। কোডাই থাকমো উপায় নাই।’ এভাবেই নিজেদের আকুতি জানাচ্ছিলেন নুরনবী-মরিয়ম দম্পতি। সম্প্রতি ধরলা নদীর ভাঙনে বাড়ি হারিয়ে খুদিরকুটি আব্দুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে ধরলা নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনে একের পর এক সরকারি স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। ভিটেমাটি হারাচ্ছেন নুরনবী-মরিয়ম দম্পত্তির মতো শত শত মানুষ। এরই মধ্যে খুদিরকুটি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বহুতল এই বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রটি বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের একমাত্র আশ্রয়কেন্দ্র ছিল। ধসে গেছে আক্কেল মামুদ কমিউনিটি ক্লিনিকটিও। বেগমগঞ্জ কমিউনিটি ক্লিনিকটি যেকোনো মুহূর্তে ধরলায় পতিত হতে পারে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কয়েক দিনে এলাকাটির শতাধিক বাড়ি ধরলায় ভেঙে পড়লেও ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
ইউনিয়নের খুদিরকুটি, ব্যাপারীপাড়া, বালাডোবা, মোল্লারহাট গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ছিল কমিউনিটি ক্লিনিকটি। খুদিরকুটি গ্রামের রেশমা বেগম বলেন, ‘বাড়ি নাই। ক্লিনিকত গেইল (গেছে)। সোগ (সব) যাবার নাগছে। এলা (এখন) জ্বর হলে এলাকার মানুষ ওষুধ পাবার নোয়ায় (পাবে না)। বাড়িত পানি উঠলে যাওয়ার জাগা থাকিল (থাকল) না।’
আক্কেল মামুদ কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) ইমরান হাসান বলেন, ‘৫ থেকে ৬টা চরের মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল ছিল এই কমিউনিটি ক্লিনিকটি। প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখানে সেবা পেত। ক্লিনিকটি ভেঙে পড়ায় চরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের লোকেরা আবার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ল।’ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন মঞ্জুর এ মুর্শেদ বলেন, ‘ভাঙনের খবর পেয়ে পাউবো ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয়ব্যবস্থা নেওয়ার আগে ক্লিনিকটি ভেঙে পড়েছে।’
শুধু এবারই নয়, ধরলা নদীতে পানি বাড়তে শুরু করলে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ব্যাপারীপাড়া, মণ্ডলপাড়া, খুদিরকুটি, কালিগঞ্জ এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। এ বছর ভাঙনে তিনটি মসজিদ বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই খুদিরকুটি আব্দুল হামিদ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করেন। সেই স্কুলটিও যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এবারে ধরলা নদী যেভাবে ভাঙছে, গত কয়েক বছরে এমনটা দেখা যায়নি। শতাধিক বসতবাড়ি ভেঙে গেছে।
অনেকেই ঘর সরানোর সুযোগ পাননি। এখানকার মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল, আক্কেল মামুদ কমিউনিটি ক্লিনিকটাও গেল। বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র বিলীন হলো। বন্যা হলে মানুষের যাওয়ার জায়গাটাও থাকল না। এই ইউনিয়নে আরও একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। সেটাও যেকোনো মুহূর্তে নদীতে ভেঙে পড়তে পারে। ইউনিয়নের মধ্যে একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেটাও ভাঙনের মুখে পড়েছে। এ ভাঙন ঠোকানো না গেলে কমপক্ষে দুই কিলোমিটার জায়গা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। এতে পাঁচ শতাধিক পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারাবে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। ভাঙনরোধে কয়েক দিন ধরে পাউবো জিও ব্যাগ ফেলছে। তবে আগে থেকেই যদি পাউবো ভাঙনরোধে কাজ করত তবে আশ্রয়কেন্দ্র ও ক্লিনিকটি রক্ষা করা যেত।’
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘প্রথম কয়েক দিন ভাঙন তীব্র থাকায় কাজ শুরু করার সুযোগ হয়নি। তবে বেগমগঞ্জ কমিউনিটি ক্লিনিক ও আব্দুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয়টি রক্ষায় প্রাথমিকভাবে নদীতে ২ হাজার ৫০০ বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজ শুরু হয়েছে।’